আমার প্রণতি

MOnija
মনিজা রহমান

মনিজা রহমান: প্রতি জন্মদিনে আমার তিনজনের কথা খুব মনে হয়। তারা কেউই আমার রক্তের সম্পর্কের নন। তবু তারা মন ও মননের এত গভীরে প্রোথিত যেন, যুগ যুগান্তরের চেনা।

ওয়াহিদ ভাই জন্মদিনে কাউকে ফোন করতেন না। বাংলাদেশের সংস্কৃতিচর্চার পথিকৃৎ ওয়াহিদুল হকের কথা বলছি। কারো জন্মদিন এলে তিনি বলতেন, ফোন করার চেয়ে সশরীরে চলে গেলে কেমন হয় ! ঠিকই তিনি চলে যেতেন। একা কিংবা দলেবলে। ফোন করলে আন্তরিকতায় কোথায় যেন ঘাটতি থেকে যায় বলে মনে করতেন তিনি। এখন এই ফেইসবুকের যুগে কি করতেন ওয়াহিদ ভাই ? আমার মাঝে মাঝে খুব ভাবনা হয়। ফোন করারও তো সময় হয় না। কারো ওয়ালে এইচবিডি লিখেই খালাস !

জন্মদিন মানেই তো বয়স বেড়ে যাওয়া, জীবনের খাতা থেকে একটি বছর হারিয়ে ফেলা । তাহলে জন্মদিনে এত উদযাপন কেন?এমন প্রশ্ন সাঈদ স্যারের। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সাঈদ, যাকে বলা হয় আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর। ওনার একটা গল্প আছে। একটা কম বয়সী মেয়ে সরাসরি একদিন স্যারকে বলেছিলেন, ‘স্যার আপনার তো বয়স বেড়ে গেছে। আপনি তো বুড়ো হয়ে গেছেন।’

স্যার তখন মেয়েটাকে বলল, ‘তুমি কি জান, কতদিন বাঁচবে ?’ মেয়েটা বলল, না সে জানে না। তখন স্যার মেয়েটাকে উত্তর দিল, যদি তুমি এই মুহূর্তে মারা যাও আর আমি বিশ বছর বেঁচে থাকি। তাহলে কে বুড়ো? নিশ্চয়ই তোমার চেয়ে আমি অনেক তরুণ।’মাঝে মাঝে যখন ভাবি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি, হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের তারুণ্যের সময়গুলি… তখন স্যারের এই কথাগুলি মনে পড়ে।

প্রতি জন্মদিনে আমার একটা ফোন আসে। এমন হয় না কারো কারো যে, বিশেষ ওই দিনটাতে সকালবেলা থেকে আপনার মন বিষন্ন। কাছের মানুষের কাছে জন্মদিনে যেরকম প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশা করেছিলেন, সেরকম পাননি। ঠিক সেই মুহূর্তে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন থেকে ফোন আসে। ও পাশ থেকে একজন বলে, ‘আপনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাই। গুরুজি আপনার জন্য আজ বিশেষভাবে দোয়া করেছেন।’ সামান্য দুটি কথার কথার এতটাই শক্তি যে নিমিষে চোখ ভরে যায় পানিতে।

মনে হয়, আমার কথা ভাবার মতো তাহলে এই পৃথিবীতে কেউ আছে ! নিজেকে আর আগের মতো সামান্য, অসহায় মনে হয় না। গুরুজি মহাজাতক শহীদ আল বোখারির শান্ত-সৌম্য মুখটা ভাবলে আশ্চর্য্য এক প্রশান্তিতে ভরে যায় মন। আর তখনই মনে হয় কোয়ান্টাম ল্যাবে গিয়ে রক্তদান করে আসতে। কেননা তিনিই শিখিয়েছেন, ‌জন্মদিনে রক্ত দিন। একজনের জীবন বাঁচান।

এই তিনজন মানুষ বহু মানুষের মননে, চেতনায়, বিশ্বাসে, লড়াইয়ে, সংগ্রামে যুগিয়েছেন সাহস। তাদের দেখানো পথে বুঝতে পেরেছি আমরা.. কেন চেতনার রঙে পান্না সবুজ আর চুনী উঠে রাঙা হয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লালন কিংবা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে দেখা হয়নি। কিন্তু তাদের ছোঁয়া পেয়েছি এই যুগস্রষ্টাদের কৃপায়। তাদের অসামান্য সান্নিধ্যে। যে কারণেই কবিতা সিংহের ‘আমি সেই মেয়ে’ কবিতাটি যখন পড়ি, আমার সমগ্র সত্তা যেন ঝনঝন করে ওঠে কি এক প্রত্যয়ে !

