‘প্রসঙ্গ: তসলিমা নাসরিন, কিছু ট্যাবু ও আমাদের সাহিত্য পড়া’

Taslimaসরিতা আহমেদ:

তাঁকে আমরা ভালোবাসি বা না বাসি, সমর্থন করি বা না করি, তবু তাঁকে ঘিরে চায়ের কাপে আজও ঝড় ওঠে সে মধ্যবিত্তের তলতলে জীবনযাপনেই হোক, বা তাবর রাজনীতিবিদের টেবিল ঠোকা বৈঠকি বিকেলেই হোক।

তাঁর ক’টা বই বেরুলো বা ব্যান হলো, কেমন আছেন তিনি, কোথায় কাটছে তাঁর জীবন সেটা জানি বা না জানি, তবু আজও তাঁকে নিয়ে কম লেখালিখি কিন্তু হয় না।

প্রিন্ট মিডিয়ার কথা বলছি না, সোশ্যাল সাইটগুলোর ‘ভার্চুয়াল পাঠশালার’ কথাই বলছি। সে যাই হোক আজ এতোখানি পথ পেরিয়ে এসবে তাঁর কিছু যায় আসে না।

কিন্তু আমাদের যায় আসে। আমরা মানে গুটিকয় সচেতন আর কোটি কোটি অচেতন বা অর্ধচেতন পাবলিক যারা কাগজে তাঁর নাম দেখলে গোগ্রাসে সেটি পড়ে, মিডিয়ার দেওয়া গালভরা গাল‘বিতর্কিত লেখিকা’ শিরোনাম পড়ে চুক চুক আওয়াজ তোলে জিভ-টাগরায় এবং অবশ্যই চায়ের কাপে।

তারপর একদল বলে, ‘কী লাভ এসব বিতর্কে জড়িয়ে? এখানে কী আছে খালি ব্যান, নয় বিতর্ক! বরং সুইডেনে উনি নাগরিকত্ব নিয়ে স্বচ্ছন্দে বাস করলেই পারেন।‘

একদল বলে, ’কী আর করবে সংসার তো পেলো না, বই আর বিতর্ক লিখেই এবং গাল খেয়েই দিন কাটে। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো আর কাকে বলে! যত্তসব!”

একদল যোগ করে, ‘ জীবনে ধর্ম মানে না। মেয়েমানুষ হয়ে অত ঠোঁট কাটা হলে চলে? ওর পাপ লাগবে না তো কী আমাদের লাগবে? এতো জিভ-ছোলা কথা বললে ধর্মে সইবে নাকি! এখনও সময় আছে তওবা করে ধর্মের পথে আসুক। নিজের ঘরে ফিরতে পারবে। নইলে আজীবন নির্বাসন ঘুচবে না। দেশ থেকে ও আপদ আমরা তাড়িয়েই ছাড়বো।’

আর একদল ‘প্রগতিশীল’ হাঁ হাঁ করে তেড়ে এসে বলে, ‘কেন? এদেশে যদি আজমল কাসভের মতো ইন্টারন্যাশানাল জঙ্গি, আফতাব আনসারির মতো ন্যাশনাল জঙ্গি, কোটি কোটি চোর পলিটিশিয়ান এবং আমাদের এতো শত বিতর্কিত বুদ্ধিজীবী থাকতে পারে, তবে তসলিমা কেন নয়?’

অবাক হই। যেন তসলিমার থাকার সাথে দাগানো খুনি-জঙ্গির নামগুলোই একমাত্র উদাহরণ! নেগেটিভিটির মাঝে যে মানুষটা পজেটিভ ভাইব ছড়ানোর জন্য প্রাণপাত করছেন, অন্ধকারের মাঝে থেকেও যিনি সত্যের টর্চ হাতছাড়া করেননি এক মুহূর্তও, তার সাথে কেবল অন্ধকার জগতের লোকের তুলনা হচ্ছে!!

