আইসিটি অ্যাক্ট একটা ‘বর্বর’ আইন: তসলিমা

Taslima addaউইমেন চ্যাপ্টার: বাংলাদেশে আইসিটি (সংশোধিত) অ্যাক্টকে ‘বর্বর আইন’ বলে অভিহিত করেছেন নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিন। তিনি বলেন, এখানে আইনজীবীদের একত্র হয়ে লড়াই করা উচিত এই আইনটা বাতিলের জন্য। বাংলাদেশ যদি গণতান্ত্রিক দেশ হয়, তবে এই আইন থাকতে পারে না। গণতন্ত্রের প্রধান পিলার হচ্ছে ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন। কিন্তু এই আইন চলে যায় বাক স্বাধীনতা, মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে। এটা তো চলতে পারে না।

গত ১০ই আগস্ট ওয়ার্ল্ড হিউম্যানিস্ট কংগ্রেসের শেষ দিনে অক্সফোর্ডে একসাথে আড্ডা দেন বাংলাদেশের বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন, ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন ও ব্লগার আরিফুর রহমান। সেখানেই এই মন্তব্য করেন তসলিমা নাসরিন। উইমেন চ্যাপ্টারের পাঠকদের জন্য তাদের বক্তব্য তুলে ধরা হলো।

অনানুষ্ঠানিক এই আড্ডায় গত বিশ বছর দেশের বাইরে নির্বাসিত জীবনযাপন নিয়ে, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, নতুন প্রজন্মসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
তসলিমা নাসরিনের এক প্রশ্নের জবাবে ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন বলেন,  প্রথম প্রথম একটু অস্বাভাবিক লাগলেও, এখন একটু সাহস পাচ্ছি। এতো মানুষ একসাথে কখনো দেখিনি। এতদিন যে কাজগুলো করে আসছিলাম তা বিফলে যায়নি। যখন জেল-এ ছিলাম তখন খুব হতাশাগ্রস্ত লাগতো। মনে হতো কিসের জন্য করলাম?কাদের জন্য করলাম? যে মানুষদের জন্য লিখছিলাম তারাই তো গালিগালাজ করতো, তারা ঘৃণা করতো। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে না, কিছুতো এগিয়েছে। এই যে আপনার সাথে দেখা হলো, ডকিন্সসহ অনেকের সাথে দেখা হল এটাও এক বড় সাফল্য।

তসলিমা নাসরিন বলেন,  এখন তো ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে আসছো। কাজ করছো,  অনেকের সাথে দেখা করছো, তোমাকে দেখতে অনেক আসছে। কত লোক তোমাকে ইনভাইট করছে। কতো লোক আপ্রিসিয়েট করছে তোমার কাজকে। তুমি যা করছো, তোমার খুব ভালো লাগে না?

জবাবে আসিফ বলেন হ্যাঁ, এক ধরনের গর্ব বোধ হয় আমি বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করছি, বাংলাদেশকে সামনে নিয়ে আসছি। কিন্তু বাংলাদেশকে নিয়ে আপনার মতই হতাশা থাকে। তারপরও দেশটা তো আমাদেরই।
তসলিমা নাসরিন বলেন,  দেখ, বাংলাদেশ সম্পর্কে আমি অনেক আগের কথা বলছি, জানি বাংলাদেশ একটি গরিব দেশ, যেখানে বছরে বছরে বন্যা হয়, জানি যে একদিন বাংলাদেশ ডুবে যাবে। জানি ওখানে ইসলামী মৌলবাদীর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু যা জানি না, তাহলো, ওখানেও মানুষ আছে ফ্রি চিন্তার, ওখানেও যুক্তিবাদী মানুষ আছে, আছে মানবতাবাদী, অসাম্প্রদায়িক। তারা আন্দোলন করছে।

তসলিমা নাসরিন বলেন,  আমার বিরুদ্ধে সরকার মামলা করেছে,মৌলবাদীরা করেছে, তারা তাণ্ডব করেছে, কিন্তু আমি যে আছি ওখানে যে মানুষ আছে কথা বলার, বই লেখার, তুমি আছ ব্লগ লেখার। তোমাদের উপর খুব অত্যাচার হচ্ছে। তারপরও তোমাদের মত মানুষ আছে। আমার মত মানুষ আছে।

