আমরা যারা একলা থাকি-৩২

imp 1উইমেন চ্যাপ্টার: বিবিসি বাংলায় ভাঙা পরিবার বা ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তানদের নিয়ে একটা অনুষ্ঠান শুনছিলাম। খুবই স্পর্শ করে গেল সবার গল্প। ওইসব পরিবারের মেয়েগুলো কথা বলতে বলতে কেঁদে দিয়েছিল। আমার চোখের কোণও জলে ভরে গেল। অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম প্রোগ্রামটি শেষ হওয়ার পরও। ভাবছিলাম নিজের কথা, পরের কথা, সমাজের কথা। হঠাৎই বিগড়ে গেল মনটা।

কী এমন আসে যায় সমাজের? কার পরিবার ভাঙলো বা জোড়া লাগলো, তাতে কী সমাজের? এই বাচ্চাগুলোকে কেন ঠিকঠাক মতোন বেড়ে উঠতে দেয় না পরিবারের মানুষগুলো? কেন তাদেরকে সবসময় কোণঠাসা হয়ে থাকতে হয়? একটা মানবিক সমাজ কেন গড়ে উঠতে পারে না আমাদের মতোন মানুষগুলোর জন্য?

আমি নিজেও প্রায় একইরকমের ভাঙা পরিবারেরই সন্তান। আমার মা-বাবার ছাড়াছাড়ি আইনত না হলেও ঈশ্বরের নিয়ম মতো বা রাজনীতির শিকার হয়ে দুজন আলাদাই হয়েছিল। একাত্তরে বাবাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী। তারপর আর খোঁজ পাইনি আমরা। সেদিক দিয়ে ধরতে গেলে আমিও তো ভাঙা পরিবারেরই। কিন্তু আমার প্লাস পয়েন্টটা হলো যে, আমার বাবাকে নিয়ে বা মাকে নিয়ে কেউ কোনদিন কটু কথা বলেনি। শারীরিক-মানসিক সবদিকে শূন্যতা থাকলেও একটা গর্ববোধ সবসময় ছেয়ে থাকতো আমায়। দেশের জন্য উৎসর্গ হয়েছে আমার বাবা। আমি স্নেহবঞ্চিত হয়েছি, আমি একজন অপূর্ণ মানুষ হিসেবে বড় হয়েছি দেশের কল্যাণে। কিন্তু আমার অপূর্ণতা পুরো জীবনেরই ভিত নড়িয়ে দিয়ে গেছে। পারিনি তা কাটিয়ে উঠতে। এখনও প্রতিনিয়ত তার বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছি।

আমি জানি, একটা মানুষের শূন্যতা কতটা অপূর্ণ করে দেয় জীবন! সারাজীবনের মতোন কনফিডেন্স লেভেল কমিয়ে দেয়, ঠিকমতো বৃদ্ধিটা হয় না। সেখানে বাবা-মায়ের দ্বন্দ্বের মধ্যে যে শিশু প্রতিনিয়ত বড় হয়, সে তো মানসিক অস্থিরতাতেই পার করে দেয় পুরো জীবন। সিদ্ধান্ত নিতে অনীহায় ভূগে। তার ভবিষ্যত নড়বড়ে হয়ে উঠে। আমিও তাই ভয় পাই, যে নড়বড়ে জীবন পার করেছি আমি, যে জীবনে আমারও ঘর ভেঙেছে, আমার ভবিষ্যত প্রজন্ম যেন সেটা থেকে দূরে থাকে। তাদের জীবন যেন বাঁধা থাকে অদৃশ্য সব নিয়মে।

বাচ্চাগুলো সাক্ষাতকারে বলছিল, বাবা-মা তাদেরকে বুঝতে চায়নি। অথবা ভুল বুঝছে। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হচ্ছিল, এটা অবশ্যই ঠিক। এই ভুল বুঝাবুঝি হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মা অথবা বাবাকে নিজেকে দায়বদ্ধ ভাবেন, এমনটাও হয় যে, একপর্যায়ে তার মনে আসে যে, এই সন্তানটি না হলে তো তার জীবন এমন দুর্বিষহ হতো না! সেখান থেকেই শুরু হয় সমস্ত দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। সন্তানও তখন ভুল বোঝে।

