শেকড়ের খোঁজে দিন রাত

Lee
সালেহা ইয়াসমীন লাইলী

সালেহা ইয়াসমীন লাইলী: সেদিন রয়টার্স এর ক্যামেরা পারসন রফিকুর রহমান যখন ‘রাখাইন’ বলে সম্বোধন করলেন কিছুটা চকিত হয়ে গিয়েছিলাম। পরীক্ষায় নকল ধরা পড়ার মতো বিব্রত বোধ করছিলাম যেন। কিন্তু সেটাও খুব গোপনে। এক সময় রফিক ভাই নিজেই নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে বললেন, আপনি যে স্বচ্ছন্দে নৌকার ছাদে ওঠানামা করছেন যেন পাহাড়ের কোন নারী! তাছাড়া রাখাইনদের মতো নাক ও চোখ কিছুটা ছোট হওয়ায় মজা করে ‘রাখাইন’ বলেছি। কিছু মনে করবেন না। এই ‘রাখাইন’ ডাকাটাই আমাকে আপনার সহজে ভুলতে দেবে না।

সত্যিই তো, তাকে আর ভুলতে পারলাম কই? জীবনে প্রথম কোন অপরিচিত মানুষ আমার সত্ত্বার অস্তিত্ব জানান দিয়েছিল যে। যখনই নিজের শেকড়কে খুঁজতে চেষ্টা করি রফিক ভাইযের কথা মনে পড়ে। আগেও আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজের চেহারা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতাম। মা-বাবা ও স্বজনদের সাথে মিলাতে চাইতাম। নিজের চোখকে ফাঁকি দিয়ে মিলেও যেত যেন। কিন্তু রফিক ভাইয়ের চোখ! দেখে ফেলল সব?

তখন ২০১১ সাল। কুড়িগ্রামে পর পর তিনবার ভয়াবহ বন্যায় ২ লক্ষ মানুষ পানিবন্দী। রয়টার্স থেকে রফিক ভাই গিয়েছিলেন আরো কয়জন সাংবাদিকসহ কুড়িগ্রামে। আমি ছিলাম তাদের টিমের সাথে। উত্তাল ব্রহ্মপুত্রে নৌকায় করে তলিয়ে যাওয়া বাড়ি ঘরের ছবি তুলছি, কথা বলছি দুর্গত মানুষের সাথে। নৌকায় ইন্টারনেট সংযোগ ভাল নয় বলে নৌকার ছাদে বসে ল্যাপটপ নিয়ে নিউজের আপডেট দিচ্ছিলাম বার বার। সেদিনের ঘটনাটি।

তার আগে ২০০৩ সালে আমি শেষবারের মতো খুঁজতে বেরিয়েছিলাম আপনার শেকড়। কক্সবাজার এর কয়েকটা গ্রামে গিয়েছিলাম সেবার। সেখানকার মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলেছি। যারা ভারতে গিয়েছিলেন প্রশিক্ষণ নিতে তাদের সাথে, যারা শরণার্থী ছিলেন তাদের সাথে। তাদের সবাই ফিরেছে কিনা জানতে চেয়েছি, শরনার্থী শিবিরে কেউ মারা গেছে কিনা তার খোঁজ করেছি। মেলাতে পারিনি কোন নাম। অং ক্য চিং ও মা হ্লা চিং চিরকুটে লেখা এই নাম দুটি ছাড়া আর কিছুই যে নাই আমার কাছে। কোন গ্রাম, ঠিকানা, পেশা কিছুই না। কেউ তাদের কোন খোঁজ দিতে পারেনি।

বারবার পার্বত্য চট্টগ্রামের যেখানেই রাখাইনদের বাস আছে সেখানেই খুঁজে খুজে তন্ন তন্ন করে ফিরেছি। কত্ত বছর আগের চিরকুটের লেখা ক্ষয়ে ক্ষয়ে আবছা হয়ে যাওয়ার সেই কাগজটিকে যত্ন করে নতুন কাগজে মুড়েছি। আবার নতুন করে লিখে রেখেছি নতুন কাগজে। সেটুকুই তো আমার শেকড়। আলমারীতে তুলে রাখা সবচেয়ে দরকারি ফাইলটিতে যত্নে রাখা অস্তিত্ব।