তসলিমা নাসরিন বলেন, বাংলাদেশ শুধু ইসলামমি মৌলবাদীই তৈরি করছে না, আমাদের মত মানুষও তৈরি করছে। সুতরাং এটাতো মানুষ জানছে বিদেশে। শুধু যে বাংলাদেশ একটি গরিব দেশ দুদিন পর ডুবে যাবে, তা না। ওখানেও মানুষ আছে যারা চিন্তা করে,  ওখানেও মানুষ আছে যারা সমাজটাকে বদলাতে চায়, ওখানেও মানুষ আছে যারা স্বপ্ন দেখে। আমরাই সেই বার্তাটা পৌঁছে দিচ্ছি ওখানে। পজিটিভ জিনিস দিচ্ছি যেটা অন্য কেউ দিতে পারে না বাংলাদেশে। দেশের মানুষ প্রতিবাদ করে সেটা তো সাংঘাতিক একটি পজিটিভ দিক।

তসলিমা বলেন, কেন আমাকে দেশ থেকে বের করে দিল। দেখ এতো বাধা,  এতো কষ্ট তারপরও আমি লিখে যাচ্ছি। আমার মত আসিফও অনেক কষ্ট করে লিখছে।

তসলিমা নাসরিন বলেন, আমি অনেক কষ্ট করে যাচ্ছি যাতে বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা আমাকে দেখে শিখে এবং তারা আমার মত হয়।

ব্লগার আরিফুর রহমান বলেন, আপনি অনেক কষ্ট করে যাচ্ছেন। আপনি ছোটবেলা থেকেই আমাদের মনের মাঝে আছেন কারণ আপনি প্রথম যোদ্ধা।বাংলাদেশে একটি আইন হচ্ছে আইসিটি অ্যাক্ট, যা আর কোন দেশে নেই,  আপনি কোন কথা বলতে পারবেন না। কিছু লিখলেই জেলে চলে যাবেন। এ প্রসঙ্গে আসিফ এবং আরিফ দুজনই কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরেন, যারা প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে লিখে এখন দণ্ড ভোগ করছে।

তসলিমা নাসরিন বলেন, আইসিটি অ্যাক্ট এর মত এতো বর্বর আইন আর কোন দেশে নেই। বাংলাদেশে আরও অনেক আইন আছে এরকম এগুলো বাতিল করতে হবে।

নারী স্বাধীনতা নিয়েও কথা হয় তাদের মধ্যে। একপর্যায়ে তসলিমা জিজ্ঞাসা করেন, দেশে লিভ টুগেদার হয় কিনা! দুজনই বলেন, কিছু কিছু হয়, তবে তা হয় গোপনে। এখনও মানুষের সেই সাহস হয়নি ঘোষণা দিয়ে একসাথে থাকার। এ প্রসঙ্গে তসলিমা বলেন,  আমি ব্যক্তিগতভাবে বিয়েবিরোধী নই। তবে বিয়ে যে করতেই হবে, তাও নয়। যে করতে চায় না, তার কেন স্বাধীনতা থাকবে না তার প্রিয় মানুষের সাথে একসাথে থাকার। লিভ টুগেদার এক অর্থে ভালোই। যদিও এখনও অধিকাংশই হয় অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো মেলামেশা করে একজন আরেকজনকে চেনার সুযোগ পায়। কিন্তু সেটা হাতেগোণা। লিভটুগেদার করলে একজন আরেকজনের ভালোমন্দ দিক নিয়ে ভালো করে জানার এবং বোঝার সুযোগ পায়। তারপর ইচ্ছে করলে বিয়ে করবে, নয়তো করবে না।

তসলিমা আরও বলেন, এটা খুবই অস্বাভাবিক যে, একজন স্ট্রেঞ্জারের সাথে প্রথমদিনেই শুতে হচ্ছে। এটা যেন একটা লটারির মতোন। লাগলো তো হয়ে গেল।

একা মেয়েদের বাসা ভাড়া করা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথাও বলেন তসলিমা। তবে ঢাকা শহরে এখন অনেক মেয়েই একা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছে, এটা জেনে তিনি খুশি হন।

তিনি বলেন, ২০ বছর পর তিনি এই প্রথমবারের মতোন এমন তরুণ প্রজন্মের দেখা পেলেন, যারা বলছে যে, তারা তসলিমাকে পড়েছে, তারা তাকে পছন্দ করে, তারা তার দেশে ফিরে আসার ব্যাপারে সোচ্চার।

এই প্রজন্মই পারে দেশটাকে বদলাতে, এমন আশার কথাও বলেন তসলিমা। পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে বিবদমান দ্বন্দ্বগুলো নিজেরাই মিটিয়ে ফেলার অনুরোধ করে তিনি বলেন, নইলে এর মাঝেই সুযোগ খুঁজবে স্বার্থান্বেষী মহল। (বিস্তারিত পরে আসছে)

 

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.