….

আমি প্রণাম জানাই সেই প্রথম আগুনকে

যার নাম বর্ণ পরিচয়

সেই অগ্নিশুদ্ধ পরম্পরাকে

সেই সব পুরুষ রমণীকে যারা উনবিংশ শতাব্দীর

অন্ধকারের হাতলে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে

এক জন্মে আমাকে জন্ম জন্মান্তরের দরজা খুলে দিয়েছেন

………..

আমার হাতে জ্বলছে দিশারীদের শিক্ষার মহান শিখা

আপনারা… আপনারা নিজের দর্পণে আমাকে চিনুন, আমাকে চিনুন

আমাকে চিনুন

 

আমাকে, আমাদের চেনাতে সাহায্য করেছেন তারা। এক জন্ম থেকে আমাকে জন্ম জন্মান্তরের দীক্ষা দিয়েছেন।

মানুষের জীবনে বয়োসন্ধিকাল আসে ১৪ বা ১৫ বছর বয়সে। ঠিক তার কাছাকাছি বয়সেই জীবনের আদর্শ, বিশ্বাসগুলি তৈরী হয়। স্কুল ছেড়ে কলেজ জীবনশুরুর সেই সন্ধিক্ষণে যোগ দিলাম বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের পাঠচক্রে। প্রথম এক পরশপাথরের দেখা পেলাম।

সাদা পাঞ্জাবী পরা এক জন মানুষ। ঘন্টার পর ঘন্টা যার কথা শুনলেও ক্লান্তি আসে না। মনে হয় আরো শুনি। আরো।

পুরো বিশ্ব জগতকে বইয়ের মাধ্যমে আমাদের কাছে নিয়ে এলেন আবদুল্লাহ আবু সাঈদ স্যার। অতীত-বর্তমান একাকার হয়ে গেল। বিশেষ করে মানব মনের জটিল নিগুঢ় রহস্য উন্মোচনে বিস্মিত হলাম বার বার। আগে পড়া বইয়ের চরিত্রগুলিকে খুব সাদামাটা মনে হল। সপ্তপদীর রিনা ব্রাউন, কৃষ্ণকান্তের উইলের রোহিনী, পদ্মা নদীর মাঝির কপিলা, পুতুল নাচের ইতিকথার শশী কিংবা কবি উপন্যাসের বসন্ত আমার ভাবনার দরজাকে খুলে দিল। চেনাজানা জগতের মানুষ হয়েও তারা যেন কত অজানা।

অন্যরকম অনুভবে পড়লাম সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, নাজিম হিকমত কিংবা বোদলেয়ারের কবিতা। মোপাসা, জ্যাক লন্ডন, ও হেনরি, সমারসেট মম, টলস্টয়, মান্টো, রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্প। বিশ্ব সাহিত্যের এই শ্রেষ্ঠ কারিগরদের, জীবন থেকে ছিনিয়ে নেয়া এক খণ্ড ছবির চিত্রায়নের দৃশ্য অবলোকনে অতৃপ্ত হতাম। কিন্তু এটাই তো ছোট গল্পের বৈশিষ্ঠ্য।

সাঈদ স্যার বলতেন, বিশ্ব সাহিত্যে কেন্দ্রে ধরা যাক ৫০০ ছেলেমেয়ে এল। তবে সবাই যে শেষ পর্যন্ত ভাবনার এই বিশাল জগতে আলোর মশাল জ্বালিয়ে আজীবন ঘুরবে সেটা আশা করি না। তবে ৫ জনও যদি টিকে থাকে তারাই আলো ছড়াবে যেখানে যেভাবে থাকুক। বোধের, বোঝার, অনুভবের, চিন্তায় এক অদ্ভুত নিরপেক্ষতা, ত্রিকালদর্শীতা আর এভাবে আর কার কাছ থেকে পাব আমরা ?

