সোভিয়েত নারীর দেশে-১৮

peter 2সুপ্রীতি ধর: জীবনটা তখন কানায় কানায় পূর্ণ ছিল, বিলাসিতা না থাকলেও। আর বিলাসিতাই বা ছিল না, কিভাবে বলি? যখন যেখানে খুশি চলে যাচ্ছি, ঘুরছি-ফিরছি, হৈ-হুল্লোড় করছি, পড়াশোনাও করছি সময় মতো, আর কী চাই! ছোটবেলা থেকেই কম পেয়ে অভ্যস্ত হয়েছি, কাজেই দোকানের ঝা চকচকে জিনিসপত্রে আমার নেশা কমই ছিল। তবে সংসারের টুকিটাকি আসবাবপত্র আমায় টানতো খুব। সুযোগ পেলেই রূপোর চামচ, রূপোর থালা-বাটি কিনতাম। আজ মনে হয়, সেইসব মূল্যবান জিনিসগুলো গিফট না দিয়ে নিজের জন্য রাখলেই পারতাম। সম্পর্কগুলো তো আর টেকেনি, কিন্তু জিনিসগুলো ঠিকই রয়ে গেছে তাদের ঘরের শোভাবর্ধনের কাজে।

জিমে যেতাম নিয়মিত। সপ্তাহে একদিন সাউনা। তিন ঘন্টা ধরে গরম-ঠাণ্ডা পানিতে স্নান, সুইমিং, হট ভ্যাপার নেয়া, পুরো সপ্তাহের জন্য জাদুর মতোন কাজ করতো। একদিন অপেরা শুনতে যাওয়া, একদিন কনসার্ট দেখতে যাওয়া, সিনেমার তো কোন দিনক্ষণই নেই। ফিগার স্কেটিং দেখতে যাওয়া। ভাল ছবি রিলিজ পেলেই আমার পোলিশ বন্ধুরা আমার জন্য টিকেট নিয়ে আসতো। দলবেঁধে সিনেমা দেখতে যাওয়া, সে এক দিন ছিল বটে!

Peter 6
আমি, মৃণালদা, শিউলী আপা ও মোতালেব

Peter 1তার মাঝে আবার হেরমিটেজে গিয়ে আর্ট সেশনে ভর্তি হই আমি। অষ্টাদশ শতকের রিয়ালিজম, বিংশ শতকের স্যুরিয়ালিজম, সর্বোপরি ইমপ্রেসিয়ানিজম তখন আমার মাথার মধ্যে ঘুরছে। তবে রিয়ালিজমটাই বেশি নেশায় পেয়ে গিয়েছিল। এর শেষ দেখা চাই। পুরো ক্লাসে আমি একা বিদেশি, আর কম বয়সী। তাই সবার নজরও আমার দিকেই। এর মাঝেই একদিন শুনি রেমব্রান্টের বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘দানাইয়া’র ওপর কোন এক বিকৃত মস্তিষ্কের লোক এসিড ছুঁড়ে মেরেছে। আমরা সব দৌড়ে গেলাম সেই খবরে। সত্যিই তাই। তিন বছরেরও বেশি সময় লেগেছিল সেই ছবি রেনোভেট করতে। সেই সময়কার রংই কই, শিল্পীই বা কই! এরপর থেকে কিছুটা কড়াকড়ি আরোপ হয় হেরমিটেজে।

এমনি সব ব্যস্ততার জীবনে ঘরে আমাকে পাওয়াই মুশকিল ছিল। ফলে বাংলাদেশি বন্ধুরা এমনও দিন গেছে, শীতের মধ্যে, বিশেষ করে সমুদ্র পাড়ের পাগলা হাওয়ার মধ্যে ঘন্টাখানে জার্নি করে এসে ফেরতও গেছে না পেয়ে। রেখে গেছে ছোট্ট চিরকুট, ‘এসেছিলাম’। কী মিষ্টি! পরে থেকে অনেকেই বুদ্ধি শিখে গিয়েছিল। বাজার করে নিয়ে আসতো। আমাকে রুমে পেলেও সই, না পেলেও অসুবিধা নেই। এসে মুরগি কেটে, রান্না করে  রুমমেটদের সাথে নিয়ে খেয়ে-দেয়ে বাসনকোসন ধুয়ে রেখে যেত। আমার রুমমেটরা এমনই ভাল মেয়ে ছিল। 🙂

