আরশিতে কাকাতুয়া

Moinusওয়ারশো যাওয়ার ট্রেন ও বালুঝড়

মঈনুস সুলতান: ঘুরে বেড়ানোর জন্য হাতে আরো সপ্তা খানেকের মতো অবসর আছে। কিন্তু জার্মানির ফ্রান্কফুর্ট শহরে আমি আর থাকতে চাচ্ছি না। ভাবছি পোল্যান্ডের দিকে যাবো। ওয়ারশো শহরে জাহাজী শ্রমিকদের আন্দোলনের বিষয়ে খানিক খোঁজখবর নেবো। কোন এজেন্ডা ছাড়া হাঁটবো ফুটপাতে। এখন সামার চলছে, রোডসাইড ক্যাফেতে বসে একটু জিরিয়ে নিয়ে ঢু মারবো শিপ- ইয়ার্ডে; মওকা পেলে খালাসিদের পানশালায় বসে চুটিয়ে শুনে নেবো জাহাজীদের পছন্দ সই ব্যান্ডের বাজনা।

না, ফ্লাই করার মতো অর্থবল নেই, আবার সাত তাড়াতাড়ি উড়ে গিয়ে ওয়ারশোতে ল্যান্ড করার কোন প্রয়োজনও আমার নেই। তাই ট্রেনের টিকিট কেনার জন্য চলে আসি মস্ত এক রেলওয়ে স্টেশনে। কিছুদিন হলো আমি ইউরোপে ট্র্যাভেল করছি, কিন্তু যানবাহন কিভাবে ম্যানেজ করতে হবে, কোথায় টিকিট কাটতে হবে, কোন জায়গায় পাতাল রেল থেকে বেরিয়ে ট্রাম ধরতে হবে ; এ বিষয়গুলো কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না। তাই রেলওয়ে স্টেশনে এসে টিকিট কাউন্টার খুঁজে পেতে আমার বিস্তর সময় লাগে।

ইন্টারন্যাট আবি®কৃত হলেও তখনো জার্মানিতে আজকালকার মতো অনলাইনে টিকিট কেনার বিষয়টি চালু হয়নি। কাউন্টারের কাছাকাছি আমি এক মহিলাকে কুঁজো হয়ে রেলওয়ে ম্যাপ ও টাইমটেবিল ঘাঁটতে দেখি। মহিলার বয়স হয়েছে বিস্তর, তাঁর চুলে রঙ পিজিওন ডাভ বলে এক ধরনের পাখির পালকের মতো রূপালি মেশানো ধূসর। মাত্র মিনিট কয়েক আগে আমি কাউন্টারে নীল চোখা গাব্দাগোব্দা এক ক্লার্কের সাথে ওয়ারসোর টিকিট কেনা বাবদে কথা বলেছি। তার জার্মান ভাষা আমি একবারেই বুঝতে পারিনি, তাই সবিনয় অনুরোধে ক্লার্ক ওভারকোট মোছার ব্রাশ দিয়ে ঘন দাড়ি আচড়াতে আচড়াতে ইংরেজীতে টিকিটের দাম ইত্যাদি বুঝিয়ে বলেছেন। তার ইংরেজী বুলিতে নাখটে মুখটে জাতীয় উচ্চারণ বিভ্রাট থাকায় আমি তারও বিশেষ কিছু বুঝতে পারিনি। তাই তাকে ধন্যবাদ দিয়ে সরে এসেছি কাউন্টার থেকে। এবার এক বৃদ্ধা মহিলাকে ম্যাপ ঘাঁটতে দেখে ভাবি- কথাবার্তা বলে দেখি, যদি তিনি ইংরেজী বুঝতে পারেন তাহলে তাঁর কাছে সাহায্য চাইবো।

মহিলাও নাকের ব্রীজে হাইপাওয়ারের রিডিং গ্লাস ঝুলিয়ে আমাকে খুঁটিয়ে দেখেন। দিন কয়েক হলো ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও গাজায় ইসরায়েলী হামলা বেড়েছে বিঘতভাবে। বোমাবর্ষণে মৃত্যু হচ্ছে নারী শিশু সহ বেসমারিক আমজনতার। ফিলিস্তিনিরা গড়ে তুলছে দ্বিতীয় ইন্তিফাদা বা প্রতিরোধ আন্দোলন। এগিয়ে আসা ইসরায়েলী ট্যাংকের দিকে তারা ছুঁড়ছে পাথরের ঢেলা। আমি ইন্তিফাদার প্রতি সংহতি প্রকাশ করে গলায় প্যাচিয়েছি কেফ্যিয়া বা সাদাকালো চেককাটা স্কার্ফ। আমার হ্যাট ও গাল্ফসার্টে গাঁথা বেশ কয়েকটি বোতাম; তার প্রতিটিতে ইসরায়েলী আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানিয়ে লেখা একাধিক শ্লোগান। হাইপাওয়ারের গ্লাসের ওপর দিয়ে মহিলার চোখের দৃষ্টিকে উদাসীন দেখালেও স্পষ্টত তিনি শ্লোগানের বাণীগুলো নিরিখ করে দেখছেন।

