আমরা যারা একলা থাকি-৩১

imp 1উইমেন চ্যাপ্টার: এই সমাজে অদ্বিতীয়াদের গল্প শেষ হয় না। এটা গাণিতিক হারে বাড়তেই থাকে একের পর এক। অদ্বিতীয়াদের সবাই হয়তো সমাজে প্রতিষ্ঠা পায় না, সবাই হয়তো পেরিয়ে যেতে পারে না সামাজিক পুলসিরাতের বেড়াজাল, তারপরও তারা বেঁচে থাকে অদ্বিতীয়া হয়েই।

আজ আরেকজন অদ্বিতীয়ার জীবনের একটা খণ্ডিত অংশ লিখতে গিয়ে খুব সত্যি একটা কথা বলতে ইচ্ছে করছে আমার। আমাদের প্রিয় লতা আপাকে (একসময়ের অভিনেত্রী লুতফুন নাহার লতা) নিয়ে একজনের লেখা একটা চিঠি উইমেন চ্যাপ্টারে পড়তে গিয়ে বার বার চোখের কোণ ভিজে উঠছিল।

লতা আপার দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে তার ২২ বছর বয়সী ছেলে সিদ্ধার্থ যে ভূমিকাটা রেখেছে শুধুমাত্র একটা পরিবার পাওয়ার আশাতেই না, মাকে ভাল রাখার জন্যও, সেটা কোনো ভাষায় বর্ণনা করার  সাধ্য আমারও নেই। শুধু দীর্ঘনি:শ্বাস ফেলা ছাড়া। কারণ এমন মানবিকতার উদাহরণ খুবই কম আমাদের চারপাশে।

সেই কবে থেকে একাকি জীবন যাপন করি (এ নিয়ে কথা বললেই আমি জানি অনেকে মনো:ক্ষুন্ন হন, আমার দুর্বলতা ভাবেন)। কিন্তু কই, ‘তুমি কি একাই থেকে যাবে?’ এই কথাটি ছাড়া কেউই তো জোরালোভাবে কোনদিন কিছু বলেনি। উদ্যোগও নেয়নি। একমাত্র মা-ই বেঁচে থাকতে বলতেন, ‘এই জীবন সমুদ্র পাড়ি দিবি কি করে?’ কারণ মাকেও এই জীবনতরী একাই বয়ে যেতে হয়েছিল। সারাজীবন বড় ছেলের গালিগালাজ শুনেও মা চুপ করে থেকে চাকরি করে সবার উদরপূর্তি করিয়ে বড় করেছিল। শেষ জীবনেও বেশ কষ্ট পেয়েই গেছেন তিনি।

বরং যখন জীবনের একটা পর্যায়ে একটু পা পিছলেছিল আমার, আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিলাম একজনকে, ধরেও ছিলাম, তখন চরমতম গালি ‘বেশ্যা’ শব্দটিও’ আমাকে শুনতে হয়েছিল যে, দুই বাচ্চার মা হয়ে যে অবিবাহিত পুরুষের সাথে প্রেম করে, সে তাদের ভাষায় বেশ্যা ছাড়া কিছুই না। আমি সেই পুরুষটির জীবন ধ্বংস করে দিতে চাইছি, হেন-তেন অনেক কিছু। অফিসের লোকজনও সেদিন পুরুষটির পক্ষ নিয়ে নির্দ্বিধায় বলে দিয়েছিল, ‘সে কী আপনাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল?’ আমি স্মৃতি হাতড়ে কিছু কথা, কিছু ঘটনাকে প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করাতে গিয়েই মনে হয়েছিল, ‘এই মানুষটি কিছুতেই আমার মানুষ না’। ভাগ্যে কুৎসা ছাড়া কিছুই জোটেনি, চাকরিও ছাড়তে হয়েছিল। দুই বাচ্চা নিয়ে অনিশ্চিত একটা ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়াতে বাধ্য হয়েছিলাম আমি।

ছারখার হয়ে গিয়েছিল আমার আর বাচ্চাদের জীবন। আর্থিক-মানসিক-সামাজিক সব দণ্ডেই আমরা দণ্ডিত হয়েছিলাম সেদিন। সেই দণ্ডভোগ আজও চলছে।