একদিন জিম থেকে বের হচ্ছি, পরনে ট্রাউজার আর হালকা জ্যাকেট। পকেটে হাত ঢুকিয়ে হাঁটছিলাম। দেখলাম একটি বছর দশেকের ছেলে খুব ফলো করছে আমার হাতটা। থেমে গেলাম। বললাম, কিছু হয়েছে তোমার? ছেলেটি ভরসার কণ্ঠ শুনে কোনরকম দ্বিধা না করেই ২০ রুবল চেয়ে বসলো। তখনও ২০ রুবলের দাম অনেক সোভিয়েত রাশিয়ায়। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। গত আড়াই বছরে এমন কথা কখনও শুনিনি। হঠাৎই মেজাজটা বিগড়ে গেল, বললাম, ‘তুমি কি জানো কি বলছো? কেন তুমি একজন বিদেশির কাছে নিজেকে ছোট করছো? কেন নিজের সংস্কৃতিকে অপমান করছো’? ছেলেটি ততক্ষণে পালিয়ে বাঁচে। মনটা আমার খারাপ হয়ে গেল।

Peter 8দেশটিতে চোখের আড়ালে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলো কিভাবে মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলছিল, এটা তারই একটা নমুনা ছিল মাত্র। বিশ্বের সবচেয়ে বড় একটা দেশ, রাজনৈতিক সিস্টেম আলাদা, অনেক না পাওয়া আছে, কষ্ট আছে, তারপরও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আকাশচুম্বি। সেটাই আজ ধূলিসাৎ হতে বসেছে। আর এর জন্য আমরা বিদেশিরাও কম দায়ী নই। যাদেরই সামর্থ্য আছে দেশ থেকে টাকা আনছি, খরচ করছি, অভাব বুঝতে দিচ্ছি না। যাদের তা না আছে, তারা পাশ্চাত্যের দেশে যাচ্ছি, ওখানে গিয়ে কাজ করে টাকা আনছি, আসার সময় বিক্রয়যোগ্য জিনিসপত্র নিয়ে আসছি, ১০ গুণ দামে বিক্রি করছি এই সোভিয়েত লোকজনের কাছেই। বিবর্তনটা এভাবেই ঘটে যাচ্ছিল কখনও তলে তলে, কখনও বা দৃশ্যমান হয়ে। সোভিয়েতরা টাকা আয়ের সহজ পথ না পেয়ে বাঁকা পথেই অগ্রসর হচ্ছিল। কি করবে, খেয়ে তো বাঁচতে হবে!

এরই মধ্যে ৮৮ সালের ১৮ জুলাই আমাদেরই সহপাঠী ডাক্তারি পড়ুয়া বেলী-লোকেশের ঘরে ছেলে অনিন্দ্য জন্ম নেয়। দেশে থাকতে ভাগ্নে-ভাতিজা পেলে বড় করার অভিজ্ঞতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি কিছুদিন, কিন্তু সময় বের করাই তো কঠিন। তাছাড়া দূরত্বও একটা ব্যাপার। বেলীর শরীর ভাল ছিল না শুরু থেকেই। অনিন্দ্য হওয়ার পর তার যক্ষ্মা ধরা পড়ে। ডাক্তাররা বাচ্চাটাকে এতিমখানায়, আর বেলীকে পাঠিয়ে দেয় কৃষ্ণসাগরের পাড়ে অবকাশ যাপন কেন্দ্র সোচিতে। আমাদের হৃদয় ভেঙে খান খান হয়ে যায়। মাঝে মাঝেই শিউলী আপা আর আমি গিয়ে দেখে আসি অনিন্দ্যকে। ও শুধু কাঁদে। আমাদের সবার মধ্যে একখানা শিশু, তাও এতিমখানায়। মানতে না চাইলেও আমরা তো মা নই, মেনে নিতেই হয়।

যা বলছিলাম, আসলে এতোদিন পর রোজ নামচা লিখতে গিয়ে ঘটনাগুলো সাজিয়ে রাখা যাচ্ছে না। আগে-পরে হয়ে যাচ্ছে। কোথাও তো আসলে লিখিত কিছু নেই। সবই স্মৃতি থেকে লেখা। তবে মনে হয়, এইতো সেদিনের কথা।

