আর নির্বাসন নয়, মেয়েকে ঘরে ফিরতে দিন

Taslima 1রাফী শামস: তসলিমা নাসরিন কে নিয়ে লেখালেখির পরিমাণ খুব কম নয়। বিপক্ষে তো বটেই,পক্ষের লেখার সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু সমস্যা হল বিপক্ষের মানুষগুলো বেশি, তারা অবস্থান করছে নীতি নির্ধারণ ও ক্ষমতার কেন্দ্রে। আর আমরা পক্ষের মানুষ গুলো দু কলম লেখা আর মানব বন্ধনের বাইরে যেতে পারিনি কখনও।

অবশ্য এটা প্রমাণিত যে, লেখার শক্তি অস্ত্রের থেকেও বেশি, তা নাহলে তসলিমা নাসরিন তো নির্বাসিত হতেন না! তাঁর লেখাকে মোকাবিলা করা দূরে থাকুক, সহ্য করার ক্ষমতাটুকুও অর্জন করতে পারেনি এ অঞ্চলের বিরোধিরা! তসলিমা নাসরিন একটা ভয়ংকর নাম হয়ে উঠেছে,তাঁর নাম শুনলেই কেঁপে ওঠে সবাই। শিশুদের কানে আঙ্গুল গুঁজে দেয়া হয় যেন এই নিষিদ্ধ নামটা না শুনতে পারে তারা! তবে আমি বাজি ধরে বলতে পারি, যারা তসলিমার বিরোধিতা করে তারা কেউ তসলিমা নাসরিনের বই পড়েনি। পড়লেও বাছাইকৃত খণ্ডিত কোন অংশ যা কিনা বিরোধিরা প্রচার করে, সেটুকুই তাদের তসলিমা সম্পর্কিত জ্ঞান!

তসলিমা নাসরিনের লেখার সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে ক্লাস সিক্সে থাকতে। এক আত্মীয়ের বাসায় তাঁর একটি বই পেয়েছিলাম,বইটি যত্ন করে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল! পত্র-পত্রিকার কল্যাণে আমি ততদিনে এই তসলিমা নাসরিন নামটির সাথে পরিচিত। ‘নিষিদ্ধ’ জিনিস পড়ার আগ্রহে আমি লুকিয়ে বইটি বাসায় নিয়ে আসি! সেটি ছিল একটি উপন্যাস- ‘ভ্রমর কইও গিয়া’…সেই বয়সে বইটিকে রগরগে যৌন উত্তেজক একটি কাহিনী হিসেবে নিয়েছিলাম আমি, অন্তর্নিহিত ব্যাপারটা ধরতে পারিনি। পরে ধরতে পেরেছি এবং মুগ্ধ হয়েছি। এরপর ধীরে ধীরে তাঁর তীক্ষ্ণ কলামের সাথে পরিচয় ঘটে আমার। আমি তখনও প্রথা দ্বারা আচ্ছন্ন, প্রথাকে প্রশ্ন করতে কিংবা ভাংতে শিখিনি। মস্তিষ্কে ধর্ম এবং পুরুষতান্ত্রিকতার কুৎসিত সব ধারণা নিয়ে বসে আছি তখনও। তাই তাঁর কলাম গুলো পড়ে কেঁপে উঠেছি বারংবার।মনে হয়েছে ‘বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি করছে এই মহিলা’!

কিন্তু ধীরে ধীরে যখন বুঝতে শিখলাম মিথ্যা ও ভ্রান্ত সব হাস্যকর প্রথায় আচ্ছন্ন হয়েছিলাম আমি,নিজেকে পুরুষ হিসেবে শ্রেষ্ঠ ভাবার অযৌক্তিক চিন্তা লালিত হত আমার ভেতর,নিজের ধর্ম সেরা-অন্য ধর্ম ভ্রান্ত-এই নোংরা বিশ্বাস ছিল অন্তরে,তখন নতুন করে তসলিমা নাসরিন কিংবা হুমায়ূন আজাদ স্যার এর লেখা গুলোকে উপলব্ধি করলাম।মূলত আমার প্রথাগত বিশ্বাসের শিকড়ে আঘাত এনেছিলেন এরাই,যার কারণে আজ আমি কিছুটা হলেও জীবন কে উপভোগ করতে পারছি!নতুন দৃষ্টি নিয়ে সব কিছু দেখতে পারছি।মুক্ত ভাবে চিন্তা করতে পারছি।

তসলিমা নাসরিনের লেখার বিষয় বস্তু নিয়ে আলোচনা হতে পারে,সমালোচনা হতে পারে,তর্ক-বিতর্কও হতে পার। কিন্তু এই জন্য একজন লেখক কে কোন ভাবেই দেশ থেকে বের করে দেয়া যেতে পারেনা।তাঁকে দেশে আসতে না দেয়া,নির্বাসনে রাখা এদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অক্ষমতাই প্রকাশ করে।তসলিমা নাসরিন এই অক্ষমতা কে ভাল ভাবে বুঝেছেন এবং আক্রমন করেছেন বলেই ক্ষীপ্ত এই পুরুষতান্ত্রিক অক্ষম সমাজ। ক্রোধাক্রান্ত হই তখনই যখন দেখি এরশাদের মত ভাড়টি এখন প্রধানমন্ত্রির বিশেষ দূত হয়ে টিকে আছে যার কিনা জেলে পচে মরার কথা,গোলাম আযমের মত দেশদ্রোহি রাজাকার বহাল তবিয়তে টিকে আছে,জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় লালিত পালিত হচ্ছে- আর একজন তসলিমা নাসরিন কে নির্বাসনে থাকতে হচ্ছে!

কি করেছেন তসলিমা নাসরিন? কয়টা খুন করেছেন তিনি? কার জায়গা জমি দখল করেছেন? কত টাকার ঋণ খেলাপ করেছেন? কার টাকা মেরে দিয়েছেন? কোন অঞ্চলের গডফাদার ছিলেন তিনি? তিনি কি শেয়ার বাজার কেলেংকারির সাথে যুক্ত ছিলেন? কিংবা সাগর-রুনির হত্যাকান্ডে? তিনি কি নারী পাচার শিশু পাচার গ্রুপের কেউ? তাঁর গাড়ি থেকে কি কাল বিড়াল বেরিয়েছিল??? আসলে তাঁর অপরাধ টা তাহলে কি এবং কোথায়?

আসলে তাঁর অপরাধ হল তিনি সত্য কথা গুলো অকপটে বলেছেন কোন ভন্ডামি না করে,যা সহ্য হয়নি এই ভন্ড অক্ষম সমাজের। তাঁর কথায় অক্ষম সমাজের ক্ষয়ে পড়া সংবেদনশীল অঙ্গের অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে- এই অপরাধ হয়তো খুন ধর্ষণ কিংবা দেশদ্রোহিতার অপরাধের থেকেও মারাত্মক! হে ভন্ড সমাজ তোমার ঐ দুর্বল অনুভূতিতে আমি সকাল বিকাল সন্ধ্যা রাত লাথি মারি। তবে বের করে দাও আমাকে, নির্বাসনে পাঠাও কোন গহীন অঞ্চলে। আমার মত আরও অনেক ‘আমি’ কে বের করে দাও তোমাদের ‘আদর্শ’ সমাজ থেকে।

ভারত সরকার তসলিমা নাসরিনের ভিসার মেয়াদ বাড়িয়েছে। ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতা। তবে এখন সময় হয়েছে, দেশের মেয়েকে নিজ বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসার। এই সরকারের কি সেটা করার মত শক্ত মেরুদণ্ড আছে???

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.