তাঁর সাথে কথা বলার, এবং সম্ভব হলে টিকিট কেনা বাবদে তাঁর সাহায্য চাওয়ার প্রয়োজন আমার আছে। সুতরাং, এগিয়ে যেতে যেতে বৃদ্ধার মুখের এক্সপ্রেশন নিয়ে দ্রুত চিন্তা করি। না, ওখানে করুণা বা সহানুভূতির ছিটেফোঁটাও নেই, তবে আছে শত বছরের পুরানো কোন বইয়ের জরাজীর্ণ পাতার মতো এক ধরনের উদাসীন ভাবগাম্ভির্য্য। পাতাটি যেন বিবর্ণ হতে হতে ঝাপসা হয়ে এসেছে, তাই আমি তাঁর অভিব্যক্তিতে বিশেষ কিছু পড়তে পারি না।

তবে তিনি ‘হোয়াটস্ আপ?’ বলে একটু পজ নিয়ে ‘ হাউ আর ইউ ডুয়িং টুডে?’ বললে আমি যেন তৃষ্ণায় বরফ দেয়া সোডাজলের তালাশ পাই। তাঁর ইংরেজী বাগবিধিটি স্পষ্টত আমেরিকান। তিনি হেসে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে নিজেকে মিসেস এলিশেভা গারফিংকেল বলে পরিচয় দেন। আমি হাত মেলাতে গেলে তার গলার লকেটে পাঁচ আংগুলের পাঞ্জার ডিজাইনটি নজরে পড়ে। নকশার ভেতরে অনেকগুলো ছোট ছোট ডায়মন্ড দিয়ে আঁকা কিং ডেভিডের নক্ষত্র প্রতীক ঝলসে ওঠে। আশকানাজি গোত্রের সেকেলেপন্থী ইহুদি মহিলারা এ ধরনের জমকালো জুইশ সিম্বলঅলা অলংকার পরে থাকেন, এ ব্যাপারে আমি সচেতন। আজ আমি ফিলিস্তিনিদের আন্দোলনের সমর্থক হিসাবে টি-শার্টে পিনঅলা বোতাম গেঁথে গলায় কেফ্যিয়া প্যাচিয়ে সড়কে বেরিয়েছি। এখন একজন ইহুদি মহিলার কাছে হেল্প চাইতে এসেছি, মনের ভেতর একটু বিব্রত ভাব মাথা চাড়া দেয়।

কিন্তু মিসেস এলিশেভা ‘হাউ মে আই হেল্প ইউ?’ বললে ওয়ারশো যাওয়ার টিকিটের প্রসঙ্গটি সংক্ষিপ্তভাবে তাঁকে জানাই। তিনি খুব সুন্দর করে হাসেন। তাঁর হাসিটি যেন কচুরিপানার ঝোপের আড়ালে লুকানো জলপদ্মের মতো সিগ্ধতা ছড়ায়। বলেন,‘গোয়িং টু ওয়ারশো বাই ট্রেন ইজ ভেরি ইজি, জাস্ট এ পিস অব কেইক। রেল ইউরোপের ট্রেন চালানোর কোম্পানিটি আজকাল এতো ইউজার ফ্রেন্ডলি যে এতে চড়ে বসলে অনায়াসে যাওয়া যায় চব্বিশটি দেশের পনেরো হাজার শহরের যে কোনটায়। তোমার সমস্যা হচ্ছে কোথায়? কোন ট্রেনটি ধরতে চাও? অপসন ওয়ান হচ্ছে-প্রথমে ইাউরো রেল ধরে যাবে ফ্র্যান্কফুর্ট টু বার্লিন। সাতশ কিলোমিটারের ধাক্কা। সময় লাগবে চার ঘন্টার মতো। বার্লিনে একটু জিরিয়ে জুরিয়ে ধরতে পারো ওয়ারশো যাওয়ার ট্রেন। বার্র্লিন-ওয়ারশো এক্সপ্রেস কোম্পানি জয়েন্টলি এ ট্রেনের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছে। টিকিট একটু এক্সপেনসিভ হলেও খুবই ওয়েল ম্যানেজড্ । মাত্র সাড়ে পাঁচ ঘন্টার ভেতর পোলান্ড বর্ডার ছাড়িয়ে পৌঁছে যাবে ওয়ারসো সিটিতে।

‘মিসেস গারফিংকেল, আমি একটু সস্তায় যেতে চাচ্ছি। তাড়াতাড়ি ওয়ারশো পৌঁছার আমার কোন প্রয়োজন নেই। অন্য অপশন আর কি আছে?’

তিনি জার্মান ভাষায় লেখা টাইমটেবিলের পৃষ্ঠা উল্টিয়ে বলেন,‘ তাহলে চলো আমার সাথে। আমিও ওয়ারশোতে ফিরে যাচ্ছি, অনেক বছর পর, ষাট কিংবা সত্তর বছর আগে আমি যখন ফ্রান্কফুর্ট থেকে ওয়ারশো’তে রাতের ট্রেনে চড়ে যাই তখন আমার বয়স ছিলো মাত্র দশ বৎসর। দ্যাটস্ অ্যা লঙ লঙ টাইম এগো। সে ওভারনাইট ট্রেনটি এখনো চালু আছে। ফ্র্যান্কফুর্টের এ সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে ছাড়বে রাত দশটার দিকে। পরদিন সকাল এগারোটা নাগাদ পৌঁছাবে ওয়ারশোতে। উড ইউ লাইক টু গো উইথ মি?’ আমি ঘাড় হেলিয়ে তার প্রস্তাবে সায় দেই।

