শাঁখা-সিঁদুর যখন আত্মরক্ষার অস্ত্র!

Hindu nari
ছবিটি প্রতীকী

সেবিকা দেবনাথ: ‘এক চুটকি সিন্দুর কি কিমত তুম ক্যায়া জানো…..’, ‘ওম শান্তি ওম’ নামের ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিখ্যাত ডায়ালগ এটি। হাসি-ঠাট্টার ছলে হয়তো উড়িয়েও দেয়া যায় এই সব বস্তা পঁচা ম্যার ম্যারে মার্কা কথা। টানা কয়েক ঘন্টার বিয়ের আনুষ্ঠানিকতায় কয়জন বর-কনে বিয়ের মন্ত্র ঠিক ঠাক আওড়ান তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কিন্তু বিয়ের পর স্বামীর মঙ্গল কামনায় ওই সামান্য এক জোড়া শাঁখা আর সিঁদুরই হিন্দু নারীদের কাছে হয়ে উঠে অমূল্য। তবে ওই সামন্য জিনিসটা যে আত্মরক্ষার কাজেও লাগে সেটা আমার জানা ছিল না।

১৯৯১ সালে বাবার চাকরি সূত্রে তখন আমরা ঘোড়াশাল সার কারখানায় থাকাতাম। বাসায় কাজ করতো শেফালিদি। জীর্ণকায় শরীর। চেহারাটা দেখলেই বেশ মায়া লাগতো। কপালে ইয়া বড় সাইজের একটা সিঁদুরের ফোঁটা। মাথায় সিঁথি ভর্তি সিঁদুর। হাতে ঢাউস সাইজের এক জোড়া মোটা শাঁখা। শাড়ি-কাপড় যা হোক তার শাঁখা-সিঁদুর ঠিক থাকা চাই। অনেক দিন পরে জানলাম দিদির মেয়েটা যখন পৃথিবীর আলো দেখেনি তার আগেই তার বর তাকে ছেড়ে চলে গেছে। তবুও এই বাড়তি বোঝা বয়ে বেড়ানো কেন? এটা আমার মাথায় কিছুতেই আসতো না।

একদিন মার আড়ালে দিদিকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘শেফালি দি তুমি এখনও কেন শাঁখা-সিঁদুর পরো? তুমি কি বিশ্বাস করো তোমার বর আবার আসবে?’ আমার কথা দিদির মনে কোন রেখাপাত করলো না।

স্বাভাবিক গলায়ই বললো, ‘আমি কি ওই হারামির জন্য পরি নাকি? আমিতো পরি আমার জন্য।’ উত্তরটা যত সহজ হবে ভেবেছিলাম, তা হলো না। কথার মানেই বুঝলাম না আমি। তখন আমি উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী। বড় বোনের জন্য উচ্চমানের এক পাত্রের প্রস্তাব আনলেন বাবার এক সহকর্মী। বাবার সাফ কথা মাস্টার্স না করিয়ে তিনি তার কোন মেয়ের বিয়ে দেবেন না। বিদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পাত্রের জন্য আমাদের দেশে পাত্রীর অভাব হবার কথা নয়। ওই পাত্রের সঙ্গে আমাদের কলোনীরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সঙ্গীত বিভাগ থেকে মাস্টার্স পাস করা মিনিদি’র খুব ঘটা করে বিয়ে হলো। অনেক গুণবতী হওয়ার পরও মোটা অংকের যৌতুক দিয়েই মিনিদি’র বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের মাস খানেক পর মিনিদি’র বর যে বিদেশ গেল আর ফিরে আসেনি। মিনিদি এক মেয়ের মা হলো। দিদি তার বাবার বাসায়ই থাকতো। এর কারণ হিসেবে মিনিদি’র মা সবাইকে বলতো, বর তো মিনিকে বিদেশ নিয়ে যাবে। কাগজপত্র সব তৈরি করছে। সব ঠিকঠাক হলেই মিনি চলে যাবে বিদেশ। বরই চাইছে মিনি যেন এখানে থাকে। ওর শ্বশুর-শ্বাশুড়ি বৃদ্ধ। ওখানে ওর ভাল লাগবে না। এরপরতো বাচ্চা হয়ে গেল। এখনতো আরও যেতে পারছে না। ইত্যাদি ইত্যাদি।

এক এক করে ৮/৯ বছর হয়ে গেল। মিনিদি’র আর বিদেশ যাওয়া হয়নি। মিনিদি একটা কিন্ডারগার্ডেনে চাকরি নিলো। অনেক পরে জেনেছি, মিনিদি’র বর ছিল লম্পট। বিয়ের আগে এসব বিষয় না জানলেও পরে তারা সব জানতে পারে। বিয়ের বছর ঘুরতে না ঘুরতেই মিনিদি’র সঙ্গে বরের ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিল। বরের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হবার পরও মিনিদিকে দেখতাম হাতে এক জোরা চিকন শাঁখা পড়তে আর চুলের এক ফাঁকে লাল রঙা একটা ছোট্ট রেখা টানতে। লম্পট স্বামীর মঙ্গল কামনায় যে মিনিদি এমনটা করতেন এটা আমার এখনও বিশ্বাস হয় না।

কাজের সূত্রে দিশাদি’র সাথে আমার আলাপ। শিক্ষিত, ভালো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত দিশাদি মাস শেষে মোটা অংকের টাকার মাইনে পায়। নিজের রোজগারে ঢাকায় ফ্ল্যাট-গাড়ি করেছেন। ১৩ বছরের ছেলে সৌম্য আর দিদির ছোট ভাইকে নিয়ে পুরান ঢাকায় নিজের ফ্ল্যাটে থাকেন। দিদির বাসায় গিয়েছিলাম দুইবার। আলাপচারিতায় কখনো দিদিকে জিজ্ঞাসা করা হয়নি তার বর কি করেন।

কয়েক দিন আগে দিদিই বললেন, তার বর ইংল্যান্ডে থাকেন। সেখানে একটি কোম্পানীর আইটি সেক্টরে কাজ করে। আমাকে অবাক করে দিয়ে দিদি জানালো, তার বর সেখানে আবার বিয়ে করেছে। প্রায় আট বছর বরের সঙ্গে দিদির ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। কোন যোগাযোগও নাই। খুব কাছের মানুষজনই এই সত্যটা জানে।

আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই দিদি বলতে লাগলো, ছেলেতো বাবার কথা শুনলেই চটে যায়। আমাকে শাঁখা-সিঁদুর খুলে ফেলতে বলে। আমি ওকে বলেছি, আমি ওর বাবার জন্য না, আমার নিজের জন্য ওসব পরি। সত্যটা জানলে দেখা যাবে কেউ বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসবে, কেউ বাঁকা চোখে তাকাবে, আমাকে তো শোনাবেই, ছেলেকেও কটু কথা শোনাতে ছাড়বে না। ওসব ঝামেলা এড়াতে গয়না ভেবেই ওগুলো পড়ি। এর বেশি কিছু না।

দিশাদি’র কথাগুলো শোনার পর শেফালি দি’র ‘আমি কি ওই হারামির জন্য পরি নাকি? আমিতো পরি আমার জন্য’ এই কথাটা আমার মনে হলো। এখনো কত অসহায় আমরা। জ্বলজ্যান্ত একটা মানুষ আত্মরক্ষা করতে পারি না, অথচ ভাবি সামান্য শাঁখা-সিঁদুর আমাদের রক্ষা করবে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.