বল্লরী’র ‘হয়ে ওঠা’

0

শময়িতা বিনীতা
আমি বল্লরীকে যখন থেকে চিনি তখন সে আমার চোখে পড়েনি। সাধারণ সুশ্রী চেহারার একটা মেয়ে। চাকরী সে একটা করে তবে তারচেয়েও বেশি করে সংসার। কোন জামা পড়বে, কি হবে ডিজাইন, জুতা আর গয়না কিনবে, কোন দোকানের শাড়ি ভালো-এসব গল্পই বেশি শুনেছি ওর মুখে। একটা মেয়ে আছে ছোট, মুখে বরের গল্পও প্রায় লেগেই থাকে। সবমিলিয়ে সাধারণ সুখী একটা গল্প। সেই বল্লরীকেই কিছুদিন পর দেখি চোখের নীচে কালি। পোশাকের পারিপাট্য কিছুটা যেন মলিন। খাওয়া নেই দাওয়া নেই, হঠাত হঠাত আনমনা। অফিসের কাজে ভুলভাল। আমি হেসে জিজ্ঞাসা করি, : কি রে প্রেমে পড়েছিস? হঠাত এত উড়ু উড়ু… কি জানি ও হয়তো কারো সাথে খুলতে-মেলতেই চাইছিল নিজের চোখের তলার কালির বাকশো। বল্লরী তার ভাঁজ খোলে। আমি দেখি ভাঁজে ভাঁজে বেদনা। ও কিছুদিন আগে থেকে শুরু করে। বল্লরীর স্বামী বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। সংসারে বিবাহিত এক ননদ আছে যে নিজের শশুরবাড়ী যায় না, স্বামীসহ বাপের বাড়িতেই থাকে। বল্লরী রাজেন্দ্রানীর মতোই সংসার করতে গিয়েছিল, কিন্তু কদিন পরেই শশুর-শাশুড়ী আর তিষ্টাতে দ্যায় না। সারাক্ষণ এটা রাঁধো, ওটা খাওয়াও-তাও সমস্যা না, সমস্যা হলো তাদের এক দাবী-চাকরী ছাড়ো। চাকরী ছেড়ে সংসার করো। বল্লরীর স্বামীকে নানান কথা লাগায়, স্বামী বাবা-মা ভক্ত উত্তম স্বভাবের ছেলে। তারা যা বলেন সে তাই করে। বল্লরীর ননদ শশুড়বাড়ী যেতে পারে না, অতটা সাজতে-গুজতে জানেনা, বল্লরী জানে, বল্লরী চাকরী করে, গুছিয়ে সংসার করে—এসব কিছুতেই সহ্য হয় না শাশুড়ী আর ননদের। তারা নানাভাবে উত্যক্ত করতে শুরু করে বল্লরীকে। সে সহ্য করে। এরই মধ্যে মেয়ে হলো। শাশুড়ী বললেন, বাচ্চা দেখতে পারবেন না। কাজের লোক আনলেও শাশুড়ী তাকে এত পীড়ন করে যে কেউ টিকতে পারে না। বল্লরী সব সহ্য করে। ভোরবেলা থেকে অফিস ডিউটি করে, নিজের জানের উপর দিয়ে উঠিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে চাকরীটা টিকিয়ে রাখে। ও বলতো তখন, : আপা মায়েদের কোন ছুটির দিন নাই। ভোররাতে উঠে রেডি হই। বাসায় ফিরলে শাশুড়ী বাচ্চা আমার কাছে ছুঁড়ে দিয়ে বলে, এখন একটু ঘুমাতে যাই। একটা ছুটির দিন, সেদিনও সারাদিন রান্না ঘরে কাটাই ওদের খুশী করতে। আমি বলতাম, : চাকরী ছাড়ো না কেন, না হয় সংসারটাই করলে… ও বলে, : কার ভরসায় আপা? আমার বর যদি কোনদিন বের করে দ্যায়, কোন ঠিক আছে… কিছুদিন পর কি হয়, বল্লরীর স্বামী নিজেই বুঝতে পারে তার মা আর বোন স্ত্রীর সাথে অন্যায় করছেন। ওরা আলাদা বাসা নেয়। দুজনে ভাগাভাগি করে অফিস ডিউটি করে, বাচ্চা দেখে, একটা বয়স্ক কাজের লোকও পায়। বল্লরী এই প্রথম নিজের সংসার পেল। মনের খুশীতে নিজের বেতনের জমানো টাকায় এটা-সেটা কেনে, আলমারী কেনে, পালঙ্ক সাজায়। মাঝে মাঝে শশুড়বাড়ী যায় এটা-সেটা রান্না করে নিয়ে। ভাবে দূরে থাকলেই আসলে সম্পর্ক ভালো থাকে বেশি। একটা গোছানো জীবনের আনন্দে বুঁদ হয়ে থাকে সে। এরপর এলো ঝড়। হঠাতই শাশুড়ী তার একমাত্র ছেলেকে আবার ফিরে আসতে বলেন একসাথে থাকার জন্য। বলেন, যা হওয়ার হয়েছে। ছেলেও ফেরার জন্য একপায়ে খাঁড়া। বড় একটা বাসাও ঠিক করে ফেলে সে বল্লরীকে প্রায় না জানিয়েই। এইবার বল্লরী বেঁকে বসে। সে যাবে না। বল্লরীর এক কথা, যে যন্ত্রণা আমাকে তারা দিয়েছেন, আমি আবার কেন ফিরবো, কোন সমস্যা তো নাই, তুমি একমাত্র ছেলে টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য কর,( যদিও বল্লরীর শশুড় এখনও চাকরী করেন, সংসার চালানোর পুরো ক্ষমতা তার আছে।) আমরা প্রায়ই যাচ্ছি ঐ বাসায়, তবে কেন একসাথে থাকতেই হবে?