আমার মনে আছে, স্কুলে পড়া বয়সে ক্লাশ এইট হবে, সম্ভবত ১৯৯৯, এক বন্যার সময়ে বাবার বইয়ের আলমারি থেকে হাতে পড়েছিল ‘নির্বাচিত কলাম’ এবং ‘লজ্জা’। আগে তুলে নিয়েছিলাম ‘নির্বাচিত কলাম’ বইটি। পড়তে শুরু করেছিলাম শুয়ে শুয়ে এক দুপুরবেলা আর পাঁচটা গল্পের বই পড়ার মতো, ভাত ঘুম দেওয়ার আগে।

বেশ মনে আছে বইটা যখন শেষ করেছিলাম রাত তখন ৮ টা এবং আমি সোজা হয়ে উঠে বসে পড়েছিলাম, নিজেরও অজান্তে। ঘুমের ঘোরেও দু’চোখের পাতা অনেক দেরিতে এক হয়েছিল।

‘লজ্জা’ ওই বয়সে পড়ে কিছুই বুঝিনি। কোন ইতিহাসের কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে লেখা জানতাম না, পড়ার বইয়ের বাইরে খবরের কাগজের সাথে আলাপ ছিল না। বইগুলো লুকিয়ে পড়েছিলাম বাবার বকার ভয়ে, সেই শুরু লুকিয়ে পড়ার, লুকিয়ে লেখার এবং অনেক কিছু লুকানো থেকে বের করে আনার। পরে মেয়েবেলার শেষ লগ্নে গিয়ে এবং বড়বেলায় এখনো দেখি তাঁর নামের সাথে ‘লুকানো’ শব্দটিও
এমনি এঁটুলির মতো সেঁটে আছে যে আনন্দবাজারে পত্রিকায় তাঁর ইন্টারভিউও বেরোলো ‘তুই নিষিদ্ধ, তুই কথা কইস না’ শিরোনামে।

তবে হ্যাঁ, সেদিনের ওই লুকিয়ে তসলিমা পড়ার জন্যই হোক আর যাই হোক মেরুদণ্ডটা বড্ড ঋজু হয়ে গেছে। তাঁকে নিয়ে আলাপচারিতায় মূলত যে যে ‘নিষিদ্ধ পয়েন্ট’ ট্যাবু আকারে বেরিয়ে আসে তাহলো:

১)
তসলিমার লেখাগুলো সাহিত্য পদবাচ্য নয়: আমার এক বাংলা অনার্স বান্ধবী বলেছিল ‘ওকে আমি সাহিত্যিকের পর্যায়ে ফেলিই না। ওর লেখায় রগরগে ব্যাপার বেশি, স্নিগ্ধতা নেই একদম। ‘আমি বলি, ‘হ্যাঁ রে, বাংলা সাহিত্য পদবাচ্য লেখা মানেই কি কাল্পনিক মিথ্যার আশ্রয়ে কিছু হিরো- হিরোইনের কাহিনী থাকতে হবে? যেখানে প্রেমঘন সেক্সদৃশ্য বর্ণনা করার সময় মিষ্টি মিষ্টি কথার আড়ালে নায়কের মুখে লেখক লিখবেন, ‘কই, আমার সাদা পায়রা দুটো কই! তারা যে আমার হাতে আদর খাওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে, আমি জানি। কাছে এসো…‘ –আর সেটা পড়ে ‘নাজুক নাজুক’ বলে পাঠকের অন্তর্বাস ভিজে যাবে গোপন কামে। তবু সেটা সুন্দর। কারণ সে গল্পের ঢাল আছে “এই গল্পের সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। বাস্তবের কোন ঘটনা-স্থান-পাত্রের সাথে যদি কোনও মিল পান, তা নিছক কাকতালীয়!”

না, তসলিমার কলম এসব ঢাল নিয়ে চলতে রাজী না। কারণ উনি যা লেখেন তা আমার-তোমার জীবন থেকে সেঁচে নেওয়া বিষয়। জীবনাদর্শ নিয়ে যা বলেন, সেই জীবন উনি যাপন করেন। আর বাংলা সাহিত্যের কোন বিশ্বকোষে লেখা আছে ‘ সাহিত্যের সাথে মিথ্যে কষ্ট কল্পনার নীরব আঁতাত থাকতেই হবে?’ এমন কোন সংজ্ঞা আছে যে, সাহিত্যিকের সত্য বলা নিষিদ্ধ? লেখক যে জীবন কাটান আর যে জীবন লেখেন তার মাঝে থাকতে হবে যোজন দূরত্ব? আছে যদি, তবে আমায় দেখাও।

