সাহেরা কথা- ১৬

Black womenলীনা হাসিনা হক: বেশ কিছুদিন থেকেই সাহেরার মনটা ভার ভার। ভাবি, হয়তো গ্রামে রেখে আসা বড় মেয়েটার জন্য মায়ের মন কাঁদে, ছোটটা সাহেরার সাথেই থাকে। অসুস্থতাজনিত ছুটিতে জমে থাকা কাজের চাপে দিশেহারা আমি আর সাহেরার সাথে এটা নিয়ে বেশী আলাপ করতে পারি না।

অফিসের কাজ মোটামুটি সামলে এক সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এটা সেটা কত কাজ থাকে, তার উপরে আমার বারান্দার গাছগুলো বর্ষার জলে হাওয়ায় লতিয়ে উঠেছে, বারান্দার গ্রীলে কোনও জায়গা নাই। এগুলো ঠিক ঠাক করতে হবে। ড্রাইভারকে দিয়ে মাটি আর সার আনিয়েছি, বসে বসে টবে মাটির সাথে সার মিশিয়ে দিচ্ছি, সাহেরা যথারীতি আমার পাশে। টুক টাক কথা বলি। ঝুঁকে টবের মাটি ঠিক করতে করতে জানতে চাই, কি হয়েছে, মন কেন ভার ভার সাহেরার? সাহেরা জোরে শব্দ করে কেঁদে ওঠে! একটু অপ্রস্তুত বোধ করি। হাতের মাটি ধুয়ে সাহেরাকে নিয়ে ঘরে এসে বসি। কি হয়েছে সাহেরা, খুলে বল আমাকে।

চোখের জল মুছে সাহেরা জানায়, সাহেরার রিকশাচালক স্বামী গত বছর যখন সাহেরারা শীতের ছুটিতে বাড়ী গিয়েছিল সেই সময় কাউকে না জানিয়ে পাশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে নিজের ভ্যাসেকটমি করিয়ে এসেছে, সে একটা লুংগি আর কিছু টাকা পেয়েছে। সেই টাকা দিয়ে জুয়া খেলেছে! আমি বলি, এতো ভালই হয়েছে সাহেরা, ছেলে ছেলে করে তোমার মাথা আর খারাপ করবে না। মেয়ে দুটোকে ভালো মতন মানুষ করো। সাহেরা আরও জোরে প্রায় ডুকরে কেঁদে ওঠে।

ফোঁপাতে ফোঁপাতে এইবার যে কথা শোনায় সাহেরা, তাতে আমার মাথায় যেন বাজ পরে! সাহেরার স্বামী যৌন সক্ষমতা হারিয়েছে। প্রায় দেড় বছর ধরে সাহেরা এই অবর্ণনীয় কষ্টের আর লজ্জার কথা নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছে এমনকি আমাকেও বলে নাই। আমি বোঝানোর চেষ্টা করি যে ভ্যাসেকটমিতে কখনো এমন হয় বলে আমার জানা নাই। কিন্তু সাহেরার বদ্ধমূল ধারণা এই কারনেই এমন হয়েছে।

আমি অনেক চিন্তা ভাবনা করে প্রস্তাব করি তার স্বামীকে আমার পরিচিত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য, কেউ জানবে না আর চিকিৎসার খরচ আমিই দিবো। বেশ কয়েকদিন কথা বার্তা বলার পরে সাহেরা তার স্বামীকে নিয়ে গেল আমার পরিচিত ডাক্তারের কাছে, আমি আগেই বলে রেখেছিলাম।