সাঈদ স্যারের কাঁঠাল বাগানের বাসাটা নিতান্তই সাদামাটা। বই ছাড়া দ্রষ্টব্য কিছু নাই। আর ওয়াহিদুল হকের কাফরুলের বাসায় প্রথম গিয়ে হতাশ হননি এমন মানুষ হয়ত খুব কমই আছে। ড্রইংরুমে সোফা নেই। বেডরুমে খাট নেই। আলমারি নেই। ডাইনিং টেবিল নেই। মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে খাওয়ার ব্যবস্থা। শো পিস রাখার মতো কোন শোকেজ নেই। বাহুল্য নেই। কোন ফুটানি নেই।

আছে অনেক বই। হারমোনিয়াম। তবলা। ড্রইং রুম থেকে একজন মানুষের শিক্ষার-বোধের পরিচয় পাওয়া যায়। যার উজ্জ্বল শিক্ষা হতে পারেন ওয়াহিদ ভাই।

‌ওয়াহিদ ভাইকে প্রথম দেখি কণ্ঠশীলনের আবর্তনের প্রথম ক্লাসে। পাঞ্জাবী পরা একজন খর্বকায় মানুষ। নরম তুলতুলে চেহারা। কেউ ওনাকে দাদু ডাকেন। কেউ কাকা। আমরা সাধারণেরা বলতাম, ভাই। কথা বলেন খুব ধীরে, মোলায়েম কণ্ঠে। এটাই ছিল বাংলায় কথা বলার আদর্শ ধরণ। যেটা বুঝেছি অনেক পরে।

মিরপুর কাফরুলের অতি সাদামাটা ঘরে এমন একজন মানুষ বাস করতেন যার প্রতিভার পরিমাপ করার ক্ষমতা এদেশে কেন এই পৃথিবীতে কারো নেই। এত বিচিত্র জ্ঞানের সম্ভার ওয়াহিদ ভাইয়ের ছিল যে কল্পনায় আনাও দুস্কর। আমরা সারা রাত মুখস্ত করে এসে কণ্ঠশীলনেরবসায় বলতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলতাম। আর ওয়াহিদ ভাই কবে কোনকালে পড়েছেন, ঠিকই শুধরে দিতেন আমাদের।

উদ্ভিদ বিদ্যা, প্রাণী বিদ্যা, ভুগোল, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, জোতির্বিজ্ঞান থেকে শুরু করে এমনকি ক্রিকেট খেলা নিয়েও ওয়াহিদ ভাইয়ের বলার ক্ষমতা ছিল একজন পিএইচডি ডিগ্রিধারীর মতোই। উনি কোনকিছু জীবনে একবার পড়লে কোনদিন ভুলতেন না। এমন অসাধারণ ছিল তাঁর স্মৃতিশক্তি।

আমাদের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্কে নিয়ে যেতেন গাছ চেনানোর জন্য। নভোথিয়েটারে নিয়ে গেছেন আকাশের তারা চেনাতে। গান শেখাতেন আমাদের মতো অর্বাচীনদের। অথচ জানতাম যে, দুই বাংলার যে কোন শিল্পী কতখানি উদগ্রীব থাকতো ওয়াহিদ ভাইয়ের কাছ থেকে একটি প্রশংসা সূচক বাক্য শোনার জন্য।

এত বড় হয়েও এমন সাধারণ ….! কণ্ঠশীলনের কারো বিয়ে থাকলে ওয়াহিদ ভাইকে আলাদা ভাবে না বললেও তিনি চলে যেতেন ! অথচ আমরা … ? ও আমাকে গুরুত্ব দিল না, সে আমার সঙ্গে কথা বলল না.. ভেবে মনে মনে কত না গুমড়াতে থাকি।