কাউন্টারে আমি নাইট ট্রেনের টিকিট কিনতে আসি। মিসেস এলিশেভা গারফিংকেলও আমার সাথে সাথে আসেন। আমার এমনি অগোছালো স্বভাব, কিছুতে ব্যাকপ্যাকে পাসপোর্ট,আইডি ইত্যাদি খুঁজে পাই না। একটি ফোল্ডার থেকে অবশেষে ট্র্যাভেলার চেক বের করতে গেলে এক তাড়া পত্রিকার কাটিং ছড়িয়ে পড়ে ফ্লোরে। মিসেস এলিশেভা কুঁজো হয়ে তা কুড়িয়ে তুলেন। টিকিট কাটা হয়ে যেতেই দেখি তিনি কাটিংগুলো গোছাতে গোছাতে চশমা চোখে তা খুঁটিয়ে দেখছেন। পশ্চিমতীর ও গাজায় ইসরায়েলী আগ্রাসন আমাকে পীড়া দিচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমসের ইন্টারন্যাশনেল এডিশন থেকে কিছু তথ্য ও ফিলিস্তিনি নিপীড়নের ছবি আমি কেটে রেখেছি। ভাবছি একটু প্রতিফলন করে এ বিষয়ে একটি লেখা তৈরী করবো।

আমরা হেঁটে টার্মিনালের এক প্রান্তে এসে একটি বেঞ্চে বসি। মিসেস এলিশেভা ফোল্ডারে কাটিংগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে বলেন,‘আই সি, ইউ আর থিংকিং এবাউট প্যালেস্টাইন ইস্যু।’ আমি জবাব দেই,‘আই অ্যাম এফরেইড, উই মে হ্যাভ অ্যা ডিফরেন্ট পজিশনস্। মনে হয় আমরা দুই বিপরীত দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখছি।’ তিনি খুব নির্লিপ্তভাবে জানান,‘ইয়েস, এজ অ্যা জু, আমি ইসরাইলের রাষ্ট্র হিসাবে একজিস্ট করার অধিকারকে সমর্থন করি।’

আমি কোন জবাব না দিয়ে ব্যাকপ্যাক থেকে বের করি ছোট্ট শর্টওয়েভ রেডিও। মিনিট দুয়েকের ভেতর তাতে ‘এন-পি-আর’ বা ‘ন্যাশনেল পাবলিক রেডিও’র বার্লিন থেকে প্রচারিত ইংরেজী নিউজ শুনতে পাওয়া যায়। নিউজ কাস্টার দ্বিতীয় ইন্তিফাদার ব্যাকগ্রাউন্ড হিসাবে বলেন যে- ইসরায়েলী প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল শ্যারোন আল আকসা মসজিদ সংলগ্ন টেম্পোল মাউন্টেন ভিজিট করতে আসলে জেরুজালেমে রায়টের সূত্রপাত হয়। গেল পাঁচদিনের সংঘাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন ৪৭ জন, আর আহত হয়েছেন ১,৮৮৫ জন ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষ। আহত নিহতদের বেশীরভাগই বয়সের দিক থেকে তরুণ ও কিশোর। এদের অনেকে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসাবে ইসরায়েলী সৈনিকদের দিকে পাথর ছুঁড়তে গিয়ে লাইভ বুলেটের আঘাতে খুন কিংবা জখম হন।

বিবরণের শেষ দিকে নিউজকাস্টার আজকের একটি ঘটনার ওপর বিশেষভাবে ফোকাস করেন। পশ্চিম তীরের রামাল্লা শহরে বাজার থেকে সওদাপাতি নিয়ে বাবার সাথে ফিরছিলো আট বছরের বালক মোহাম্মদ আল ডোরাহ। সড়কে প্রতিবাদি প্রসেশন হচ্ছে। ইসরায়েলী হেলিকপ্টার উড়ে আসলে মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। হেলিকপ্টারের জানালা থেকে স্নাইপাররা দালানকোঠা ঘরদুয়ারের আড়ালে আশ্রয় নেয়া তরুণদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে। মোহাম্মদ আল ডোরাহের বাবা ল্যাম্পপোস্টের আড়ালে দাঁড়িয়ে পড়লে হেলিকপ্টার উড়ে আসে তার মাথার ওপর। আল ডোরাহ তার বাবার পেছনে কোটের প্রান্ত খামচে ধরে মাথা নিচু করে লুকানোর চেষ্টা করলে স্নাইপারের গুলি এসে তার ঘাড়ে লাগে। শিশুটির ললিপপ কামড়ে থাকা নিহত দেহের ছবি ছাপা হয়েছে ইউরোপের পত্রপত্রিকায়।

সংবাদ ভাষ্য শেষ হওয়ার আগেই ধড়মড় করে উঠে পড়েন মিসেস এলিশেভা গারফিংকেল। তিনি রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে অকওয়ার্ডভাবে বিদায় নিলে আমি বলি,‘সরি, মিসেস গারফিংকেল, আশা করি এ ধরনের সেনসেটিভ নিউজ শুনিয়ে আমি আপনাকে অপসেট করে দেইনি।’ তিনি আমার মন্তব্যের কোন জবাব না দিয়ে চলে যেতে থাকেন টার্মিনালের অন্য দিকে। খানিক পর দেখি মিসেস এলিশেভা আবার ফিরে আসছেন আমার বেঞ্চের দিকে। তাঁকে আরো বয়স্ক দেখায়। নড়বড়ে ফার্নিচারের মতো ঝুরঝুরে দেহকাঠামো নিয়ে তিনি আমার পাশে বসে কাঁপা দু’হাত নিয়ন্ত্রণ করতে করতে বলেন,‘সরি ফর শোয়িং ইমোশন। তুমি কিছু মনে না করলে তোমাকে একটা বিষয় কিন্তু বলতে হয়।’ আমি নীরবে তাঁর কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করি।

