রোজ নামচা-২২

Aparna 2লীনা হাসিনা হক: গত কয়েকদিন ধরে একটা বিষয় মনের মধ্যে অনবরত ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশ্বাস আর বিশ্বাসভঙ্গ। শব্দ দুটোর অর্থ, ব্যাপকতা আর নারী পুরুষের জীবনে এর প্রভাব এই সব কিছু চিন্তা আমাকে অস্থির করে তুলেছে।

আমার এক বন্ধু গত বেশ কিছুদিন ধরে তীব্র মনের কষ্টে আছে। হঠাৎই সে জানতে পেরেছে তার জীবনসাথী প্রথম জীবনের ভালবাসার মানুষের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে এবং আমার বন্ধুটিকে লুকিয়ে। প্রাথমিক ধাক্কা সামলে উঠে বন্ধুটি এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে এই অবস্থায় তার কি করা উচিত। বারে বারে সে জানতে চায় কি তার করা উচিত।

আমি এক অতি সাধারন মানুষ, কি উপায় তাকে বাতলে দেব! শুধু বলি, ধৈর্য ধরতে, নিজের সংসার আর সন্তানের কথা ভাবতে। আর এটাও বলি, স্বামী বা স্ত্রী কেউ তো কারো সম্পত্তি নয় যে অন্য আরেকজনের সাথে একটু মেলামেশা করতে পারবে না বা পুরনো বন্ধুর সাথে যোগাযোগ রাখতে পারবে না। যখন তাকে বুঝিয়ে বলি সে শান্ত হয়, আবার একা হলেই তার মন অশান্ত হয়ে ওঠে।

তার কথা হলো, আমি তো আমার জীবন সঙ্গীকে পূর্ণ বিশ্বাস করেছিলাম, সে কেন আমার বিশ্বাস ভাঙল? এদিকে তার সঙ্গীর বক্তব্য, ঘরের শান্তি বজায় রাখতেই এই লুকোচুরি, এখানে বেশী কিছু নাই। পুরনো বন্ধুর সাথে যোগাযোগ রাখা কোনও বিশ্বাসভঙ্গ নয়। আমি কাকে কি বলবো! বলতে চাই, তোমরা কি এই বিষয়টি নিয়ে খোলাখুলি আলাপ করতে পারো না? দুজনেই ভেবে দেখো, একজন আরেকজনের ব্যাক্তিগত স্পেসে বেশী ঢুকতে চেও না, দ্বিতীয়জনকে বলতে চাই, পার্টনারকে বোঝাও যে এই বন্ধুত্ব তোমাদের পারিবারিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। এই বোঝাপড়া খোলাখুলি না হলে এই টানাপোড়েনে সুন্দর সংসারটাই না ভেসে যায়।

বিশ্বাস ধারণাটি অবয়বহীন হলেও আসলেই জীবনে এর ব্যাপ্তি এতো ব্যাপক!

আমার আরেক বন্ধু সম্প্রতি জানতে পেরেছে তার দীর্ঘদিনের ভালবাসার মানুষটি অন্য আরেকজনের সাথেও প্রেমের সম্পর্ক বজায় রাখছে। জিজ্ঞাসিত হলে সেই মানুষটির উত্তর, এটা শুধুই বন্ধুত্ব। ক্রমে যখন আরও জানা গেল সেই সম্পর্কটি ও বেশ গভীর, আমার বন্ধুটি প্রথম চোটে মানসিক ভারসাম্যহীনতা প্রায় খোয়াতে বসেছিল, অনেক কষ্টে যদি বা তা সামলানো গেছে বন্ধুটির মনের মধ্যে সেই পুরাতন প্রশ্ন কেন এই বিশ্বাসভঙ্গ? যেই প্রেমের কথা তাকে বলেছে তার ভালবাসার মানুষটি, সেই একই কথা আরেকজনকে বলছে যখন, তখন কোথায় খুঁজবে সে তার সম্পর্কের শিকড়?

মানসিকভাবে ভেঙ্গে পরা বন্ধুটির হাত ধরে বসে থাকি আর মনে মনে ভাবি, বিশ্বাস কি? দুজন নর-নারীর সম্পর্কের ভিত্তি যদি হয় বিশ্বাস, সেই বিশ্বাসের সংজ্ঞা কি? আর নারী-পুরুষের সম্পর্কের বিশ্বাস বা বিশ্বাসভঙ্গতাই বা কি! কিসের উপরে ভিত্তি করে কিসের আস্থা নারী রাখে পুরুষের উপরে আর পুরুষ নারীর উপরে? সেই চির পুরাতন আকাঙ্ক্ষা যে তার প্রিয় পুরুষটি কি নারীটি অন্য কারুতে আসক্ত হবে না!

কিন্তু কেন মানুষ সেই চির সত্যকে পর্দা দিয়ে আড়াল করতে চায় যে মানুষ মাত্রই বহুগামী। কেউ তার ইচ্ছের লাগাম টেনে রাখতে পারে, বেশীরভাগই পারে না।

আরও একটা ব্যাপার, ব্যক্তিজীবনে খোলাখুলি কথা না বলাও এই ধরনের ক্রাইসিস তৈরি হওয়ার পেছনে কাজ করে। আমরা খোলাখুলি কথা বলতে বা শুনতে ভয় পাই। একজন আরেকজনকে স্পেস দিতে ভয় পাই, আবার এটাও সত্য যে অনেকসময় স্পেস দিলেও অনেকে সেটার অকারণ ফায়দা নিতে চায়।

কথায় আছে বনের বাঘে খায় না, মনের বাঘে খায়। একটুখানি খোলাখুলি কথার অভাবে আমার কাছের মানুষদের ব্যক্তিজীবনকে মনের বাঘে খাওয়া থেকে বাঁচাতে পারবো তো! (চলবে)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.