শুনেছি তসলিমা ভয়াবহ অপরাধ করেছেন!

Taslima
তসলিমা নাসরিন

সুষুপ্ত পাঠক: ৭১ টিভিতে তাসলিমা নাসরিনকে সাক্ষাৎকারে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, যদি তাকে বাংলাদেশে আসতে দেয়া হয় তাহলে প্রথম তিনি কি করবেন? তসলিমার চোখ স্বপ্নাতুর হয়ে উঠেছিল। তিনি জানিয়েছেন, প্রথমে তিনি শান্তিনগরে যে ফ্ল্যাটটা তিনি কিনেছিলেন সেখানে গিয়ে উঠবেন। তার নিজের ফ্ল্যাট, নিজের মত করে যেটাকে তিনি সাজিয়ে ছিলেন।…

গোলাম আযম আমৃত্যু এই দেশে বেঁচে থাকবে, যে এই দেশের বিরুদ্ধে একদিন যুদ্ধাপরাধের মত অপরাধ করেছিলেন সেই দেশ তাকে বয়োবৃদ্ধ দেখিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে, তার শেষ নি:স্বাসে এই দেশের মাটিতেই হবে…। তার নাগরিত্ব বাতিল হয়েছিল। এদেশে পাকিস্তানের পাসপোর্ট নিয়ে প্রবেশ করেছিল, তার নাগরিত্ব ফিরিয়ে দিতে আমরা বাধ্য হয়েছি। তার অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, তাকে শাস্তি দিয়েছি, মৃত্যু অবধি সে এই দেশেই বেঁচে থাকবে…।

শুনেছি তসলিমা ভয়াবহ অপরাধ করেছেন! কিছু উপন্যাস আর কলাম লিখেছেন। তাতে ধর্মের কঠোর সমালোচনা হয়েছিল। এই অপরাধে তার মাথার দাম উঠেছিল। তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছিল। আসলে আদৌ তার কোন অপরাধই ছিল না। তার প্রমাণ যারা তাকে হত্যার জন্য ফতোয়া দিয়েছিল তারাই তার দেশে ফিরে আসতে বড় বাধা। বিচার প্রার্থী তো অপরাধীর বিচার চায় যে কোন মূল্যে। তারা কেন তসলিমাকে বাংলাদেশে এনে তার অপরাধের বিচার দাবী করে না? তার বদলে দেশছাড়া করে রেখেছে। তার দেশের ফেরার কোন উচ্চবাচ্চ্য শুরু হলে আগাম প্রতিরোধের হুমকি জানান।… কারণ তারা জানে তসলিমা কোন অপরাধই করেনি। তারা তসলিমাকে দেশছাড়া রাখতে চায় কারণ তারা তাকে ভয় পায়! তার লেখাকে তারা ভয় পায়! তার লেখার পাল্টা কোন যুক্তি সঙ্গত উত্তর তাদের কাছে নেই। ধর্মে অমানবিক, অসত্য, অপরাধ প্রবণতাকে ডিফেন্স করার কোন উপায় তাদের কাছে নেই।…

তসলিমার নাগরিত্ব বাতিল হয়নি। সে কোন যুদ্ধাপরাধ করেনি, তবু তার চেয়ে এদেশে গোলাম আযম কত সৌভাগ্যবান!

গোলাম আযমের তবু কিছু জনসমর্থন আছে এই দেশে। তার জন্য হরতাল হয়েছে। কিছু মা্নুষ টিভিতে ইনিয়ে বিনিয়ে, আকার-ইংগিতে তাদের বিচারের বিরোধীতা করেছে। তাসলিমার পক্ষে কত প্রগতিশীলকে উদাসিন থাকতে দেখেছি। কারণ তাসলিমা আসলে “ভদ্রমহিলা” ছিলেন না! মহিলাদের মুখে “মহিলাসুলভ” কথা শুনতে না পেয়ে তারা হতাশ হয়েছেন। তার দেশছাড়ার সেই দিনগুলিতে এ-দেশে নারীনেত্রী, নারী সাহিত্যিকদের দেখেছি তার প্রতি এলার্জি। তারাও তার “বাড়াবাড়ি” দেখেছেন তার লেখায়।

ষোলকলা পূর্ণ করার মত দু-দুবার আনন্দ পুরস্কার তাকে অনেকের কাছেই অসহ্য করে তুলেছে। লেখক তসলিমা যে কি পরিমাণ অস্বস্তিকর তার প্রমাণ তার আত্মউপন্যাস “ক”। আসলে এ-ধরনের রচনা হজম হবার মত মানসিকতা আমাদের এখনো তৈরি হয়নি। একজন নারী তার যৌন জীবনের বর্ণনা দিচেছন- কত সাম্যবাদী, নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসীদের হজম হয়নি! মাওলানা-মাশায়েখদের আর দোষ কি? তাই তসলিমার জন্য এদেশে কোন শব্দ প্রকাশ্যে হয় না। যে দেশে গোলাম আযম, সাঈদীর মত আল্লামারও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হয় সে দেশে তাসলিমা অপরাধ না করেও ঘর ছাড়া, দেশছাড়া…।

একটা সমাজ, জনগোষ্ঠি, শাসক, রাষ্ট্র তখনই অসভ্য বলে প্রমাণিত হয় যখন সে-দেশের কোন লেখক, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, শিল্পীকে দেশান্তরিত হতে বাধ্য করা হয়। আমাদের আসলে সভ্য বলে দাবি করার মত কিছু নেই…।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.