সারা দেশে চরে বেড়াতেন। মানুষের শ্রেষ্ঠ গুণ…..সংঘায়নের শিক্ষা দিতেন। আমরা দেখেছি ওয়াহিদ ভাইকে নিয়ে মানুষের ভালোবাসা, উচ্ছাস, আন্তরিকতা। তবে আম জনতা যে ওনাকে দেখলেই বা এক নামে চিনে ফেলতো তা কিন্তু নয় ! এক নামে পরিচয় করিয়ে দেবার মতো কিছু ছিল না তাঁর। নাম-অর্থ-বিত্ত তাঁকে আকর্ষণ করতো না। খুব সাধারণের মধ্যেই থাকতে ভালোবাসতেন তিনি।

ওয়াহিদ ভাইয়ের মতো এতটা নারীবাদী মানুষও আমি কোনদিন দেখিনি। কণ্ঠশীলনের প্রয়োগে আমাদের উনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মালঞ্চ’ পড়াতেন। মানব মনের নিগুঢ় রহস্যের শুলুক সন্ধান দিতেন। নারী-পুরুষের ভালোবাসার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কান্না তিনি শুনিয়েছেন। উনি হেসে মাঝে মধ্যে বলতেন, ‘একজন পুরুষের মধ্যে অনেকখানি নারী থাকে। আবার একজন নারীর মধ্যে পুরুষও। আমি হয়ত কিছুটা মেয়েলি পুরুষ।’

সাঈদ স্যার বিশ্ব সাহিত্যের মনিমুক্তা আহরণ করে আমাদের সজ্ঞায়নের শিক্ষা দিতেন। বলতেন, মানুষের শ্রেষ্ঠগুণ তার সাংগঠনিক দক্ষতা। নয়ত আর যত গুণই থাকুক না কেন সে তো মন্দের ভালো। দেশের সব স্কুলে এই বার্তাকে পৌঁছে দেবার জন্য বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের মতো মহীরুহের জন্ম দিয়েছেন তিনি। আর ওয়াহিদ ভাই নিজের জীবনের শিক্ষা দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন সজ্ঞায়ন কাকে বলে। কাঁধে ঝোলা, পায়ে চটি পরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়াতেন রবীন্দ্র সঙ্গীত চর্চাকে ছড়িয়ে দিতে। ওয়াহিদ ভাইয়ের সঙ্গে ঢাকার বাইরে যাবার সুযোগ যাদের হয়েছে তারাই জানে ঢাকার বাইরে সংস্কৃতিপ্রেমী ব্রাত্য এই সব মানুষের কাছে কতখানি পুজনীয় তিনি! রবীন্দ্রনাথের ছবির পাশে তারা টাঙ্গিয়ে রাখে ওয়াহিদ ভাইয়ের ছবি।

কলেজে পড়তে সাঈদ স্যার আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পরে কণ্ঠশীলনে ঢুকে ওয়াহিদ ভাইকে পেলাম।

পেশাগত আর সাংসারিক জীবনের টানাপোড়েনে যখন দিশেহারা অবস্থা, তখনই জানলাম একজন মহাজাতক শহীদ আল বোখারির কথা। তিনি আড়ালের মানুষ। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে জীবনযাপনের বিজ্ঞান শেখান। সাঈদ স্যার আলোকিত মানুষ হতে বলেন। আর মহাজাতক সেই আলোকিত জীবনে সবাইকে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সৃষ্টির সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেবার কথা। ব্যক্তির ইহলৌকিক আর পারলৌকিক উন্নতির পাশাপাশি সঙ্ঘের শিক্ষা তিনিও দেন।

আগেই বলেছি মহাজাতক নিজেকে আড়ালে রাখতে ভালোবাসেন। একজন মানুষ এক জীবনে এত কাজ করতে পারে ওনাকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। একজন মানুষ এমনভাবে স্বপ্ন দেখতে পারে আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে সেটাও ওনাকে না দেখলে অজানাই থেকে যেত। জীবনে প্রথম লামায় গেলাম প্রথম রমজানে। কি সাদামাটা খাবার! মাছ নেই, মাংস নেই….শুধু সবজি, ভর্তা আর ডাল। তবু কত তৃপ্তি ভরে খাওয়া! ফ্যান ছাড়া ঘুমানো। কোনদিন ভাবতে পেরেছি? কোনকালে? সবার সঙ্গে জামাতে নামাজ পড়া। লাঠি হাতে পাহাড় বেয়ে ওঠা। পাহাড় চূড়ায় মেডিটেশনের অসামান্য অভিজ্ঞতা। আবার দুর্গম পাহাড় বেয়ে নেমে আসা।