৮৮ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত হয় অষ্টম ইউয়েফা ইউরোপীয়ান ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ। সেমিফাইনালে ইতালি আর রাশিয়া খেলছে। তখন আমাদের গ্রীষ্মের ছুটি চলছে। সবাই হোস্টেলে মহা আগ্রহ নিয়ে খেলা দেখছি। সোভিয়েত ইউনিয়ন রেখে কি অন্য দলকে সাপোর্ট করতে পারি? ২-০ গোলে ইতালিকে হারানোর পর পুরো তিনটি ১৯ তলা ভবন যেন চিৎকারে চিৎকারে ভেঙে পড়তে চাইলো। আমি আনন্দে-খুশিতে জানালার পাশে থাকা টিনের পাতের মধ্যে ডালের ঘুটনি দিয়ে পিটাতে লাগলাম। পুরো এলাকা গমগম করছিল মধ্যরাতে। একটু পরেই সব থেমে গেল পুলিশের হুইসেলে। মাইক নিয়ে পুলিশ বলতে লাগলো, আমরা যদি না থামি, তবে আমাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশান নেয়া হবে। ওরা এও জানালো যে, আমরা যেন ভুলে না যাই, হোস্টেলের পাশেই আবাসিক এলাকা, যেখানে স্বাভাবিক লোকজন এখন ঘুমাচ্ছে’।

যার দেশ তার খবর নাই, পাড়া-পড়শীদের ঘুম নাই, আমাদের হয়েছে সেই অবস্থা। রুশরা দিব্যি নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে। তার দেশ জিতলো না হারলো, কিচ্ছু যায় আসে না তাতে। সেবার ফাইনালে অবশ্য নেদারল্যান্ডসের কাছে ২-০তে হেরে রানার আপ হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। এরপর থেকেই খুব সম্ভবত আর সোভিয়েত ইউনিয়ন হিসেবে খেলা হয়নি দেশটির। ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। এখন তো রাশিয়া। সেই জৌলুস আর নেই আগের মতোন, শক্তিও নেই।

Peter 3৮৭ সালে আরমেনিয়া থেকে লেনিনগ্রাদে এসে বড় করে জন্মদিন পালন করেছিলাম। যাতে মোটামুটি সবাই এসেছিল বাংলাদেশিদের। পরের বছর অনেকটা অভিমান করেই ঠিক করলাম যে, কাউকে বলবো না, কেউ যদি মনে করে আসে তো, খাবে। রান্না করে বসেছিলাম। একজন ছাড়া কেউ মনে রাখেনি আমার জন্মদিনের কথা। রুমমেটরা মিলে খাবার-দাবার খেয়ে জন্মদিন করলাম। তাও খারাপ হয়নি। কিন্তু আমি যে অভিমান করলাম, এটা জানান না দিলে তো চলছে না। তাই পরদিন গেলাম কেশবদার ওখানে পলিটেকনিক হোস্টেলে। উনি সবে কানাডা থেকে ঘুরে এসেছেন। জন্মদিনের কথা ভুলে গেছে, অভিযোগ করা মাত্রই উনি রান্না চাপালেন। কেক আনা হলো। কানাডা থেকে আনা শ্যাম্পু-সাবান গিফট দিলেন। কিভাবে যেন অন্যরাও খবর পেয়ে গেছিল। মামুন ভাই, আরিফও এলো ওদের হোস্টেল থেকে। একটা জন্মদিন ভুলে যাওয়ার অপরাধ হিসেবে এর পরেরদিন মামুনের ওখানে আবার জন্মদিন। সেখানেও কেক, খাবার, এবং পরে লন্ডন থেকে নেয়া গিফট। অত:পর সপ্তাহান্তে আবার আমার রুমে জমায়েত। বন্ধু-বান্ধব, হাসি-ফূর্তি, জীবনটা বড়ই সুন্দর ছিল তখন।

বন্ধুরা বলাবলি করছিল, মস্কোতে আমাদের যে কাণ্ডারি ছিলেন, যার নির্দেশ ছাড়া সোভিয়েত আমলে বাংলাদেশিদের মধ্যে গাছের পাতাটুকুও নড়তো না, সেই তিনিই নাকি আমাদের একজনকে বলেছেন, দেশে যাচ্ছো, আসার সময় কম্পিউটার নিয়ে আসতো পারো না? সে তো এটা শুনে থ হয়ে গিয়েছিল। অথচ এই লোকটার কারণে আমাদের এক বড় ভাইয়ের মামা জার্মানিতে থাকার পরও যেতে পারেনি, শুধুমাত্র অনুমতি দেননি বলে। এই ঘটনার পর থেকে একের পর এক তারকার পতন ঘটতে লাগলো। আমরা দূরে বসে শুনতে পাচ্ছিলাম। আমাদের মধ্য থেকেও এরই মধ্যে অনেকেই গ্রীষ্মে লন্ডন গিয়ে কাজ করে আসছিল। তাছাড়া আমরা অনেকেই পরিবার থেকে টাকা পেতাম না, পাঠানোও সম্ভব ছিল না। দেশেও যেতে পারছিলাম না টাকার অভাবে। কতদিন মাকে দেখি না।

