বিয়েই যেন সব সমাধান

men vs womenসেবিকা দেবনাথ: মেয়েদের বিয়ে না করে থাকাটা বোধ হয় এক ধরনের অপরাধ। যত বড় ডিগ্রীধারী আর যত বড় কর্মকর্তাই হোক না কেন স্বামী-সংসার পরিপাটি করে রাখাই যার যোগ্যতার একমাত্র মানদণ্ড সেই মেয়ে বিয়ে করবে না!!! এটা কোন কথা হলো? নিশ্চই কোন খুঁত আছে?

আশেপাশের মানুষগুলোর প্রশ্নবোধক চাহনি আর সুযোগ পেলে তারা কথার ঠারেঠুরে বোঝায়, শোন মেয়ে, এসব স্বেচ্ছাচারিতা কিন্তু মেনে নেয়া হবে না। মেয়ে হয়ে জন্মেছো পরের ঘরে তোমায় যেতেই হবে। অন্যের উদাহরণ না টেনে নিজের কথাই বলি।

প্রায়ই অনেকে আমাকে আড়েঠাড়ে কিংবা সোজাসাপ্টা কথায় বোঝাতে চান বা বোঝান যে, বয়স বাড়ছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগ-ব্যাধি বাড়বে/বাড়তে পারে তাই আমাকে সতর্ক করা কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য নয়। আমার বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে সেটাই তাদের মোদ্দা কথা। সুযোগ পেলেই হলো কোন না কোন উছিলায় বিয়ের প্রসঙ্গটা আনা যেন বাধ্যতামূলক। অনেকে তো হাসতে হাসতে বলেই ফেলেন, ‘আর কত দিন? এরপরতো কদর থাকবে না।’

ভাবখানা এমন যেন আমার কদর কমে গেলে, তারা অনেক কষ্ট পাবেন। বেশ কিছুদিন আগে আমার পরিচিত একজন অন্য আরেকজনকে বলতে শুনলাম, আমি মেয়ে হিসেবে খুবই ভাল। কিন্তু পাত্রী হিসেবে না। উনার ব্যাখ্যা আমি মোটা-বেটে। বয়সটাও নেহায়েৎ কম না। বাজারে পাত্রী হিসেবে নিজেকে কখনো মাপা হয়নি। সেই ইচ্ছাটাও নেই। তবে তার যুক্তিটা আমার মনে ধরেছে। সত্যি কথাইতো বলেছেন উনি।

নিজের অসুস্থতার কথা বলাও মুশকিল। কারও কাছে যদি বলি শরীরটা ইদানিং ভালো যাচ্ছে না। তাহলেই কেল্লা ফতে। কেউ কেউ মুন্নাভাই এমবিবিএস-এর মতো ডাক্তারী পাস না করেও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মতন আমায় প্রেসক্রিপশন দেন। বিনা ফি’তে পাওয়া ওই প্রেসক্রিপশনে তারা যে ওষুধের নাম বলেন তা হলো ‘বর’। তাদের ভাষ্য, ‘অনেক তো হলো। বিয়ে কর। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে’।

সামান্য মাথা ব্যাথ্যা, পেটে ব্যাথা সেই ক্ষেত্রেও ওই একই ওষুধ। আমি এর নাম দিয়েছি ‘বর থ্যারাপি’। অনেকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে যান। উপদেশের সুরে বলেন, ‘এখনো যে বিয়ে করছিস না বাচ্চা-কাচ্চা নিবি কবে? ৩৫/৪০ এর পড় তো বাচ্চা নেয়াটা খুবই রিস্কি’।

তখন আমি ওদের বলি, ‘না হলে তোদের একটাকে নিয়ে আসবো’।

ওরা ওই কথায় ভয় পায় কি না বোঝা যায় না। অপ্রস্তুত হয়ে গিয়ে বলে, ‘ঠাট্টা না। সিরিয়াসলি বলছি’।

অনেকে তো আরও গভীরে চলে যান। অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে বিয়ে না হবার কারণ খোঁজায় নেমে পড়েন।

তাদের অবশ্য বেশি কসরত করতে হয় না। এসব ক্ষেত্রে খুব সহজেই উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়। ব্যর্থ প্রেমের উপন্যাসের নায়িকা বানিয়ে দেন তারা। ‘ছ্যাকা খাওয়া পার্টি’র সদস্য বানিয়ে দেন।

তাদের ভাষ্য, ‘নিশ্চই প্রেমে ছ্যাকা/ট্যাকা খাইছে। তাই বিয়ে করছে না’। ধরে নিলাম আমি ছ্যাকা খাওয়া পার্টির সদস্য। তাতে তো আমার কষ্ট পাবার কথা। কিন্তু ওরা এত কষ্ট পায় কেন?

কেউ কেউ হৃদয়ের সব ইমোশন ঢেলে দিয়ে বোঝাতে চান। তাদের ভাষ্য, ‘সব বাবা-মা’ই তো চায় মেয়েদের বিয়ে দিয়ে যেতে। এভাবে গো ধরে থাকাটা আমার ঠিক না’।

বাবা-মা এ প্রসঙ্গে আমাকে কোন কিছু না বললেও তাদের আক্ষেপ আর কষ্টের কোন সীমা-পরিসীমা থাকে না। মাঝে মাঝে ভাবি বিয়েটাই কি সব? আমিতো কোন অসামাজিক কাজ কিংবা অপকর্ম করছি না। তাহলে লোকের এত কথা কেন?

দেশ কত কিছুতে এগিয়েছে। তবুও আমরা আদ্দিকালের গন্ডিতেই কেন গোত্তা খেয়ে পড়ি? দারিদ্র দূরীকরণে সরকার কত পদক্ষেপ নিচ্ছে। ইস্ যদি আমাদের মনের দারিদ্র দূর করতে সামান্য একটু পদক্ষেপ নিতো।

 

লেখক: সাংবাদিক

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.