তিনি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলেন,‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে নাৎসী জার্মানরা ইহুদিদের সাথে যে আচরণ করেছিল, ঠিক একইভাবে বর্তমানে ইসরাইল রাষ্ট্র ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে।’ আমি এবার জানতে চাই,‘মিসেস গারফিংকেল, জার্মানিতে হলোকাস্টের সময় ইহুদিদের জীবনে যা ঘটেছিলো সে সম্পর্কে প্রচলিত ওথেনটিক কোন কাহিনী আপনি কারো কাছে শুনেছেন কি?’ তিনি জবাব দেন, ‘এ বিষয়কে ঠিক কাহিনী বলা যায় না। আমার জীবদ্দশায়ইতো এসব ঘটেছিলো। ১৯৩৩ সালে যে বছর নাৎসীরা ইহুদিদের দোকানপাট বয়কট করলো সে বছর আমার জন্ম হয় এ ফ্রান্কফুর্ট শহরে। আমার গ্র্যান্ডফাদারের ছিলো জুয়েলারীর দোকান, গারফিংকেলরা শত বৎসর ধরে ডায়মন্ডের ব্যবসা করে আসছে। আমার গ্র্যান্ডফাদার ছিলেন প্লাটিনামে ডায়মন্ড সেটিং এর ব্যাপারে স্পেশালিস্ট। আমার বাবা ও কাকা ছিলেন যথাক্রমে ডাক্তার ও আইনজীবী। তারা পরিবারের জুয়েলারি ব্যবসায় যাননি। ১৯৩৬ সালে জার্মানিতে ইহুদিদের পেশাগত চাকরি-বাকরি নিষিদ্ধ করে দেয়া হলে দুজনে বেকার জীবন যাপন শুরু করেন।’

মিসেস এলিশেভা এবার বোতলের জল দিয়ে ক্লনোপিন বলে একটি ট্র্যংকুলাইজার ট্যাবলেট নেন। তারপর দীর্ঘ পজ নিয়ে আমার দিকে তাকালে আমি জানতে চাই,‘ আপনার পরিবারের সকলে কি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার পর অব্দি বেঁচে ছিলেন?’ যেন খুব ডাম্ব স্টুপিড একটি প্রশ্ন করেছি এমন ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন,‘১৯৩৩ সালে জার্মানীতে নাগরিক হিসাবে বাস করতো জুইশ সম্প্রদায়ের পাঁচ লক্ষ বাইশ হাজার মানুষ। ১৯৪৩ সালে নাৎসীরা জুডেনরেইন বা ক্লিনিং অব জুজ অভিযান শুরু করলে কেবলমাত্র দুই লাখ চৌদ্ধ হাজার ইহুদি জার্মানী থেকে পালিয়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশ বা আমেরিকায় শরণার্থী হওয়ার সুযোগ পায়। বাকিদের কেউই গ্যাস চেম্বারে মৃত্যুর নিয়তি থেকে রেহাই পায়নি। আমার বাবা-কাকা-মা-মাসি সকলেই এ পরিসংখ্যানের অন্তর্গত।’

মিসেস এলিশেভা গারফিংকেল এবার উঠে পড়তে পড়তে বলেন,‘ আই হোপ নাউ ইউ উড আন্ডারস্ট্যান্ড, ইহুদি সম্প্রদায় কেন মরিয়া হয়ে একটি রাষ্ট্র চায়, ইসরায়েলের অস্তিত্ত্ব না থাকলে আমাদের যাবার যে আর কোন স্থান নেই। উই আর ডেসপারেট !’ তিনি গুডবাই না বলে বেঞ্চ ছেড়ে চলে যান এক্সিট সাইনের নিশানা ধরে।

ওয়ারশো যাওয়ার নাইট ট্রেনে বসে আমি মনে মনে মিসেস এলিশেভা গারফিংকেলের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। খুব নার্ভাস লাগছিলো। অনেকদিন ধরে আমি ট্র্যাভেল করছি, কিন্তু নতুন কোন দেশে যেতে হলে আমার অস্থির লাগে, বর্ডার ক্রসিং ম্যানেজ করতে পারবো কিনা তা ভেবে তীব্র আত্মবিশ্বাসের অভাব বোধ করি। বিকালে একটি নির্জন লাইব্রেরীতে বসে ফিলিস্তিনি প্রসঙ্গ নিয়ে একটি আর্টিকেল লিখতে চেষ্টা করেছি। ইসরায়েলী আগ্রাসনের বিষয়টি হাইলাইট করতে গিয়ে মনে জলছাপের মতো ভেসে গেছে মিসেস গারফিংকেলের করুণ- বয়সের ভারে জীর্ণ মুখাবয়ব। তাঁর সাথে একত্রে ওয়ারশো অব্দি ট্র্যাভেল করা সহজ নাও হতে পারে? এসব উদ্বেগ থেকে মনকে অন্যদিকে ফেরানোর জন্য আমি ম্যাক্স আরন্সট্ বলে এক পরাবাস্তববাদী চিত্রকরের আর পেইনটিংঅলা বই এর পাতা উল্টাই। শিল্পী শুধুমাত্র কয়েকটি টপ-হ্যাট দিয়ে তৈরী করেছেন বিচিত্র মনুষ্য ফিগার, আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকি। অভিজ্ঞতায় দেখেছি তীব্র স্ট্রেসের সময় পরাবাস্তবাদী কোন চিত্র অবলোকন করলে তা খানিকটা লাঘব হয়। সুতরাং,আমি পাতা উল্টিয়ে তেলের পিপা ব্যবহার করে তার আঁকা ‘ম্যাকানিক্যাল হাতী’র ছবির পাতায় জন্তুটির হোজ পাইপের মতো শুঁড় আংগুল দিয়ে ছোঁই।