রাতে ডাক্তার ফোন করে বললেন, কেস হিস্ট্রিতে দেখা যাচ্ছে সাহেরার স্বামী অনেকের সাথে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে যার মধ্যে বস্তির পাশের ঘরের প্রতিবেশীর স্ত্রী থেকে শুরু করে ভাসমান যৌনকর্মী সবাই আছে! কেস হিস্ট্রিতে আরও বলে যে, কনডম সে ব্যবহার প্রায় করেই নি কখনো। সাহেরার স্বামীর বেশ কয়েকবার নানাধরনের যৌনরোগ হয়েছিল, তখন সে টোটকা, কবিরাজ করেছে আর কয়েকবার ফার্মেসীর লোকের কাছ থেকে হয়তো কিছু এনটি বায়টিক সেবন করে সাময়িক সমস্যা দূর করেছে। কিন্তু তার এখনো রোগ রয়ে গেছে বলে ডাক্তার ধারণা করছেন এবং কিছু রক্ত ইত্যাদি পরীক্ষা করতে দিয়েছেন। আমি আর সাহেরাকে এগুলো কিছু বলি না।

এক সপ্তাহের মধ্যে রক্ত পরীক্ষার ফল জানা গেল, ডাক্তার সাহেবের ধারণাই ঠিক, সাহেরার স্বামী যৌনরোগে আক্রান্ত অনেকদিন ধরেই আর তারই ফলশ্রুতিতে এই যৌন অক্ষমতা। আমার মনে ভয়, সাহেরাও কি সংক্রমিত! সাহেরাকে নিয়ে নিজে গেলাম ডাক্তারের কাছে, সব পরীক্ষা নিরীক্ষা করে কিছু সমস্যা পাওয়া গেল কিন্তু ততটা বিপদজনক নয় আর ডাক্তার আমার স্কুল জীবনের বন্ধু, যত্ন করে চিকিৎসাপত্র লিখে দিলো, বুঝিয়ে বলল সাহেরাকে। ওষুধপাতি কিনে বাড়ী ফিরলাম। সাহেরা পরবর্তী এক মাসে পরিপূর্ণ সুস্থ। আর কোনও সমস্যা তার পাওয়া গেল না।

সাহেরার স্বামীরও চিকিৎসা চলছে। আমি সাহেরাকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলাম কি কারনে তার স্বামীর এই অবস্থা হয়েছে। হয়তো ভাল হয়ে যেতে পারে। চিকিৎসাটা চালিয়ে যেতে হবে। ওষুধের দাম বেশী কিন্তু সাহেরার দিকে তাকিয়ে এই খরচটুকু তো আমাকে করতেই হবে।

আমি একটু জানতে চাইলাম স্বামীর চরিত্রের এই দিকটি সে জানতো কিনা। সাহেরা কেঁদে দিয়ে বলল এগুলো নিয়ে অনেক অশান্তি হয়েছে। বস্তির প্রতিবেশীরা জানে এসব আর একবার নাকি সাহেরার অবর্তমানে কোন মেয়েকে ঘরে এনে তুলেছিল সেসব নিয়ে অনেক কাণ্ড। যাইহোক, বললাম তাকে যে এবার হয়তো ঠিক হবে স্বামী। ম্লান মুখে সাহেরাও মাথা নাড়ে, হয়তো হবে।

এরই মধ্যে গত সপ্তাহে একদিন রাত প্রায় ১১টার দিকে নীচের সিকিউরিটি গার্ড ইন্টারকমে জানালো সাহেরা এসেছে সাথে তার মেয়েটা, ওদেরকে কি ওপরে আসতে দিবে কিনা।

কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ঢুকল সাহেরা, চোখ মুখ ফোলা, মেয়ের মুখও কান্না কান্না।

জানা গেল, গত রাতে সাহেরার স্বামী বাড়ী ফিরে নাই, ইদানিং সে প্রায়ই এমন করছে। এটা সে আগেও করতো, মাঝেচিকিৎসার প্রথমদিকে কিছুদিন বন্ধ ছিল। আজ সন্ধায় সাহেরা গেছে বাজার করতে, হঠাৎ তার নজরে আসে স্বামীর রিকশায় সাজুগুজু করা তাদের বস্তিরই একটি মেয়ে বসে আছে আর স্বামী মেয়েটিকে চা বা আইসক্রিম কিছু একটা খুব আদর করে খেতে দিচ্ছে। সাহেরার মাথাতো পুরো ঘুরে গেল। চিৎকার চেঁচামেচি, লোকজন জড়ো হল, মেয়েটির বরাতে জানা গেল, সাহেরার স্বামীর সাথে বেশ কিছুদিন থেকে মেলামেশা চলছে। রিকশা করে ঘুরে বেড়ানো, সিনেমা দেখা আর বার কয়েক সাহেরার অবর্তমানে তাদের ঘরে সময় কাটানো। এটুকুই তারা করেছে!!!