২)
তসলিমা মেয়েদের জন্য লেখে ভালো কথা, কিন্তু বড্ড বেশি ধর্ম-বিদ্বেষী: আমি বলি, ‘ধর্ম মানবো আবার নারীমুক্তি/নারীর অধিকার নিয়ে গলাও ফাটাবো, সেটা যদি চাও তাহলে আমায় সোনার পাথরবাটি এনে দেখাও! কারণ ও দুটো তো একসাথে চলতে পারে না, এটা তো মেয়েরা জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছে যুগে যুগে। ওরা বলে, ‘প্রকৃত ধর্ম তো এরম না, মানুষ এমন বানিয়েছে। ধর্মকে corrupt করেছে । –“ ও মা ! তাহলে ধর্মও যে politician দের মতো রং চেঞ্জ করে corrupt হতে পারে তা স্বীকার করছো তো! ধর্মও তাহলে কাঁচের বাটিতে রাখা জল, যাকে যখন খুশি ধর্ম ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করে, কুলকুচি করে, কফ থুথু দেয়, আবার গঙ্গা জলের মত পূজাও করে! এর চেয়ে কি নাস্তিকতা ভালো না?’

৩)
তসলিমা পুরুষ বিদ্বেষী: আমায় কিছু জন বলেছে, বেশি ওপেনলি ওঁর অনুগামী হতে যেও না। পুরুষ বিদ্বেষী তো তাই ওর অনুরাগী হলে আর এ জন্মে তোমার বিয়ে হবে না ।
–কেন?
— তুমি জানো না, তসলিমার লেখা মানতে গিয়ে কত কত সংসারে আগুন লেগেছে। কত সম্পর্ক ভেঙ্গেও গেছে ওর জন্য।

তাই কি? কটা বই পড়েছে ওরা তসলিমার, যারা দাবি করছে ও পুরুষ বিদ্বেষী/সংসার বিরোধী? আসলে কিন্তু সম্পর্কগুলো অন্য কারোর জন্য ভাঙ্গে না, ভাঙ্গে নিজেদের কারণেই। আর যদি অন্য কাউকে দায়ি করার মতো অবস্থা দাঁড়ায়, তখন সেই সম্পর্কের ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। সত্যকে চেপে মিথ্যে দিয়ে সুখের বাড়ি নির্মাণ করা যায় না।

পুরুষ-নারী সমতা যেখানে থাকবে, সেখানে সংসারে ফাটল ধরবে কী করে? এর জন্য পুরুষ বিদ্বেষী বা নারীপ্রেমীর প্রশ্ন আসে কী করে! কথা হলো, পুরুষ মানুষের কিছু দোষ-ত্রুটিকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেই কি সেটা পুরুষ বিদ্বেষ বলে? আর তা মেনে নিলেই কি প্রকৃত সতীলক্ষ্মী মেয়েছেলে!

নারীবাদ মানেই কিন্তু পুরুষবিদ্বেষ নয়, নারীবাদ মানববাদেরই আরেক দিক। যেখানে কোনো বিশেষ জেন্ডারের আধিপত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না, শুধু সমাজের যে শ্রেণি নানা দিক থেকে দলিত, পিছিয়ে রাখা, অত্যাচারিত
তাদেরকে সামনে চলার প্রেরণা দেওয়া, তাদের মনোবল বাড়ানো নানাভাবে। কিন্তু এই কথা জানে বা মানে ক’জন? তসলিমাই শুধু ট্যাগ খায় পুরুষবিদ্বেষী বলে। কী অদ্ভুত মূর্খের মতো কথা! কোন যুক্তিতে এই ট্যাগ?

এরম আরো অজস্র ট্যাবু তৈরি আছে তসলিমার নামের সাথে। মিডিয়া এই সব ট্যাবুগুলোর ওপর ভর করেই খবর বানায়। তাই তাঁর কোন বই ব্যান হলো তার খবর পেপারে ওঠে, তাঁর কোন বই বিদেশে বেষ্ট সেলার হলো, তার খবর থাকে না। তাঁকে ঘিরে রাজনীতির নোংরা খেলার হলুদ সাংবাদিকতা হয়, যা চেপে যায় তাঁর অক্সফোর্ডে লেকচার, জাতিসংঘে বক্তৃতার, সাম্মানিক ডিগ্রী প্রাপ্তি, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের তুমুল ক্লাশ – এরম আরো অজস্র উজ্জ্বল কৃতিত্বকে।

কেন? এসব লিখলে কি পেপারের কাটতি কম হবে? না, এসব লিখলে মোল্লাতন্ত্রের ধমক নানা রঙ্গের পার্টির ওভারহেড ফোনের দ্বারা সংবাদপত্রের অফিসে আছড়াবে, যা আদপেই কোনো ‘নির্ভিক সাংবাদিক’ চাইবে না। তাই ছাপা হোক বিতর্কিত খবর, যদি উনি কিছু নাও বলেন তবু তাঁর মুখে বসানো হোক এমন শব্দ , যা মানুষ এবংমোল্লা ‘খায় ভালো’!