কিন্তু দিন পড়ে থাকে না, একসময় সব কেটে যায়, বর্ষার পর আনন্দচ্ছোল জ্বলজ্বলে রোদ আসে, আমার জীবনেও এসেছে। আমি টানা ছয় বছরের মেরুদণ্ডহীন (বন্ধুদের ভাষায়) জীবন থেকে বের হয়ে এসে সোজা হতে পেরেছি। বাচ্চাগুলো ততদিনে তর তর বেড়ে উঠেছে ডগানো লতার মতোন। নাদুস-নুদুস হয়েছে সবদিক দিয়ে। কিন্তু আমি? জীবন চলছে ঠিকই, একাকিত্ব তো কমেনি। হয়তো আমরা আনন্দ খুজেঁ পেতে জানি বলে কষ্ট হয় না বাঁচতে। তবে জীবন দিয়ে বুঝেছি, অর্থ একটা বড় ফ্যাক্টর ভাল থাকার জন্য, সে একাই থাকি, আর দোকাই থাকি।

কিন্তু যাকে আমি সব হারিয়ে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিলাম, সে তো আমার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডটাও ভেঙে দিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে আজও কি পেরেছি বের হতে? পারিনি। আজ পড়ন্ত বেলায় যখন কেউ সত্যি সত্যিই উদ্যোগ নেয়, তখন সেখানে না থাকে প্রাণ, না থাকে উচ্ছলতা।

আর সেইসব দিনে বন্ধুও চিনেছিলাম বটে! এক হাফেজী (পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ-রোজা করা) বন্ধু আমাদের সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে সম্পর্কেই জড়িয়ে গিয়েছিল আমার সেই আঁকড়ে ধরা মানুষটির সাথে। জানা মতে তাদের সেই সম্পর্ক বিছানা পর্যন্ত গড়িয়েছিল। আর অন্য দুই বন্ধু, ঠিক যে সময়টিতে ওদেরকে আমার খুব প্রয়োজন ছিল, যখন আমি ভেঙে পড়তে পড়তে আর কোনো অবলম্বনই খুঁজে পাচ্ছিলাম না স্লিপিং পিল ছাড়া, তখন মুখ ফিরিয়েই শুধু নেয়নি, তারাও সেই পুরুষটিরই পক্ষ নিয়ে সরে গিয়েছিল। পুরুষটি তাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল, ‘আমি একটা সাইকো, আমাকে বন্ধুর চেয়ে বেশি কিছু ভাবা ঠিক নয় তার পক্ষে’। আমার উত্তর আধুনিক বন্ধুরাও তা মনে এবং মেনে নিয়ে আমাকে ছেড়ে গিয়েছিল আমার চরম দু:সময়ে। খড়কুটোর মতোন ভাসতে ভাসতে আমি একদিন ঠিকই তীরে পৌঁছুই। এবং ভালভাবেই পৌঁছুই। আমার সেই আঁকড়ে ধরা মানুষটি অবশ্য একা থাকেনি। একের পর এক বন্ধু পাল্টে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে দিব্যি। পাল্টাতেও হয় না তাদের আধুনিক সমাজে। সবার একসঙ্গে বসবাসও চলে।

আমিই শুধু ব্যতিক্রম হয়ে জীবন কাটাই যুদ্ধ করে। তীরহারা সাগর পাড়ি দিতে থাকি অতি সন্তর্পণে, পচা শামুকে আর কোথাও পা কাটা যাবে না, ভেঙে বা মুষড়ে পড়াও চলবে না। শিরদাঁড়া সোজা রেখে পথ চলতে হবে যতোই হাতছানি আসুক না কেন!

সম্প্রতি লতাপার বিয়েটা আবার ভাবিয়ে তোলে আমাকে। লতাপাও আহ্লাদের সুরে যখন বলেন, ‘কেমন আছো সোনা? কথা দাও, আর একা থাকবে না!’ গলা পর্যন্ত এসে কথাটা আটকে যায়। বলি, ‘এমন কথা কেমন করে দিই তোমাকে? কে আছে কোথায় আমার পড়ন্ত বেলার হাতটি ধরবার? যে হাত আমার শক্ত-সমর্থ নয়, ছিলও না কখনও, সেই হাত কে ধরবে? মানুষ তো শক্তের পুজারি।’

বলা হয় না, আমিও যে একটা শক্ত হাত চাই আপা, অনেক কষ্ট করেছি জীবনে, যেমন আর্থিক, তেমনি মানসিক, সামাজিকও। এখন যদি জীবনের মোড় ঘুরাতেই হয়, তবে কোনরকম আপোস করে নয়। ভাল একটা জীবন চাই………….অফুরন্ত অবসর বা আনন্দ ভাগাভাগির জীবন। (চলবে)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.