লামা হল কোয়ান্টামের সব নারী সদস্যদের বাপের বাড়ী। এটা গুরুজির ঘোষণা। বাপের সংসারে, স্বামীর সংসারে আজীবন পরগাছার মতো কাটানো অর্ধেক জনগোষ্ঠির জন্য এরচেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কি হতে পারে? চারদিকে নেতিবাচকতা আচ্ছন্ন এক সমাজে একজন মানুষ ইতিবাচক ভাবতে বাধ্য করেন। বলেন, মানুষের মনই নিয়ন্ত্রণ করে সব কিছু। দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টান। জীবন পাল্টে যাবে। এভাবে সমস্যাকে সম্ভাবনায়, কষ্টকে প্রাপ্তি আর চ্যালেঞ্জকে আপন ভেবে সেই আমি পাল্টে গেলাম অনেকখানি।

তিনজনই সংঘায়নের কথা বলেন। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের দেশব্যাপী কার্যক্রম, সে তো সংঘেরই ফসল। গুরুজি বলেন, সংঘের ওপর সৃষ্টিকর্তার দোয়া থাকে। সৃষ্টির সেবায় নিজেকে নিবেদিত করতে পারাটা বড় ইবাদত। একজন মানুষের সবচেয়ে বড় গুণ কি? সাইদ স্যারের ভাষায়, সাংগঠনিক দক্ষতা। সততা, সত্যবাদিতা, পরোপকার, বিশ্বস্ততা যতই গুণই থাকুক না কেন, ওই মানুষকে বলা যাবে তুলনামূলকভাবে ভালো। কিন্তু পুরোপুরি ভালো বলা যাবে না যদি না তার সাংগঠনিক দক্ষতা না থাকে! আর ওয়াহিদ ভাই বলতেন, এই যে আমরা এখানে এক হয়েছি একটা ভালো কাজের জন্য। আবৃত্তি তো এখানে উপলক্ষ। লক্ষ্য হলো, সংগঠনের মাধ্যমে একে অন্যের আনন্দ-বেদনা শেয়ার করা। ওয়াহিদ ভাই ঘৃণা করতেন সেই সব সংগঠনকে যারা ক্ষমতায় যাবার লোভে সংগঠিত হয়। তাঁর ভাষায়, এতে করে শুরুতেই পচে যায় তারা।

বিশ্ব সাহিত্য সম্পর্কে সাঈদ স্যারের জ্ঞান ছিল অগাধ। উনি কিভাবে যেন বের করে আনতেন সারমর্মটুকু। সাহিত্যের মাধ্যমেও তিনি দিতেন সংঘায়নের শিক্ষা। জ্যাক লন্ডনের একটা গল্প আছে। এক তুষারে ঢাকা মরুতে আগুন জ্বালানো নিয়ে। একজন প্রচণ্ড কঠিন মানসিকতার মানুষের সঙ্গে লড়াই চলে এক নেকড়ের। দুইজনই চায় দুজনকে খেয়ে জীবন বাঁচাতে। ক্ষুধায়, পিপাসায়, পথ চলার ক্লান্তিতে দুজনের মুমুর্ষূ অবস্থা। মানুষটির একটি ম্যাচের কাঠি জ্বালানো দরকার ছিল। কিন্তু একা হওয়াতে সেই কাঠি সে জ্বালাতে পারেনি। ঠাণ্ডায় হাত জমে যাচ্ছিল। প্রচণ্ড লড়াই করার মানসিকতা থাকলেও, একজন সাহসী মানুষের সমস্ত গুণ নিয়েও মারা যায় লোকটি, কেবল একা হবার কারণে। সেই কত বছর আগে স্যারের মুখে গল্পটা শুনেছিলাম। কিন্তু এখনও মুগ্ধতার আবেশ রয়ে গেছে।

