যন্ত্রের যন্ত্রণা না যন্ত্রনাকারীর?

0

সালেহা ইয়াসমিন লাইলী: আজকাল ফোনে কথা বলতে আমার ভাললাগে না। কারণে অকারনে ফোনটি বেজে উঠলে বুকটা ধরপর করে ওঠে। ফোনে ভাইব্রেশন হলে হার্টবিট বেড়ে যায়। ফোনে কেউ অপ্রয়োজনিয় কথা বললে অস্থির লাগে। কান গরম হতে থাকে। ধৈয্য রাখতে পারিনা বিনয় দেখানোর। ফোন রেখে দেই। খুব ইচ্ছে করে মোবাইল ফোনহীন সময়ে ফিরে যেতে। চেষ্টাও করি। মাঝে মাঝে ফোন বাসায় রেখে বাইরে চলে যাই। কখনও সাউন্ড অফ করে আলমারীতে তুলে রাখি।

তাতে সমস্যা যা হয় প্রফেশনাল। সাংবাদিকতার শক্তিই হলো সংযোগ। সেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলে সংবাদে পিছিয়ে পড়ি। অফিস থেকে জরুরী খবর পেতে বা নিতে ফোন দিয়ে পায় না বলে অভিযোগ তোলে। খুবই সাধারন সমস্যা। কিন্তু আমার জন্য সমস্যাটি অসাধারন বিড়ম্বনার। যখন ফোনের সুইচ অন করি দরকারী ফোনগুলোতে কলব্যাক করতে করতে আবারো হাপিয়ে উঠি। কি করব ভেবে পাই না।

ফোনের বিড়ম্বনায় পেশা বদলেও উপায় নাই, উপায় দেখি না সংযোগ বিচ্ছিন্নের। ফোন ভীতি কাজ করে সবসময়। কোনদিকে মনযোগ নিবিষ্ট করতে পারি না।

আমার এক বন্ধু প্রায়ই বলতো, ‘ফোনে বেশী কথা বলতে ভাল লাগে না, সাক্ষাতে বলব।’ যদিও তার ফোনটি তাকে গোসল ও ঘুমানোর সময় ছাড়া হাতছাড়া করতে দেখিনি কোনদিন। ইদানিং তার কথাটি খুব মনে পড়ে যখন বাধ্য হই বেশীক্ষণ ফোনে কথা বলতে। ইচ্ছে হয় তাকে বলি, ‘আমারো এই রোগে পেয়েছে, ফোন ভীতি। শুধু কথা বলার ভয় নয়, ফোনটি হাতের কাছে রাখতেও ভাল লাগে না।’

প্রফেশনের কারণেই বহু মানুষের সাথে সংযোগ। ফোন নম্বর নেয়া ও দেয়া। বলা হয়, যার সোর্স যত বেশী, তিনি তত ভাল সাংবাদিক। এই ভাল সাংবাদিক হওয়ার প্রতিযোগীতায় সব সময় ফোন দেয়া ও রিসিভ করতে হয়। এতে কিছু অতি উৎসাহী মানুষ অযাচিত ফোন করার সুযোগ নেয়। তবুও সম্পর্ক বা সোর্স এর গুরুত্ব দিতে বিনয় দেখিয়ে যেতে হয় কথা বলে বলে। জেলা শহরের নারী সাংবাদিকদের প্রায় সকলেই একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন বলে শুনে থাকি। কিন্তু শিষ্টাচার ও রুচিবোধের ভিন্নতা ও সহনশীলতা কম থাকার কারনে হয়তো আমি বেশী আক্রান্ত বোধ করি।

যন্ত্রের যন্ত্রনা, প্রযুক্তির বিড়ম্বনা এসব থেকে বের হওয়ার কোন সুযোগ হয়তো হয় না, তবে কাজের কাজটি যে কত সহজ করেছে মোবাইল ফোন তা ভেবে আপ্লুত হই । প্রয়োজনে যখন ফোনটি কাজে লাগে তখন নিজেই মুগ্ধ হই। মাঝরাতে যখন বুকের ব্যাথা নিয়ে হাসপাতালে ফোন দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ও ডাক্তার বাসায় আনি, ভাল লাগে। কোথাও যাওয়ার আগে যখন প্রয়োজনীয় মানুষটার অবস্থান নিশ্চিত করে নেই, সময় অপচয় হয় না। জরুরী সংবাদ পেতে ও দিতে এই ফোন যুগান্তকারী সফলতা দেখায়। তাই বলে যথেচ্ছ ব্যবহার সহ্য করতে হবে কেন?

ফোন তো নিজে নিজে বেজে ওঠে না। ব্যবহারকারীরা বাজতে বাধ্য করে। করুক। প্রয়োজনে। কিন্তু অপ্রয়োজনে বা অকারনে এর ব্যবহার বন্ধ করার জন্য ব্যবহারকারীদের আত্মউপলব্দি না থাকলে তার স্বীকার হতেই হবে। আমরা বাঙালীরা আড্ডাবাজ ও বাচালতা করে শান্তি পাই। জীবনের বড় সময় নষ্ট করি অযথা। কে কোন কথায় বিরক্ত হল নাকি আকৃষ্ট তোয়াক্কা নাই। নিজের মতো করে শান্তি পাই কথা বলে বলে।

কিছু মানুষকে দেখি একসাথে দুইটা ফোনে অনবরত কথা বলতে। একজনকে থাকিয়ে রেখে অন্যজনকে স্পেস দেয়। কথার ফাঁকে ফাঁকে আবার অধিনস্তদের নির্দেশনাও অব্যহত রাখে। আমি এই মানুষগুলোর ধৈর্য্য শক্তির প্রশংসা করি। তবে এমন মানুষগুলোর মধ্যে আমি কোন সৃষ্টিশীলতা খুঁজে পাই না। অথচ তারাই হাজার কাজের কাজি হয়ে থাকে। আমি পারি না। এটা আমার অপারগতা। যারা পারেন তারাই যোগ্য। তবে আমার এমন যোগ্য হওয়ার বাসনা নাই। তাই আমি নিস্তার খুঁজি। অপ্রয়োজনিয় ও অযাচিত কথা থেকে নিস্তার চাই।

মোবাইল ফোনটি আমার একেবারেই ভাল লাগে না, তা নয়। আমিও এটি সাথে রাখতে চাই স্বস্তি নিয়ে। আমিও বিশেষ জনের ফোনের অপেক্ষা করি। ফোনও করি। শুধু নিজের ভাললাগার জন্য কথা বলি, শান্তি পাই। হয়তো আমি যাকে ফোন করি তারও আমার মতো উপলব্দি বা ফোন ভীতি হয়।

লেখক ও সাংবাদিক

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.