বাজারের মানুষের সামনে স্বামীর চরিত্রে কালিমালেপনকারী অসভ্য মেয়েছেলে সাহেরাকে খেতে হল বেদম পিটুনি, বাম হাতের কবজি জখম, ৯ বছরের মেয়েটিও রেহাই পেল না, সবার শেষে সেই মোক্ষম অস্ত্র, সাহেরাকে নিয়ে ঘর করার কোন ইচ্ছা স্বামীর নাই, এই কালো কুচ্ছিত বউকে সে আর দেখতে চায় না, প্রয়োজনে তাকে তালাক দিবে। আর তার বেটামানুষী (যৌন) শক্তি ফিরে এসেছে, কাজেই সে যা ইচ্ছা তাইই করতে পারে এখন।

সাহেরাদের বাড়ীওলা বুদ্ধি করে সাহেরাকে তার মেয়ে সহ আমার বাসার সামনে দিয়ে গেছে। ডাক্তার বন্ধুকে ফোন করে সাহেরাকে পেইন কিলার আর ঘুমের ওষুধ দেই। রাতটা রেস্ট নিক, সকালে কথা বলবো।

পরদিন ভোরে ঘুম ভেঙ্গে দেখি সাহেরা আমার জন্য চা বানিয়ে এনেছে। তার মুখ চোখ বেশ শান্ত। জানতে চাইলাম, স্বামীকে ডেকে এনে কথা বলবো কি না! শান্ত গলায় জানালো, তার দরকার নাই, আজ ভোরে সে তার বাবাকে ফোন করেছে, সাহেরার বাবা দুদিন পরে এসে ছোট মেয়েটাকে নিয়ে যাবে গ্রামে। ওখানেই স্কুলে পড়বে সে তার বড় বোনের সাথে। সাহেরা আমার কাছে থাকবে, আমি যেন আর ৫০০ টাকা বাড়িয়ে দিই। স্বামীর ঘরে সে আর আপাতত ফিরে যাচ্ছে না। আদৌ যাবে কিনা তা ভেবে দেখবে আর বাবা মায়ের সাথে আলাপ করবে। কারন গত ১৫ বছর ধরে এই অশান্তি সে সহ্য করেছে কিন্তু এখন আর পারছে না, চাইছেও না। আমি বেশ অবাক হলাম সাহেরার এই সংহতরূপে, সত্যি বলতে একটু ভালও লাগলো। যাক, নিজের ভালটা অন্তত বুঝতে পেরেছে। পরেরটা পরে দেখা যাবে, হাঁফ ছাড়লাম একটু।

চা শেষ হয়েছে, কাপ তুলে নিয়ে যেতে যেতে সাহেরা আমার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘ আফা, তোমার মোর একখান অনুরোধ, এই হারামীর (স্বামীর) চিকিৎসা বন্ধ করার জন্য ডাক্তারক একনা ফোন করি দেও, শইল ঠিক হইছে, জিনিসখান (প্রজনন যন্ত্র) ঠিক হবার নাইগছে কি নাগে নাই, হারামজাদার বজ্জাতি শুরু হইছে। ওমাক ( তাকে) দিয়া মোর তো আর এই জনমে সুখ হবার নয়, তুমি কিসক ওর কেরামতি (যৌন সক্ষমতা) ফিরানর জন্য টেকা খরচ কইরবেন? ঠিক হইলেও তো ও আমার কাছে ফিরবার নোয়ায়, তুমি এই চিকিৎসা বন্ধ করেন!’

আমি বসে থাকি খাটের উপরে আর বোঝার বৃথা চেষ্টা করি সাহেরার মনের কষ্টের গভীরতাকে!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.