প্রজন্মই ফেরাবে তসলিমাকে একদিন

ঠগ
তসলিমা নাসরিন

ফজলুল বারী: দুদিন আগে ইনবক্সে এক ভদ্র মহিলার একটি বার্তা এসেছে। আমাকে তিনি লিখেছেন, আপনি এত কিছু নিয়ে লিখেন, কিন্তু তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে লিখেন না কেন? তার বয়সী একজন ভদ্র মহিলা তসলিমার জন্য লিখেছেন এবং লিখতে বলেছেন দেখে ভালো লাগলো। এটি তসলিমার আরেক সাফল্য। বাংলার ঘরে ঘরে এই ভদ্র মহিলার মতো তসলিমার লেখালেখির গুণমুগ্ধ অনেক মানুষজন যে নিরবেও আছেন তা আমরা জানিনা অথবা হিসাবে রাখিনা।

এই ঈদের ছুটিতে চমৎকার একটি কাজ করেছে একাত্তর টিভি। ভারতে গিয়ে তসলিমার একটি এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার ধারণ করে নিয়ে এসেছেন আমাদের খুব প্রিয় একজন সাংবাদিক ফারজানা রূপা। সময়ের সমস্যায় সাক্ষাৎকারটির পুরোটা আমার দেখা হয়নি। আমার লেখার সুবিধার্থে সেই সাক্ষাৎকারের ভিডিও লিংক পাঠিয়েছেন সেই ভদ্র মহিলা। কিন্তু এখানেও পুরো সাক্ষাৎকারটি নেই। যতটা দেখেছি শুনেছি, আসলেই একাত্তর টিভি আর ফারজানা রূপার এটি একটি অসাধারণ কাজ হয়েছে। ঈদ উপলক্ষে সাক্ষাৎকারটি নেয়া না হলেও ঈদের ছুটিতে টিভি অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে এটিকে শ্রেষ্ঠ উপহার বলা চলে। ধন্যবাদ একাত্তর টিভি, ফারজানা রূপা এবং তসলিমা নাসরিন। কারণ তার অনেক কথা এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে বেশ ভালোভাবে উঠে এসেছে। দেশের কোন মিডিয়া এর আগে তসলিমার কথাগুলো এভাবে তুলে আনার চেষ্টা করেনি। তার বিরুদ্ধে শুধু লেখাই হয়েছে। তার কথাগুলো, যুক্তিসহ বলিষ্ঠভাবে এভাবে আর কখনো তুলে আনেনি অথবা তাকে সে সুযোগ দেয়া হয়নি।

আমি যখন ছাত্র, বিভিন্ন পত্রিকার চিঠিপত্র বিভাগে লিখি তখন থেকে তসলিমাকে নামে চিনি। চিত্রালীর ‘আপনাদের চিঠি পেলাম’ বিভাগে তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ঠিকানা ব্যবহার করে নিয়মিত লিখতেন। তখনও আজকের মতো নারীবাদীই ছিলেন তসলিমা নাসরিন। ঢাকায় স্থায়ীভাবে আসার পর টিএসসির জীবনে তাকে প্রথম সামনাসামনি দেখতাম রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সঙ্গে। আর তাকে আরও ঘনিষ্ঠ জানাশোনার সুযোগ হয় মিনার মাহমুদকে বিয়ে করার পর। সেই সংসারটি ধরে রাখতে তার প্রাণান্ত চেষ্টা আমাদের চেয়েও আমাদের আরেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু আক্কাস মাহমুদ বেশি সবিস্তার জানেন। আমাদের প্রিয় প্রজন্ম পত্রিকাটিতে তিনি লিখতে শুরু করেছিলেন, ‘আমার মেয়েবেলা’। পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাওয়াতে লেখাটি পরে কলকাতা থেকে বই আকারে বেরোয়।

আমরা যখন ঢাকায় যার যার ক্যারিয়ার সাজানো নিয়ে ব্যস্ত, মোল্লারা তার লেখালেখিতে ক্ষিপ্ত হয়ে তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করলে তিনি আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হন। সত্য বাস্তবটি হচ্ছে, সেদিন আমরা কেউ তার পাশে দাঁড়াইনি বা দাঁড়াতে পারিনি। বিদেশে পেন নামের সংগঠন, দেশে ইয়াহিয়া খানের মতো তার ও আমাদের একজন কমন ফ্রেন্ড সহ আরও কয়েকজন তখন তাকে খুব সাপোর্ট দেন। শিরিন হক, নাসরিন হকের(এখন প্রয়াত) মতো নারী পক্ষের কয়েকজন সাহসী নেত্রী, ড. কামাল হোসেন, ব্যারিষ্টার আমির উল ইসলাম, সারা হোসেনের মতো আইনজীবীদের সমর্থনে তার দেশ থেকে নিরাপদে বেরিয়ে যাবার মতো একটি পথ তৈরি হয়। মোল্লা আর তৎকালীন খালেদা সরকারের আক্রোশ থেকে তখন জীবিত দেশের বাইরে চলে যেতে পারলেও তসলিমা নাসরিন এভাবে তার জন্মভূমি এবং নাগরিক অধিকার হারান। বাংলাদেশের মৌলবাদী ও পুরুষতান্ত্রিক বিচার ব্যবস্থা গোলাম আযমের মতো একজন ঘৃণিত দেশোদ্রোহীর নাগরিক অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিলেও তসলিমার মতো একজন লেখকের নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।