তখনই মিসেস গারফিংকেল এসে কামরায় ঢুকলে চিএকলার বইখানা শোল্ডারব্যাগের নিচে ঠেলে দিয়ে লুকিয়ে ফেলি। কেন জানি মনে হয়- আমি ম্যাকানিক্যাল হাতীর অদ্ভুত আকৃতির দিকে তাকিয়ে আছি দেখলে হয়তো মিসেস এলিশেভা আমাকে রীতিমতো উইয়ার্ড বা কিম্ভুত রুচির লোক বলে ভাববেন।

তিনি আমার দিকে তাকিয়ে খুব মিষ্টি করে হাসলে আবার কচুরিপানার আড়ালে লুকিয়ে থাকা পদ্মফুলের সিগ্ধ ইমেজের কথা মনে পড়ে। মহিলা জানতে চান,‘তুমি কি আমাদের পারিবারিক কয়েক পুরুষের বসতবাড়ির ছবি দেখবে?’ ঘাড় হেলিয়ে সায় দিতেই তিনি ব্যাগের জিপার খুলে বের করেন বেলারুশিয়ার ইহুদি চিত্রশিল্পী মার্ক শ্যাগালের ছবির রঙীন প্লেটঅলা একটি বড়সড় পেইনটিং এর বই। তার ভেতরে বুকমার্কের মতো গুঁজে রাখা দুটি সাদাকালো ফটোগ্রাফ বের করে আমাকে দেখিয়ে বলেন,‘এ তিনতলা বাড়িটি আমার গ্র্যান্ড ফাদারের আগের প্রজন্মের পূর্বপুরুষ ফ্রাংন্কফুর্ট শহরে তৈরী করান ১৮৩২ সালে।’ আমি বিশাল ঝাড়বাতিঅলা হলরুমের ইনটিরিওরের ছবিটি হাতে নিয়ে তাতে রাখা ঝাপসা হয়ে আসা গ্র্যান্ড পিয়ানোর দিকে তাকাই। জানতে চাই,‘বাড়িটি এখনো আছে কি?’ তিনি জবাব দেন,‘ ১৯৪৩ সালের মে মাস অব্দি এ বাড়িতে আমার গ্র্যান্ডফাদার বসবাস করতেন। জুলাই মাসে পরিবারের সবাইকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নেয়া হয়। তার পরের বছর মিত্রশক্তির বোমাবর্ষণে বাড়িটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়।’

মহিলা এবার মার্ক শ্যাগালের চিত্রকলার বইটি মনোযোগ দিয়ে দেখতে শুরু করেন। ‘দ্যা পোয়েট’, এবং ‘ফিডলার’ বা ‘বেহালা বাদক’ শিরোনামের ছবিগুলোর পৃষ্ঠা উল্টিয়ে ‘কাউ উইথ প্যারাসল’, বা ‘ছাতা মাথায় গরু’র ছবির পাতায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তাকিয়ে থাকেন তিনি। পরাবাস্তবাদী কেতার এ চিত্রটি সত্যিই বিচিত্র। একটি গরু তার নীল বর্ণের মুখমন্ডলে তীব্র বিষাদ ফুটিয়ে সামনের পা বাঁকা করে খুরে ধরে আছে কারুকাজ করা একটি ছাতা। তা দেখতে দেখতে মিসেস এলিশেভা যেন জনান্তিকে কথা বলেন,‘আজ থেকে ষাট সত্তর বছর আগে আমি এ ট্রেন চড়ে ওয়ারসোতে যাই। তখন আমার বয়স ছিলো মাত্র দশ বছর। খুব স্ট্রেস হচ্ছিলো। কিছুতেই শান্তি পাচ্ছিলাম না। আমার জার্মান ন্যানি বা আয়া আমাকে স্লিপিং পিল দিয়ে ঘুম পাড়াতে চাচ্ছিলো। এ ট্রেনের কথা ভাবলেই কেমন জানি উদ্বেগ লাগে।’ মহিলা বোতল থেকে গলায় জল ঢেলে ক্লনোপিন বলে একটি এন্টি অ্যাংজাইটি পিল নেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলেন,‘মনে দুশ্চিন্তা হলে, মার্ক শ্যাগালের চিত্রের মতো উপকারি আর কিছু নেই।’ আমি জানালার কাঁচে তাঁর প্রতিফলনের দিকে তাকাই। ওখানে আমাদের দুজনের ছায়া প্রতিবিম্বিত হচ্ছে। আমাদের চেহারাসুরত, বয়স ও জেন্ডারে বিস্তর পার্থক্য। কিন্তু কোথায় যেন- আত্মবিশ্বাসের অভাবে, কিংবা চিত্রকলার রুচিতে খানিকটা মিল আছে। এ বিষয়টা অনুধাবন করতে পেরে আমি খুব অবাক হই।