৮৯ সালের জানুয়ারিতে আমি সাড়ে তিন বছর পর দেশে যাই। এর মধ্যে মা হাওয়াইয়ে দাদার কাছ থেকে ঘুরে গেছেন। একমাসের মতোন ছিলাম দেশে। যাওয়ার সময় স্যুটকেসভর্তি করে সোভিয়েত আমলের সব স্যুভেনির নিয়ে গেছিলাম সবার জন্য। কেউ বাদ যায়নি। এখনও আত্মীয়স্বজনদের বাড়ি খুঁজলে পাওয়া যাবে সেই নিদর্শনগুলো।

ফিরে এসেই উপলব্ধি করতে লাগলাম দেশের পরিবর্তনগুলো। তখনও কুপন চালু না হলেও কম কিছু ছিল না। কোনো খাবারই পাওয়া যেত না। যা পেতাম লম্বা লাইনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে তারপর কিনতে হতো। সেই তুলনায় মস্কোর লোকজন যেন কেমন করে ভাল ছিল আমাদের তুলনায়।

শিউলী আপা, মৃণালদা, অনুরূপদা, রেজাউল ভাই, শিহাব ভাইদের পড়া শেষ। চলে যাবেন সবাই এক শিহাব ভাই ছাড়া। এর মাঝে উনি বিয়েও করলেন রুশ তন্বী এক মেয়েকে। আমরাই সাজিয়ে-গুছিয়ে দিলাম। খুব ভাল মানুষ সভেতা। ৮৭ থেকে ৮৯ সাল, দীর্ঘ দু্ বছরে লেনিনগ্রাদের আশপাশের শহরগুলো আমরা ভাজা ভাজা করে ঘুরে বেড়িয়েছি সব বাঙালী মিলে। সময় পেলেই দৌড়াতাম, কখনও ট্রেনে, কখনও সমুদ্রপথে। নেভা নদী থেকে রকেট ছাড়তো, নদী পেরিয়ে সমুদ্রের বুক চিরে রকেট থামতো পেত্রোদভারেৎস গিয়ে, জারের গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদে। সারাদিন সেখানে ঘোরার মতো জায়গার অভাব নেই। খাবারও নিয়ে যেতাম সঙ্গে করে।

Peter 5শুধু কি পেত্রোদভারেৎস? পুশকিন, পাভলভস্ক এই উপশহরগুলোও একেকটা ইতিহাস। তাছাড়া পুরো লেনিনগ্রাদের প্রতিটি ইটপাথরই ইতিহাসের জানান দেয়। ১৯১৪ সালে শহরটি নাম সেন্ট পিটার্সবুর্গ থেকে বদলে পেত্রোগ্রাদ করা হয়, ১৯২৪ সালে এর নাম হয় লেনিনগ্রাদ, এবং ১৯৯১ সালে আবার সেন্ট পিটার্সবুর্গ নামে ফেরত আসে। এসব পরিবর্তনের পিছনেও একটি করে ইতিহাস আছে। কখনও তা রক্তাক্ত, কখনও বা শুধুই বৈপ্লবিক।

সব ইতিহাসের মধ্যে বাস করে আমরা যারা আশি এবং নব্বইয়ের দশকে দেশটিতে ছিলাম, তারা তিনটা সময়ের কালের সাক্ষী হয়ে রইলাম। এক সোভিয়েত রাশিয়া, দুই, সোভিয়েতের পতন, তিন, পরিবর্তিত রাশিয়া।

আমরা জানি, খিদে পায় কি করে মানুষের, কি করে খাবার জোগাড় করতে হয়, ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়েও যখন নাকের ডগায় এসে খাবার ফুরিয়ে যায়, সেই অনুভূতি আমরা জানি। এটাও জানি, কি করে একটা দেশের সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে গেলে তার প্রথম প্রভাব এসে পড়ে নারীর ওপর, নারীর চরিত্রের স্খলনের মধ্য দিয়ে। শুধুমাত্র একটু ভাল খাবারের আশায় মেয়েগুলো কি করে একেকজনের রুমে চলে যেত অনায়াসে। এসবই চোখের সামনে ঘটতে দেখেছি আমরা। (চলবে)

 

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.