কি প্রয়োজন নারীর এমন শিক্ষার!

Children with booksশামীমা মিতু: পেশাগত দায়িত্ব পালন করতেই রাজধানীর বেশ কয়েকটি স্কুলে ঘুরেছি আজ। এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। পরীক্ষায়  উত্তীর্ণ হয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর একেকজনের আনন্দঘন মুখ, উল্লাসে, স্বপ্নে আকাশ ছুঁয়ে যাবে যেন। ছড়িয়ে পড়বে পৃথিবীর এ প্রান্তথেকে ও প্রান্তে। পাড়ি জমাবে মহাকাশে।

এইচএসসির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জীবনের লক্ষ্য কি হতে পারে? অনুভুতি জানাতে অনেক স্বপ্নের কথা বলেছে খুশির জোয়ারে ভাসা ছেলে মেয়েরা। কেউ আর্কিটেক্ট হতে চায়, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ ইঞ্জিনিয়ার। আরো কত যে স্বপ্নের ছড়াছড়ি। কিন্তু অদ্ভুত ও মর্মান্তিক হলেও আজ এক সত্য ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। রেজাল্টের অনুভুতি জানাতে জিপিএ-৫ পাওয়া ডেমরা ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের এক মেয়ে জানায়, সে শিক্ষিত ও আদর্শ গৃহিনী হতে চায়।

শুধু ওই মেয়ে নয়, এখনো পর্যন্ত অধিকাংশ মেয়ের উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্য বিয়ের জন্য ভালো পাত্র পাওয়া। এমনকি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মেয়ে এবং তাদের অভিভাবকদের মাথায়ও ‘ভালো বর, ভালো ঘর’ এর ভূত চেপে থাকে। এসব মেয়েরা যেন আগ্রহীই না নিজেদের পরিচয় তৈরি করতে। নিজেদের অস্তিত্ব স্বগৌরবে জানান দিতে। নিজেদের মেধার প্রকাশ ঘটাতে।

দেশে আজ পর্যন্ত কতজন নারী সফল ইঞ্জিনিয়ার হতে পেরেছে? বিজ্ঞানী, আর্কিটেক্ট, পেইন্টার, ভাস্কর, জাজ, দার্শনিক, কর্পোরেট হাউসের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, বিমান চালক, কূটনীতিবিদ, অধ্যাপক, আইনজীবী? কতজন মেয়ে পেরেছে নিজের স্বকীয়তা প্রমাণ করতে। হ্যাঁ পেরেছে, হাতে গোনা কয়েকজন। প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে যত মেয়ে বের হচ্ছে তার তুলনায় এই হাতে সংখ্যাকি সমুদ্রে খড়কুটোর মত নয়?

বেগম রোকেয়ার ‘অবরোধবাসিনী’তে পাওয়া যায়, চোরে কান কেটে গহনা নিয়ে গেছে কিন্তু পরপুরুষে কন্ঠস্বর শুনবে বলে চিৎকার করেনি মেয়েটি। সেই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে বহু সময় পার হয়ে গেছে। তাছাড়া শিক্ষার সুযোগ পেতে ঘর থেকে স্কুল পর্যন্ত যেতেও বহুকাঠখড় পোড়াতে হয়েছে মেয়েদের। যার প্রতিদান ‘উচ্চ শিক্ষিত হওয়ার উদ্যেশ্যে একজন ভালোপাত্র পাওয়া’ কখনোই হতে পারে না। কখনোই হতে পারে না উচ্চ শিক্ষিত একজন নারী অথর্বের মতো টাকাওয়ালা স্বামীর ঘরের শোভা বাড়াবে। তা যদি কেউ করে থাকে তবে অবশ্যই এইসব মেয়েরা ‘নারী মুক্তির কিংবা নারী শিক্ষার পথে এতদুর হেঁটে আসা’ সভ্যতার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। অমার্জনীয় অপরাধ করছে।

বাস্তবতা এমন, এখনো অধিকাংশ মেয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করেও গৃহিনী হয়ে জীবনযাপন করে কিংবা গৃহিনী হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কোনো কাজের সাথে যুক্ত হলেও যেটা যেন গৌণ! মেয়েরা কবে বুঝবে পরজীবি হয়ে বিলাসী জীবন যাপনে সে পরজীবীরই মর্যাদা পায়। যাকে রাখলেও ক্ষতি নেই,ছুড়ে ফেললেও ক্ষতি নেই! অথচ কিছু মেয়ে নিজের পরিচয় গড়তে আকাশ সমান ত্যাগ স্বীকার করে যাচ্ছে করে যাচ্ছে এই সমাজে, পরিশ্রম করছে, পরিবারর থেকে শুরু করে সমাজ রাষ্ট্রের প্রতিটা স্তরে জানান দিয়ে যাচ্ছে ‘সময় এখন মেয়েদের’।

একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে বাংলায় ‘নিজে ভালো তো জগৎ ভালো’। এ কথাটি আমি একেবারেই সমর্থন করি না। কারণ নিজে ভালো হলেই সমাজের ধর্মান্ধ, মৌলবাদি, সাম্প্রাদায়িক, নারী নির্যাতনকারীরা ভালো হয়ে যায় না। তবে মেয়েদের বেলায় আজ আমি এই কথাটি প্রয়োগ করবো। পুরুষতান্ত্রিকতার এত কুটকৌশলের মাঝে নিজেদের আত্মসম্মান, মর্যাদা, স্বকীয়তার মূল্যায়ন যদি নিজেরাই করতে না পারে তবে কি প্রয়োজন ‘তাদের’  এমন উচ্চ শিক্ষার?

বাধা থাকবেই কিন্তু নিজের কন্ঠ পৃথিবীকে শোনানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যারা পেছন পথে হাটে কিংবা স্থবির হয়ে থাকে নারীর এগিয়ে যাওয়ার পথে সভ্যতার বুকে বিশ্বাসঘাতক হয়েই থাকবে।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.