বল্লরীর উপর কঠিন অত্যাচার নামে এবার। গায়েও হাত তোলা হয়। ওর স্বামী ফিরে যায় বাবা-মায়ের কাছে। বাসা ভাড়া থেকে শুরু করে এই সংসারে একটি পাই-পয়সাও খরচ করে না সে। এমনকি বাচ্চাটাকেও মাঝে মাঝেই নিজের কাছে নিয়ে তিন/চারদিন পর্যন্ত মায়ের কাছে আসতে দ্যায় না।

আমি দেখি সাধারণ শাড়ি-চুড়ির গল্প করা একটা মেয়ের “হয়ে ওঠা”। বল্লরী দাঁতে দাঁত চেপে সমস্ত সহ্য করে, আমি বলি, : তুমি তো সিক হয়ে যাবা, ফিরে যাও নয়তো একটা কিছু সিদ্ধান্তে আসো, এমনও তো হতে পারে যে তোমার শশুড়বাড়ীর লোকজন তোমাকে এবার বুঝতে পারবেন… বল্লরী বলে, : আমি ওদের খুব ভালো চিনি আপা, ওরা বদলানোর না। সেটাও বড় কথা নয়। আমার কোথায় লেগেছে জানো? আমার স্বামী আমার মতামতকে বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা করে না। আমি আমার স্বীকৃতি আর সম্মানটা চাই। বাবা-মায়ের সাথে বাসা নেয়ার সিদ্ধান্ত তো সে আমার সাথে আলোচনা করে নেয়নি, আমি কি পুতুল? যখন যেভাবে বলবে সেভাবে চলতে হবে, হোয়াটস রং আপা?

বল্লরী একা বাসায় থাকে। একা বাজার করে, রান্না করে, মেয়েটাকে ওর বর নিয়ে গেলে সারা রাত টিভি চালিয়ে, আলো জ্বালিয়ে ঘুমায় যেন একা না লাগে। খাওয়া গলা দিয়ে নামে না, কাজে মন বসে না, তবু সে শক্ত হয়ে থাকে। স্বামী ম্যাসেজ পাঠায়,বলে, : তোমার স্বামী-সন্তান সব আছে, তবু তুমি জেদ করে নিজের সর্বনাশ করছো, আমি ডিভোর্স চাই… বল্লরী চুপ করে থাকে, ধৈর্য্য ধরে। আমারই অস্থির লাগে, বলি, : বল্লরী এভাবে তো হয় না। না হয় আলাদাই হয়ে যাও। ও বলে, : সংসার ভাঙতে চাই না। আর সবচেয়ে বড় কথা কি জানো, যেকোন কিছুর মিক্সিং খুব খারাপ। আমার স্বামী যদি শুধুই বউ পেটানো স্বামী হতো, আমার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া ইজিয়ার হতো, কিন্তু সে কখনও ভালো, কখনও মন্দ। আমার কথা ভেবেই তো আলাদা বাসা নিল, এখন আবার ঐ বাড়িতে ফেরার জন্য পীড়নও করছে…কি বুঝবো বলো? সংসার ভাঙলে যদি পরে পস্তাতে হয়! আপা তোমাকে বলি, সত্য উত্তম, মিথ্যাও চলতে পারে, কিন্তু অর্ধসত্য ভয়ংকর।

বল্লরী এখনও এই অবস্থাতেই আছে। আমি শূধু দেখি সাধারণ সাদাসিদে এক মেয়ের স্পর্ধিত হয়ে ওঠা। ওর বসার ভঙ্গীই বদলে গেছে। শিড়ঁদাড়া টানটান, ঋজু একটা মেয়ে-যে স্বামীর কাছে আর কিছুই চায় না, শাড়ী-গয়না এমনকি সংসার খরচও নয়, শুধু চায় সম্মান, নিজের মতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আর দূরে সরাতে চায় অর্ধসত্য। বল্লরীর চোখের তলার কালী হয়তো আরও একটু বেড়েছে, তাও ওকে আমি আগের চেয়ে অনেকবেশি সুন্দর ও সুন্দরী দেখি। রূপ আর গুনমুগ্ধ হয়ে রই।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৩৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.