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘দি ওল্ড ম্যান এ্যান্ড দ্যা সি’। বইটা পড়ার পরে সাঈদ স্যার জানতে চেয়েছিলেন, ‘কেন বুড়ো মানুষটা মাছটা শেষ পর্যন্ত তীরে আনতে পারেনি বলতো?’ তরুণ বয়সে সামান্য জ্ঞানে কারো পক্ষে বলা সম্ভব হয়নি। স্যারও সেটা জানতেন। তাইতো তিনি একটু পরে বললেন, ‘বইতে দেখবে বৃদ্ধ বারবার একটা কিশোর ছেলের কথা বলছে। যে ছেলেটি মাছ ধরতে যাবার সময় সব সময় ওনার সঙ্গে থাকতো। কিন্তু বৃদ্ধ অনেকদিন কোন মাছ না পাবার কারণে ছেলেটির বাবা ওকে অন্যত্র কাজে লাগিয়ে দেয়। আর একা হবার কারণে বৃদ্ধের পক্ষে সম্ভব হয়নি মাছটিকে ডাঙ্গায় টেনে আনার। কারণ কোন মানুষই একা কোন কাজ করতে পারে না। তার দরকার হয় আরেকজনের সাহায্যের। আর এটাই সংগঠনের শিক্ষা।‘

স্যার একটা উদহারণ প্রায়ই দিতেন, রাস্তায় একজন ছিনতাইকারী যখন কাউকে আক্রমণ করে, তখন সবাই ছুটতে থাকে। কিন্তু এটা না করে রাস্তার সব মানুষ যদি একবার ঘুরে দাঁড়ায়, তবে ওই ছিনতাইকারীর কোন শক্তিই থাকে না।

সেই কবে কতকাল আগে কলেজ কর্মসূচীতে শোনা কথা, তবু আজও মার্বেলের ভিতরে গেথে থাকা ফুলের মতো মনের মধ্যে গেঁথে রেখেছি। স্যার বলতেন, দেখ প্রত্যেকটা মানুষই নায়ক। কারণ সে যখন জন্ম নেয়, তখন সে নিষ্পাপ শিশু। কিন্তু পারিপার্শ্বিকতা অনেক সময় মানুষকে নায়ক থাকতে দেয় না। কিন্তু মানুষের স্বপ্ন থাকে নায়ক হবার। স্যার এই নিয়ে কথা বলতে বলতে প্রশ্ন করেছিলেন, তোমরা যখন সিনেমা দেখ… কাকে পছন্দ কর? নায়ক নাকি ভিলেনকে? অবশ্যই নায়ককে। দুই পক্ষের মারামারি হলে সবাই নায়কের পক্ষে তালি দেয়। কারণ ওই যে প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই স্বপ্ন থাকে নায়ক হবার।

উপস্থিত বুদ্ধি বাংলায় যাকে বলে প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, স্যারের জন্যেই যেন শব্দটা সৃষ্টি হয়েছিল। বহুদিন আগে কোন একটা উৎসবে আমরা মেয়েরা খুব সেজেগুজে এসেছিলাম। ছেলেরা বরাবরের মতো অগোছালো। উদাসীন। আমাদের মেয়েদের মধ্যে একজন স্যারকে বলল, দেখেছেন স্যার। ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা কত সৌন্দর্য্য সচেতন। আমরা সেজেছি। ওরা কিন্তু সাজেনি। স্যার তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন, ‘ছেলেদের সৌন্দর্য্যবোধ আছে বলেই তোমরা সেজেছ। আর তোমাদের সেটা নাই বলে ওরা সাজেনি।’ স্যারের ওই কথায় ছেলেরা তো বেজায় উল্লসিত।

