একা থাকা কোনো ‘ক্রাইম’ না

Aparna 2সামিমা ঝুমুর: “সামিমা ঝুমুর ইজ ইন এ রিলেশনশিপ” এই কথাটি আমাকে অনেক সাহস নিয়ে লিখতে হয়েছে। “আমার সমাজ” আবার কি না কি ভাবে চকিতে একটি ভাবনা মনে উঁকি দিয়ে হারিয়ে গেল আমার অবস্থানের কাছে, আমি টিন-এজার নই, আমি অনেক কিছু দেখেছি, যুদ্ধ করেছি, তারপর আজ এখন নিজেকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছি।

“একলা মেয়ে মানুষ যেন একটি ক্রাইম, সে হোল সকলের সম্পত্তি, সবার সুদৃষ্টি –কুদৃষ্টি তার প্রতি থাকে সর্বদা”।

আমি একা-এটি কোন ক্রাইম নয়, আমি আমার সংসারটি আর করছি না এটি কোন পাপ নয়, একটি অবস্থা মাত্র। আমি দেখেছি সমাজে অনেক ভালো মানুষ নামের খারাপ মানুষ আছে যারা একলা থাকার ব্যাপারটি বুঝেও না বোঝার ভান করতে, তাদের অযথা বিষয়টিকে নিয়ে খোঁচাখুঁচি করতে, একলা মেয়েটিকে পথ চলতে সহযোগিতা না করে তার পথটিকে আরও দুর্গম আর দুর্বিষহ করতে।

বিয়ে কি একটি মেয়ের একমাত্র সামাজিক পরিচয়? আমাকেও নিজের মনের বিরুদ্ধে আমার বৈবাহিক অবস্থান নিয়ে অনেক সময় ছলনা করতে হয়েছে যত টানা নিজের প্রয়োজনে-তার চেয়ে বেশী সমাজের প্রয়োজনে! আমাদের সমাজ আজও কেন মেনে নিতে পারে না একটি মেয়ের একা থাকার ইচ্ছেটাকে? আমি এমন অনেক মেয়েকে জানি যে কিনা শুধু সমাজের ভয়ে আর সাহসের অভাবে দিনের পর দিন সংসার করে যাচ্ছে অসম্ভব মানসিক কষ্ট নিয়ে এবং একটি সময় একটি অসুখী মন নিয়ে মারা যায়! এটা কি কোন জীবন হলো?

আমিও একটি সময় কেঁদেছি, চিৎকার করেছি, মন খারাপ করেছি, কিন্তু পরে নিজেকে সামলেছি; বড় কঠিনভাবে সামলেছি, এখন আমি মানুষের মুখের উপর সত্য কথা বলতে পারি, তাঁকে সুন্দরভাবে কটু কথা বলতে পারি। আসলে আমার চরিত্রই এমন, অনেক ছোট বেলাতে আমার মা-বাবা আমাকে নিয়ে ভাবতেন এই মেয়েটার এমন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে কেমনে টিকবে এই সমাজে!!

আজ আমি বলব “মা আমি টিকেছি”। আমার এই পথ চলার সবচেয়ে বড় শক্তি যুগিয়েছে আমার মেয়ে “ধরিত্রী”, আমি অবাক হই -খুশী হই- গর্ব করি ওকে নিয়ে। আমার খুব কাছে বন্ধু আমার মেয়ে, আমাকে আগলে রেখেছে বলতে পারেন। খুব সহজ কথায় আমার মেয়ে আমাকে এই রিলেশনের ব্যাপারে ‘হ্যাঁ’ বলতে সাহায্য করেছে।

একটি ঘটনা ওর সম্পর্কে না বললেই না, কোন একদিন আমি অনেক কষ্ট নিয়ে কোন একজনের কথা বলেছিলাম “মা দেখ ও আমাকে এত কষ্ট দেয় যে আমার ওর কথা মনে পড়লেই অনেক কষ্ট হয়, আমার মেয়ের উত্তর “তুমি ওর কথা মনে করো ক্যান? জাস্ট ডিলিট হিম, ডিলিট করা জিনিস তো আর ফিরেও আসতে পারে না, আর তোমার মনেও পড়বে না”।

আমার মেয়েকে আমি সব বলি, আমার মা বলে “তুই কি বল তো, মেয়েকে কেউ বলে এই কথা”। কিন্তু সে আমাকে সবসময় এমন সব সমাধান দেয়, সত্যি বলতে কি আমার মাথায়ও এমন সহজ সমাধান আসে না। আসলে আমরা বড়রা অনেক বেশী জটিল! আমার চিন্তাটাই শুরু করি জটিল থেকে।