কিন্তু মুখে না বললেও তসলিমার অতি বড় সমালোচকও এটা স্বীকার করতে বাধ্য হবেন, সাহিত্যের আন্তর্জাতিক বাজারে যে ক’টা মুষ্টিমেয় মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চাকারী আছেন, তসলিমা তাদের মধ্যে বঙ্গ তথা বাংলা সাহিত্যের একমাত্র উজ্জ্বল প্রতিনিধি এবং বেষ্ট সেলার লেখক। তাঁর লেখাকে আমরা যতই গালি দিই, লুকিয়ে পড়ি ,উপন্যাস-কবিতার পাতার পেঁয়াজ ছাড়াই, কখনও কাঁদি, কখনও ‘ব্যান কর এ আবর্জনা’ বলে ছুঁড়ে ফেলি না কেন, বাংলা ভাষার একমাত্র অভিবাসী লেখক হিসেবে আজকের প্রজন্ম তাঁকেই চেনে।

হ্যাঁ শুধু তাঁকেই – যিনি গোল্লাছুট খেলতে খেলতে কখন যেন নিজের অজান্তেই খেলা থেকে বাদ পড়েছেন, নির্বাসিত হয়েছেন আমাদের জন্য আমাদের হয়ে আমাদের দাবিগুলো গুছিয়ে বলার জন্য আমাদেরই প্রাণের বাংলা থেকে।

‘সেই সব অন্ধকার’ আর ‘নেই, কিছু নেই’ এর মধ্যে বাঁচতে বাঁচতেও তিনি স্বপ্ন
দেখেছেন এমন এক সাম্যের সমাজ গঠনের যেখানে থাকবে না কোনো কাঁটাতার, প্রতিষ্ঠা পাবে এক সুন্দর জাতি – ‘মানুষ’ যার নাম। আমরা তাঁকে সম্মান জানানো তো দূরে থাক, প্রয়োজন বোধ করিনি কী লিখেছে তা পড়ে দেখার!

সত্যি সেলুকাস, তাঁর জীবন এক বিচিত্র জার্নি, অন্ধকার থেকে আলোর দিকে।আবার অনেক আলোকময় পৃথিবী প্রান্তের হাতছানি থাকা সত্বেও যিনি ফিরে আসতেচান সেই অন্ধকূপ পাঁকের জন্মভূমিতে, হাত বাড়াতে চান অজ্ঞানতায় ডুবতে থাকা মানুষগুলোর দিকে –তারা যাতে আলোর পথে আসতে পারে ।

তাঁর সত্যের পথ যদি আজ রুদ্ধ হয়, সত্যি বলার জন্য যদি তাঁর নাম আজ ব্রাত্য হয়, তবে বলতেই হয় :
যদি তসলিমা ব্যান হয়, তবে ব্যান হোক শিশুপাঠ্য হিসেবে আবশ্যিক নীতিপাঠগুলোও:
· ‘ সদা সত্যং বদ ‘
· ‘ সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি/সারা দিন আমি যেন সৎ পথে চলি।‘

আমরা যাই করি না কেন, কথা সেটা না, তিনি আমাদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি ম্যাজিক ও রিয়ালিটি। তাঁকে ধরে রাখতে না পারলে সেটা তাঁর অসম্মান নয়, কারণ তিনি সেসবের অনেক ঊর্ধ্বে, সেটা দেশের এবং জাতির কাছে লজ্জার। কারণ মূল্যবান রত্নের ছটা নিয়ে অনেক তুফান তোলা বিতর্কসভা করা ছাড়া তার আসল মূল্য এই অভাগা অর্ধশিক্ষিত জাতি কখনো কি দিতে পেরেছে? তাইতো আমরা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠসময় নিয়ে বুলি কপচাই, সোপ-অপেরা করি আর শ্রেষ্ঠএক সৎ-সাহসী বাঙালি সাহিত্যিককে নির্বাসনে পাঠাই, রাজনীতির নাটক করি, আবার ঠুঁটো জগন্নাথের মতো দেখিও।

শেয়ার করুন:
  • 119
  •  
  •  
  •  
  •  
    119
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.