প্রেম নিয়ে স্যারের উক্তিটি সবসময় মনে পড়ে। উনি বলেছিলেন, ‘বন্ধুত্ব হল মালভূমির মতো। যেখানে অনেকে দাঁড়াতে পারে। আর প্রেম হল পাহাড় চূড়া। যেখানে ঠাঁই হয় শুধু একজনরেই’। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে অনেকদিন পরে বন্ধু নাহিদকে নিয়ে স্যারের ভুতের গলির বাসায় গিয়েছিলাম। জানতে চেয়েছিলাম, সত্যিকারের প্রেম বলে কিছু আছে স্যার? আসলেই কি জীবন ভর একজন পুরুষ বা নারী আরেকজনকে ভালোবেসে যেতে পারে? স্যার কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, আমি সত্যিকারের প্রেম আছে এমন কাউকে পাইনি। তবে এরকম প্রেম নিশ্চয়ই আছে। হ্যান্স ক্রিষ্টিয়ান এ্যান্ডারসন একটি মেয়েকে ভালোবাসতেন। মেয়েটি পরে মারা যায়। এ্যান্ডারসন আর কোনদিন বিয়ে করেননি। মৃত্যুর পরে তার বুক পকেটে মেয়েটির লেখা একটি পুরনো চিঠি পাওয়া গিয়েছিল। এটাই হয়ত সত্যিকারের প্রেম। তবে প্রেমের চেয়ে বন্ধুত্ব অনেক বেশীদিন টিকে থাকে। প্রেম করে কাউকে বিয়ের পরে দুজন দুজনকে বন্ধু করে ফেলা উচিত।

কণ্ঠশীলনের প্রয়োগে ওয়াহিদ ভাইয়ের পড়ানো ‘মালঞ্চ’ পড়ে জীবনের অনেক কিছু শিখেছি। মোটা দাগে দেখা মানসিকতা থেকে উত্তরণ ঘটেছে। হৃদয়ের কথা শুনতেন ওয়াহিদ ভাই। কেমন যেন অনুভব করে কথা বলতেন। যে জন্য তার কথা শুনতে বার বার মানুষ ছুটে ছুটে আসতো। ওয়াহিদ ভাই বলতেন, পথে কেউ আমাকে বাসার ঠিকানা শুধালে আমি উত্তর দেবার পরেও দেখি সে আবার জানতে চায়। বাসে যাবার সময় ভাড়া দেবার পরেও কন্ডাকটর দাঁড়িয়ে থাকে। আমি বলি ভাড়া তো দেয়া হয়ে গেছে। তবু সে নড়ে না। অনেকক্ষণ পরে লাজুক হাসি হেসে বলে, স্যার আপনার কথা শুনতে ভালো লাগছে। ঠিকানা খুঁজতে থাকা মানুষটিরও বার বার ফিরে আসার কারণ সেই সুন্দর করে কথা বলা। ওয়াহিদ ভাই সবাইকে হাসিমুখে, কোমল স্বরে কথা বলার জন্য বলতেন বার বার।

আমার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনার একটি ওয়াহিদ ভাইয়ের চলে যাওয়া। জীবনে এত কষ্ট খুব কম পেয়েছি। শেষদিকে কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল তাকে। একবার শুনতাম উনি আর নেই।কান্নায় ভেঙ্গে পড়তাম। আবার শুনতাম ডাক্তাররা এখনও আশা ছাড়েননি। আশায় বুক বাঁধতাম। এভাবে কেটেছে সময়। মনে আছে সেইদিনের ঘটনা। ওয়াহিদ ভাই মারা যান বারডেম হাসপাতালে। হাসপাতালের কান্না বিধুর পরিবেশ থেকে কাউকে কিছু না বলে বাইরে চলে আসি। ওখান থেকে ইস্কাটনের বাসায় হেঁটে আসছিলাম। পথে দেখা হয়ে যায় আমার স্বামীর একজন বন্ধুর সঙ্গে। আমার শোকাগ্রস্ত মুখ দেখে উনি বিস্মিত হয়েছিলেন। আমার স্বামীকে ফোন করে জানতে চেয়েছিলেন, ‘ভাবীর বাবা যে এত অসুস্থ তাতো আগে বলেননি!’

আসলে কণ্ঠশীলনের সদস্যদের কাছে বাবার চেয়েও অনেক বেশী ছিলেন ওয়াহিদ ভাই। দলের প্রত্যেক ছেলেমেয়ের হাতখরচ চালানোর ব্যবস্থা করে দিতেন তিনি। চাকরীর ব্যবস্থা করে, টিউশনি জুটিয়ে দিয়ে। ছাত্রাবস্থায় ওই সামান্য টাকাগুলি কতখানি জরুরি ছিল, ওয়াহিদ ভাইয়ের মতো আর কে বুঝতেন!