একটু রাত হলে মহিলা তার নড়বড়ে শরীর নিয়ে আপার বার্থে উঠতে যান। পা ফসকে পড়ে গিয়ে যদি হাত-পা ভাঙ্গেন, এ আতঙ্কে আমি বলি যে,‘মিসেস গারফিংকেল, আপনি কাইন্ডলি নিচে ঘুমান, আমি উপরের বার্থে উঠছি।’ কিন্তু কিছুতেই তিনি তাতে রাজি হন না। পা বাঁকিয়ে চুরিয়ে বাতব্যাধিগস্থ মহিলা কাতরানোর ধ্বনি করে উপরের বার্থে কোনক্রমে উঠে শুয়ে পড়ে মৃদুস্বরে কোঁকান।

বেশ রাতে ট্রেন থামে। বর্ডার পুলিশের বুটের শব্দে ঘুম ভাঙ্গে। মনে হয় পুলিশ যুগলের একজন জার্মান আর অন্যজন পোলিশ। তারা আমার পাসপোর্ট চেক করে মিসেস এলিশেভাকে জাগাতে যায়। কিন্তু এন্টি এংজাইটি পিল খেয়ে মহিলা ঘুমিয়েছেন। জার্মান কিংবা পোলিশ ভাষার ডাকাডাকিতে তাঁর ঘুম ভাঙ্গে না। আমার টেনশন লাগে। আমি নিচের বার্থে জড়সড় হয়ে বসে তাঁর নাক ডাকার শব্দ শুনি। মহিলা তাঁর বালিশের পাশে আমেরিকান পাসপোর্ট রেখে ঘুমিয়েছেন। পুলিশ তা তুলে নিয়ে খুলে দেখে তা বালিশের পাশে রেখে বেরিয়ে যায়। বর্ডার চেকিং সারা হলে- ট্রেন ছেড়ে দেয়ার পর আড়মোড়া ভেঙ্গে ওঠে বসেন মিসেস এলিশেভা।

পরিষ্কার বুঝতে পারি তিনি এতক্ষণ মটকা মেরে পড়েছিলেন। আমাকে ডেকে তাঁর ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে দিতে বলেন। পানি দিতে গেলে তিনি ফিক করে হেসে বলেন, ‘দশ বছর বয়সে যখন জার্মান ন্যানির সাথে এ ট্রেনে করে ওয়ারশোতে পালিয়ে যাই, তখনও ঘুমের ভান করে এরকম আপার বার্থে শুয়েছিলাম। ন্যানি বর্ডার পুলিশকে বোঝায় যে- আমার শরীর খারাপ। ন্যানি চাচ্ছিলো না যে আমার সাথে পুলিশের সরাসরি কোন কথা হোক। কারণ আমার চেহারা দেখে যদি নাৎসী পুলিশ আমাকে জুইশ গার্ল বলে সন্দেহ করে!’ তিনি বোতলের জল দিয়ে আবার আরো একটি এন্টি এংজাইটি পিল নেন।

ওয়ারশোতে নেমে আমি তাঁর কাছে বিদায় নিতে গেলে তিনি আমার দিকে একটুক্ষণ নিরিখ করে তাকিয়ে থাকেন। তারপর বিদায় সম্ভাষণের কোন জবাব না দিয়ে তাঁর নড়বড়ে শরীরে ভারী ব্যাগ জাপটে ধরে সোজা হেঁটে যান ট্যাক্সির দিকে।

বিষয়টির এখানে তামাদি হলে এ বিবরণ লেখার প্রয়োজন পড়তো না। কিন্তু তাঁর সাথে আবার আমার দেখা হয় পাঁচ কিংবা ছয় বছর পর, সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, মিসরের আসোয়ান বাঁধের কাছাকাছি আবু সিম্বল এয়ারপোর্টে।

সকালবেলা কায়রো থেকে ঈজিপ্ট এয়ার এক্সপ্রেস এ চেপে তিন ঘন্টা চল্লিশ মিনিট আকাশে উড়ে আবু সিম্বল বলে একটি পুরাতাত্ত্বিক সাইটে এসেছি। প্লেন পথে আসওয়ান এয়ারপোর্টে সামান্য সময়ের জন্য থেমেছিলো। ফ্লাই করতে গিয়ে আকাশ থেকে লেক নাসের বলে একটি কৃত্রিম হ্রদ এর বিপুল জলধি অবলোকন করেছি। আবু সিম্বলের অবস্থান আসওয়ান বাঁধ থেকে ২৩০ কিলোমিটার উত্তরে লেক নাসেরের পশ্চিম তীরে।

আস্ত একটি পাথুরে পাহাড় কেটে আবু সিম্বল বলে দুটি ম্যাসিভ সাইজের রক টেম্পোল তৈরী করা হয় খ্রিস্টপূর্ব ত্রয়োদশ শতকে মিসরের ফারাও দ্বিতীয় রামেসেস এর আদেশে। ফারাও রামেসেস প্রস্তর কুঁদিয়ে প্রধান মন্দিরটি নির্মাণ করান মূলত একটি যুদ্ধবিজয়ের ইতিহাসকে ধারন করে রাখতে। অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের দ্বিতীয় মন্দিরটি তৈরী করা হয় তার প্রিয় রানি নেফারতিতি’র স্মারক হিসাবে।