যদিও এই কাগজের টুকরাটি আমার হাতে পড়েছিল ১৯৯৬ সালে। যখন সেটি লেখার বয়স হয়েছিল ২৫ বছর। ঝরণা কলমের লেখা হওয়ায় অনেকটা ছেড়ে ছেড়ে দিয়েছে রেখাগুলো। কাগজের মানও ছিল না। তাই কোন রকমে পড়ে নেয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর নাই। কাগজটিকে আমানত ভেবে বাড়ির ট্রাঙ্কে রাখা ছিল। কিন্তু এত বছর পর তার দরকার হবে বলে মনে করেননি আমার আমানতকারী বাবা।

সেদিন যখন আমি তার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় জানতে চাইলাম তিনি আমার দুই সন্তানকে দেখিয়ে বললেন, এরাই তোর পরিচয়। আর কোন পরিচয় তোর দরকার কি? পরে অবশ্য তিনি অনেকটা বাধ্য হয়ে ট্রাঙ্কের তলানী থেকে খুঁজে হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন চিরকুট নামের পরিচয়টি। একটা প্রলয়ংকারী সুনামি চলে গেছে সেদিন পুরো পরিবারটি ঘিরে। আমিই বরং সুস্থির ছিলাম সকলের চেয়ে। মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলাম আমার বাবার কথাগুলো। কল্পনায় ছুঁইয়ে দেখতে চেয়েছিলাম আমার অস্তিত্বকে।

১৯৭১ সালের ২৬ মে। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে মুক্তিযুদ্ধ। কুড়িগ্রামেও যুদ্ধ চলছে। মুক্তাঞ্চল বলে জেলার ফুলবাড়ী উপজেলা ছিল শরনার্থীদের জন্য ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নেয়ার পথ। ধরলা নদী নৌকায় পাড় হয়ে পায়ে হেঁটে নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ শিশু ত্রস্ত ছুটে চলেন ভারতে। সহায় সম্পত্তি ফেলে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসা মানুষগুলো ক্ষুধায়-তৃষ্ণায়- ক্লান্তিতে জিরিয়ে নিতেন পথের ধারের বাড়ি গুলোতে। আমার বাবার বাড়িতে শরনার্থীদের আশ্রয়ের জন্য একটা ঘর ছেড়ে দেয়া ছিল। সেখানেই এক বছরের জমজ দুই শিশুকে নিয়ে রাতে আশ্রয় নিয়েছিলেন এক আদিবাসি দম্পতি। সবাই জ্বরে ভুগছিলেন। পরদিন সকালে জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে দম্পতি উঠে দাঁড়ালেও সন্তানদের কোলে তুলে নেয়ারও সামর্থ ছিল না শরীরে। বিকেলে আমার বাবার কাছে মেয়ে সন্তানটিকে রেখে দিয়ে টুকরো কাগজে শিশুটির নাম লি প্রু চিং, বাবার নাম অং ক্য চিং ও মায়ের নাম মা হ্লা চিং লিখে চলে যান। বলে যান ফেরার পথে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন। তারা আর ফেরেননি। হয়তো ফিরেছেন ভিন্ন কোন পথ ধরে। কিন্তু কোথায় ফিরেছেন? তাদের খুঁজতে বহু পথ হেঁটেছি। পাইনি।

নির্ভরতার কোন হাতের স্পর্শ আমার মাথা ছোয়নি কোনদিন। শৈশবের কোন সুখ স্মৃতি আমাকে আলোড়িত করে না, করে প্রতারিত। আমি কোন শেকড়ের টান অনুভব করি না। নড়বড়ে আমার মনের ভীত। একটুখানি দমকা পেলেই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাই। আবারো আকঁড়ে ধরে খুঁজতে থাকি নিজের শেকড়। এই আমি দিন রাত করি শেকড়ের খোঁজ।

 

লেখক ও সাংবাদিক

 

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.