সাইবার হয়রানি: প্রজন্মের কাঁটা

Munni
শাহনাজ মুন্নী

শাহনাজ মুন্নী: মিলির মনে হলো সে দুঃস্বপ্ন দেখছে। এরকম কিছু যে বাস্তবে কখনো ঘটতে পারে তা কোনদিন কল্পনাও করেনি সে। অথচ সেটাই ঘটেছে। কেউ একজন একটা খুব বাজে পর্ণো সাইটে তার নাম, ফোন নম্বরসহ ছবি পোস্টকরেছে। সেইসঙ্গে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করার। গভীর রাতে মিলির নম্বরে কদর্য সব ফোন আসতে থাকলো, আসতে থাকলো বিচ্ছিরি সব মেসেজ। পাগল হবার উপক্রম হলো তার। কিছুদিন আগে আক্দ হয়েছে মিলির। ছয় মাস পর বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা, এসময় এরকম একটা ভয়ংকর বদমায়েশি কে করলো? নিজের এক সহকর্মীকে সন্দেহ হলো মিলির, চাকরিতে ঢোকার পর থেকেই যিনি কাজে কর্মে মিলিকে সহায়তা করার নামে কোন একটা সম্পর্ক পাতাতে চাইছিলেন। সরল বিশ্বাসে তার সঙ্গে মিশেছে মিলি। তারপর একসময় যখন সহকর্মীর খারাপ অভিপ্রায় বুঝতে পেরেছে, তখনই তাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করেছে সে। আচার-আচরণে পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছে, এই সহকর্মীর সঙ্গে কোন রকম সম্পর্ক পাতাতে রাজি নয় মিলি। আর তারপরই বেরিয়ে এসেছে সহকর্মীর এই জঘণ্য, ঘৃণ্য চেহারা।

এ এক নতুন ধরনের হয়রানি শুরু হয়েছে এই প্রজন্মের মেয়েদের জীবনে, যার নাম সাইবার হয়রানি। যৌন হয়রানির মতোই এ এক ভয়ানক আতংক মেয়েদের স্বাভাবিক জীবন-যাপনে।

প্রায় একই রকম ঘটনা ঘটেছে নাসরিনের জীবনেও, অফিসে কোন এক অসাবধান মূহূর্তে, যখন ফেসবুক মিনিমাইজ করে নাসরিন কোনোকাজে উঠে গিয়েছিল, তখন, সেই ফাঁকে তারই কোন পুরুষ সহকর্মী নাসরিনের ফেসবুক একাউন্টে ঢুকে বন্ধুদের সঙ্গে ওর ব্যক্তিগত কথোপকথন কপি করে নেয়। তারপর, নাসরিনকে এসএমএস পাঠায়, ‘আমার সাথে বন্ধুত্ব করো নয়তো তোমার প্রেমিককে আমি সমস্তকিছু পাঠিয়ে দেব।’

এই প্রেমিকের সাথে নাসরিনের বিয়ের তারিখ ঠিক হয়ে গেছে। বেশ কয়েক বছর তাদের সম্পর্ক। এমন সময় এই হুমকি। প্রথম দিকে নাসরিন পাত্তা দেয়নি,  কিন্তু কিছুদিন পর যখন সত্যি সত্যি তার প্রেমিক নানা রকম মেসেজ পাঠাতে শুরু করলো,  তখন নাসরিন ঠিক কি করবে ভেবে না পেয়ে হতভম্ব।

আজ থেকে পঞ্চাশ ষাট বছর আগে যখন আমাদের মা-খালারা বাইরের জগতে বেরিয়ে এসে আপন ভাগ্য জয় করার সংগ্রাম শুরু করেছিলেন, তখন তাদের সামনে ছিল সামাজিক-ধর্মীয়-পারিবারিক বাঁধা নিষেধের দেয়াল। তাদের পরের প্রজন্মের আমাদের সামনে এসব বাঁধা নিষেধ অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছে। আমাদের মোকাবেলা করতে হয়েছে ইভটিজিং, যৌন হয়রানির মতো বাঁধাগুলো। দিন গেছে,  আমাদের পরের প্রজন্ম আরো আধুনিক হয়েছে, তাদের হাতে এসেছে নতুন প্রযুক্তি, মোবাইল, ইন্টারনেট আরো কত কী! এসবের সুবিধা যেমন আমরা ভোগ করছি,তেমনি এ্র উপজাত হিসেবে এসেছে সাইবার হয়রানি। যার বীভৎসতা হয়তো অন্য সব হয়রানিকে ছাড়িয়ে গেছে।

সরকার অবশ্য এসব রুখতে আইন করেছে। সাইবার ক্রাইমের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তারপরও এসব বিষয় নিয়ে কয়জন আর যাচ্ছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের কাছে?