১৯৬৮ সালে নীল নদে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে আসোয়ান বাঁধ নির্মিত হলে সৃষ্টি হয় কৃত্রিম জলাধার লেক নাসেরের। বাঁধ নির্মাণের আগে বিশেষজ্ঞরা আশংঙ্কা প্রকাশ করেন যে- বিশাল আকারের হ্রদ তৈরী হলে আবু সিম্বলের মন্দির-কোঁদা পাহাড়টি তলিয়ে যাবে জলতলে। তাই ইউনেসকোর সক্রিয় সহায়তায় চার বছরের পরিশ্রমে সম্পূর্ণ মন্দির কমপ্লেক্সকে পরিকল্পিতভাবে টুকরা টুকরা করে কেটে রিলকেট করা হয় ২৩০ কিলোমিটার উত্তরে। এখানে আবু সিম্বলের বিচ্ছিন্ন টুকরাগুলো এমন করিগরি দক্ষতায় সংযুক্ত করে পুনর্বাসন করা হয়েছে যে- তা দেখে বোঝার কোন উপায় নেই- আদি আবু সিম্বলের অবস্থান বছর তিরিশেক আগে ছিলো অন্যত্র।

ভেবেছিলাম ঈজিপ্ট এয়ার এক্সপ্রেসের এক দিনের ট্যুরে এসে দেখে নেবো আবু সিম্বলের রিলকেট করা টেম্পোল কমপ্লেক্স। খুব হিসাব কিতাব করে আজকের দিনটি নির্বাচন করেছিলাম। আবু সিম্বলের মন্দিরের গবাক্ষ এমন দক্ষতায় নির্মাণ করা হয়েছে যে- এ দিনের অপরাহ্ণে সূর্যালোক সরাসরি এসে পড়ে ফারাও রামেসেস ও রানী নেফারতিতির মূর্তিযুগলের মুখমন্ডলে। কিন্তু কপাল খারাপ। এয়ারপোর্ট থেকে শ্যাটোল-বাসে সরাসরি আবু সিম্বলের পুরাতাত্ত্বিক মন্দিরে না গিয়ে আমি লাকেল গাইডের প্ররোচনায় উট চেপে চলে যাই প্রথমে একটি স্থানীয় গ্রাম দেখতে। বেদুঈনদের পল্লী থেকে মন্দিরে যাওয়ার পথে পড়ি সাইমুম বা বালু-ঝড়ে।

গাইড কোনক্রমে উটকে সামলিয়ে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে এয়ারপোর্ট। সারা শরীর, জামাকাপড়, চুল সহ চোখেও প্রচুর বালু ঢুকেছে। বাথরুমে বেশ কিছুক্ষণ চোখে পানি দিয়ে বেরিয়ে লবিতে মিরমির করে তাকাচ্ছি। দেখি-মিসেস এলিশেভা গারফিংকেল চারডালার একটি লাঠিতে ভর দিয়ে এগিয়ে আসছেন আমার দিকে। তাঁর বয়স নব্বই না হলেও পঁচাশি ছাড়িয়ে গেছে। চুল হয়েছে সম্পূর্ণ রূপালি। ‘হিয়ার ইউ আর, আমরা ট্রেনে করে ওয়ারসো গিয়েছিলাম, মনে আছে?’ ‘অবকোর্স মিসেস গারফিংকেল,’ বলে আমি তাঁকে বেঞ্চে বসতে সাহায্য করি। বাতব্যাধিতে হাঁটুর জয়েন্টে সমস্যা হওয়ায় তাঁর বাঁকা হয়ে বসতে খুব অসুবিধা হয়। লবিতে বসে কাচের সচ্চ দেয়ালের ভেতর দিয়ে আমরা নীরবে বাইরের বালু-ঝড় দেখি।

জীবনে এ প্রথম সাইমুমের পাল্লায় পড়েছি। বালু-ঝড়ের প্রচন্ডতা কেবলই বাড়ছে। সমগ্র মরুভূমি যেন অজস্র পালের মতো উড়িয়ে নিচে যাচ্ছে বিপুল বালুকারাশি। মাইক্রোফোনে কায়রোতে ফিরে যাওয়ার ফ্লাইটগুলো আজকের মতো বাতিল করা হয়। আজ রাত হয়তো ছোট্ট এ এয়ারপোর্টে কাটাতে হতে পারে। যদি পরের দিন ভোরের প্লেন ধরা যায় তাহলে আমার ট্র্যাভেল প্ল্যানে তেমন কোন অদল বদল করতে হবে না। তবে মর্নিং ফ্লাইট ধরার আগে আবু সিম্বল দেখে আসা সম্ভব হবে না। জানতে চাই, মিসেস গারফিংকেলের ট্র্যাভেল প্ল্যানে কোন সমস্যা হবে কি? তিনি উদাসীন চোখে আমার দিকে তাকান। তাঁর দৃষ্টি আমাকে ছাড়িয়ে দেয়ালের স্বচ্ছ কাচ ভেদ করে দেখে নিচ্ছে নীল নদের দিকে উড়ে চলা ধূসর বালুকারাশি। তিনি কোন কথা বলেন না।