এখানে সন্তানদেরও কিছু দায়িত্ব থাকে। ওরা যখন বড় হয়, তখন তাদের বুঝতে পারা উচিত একজন বাবা বা মা কতটা লড়াই করে তাদের নিয়ে টিকে আছে সমাজে। ওরা সেখানেই ভুলটা করে। খুব স্বার্থপরের মতোন আচরণ করে ফেলে। বাবা বা মা, যেই থাকুক তার কাছে, তাদেরকে দোষারোপ করতে শুরু করে। কখনোই বোঝে না যে, তাদের একটু বুঝদার আচরণ মা-বাবাকে কতটা রিলিফ দেয়। ওরা যদি সঠিক পথে চলে, জীবনে দাঁড়িয়ে যেতে পারে, তার চেয়ে বেশি চাওয়া কিন্তু কোন মা-বাবারই থাকে না।

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলি যে, সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে ঘরে ফিরে এসে যদি সবসময় সন্তানদের অভিযোগের তোপের মুখে থাকতে হয়, তখন সেটা শারীরিক এবং মানসিকভাবে সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। দিনশেষে সব মানুষই একটু শান্তি চায়, রিলিফ চায়। আর বাসাই হতে পারে একমাত্র সেই জায়গা। অন্যদিকে সারাদিন একা একা থাকার পর সন্তানও চায় মা অথবা বাবার সান্নিধ্য। তার সারাদিনের অভিযোগও সেই মূহূর্তের জন্য তোলা থাকে। ফলে এই যে গড়মিল দেখা দেয়, এখান থেকেই ব্যবধান বাড়তে থাকে।

সন্তান যদি মেয়ে হয়, আর অভিভাবক হন বাবা, তখন বয়ো:সন্ধিকালে মেয়ে বন্ধু খুঁজে পায় না, বাবাকে সে শেয়ার করতে পারে না। আবার সন্তান ছেলে হলে, আর অভিভাবক মা হলেও একই সমস্যা। উঠতি বয়সে ছেলে মাকে বন্ধু ভাবতে পারে না। সে চায় বাবার একটা চওড়া, প্রশস্ত কাঁধ। যার অভাবে সে গুটিয়ে যায়। অনাচারের সৃষ্টি হয় সেই গুটিয়ে যাওয়া থেকে। অনেকসময় তা লাগামহীনও হয়ে যায়। অথচ সংসারের অন্য সদস্যরাও আমাদের দেশে এক্ষেত্রে এগিয়ে আসে না। সংসারে যখন ভারসাম্য থাকে, তখন এই সমস্যা সাধারণত থাকে না বলেই ছেলেমেয়ের সাথে সম্পর্কটাও অটুট থাকে।

কিন্তু মানুষের সংসার ভাঙে কখন? সংসার গড়া আর ভাঙা, দুটোই জটিল প্রক্রিয়া। যারা এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে, তারাই শুধু জানে যে, এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কি! কেউই নিজে থেকে আগ্রহী হয়ে সংসার ভেঙে দিয়েছে, এমন তথ্য খুবই কম সমাজে।

অথচ সন্তান এবং মা অথবা বাবার মধ্যকার সম্পর্ক যদি বন্ধুত্বপূর্ণ হয়, তবে এরকম ক্ষেত্রেও একটি পরিপূর্ণ সংসার জীবন যাপন করা মোটেও কঠিন কিছু না। তাই বেশি না, সামান্যই প্রার্থনা, জীবন আমাদের একটাই। যে অবস্থারই মুখোমুখি হই না কেন, একা অথবা দোকা, জীবনটাকে যেন যাপন করে যাই শেষদিন পর্যন্ত একটু হেসে, একটু আনন্দের সাথে। (চলবে)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.