মহাজাতক শহীদ আল বোখারি হলেন কোয়ান্টামের প্রত্যেকের আধ্যাত্নিক পিতা। ওয়াহিদ ভাই কিংবা সাঈদ স্যারের মতো প্রেমের ব্যাপারে এতখানি উদার নন মহাজাতক। ওনার ভাষ্যমতে, শরীরে বিশেষ একটি হরমোনের কারণেই প্রেম হয়। যার স্থায়ীত্ব আসলে সামান্য দিন। মানুষকে তাই প্রেমের মোহ ভুলে ভালোবাসতে হবে স্রষ্টার সৃষ্টিকে। প্রেম বিষয়ে গান-কবিতার ব্যাপারে তিনি আগ্রহী নন। গুরুজির সাফ কথা, বাবা-মায়ের অমতে বিয়ে করলে সেই বিয়ে সুখের হয় না। আসলে জাগতিক মায়া-মোহ ভুলে পরমাত্নার সন্ধানের কথা বলেন তিনি। তার বক্তব্য, আমরা প্রভুর কাছ থেকে দুনিয়ায় এসেছি। আবার আমরা তার কাছে ফিরে যাব। কবর হল মহাজাগতিক সফরের প্রথম ধাপ।

মনকে কিভাবে বর্তমানে রাখা যায় সেই শিক্ষাই দেন গুরুজি। সাধারণ মানুষ কখনও বর্তমান নিয়ে সুখী থাকে না। তার মন হয় অতীতের ভুলের অনুশোচনা করে। নয়ত ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা করে। কিন্তু বর্তমানকে উপভোগ করার কথা বলেন তিনি। সর্বাবস্থায় ‘শোকর আল্লাহামদুলিল্লাহ’ বলার জন্য সবাইকে উদ্ধুদ্ধ করেন। সুস্থ দেহ, প্রশান্ত মন, কর্ম ব্যস্ত সুখী জীবনের কথা বলেন। মানুষকে সুখী হতে হলে খুব বেশী কিছু লাগবে না। তিনটির জিনিষের কথা বলেন তিনি। সুস্থ দেহ থাকতে হবে। মনে প্রশান্তি থাকতে হবে। আর কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে নিজেকে। এই তিনটার কোনটির অভাব ঘটলে মানুষ সুখী হতে পারে না। বৈজ্ঞানিক ব্য্যাখার মাধ্যমে তিনি বোঝাতেন, কেন রেগে গেলে হেরে যায় মানুষ। প্রো এ্যাকটিভ আর রি এ্যাকটিভ হবার মধ্যে পার্থক্য বোঝান। জীবনে ঝড়ঝাপটা যাই আসুক নিজেকে কিভাবে শান্ত রাখা যায় তার দীক্ষা দেন। আর এজন্য মেডিটেশনের বিকল্প কোন কিছু নাই বল জানিয়ে দেন।

ওয়াহিদ ভাই ও সাঈদ স্যারও ইতিবাচকতার দীক্ষাই দেন। আসলে তারা তিনজনই যেন মনের মধ্যে সুদূরের ডাক শুনতে পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর উপন্যাসে অমল যেমন জানতে চাইতো পাহাড়ের ওপাশে কি আছে? সাধারণ মানুষের মধ্যে মধ্যে এই অনন্তের জিজ্ঞাসা থাকে না। কবি নজরুল ইসলামের সেই শিশুর প্রশ্নের মতো, ‘আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে?’ তিনজনই সকাল হবার জন্য অপেক্ষা করেননি। নিজেরাই সকাল সৃষ্টি করেছেন। এজন্যেই তো তারা প্রণম্য।

মনিজা রহমান, সাংবাদিক ও লেখক

[email protected]

(লেখাটি ঈদসংখ্যা আনন্দধারায় প্রকাশিত হয়েছে এবছর)

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.