আমার মনে কিছু কৌতূহল সোডাজলের ফেনার মতো বুজকুড়ি কাটে। ওয়ারসো যাওয়ার পথে তাঁর কাছ থেকে যা শুনেছি তাতে আমি নিশ্চিত যে-তাঁর পরিবারের কিছু মানুষের নাৎসী গ্যাস চেম্বারে মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু তিনি বেঁচে গেলেন কিভাবে? তবে কি তাঁর জার্মান ন্যানী তাঁকে ওয়ারশো থেকে ইংল্যান্ড বা নাৎসী দখলীকৃত নয় এমন কোন দেশে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলো? পরে কিভাবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হলেন? মিসেস গারফিংকেল কায়ক্লেশে তার চাকাওয়ালা ব্যাগ থেকে বের করেন একটি চিত্রকলার বই। পাতা উল্টাতেই তাতে আমি পরাবাস্তববাদী চিত্রশিল্পী ম্যাক্স আরন্সট্ এর প্রতিকৃতি দেখতে পাই। ভেতরে ভেতরে একটু চমকালে মিসেস গারফিংকেল সিগ্ধ হেসে বলেন,‘খুব দুর্যোগ দুর্ভাবনায় পড়লে আমি ম্যাক্স এর আঁকা ম্যাকানিকেল হাতীর ছবির দিকে তাকাই। সে শুঁড় তুলে হ্যালো বললে আমি মনে একটু বল পাই।’

আমি তাঁর হাতে ধরা তেলের পিপার মতো হাতীর উদরের দিকে তাকিয়ে জানতে চাই,‘হাউ আর ইউ ফিলিং মিসেস গারফিংকেল?’ তিনি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে জবাব দেন,‘ভেবে ছিলাম আজ আবু সিম্বলে একবার যাবো। তুমি নিশ্চয়ই জানো, হাজার বছর আগে ফারাও রামেসেস আমাদের পূর্বপুরুষ ইহুদি ক্রীতদাসদের বিশ বছর খাটিয়ে এ মন্দির দুটি তৈরী করেছিলো। বালু-ঝড়ে তা অবলোকন করার বিষয়টি পুরা ভেস্তে গেলো। আর প্ল্যান ছিলো বিকালের ফ্লাইটে কায়রো পৌঁছে আগামি কাল মর্নিং ফ্লাইটে জেরুজালেম যাবো-ইহুদিদের নববর্ষ রশো সানাহ এর পরব উদযাপন করতে। ক্রিতদাসদের কথা মনে করে ভেবেছিলাম রাশো সানাহ এর দিনে জেরুজালেমের পবিত্র দেয়ালে প্রার্থনা করবো।.. .. অল অব দিজ থিংকস্ আই হ্যাড প্ল্যন্ড ফর ইয়ারস্। নাউ আই সি.. ইটস্ নট গোনা হেপেনড্ । ভেরি ডিসএপোয়েন্টিং।’

তিনি নিশ্চুপ হয়ে গেলে লবিতে ইলেকট্রিসিটি চলে যায়। আধো অন্ধকারে দেখি মরুভূমি যেন খেপে গিয়ে কাচের দেয়ালে ছুড়ে মারছে রাশি রাশি বালুকা। খুব খিন্ন লাগে। এ ধরনের ডিসএপোয়েন্টমেন্ট প্রত্যাশা করিনি। তাই আমি ফিসফিস করে জানতে চাই,‘ মিসেস গারফিংকেল, আপনার তো দীর্ঘ জীবন, এ রকম ডিসএপোয়েন্টটেড আগে কখনো হয়েছেন কি?’ আধো অন্ধকারে আমি তাঁর মুখ দেখতে পাই না, কিন্তু খুব মৃদু স্বরে তিনি বলেন,‘আমার বয়স তখন এগারো কিংবা বারো। পোল্যান্ড থেকে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে লন্ডনে এসেছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ খুব তোড়েজোড়ে চলছে, লন্ডনে বোমা পড়ছে প্রতিদিন।

জাহাজ ঘাটায় প্রস্তুত হয়ে এসেছি নিউইয়র্ক গিয়ে আমেরিকাতে অভিবাসী হবো। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আমেরিকাগামী সব জাহাজের যাত্রা বাতিল করা হলো। কারণ, আটলান্টিক মহাসাগরে গেল সপ্তাহে পর পর অনেকগুলো যাত্রীবাহী জাহাজ ডুবেছে জার্মান ইউবোটের টর্পেডোর আঘাতে। জেটিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ। চারদিকে ঝিরিঝিরি তুষার ঝরছিলো। লন্ডনের আমার কোন আত্মীয় স্বজনও ছিলো না যে তাদের কাছে ফিরে যাবো।’

হঠাৎ করে বিজলি বাতি ফিরে আসলে আমার সাথে গল্প করার মাঝপথে মিসেস গারফিংকেল নীরব হয়ে যান। তিনি চোখ বন্ধ করে ট্রেসিং করার মতো ম্যাকানিক্যাল হাতীর শরীরে আংগুল দিয়ে খুব সাবধানে অদৃশ্য রেখা আঁকেন। দূরে কোথায় যেন মিনারেটে ধ্বনিত হয় আজানের ধ্বনি। আর বালুকালিপ্ত দুটি উট এসে এয়াপোর্টের কাঁচের দেয়ালে মাথা ঘঁষে। তাদের মুখের কষা বেয়ে গড়িয়ে পড়ে ক্যাকটাসের কাঁটায় কীর্ণ রক্তাভ ফেনা।

 

 

 

 

 

 

 

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.