হয়ত আমার এই স্ট্যাটাস দেখে অনেকে ভিন্ন ভাবে ভাবছেন, তাতে কি? আমি-আমরা তো জানিই “সমাজে দড়িকে সাপ ভাবার লোকের অভাব নাই” তবে “দড়ি কে দড়ি ভাবার লোকের বড়ই অভাব” – আমরা কি অদ্ভুত একটি সমাজে বাস করি, যেখানে একটি মেয়েইহয় অন্য একটি মেয়ের সবচেয়ে বড় শত্রু, সেখানে আর কি বলার থাকে, মনটাই খারাপ হয়ে যায়। এইসব মেয়েরা একটি মেকি আবরণ দিয়ে নিজেদেরকে ঢেকে রাখে, যার আসলে কোন প্রয়োজন নাই।

একজন একলা মেয়ে যদি হেসে কোনো লোকের সাথে কথা কয় বা তার চলাফেরা হয় সাবলীল, তবে তার নামে কটু কথা বলার লোকের অভাব হয় না, কিন্তু আমি দেখেছি একজন বিবাহিত ভদ্র মহিলা(!) তার বিবাহিত অবস্থানকে ব্যবহার করে অবলীলায় একের পর এক সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছে। ঠিক তেমনি একজন সমাজের অত্যন্ত গুড ম্যান তার নিজের চরিত্র প্রকাশ করে অবলীলায় একজন একলা মেয়ে মানুষের সাথে, যেন বা এটি তার মহান দায়িত্ব “একজন একলা মেয়েকে সঙ্গ দেয়া”!

আমি সমাজের এইসব অনাচার দেখেছি-শিখেছি আর নিজেকে আরো শাণিত করেছি “পাছে লোকের ভয় আমি করবো না”। আমি অনেক কষ্ট পাই যখন দেখি কোন চাকরির ইন্টারভিউতে একজন মেয়েকে তার হাজবেন্ড সম্পর্কে জানতে চায়, কিন্তু একজন ছেলেকে কি তার ওয়াইফ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়??

আমি আমার পারসোনাল লাইফ আর সোশ্যাল লাইফ সব সময় আলাদা রাখতে চেয়েছি। আমি বিবাহিত, না সেপারেটেড এটা আমার একান্ত নিজের বিষয়, আমার আইডেন্টিটি হোল “আমি ঝুমুর, আমার একটি কিউট মেয়ে আছে, আমি একা থাকি, আমি একটি সম্মানজনক কাজের দ্বারা নিজের জীবন ধারণ করছি”।

বিশ্বাস করুন, আমি কখনই তেমন ভাবে নিজেকে অসুখী ভাবিনি বা হতাশ হইনি, আমার মুখের হাসি নির্ভেজাল আনন্দের হাসি। যারা আমার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে জানেন, তাদের অনেকেই আমার মুখে দুঃখ খোঁজার চেষ্টা করেন, ক্যান যে করে জানি না!

আমি কিন্তু ভাই বিবাহিত জীবনের বিপক্ষে নই, বা অপছন্দ করি তাও নয়। আপনি প্লিজ ভেবে বসবেন না, আমি বিবাহিত জীবনে নাই বলে এত কথা বলছি। বরং পছন্দের কারণেই আবার চিন্তা করছি দোকলা থাকার।

আসলে জীবন চাকাটাই এমন, কখনো একলা তো কখনো দোকলা, আবার হয়তো একলা, এইভাবেই চলে আসছে। আমি যাদের দেখি একটি সুন্দর বিবাহিত জীবন পার করছে বা অন্তত চেষ্টা করছে সুখী-সুন্দর বিবাহিত জীবনের তাদেরকে আমি সম্মান করি, আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা থাকে তাদের প্রতি।

তবে কখনো আফসোস করি না, কারণ আমি ভাবি, “একলা থাকার মাঝে যে আনন্দ সেটা বিবাহিত জীবনে নেই, আবার বিবাহিত জীবনের যে খুশী সেটা আবার একলা থাকার মাঝে নেই!”

সত্যি বলতে কি প্রত্যেকটি অবস্থারই কিছু ভাল-মন্দ দিক আছে, বিষয়টা হল আপনি-আমি কিভাবে দেখছি বা ভাবছি তার উপড়ে। যারা আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তাদের সবাইকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ, আমার জন্য দোয়া করবেন। আমার এই পুরোটা সময়ে যারা আমাকে সত্যিকারের সাহস যুগিয়েছে, তাদের কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ!

আমি একটি কথা বেশ ভালোভাবে শিখেছি “কখনো কারো সমস্যাকে নিজের সাথে তুলনা করো না, কারণ তোমার হয়ত জানা নেই তার জীবনে সে কি পরিমাণ সমস্যার মধ্য দিয়ে নিজেকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে”।

সবশেষে আমার জীবনের মূলমন্ত্র হলো “থিংক পজিটিভ, বি পজিটিভ, ইউ উইল বি হ্যাপি” আই এম হ্যাপি, পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ, একজন সুখী মা, একটি সুখী সম্মানিত জীবন আছে আমার। আমি জানি কিভাবে জীবনকে আনন্দময় করা যায়!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.