তসলিমা দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হবার পর যে সব বিদেশি সাংবাদিক ঢাকা এসেছিলেন তাদের কয়েকজন তাকে জানতে আমার সঙ্গেও দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। তাদের যে কথাগুলো বলেছিলাম তার সার কথা ছিল, আমার চোখে তিনি আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার নিষ্ঠুর শিকার এবং ব্যক্তি জীবনে একজন প্রতারিত নারী। একাত্তর টিভির ইন্টারভ্যুতে দেখলাম তসলিমা এই দুটি ইস্যুতে জোর দিয়েছেন। ১৯৯৭ সালে আমি ফিলিস্তিনের ইন্তিফাদার রিপোর্ট করতে মিশর গেলে নোবেল বিজয়ী নাগিব মাহফুজের সঙ্গে দেখা হয় কায়রোয়। তার সঙ্গে আলোচনার আমি বাংলাদেশকে একটি উদার অসাম্প্রদায়িক সমাজ ব্যবস্থার দেশ হিসাবে উপস্থাপনার চেষ্টা করলে তিনি তসলিমা ইস্যু তুলে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, এটি কী একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজব্যবস্থার নমুনা হলো? যেখানে একজন লেখককে দেশ থেকে বিতাড়ণ করা হয়! সত্যি বলতে কী তার সে প্রশ্নের সদুত্তর দেয়ার ছিল না। আমাদের অনেক গৌরব এভাবে আমরা দাউদ হায়দার, তসলিমা নাসরিন ইস্যুতে হারিয়ে ফেলি! কারন আমরা একজন লেখকের লেখার জবাব লেখা দিয়ে দিতে পারিনা। তাদের দেশছাড়া করে সেই মৌলবাদীদের তোষামোদ করি, যারা লিখতে জানেনা। বিবি তালাকের ফতোয়া ছাড়া অনেক কিছুই জানেনা।

তসলিমার কিছু বিষয়ে আমি নানা সময়ে ভিন্নমত পোষণ করেছি। যেমন ‘লজ্জা’য় তিনি লিখেছিলেন বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হলে তাদের মুসলিম প্রতিবেশীরা তাদের পাশে এসে দাঁড়ায় না। এটি ঠিক নয়। তবে তসলিমার বেশিরভাগ লেখার সঙ্গে ভিন্নমত চলে না। তার বিরুদ্ধে দেশের সাংবাদিক-লেখকদের বড় অংশ ক্ষিপ্ত হবার কারণও আমাদের ভিতরের সুপ্ত লুকিয়ে থাকা পুরুষতন্ত্র! তিনি যা লিখেছেন এর অনেক কিছুই আমরা ছেলেরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করি। কিন্তু আমরা তাকে মেয়ে হিসাবে দেখেছি! একজন মেয়ে এসব লিখবে কেন, বেয়াদব-নষ্টা মেয়ে বলে আমরা গেছি ক্ষেপে!

এই দেশে বড় বড় খুনি-যুদ্ধাপরাধী, চোর-ছেঁচড়- ভন্ড মোল্লা-রাজনীতিক-আমলা-ব্যবসায়ী-বিচারপতি সবাই দিব্যি বেশ আছে! খাচ্ছে-দাচ্ছে! কিন্তু শুধুমাত্র লেখার অপরাধে একজন লেখককে আমরা দেশে ঢুকতে দেই না! আবার সারাক্ষণ নিজেদের সভ্য-সুশীল বলে গলা ফাটাই! এই অপরাধের ভন্ডামির বিচার ভবিষ্যত প্রজন্ম এক সময় করবেই। যার সব আছে কিন্তু নিজের দেশে জন্মভূমিতে ফেরার অধিকার নেই, এই কষ্ট শুধুমাত্র সেই বুঝতে পারে!

খালেদা জিয়ার আমলে তসলিমা নাসরিন দেশ থেকে বিতাড়িত হন। এরপর শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসেন এবং এখনও তিনি ক্ষমতায়। কিন্তু তসলিমা নাসরিন কেন কোন আমলেই ফিরতে পারেন না তার নিজের দেশে? শেখ হাসিনা-খালেদা জিয়া নিজেদের খুব পাওয়ারফুল মনে করেন! কিন্তু তসলিমার সামনে এসে ফুটো হয়ে যায় তাদের পাওয়ারের বেলুন। আসল সত্য হচ্ছে, মোল্লাদের সঙ্গে আপোষ করে ক্ষমতায় নিরাপদে থাকতে বা যেতে তসলিমাকে তার জন্মভূমিতে ফিরতে দেবার সাহস হাসিনা-খালেদা রাখেন না।

তার চল্লিশটির বেশি বই এখন পর্যন্ত দুনিয়ার যত ভাষায় অনুদিত হয়েছে বা যত বিক্রি হয়েছে-হচ্ছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় কোন লেখক এসব হিসাব-নিকাশের ধারে-কাছেও নেই! তসলিমার পক্ষে তারা দাঁড়াবেন কোন দু:খে একাত্তর টিভির সাক্ষাৎকারে তসলিমা বলেছেন, একজন লেখক হিসাবে জন্মভূমিতে ফেরার অধিকারটি এখন তিনি শুধু নতুন প্রজন্মের কাছেই শুধু আশা করেন। এটিই হবে একদিন। হবেই হবে। কারণ এখনকার নেতৃত্বের মতো এত কপট ভণ্ড নয় আমাদের নতুন প্রিয় প্রজন্ম। সে অপেক্ষায় থাকা পর্যন্ত তসলিমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ছাড়া আপাতত আর কী করতে পারি? কারণ দেশের একজন সাহসী-শক্তিশালী লেখকের দেশে ফেরার অধিকার আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি। 

শেয়ার করুন:
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.