মিলি অবশ্য তার সহকর্মীর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে মামলা করেছে। সেই মামলা এখনো চলছে। নাসরিনকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে তার অফিসের কর্মকর্তারা। যেখানে অন্যায় আছে,সেখানে তার প্রতিরোধও আছে, প্রতিকারও আছে। কিন্তু সবার আগে দরকার মানসিকতার পরিবর্তন। অফিসে কাজ করতে আসা নারী সহকর্মীটিকে যদি সম্মান আর শ্রদ্ধার সঙ্গে না দেখা হয়, যদি তাকে যথাযোগ্য মর্যাদা না দেওয়া হয়, তাহলে তো এরকম ঘটনা ঘটতেই থাকবে। এক্ষেত্রে অফিসের কর্তব্যক্তিদেরও দায়িত্ব আছে, এধরনের ঘটনা ঘটলে অপরাধিকে কঠিন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে অন্যরা সেটা দেখে এই ধরনের কাজ করা থেকে বিরত থাকে।

যারা এই কাজগুলো করে, তারা কেন করে?

হতে পারে, তাদের মধ্যে বন্ধুত্বের একটা তীব্র তৃষ্ণা থাকে, আর সেই তৃষ্ণা মেটাতে তারা নিজের চাওয়াটাকেই সবচে বেশি গুরুত্ব দেয়, অন্য পক্ষের মতামতও যে থাকতে পারে সেটি তার চিন্তাতেই থাকে না। একজন তাকে প্রত্যাখ্যান করতেই পারে, কারণ প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত ইচ্ছা অনিচ্ছা, পছন্দ অপছন্দ থাকে। জোর জবরদস্তি করে কখনো ভালবাসা বা বন্ধুত্ব পাওয়া যায় না। কিন্তু প্রায় সময়ই নিজের তৃষ্ণা চরিতার্থ করতে না পেরে তারা ক্ষুব্ধ হয়, প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়। এবং তারা এমন সব বিকৃতির আশ্রয় নেয়, যেটা অপর পক্ষকে বিব্রত করে,  ক্ষতিগ্রস্তকরে এবং সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করে। এর পেছনে অপরাধীদের আরো কি জটিল মনস্তাত্বিক কারণ লুকিয়ে আছে, তা হয়তো মনোবিজ্ঞানীরা গবেষণা করে বলতে পারবেন।

আরেকটা কথাও সেইসঙ্গে বলা দরকার মনে করছি, নারীদেরও তাদের আচার-আচরণের ক্ষেত্রে ও সম্পর্ক স্থাপনের সময় দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত। কারণ অনেকেই অভিযোগ করেন, নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অনেক নারীই পুরুষ সহকর্মীর সাথে ভাল সম্পর্ককে কাজে লাগান, তারপর কার্যসিদ্ধি হলে সব কিছুই অস্বীকার করেন। যা প্রায় সময়ই অন্য পক্ষ মানতে পারেন না, তারা তখন প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠেন এবং যে কোন উপায়ে নারীটির ক্ষতি করতে উঠে পড়ে লাগেন।

প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা শেষ পর্যন্ত কোন শুভ ফল বয়ে আনে না, বরং ধ্বংস করে দেয় সবাইকে, সব কিছুকে।   আমরা সাইবার হয়রানিসহ অন্যান্য সমস্ত হয়রানি মুক্ত সমাজ চাই, চাই নারী-পুরুষের সুস্থ স্বাভাবিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। চাই সুন্দর কর্ম-পরিবেশ।

লেখক পরিচিতি: সাংবাদিক ও লেখক

 

 

 

 

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.