মা, লাভ কেন গ্রো….প্রিয় লতাজীকে চিঠি

Lata paহামীম চৌধুরী: প্রিয় লতাজী (লুতফুন নাহার লতা), আপনার ছেলে সিদ্ধার্থ আজ আমার চোখে জল এনে দিয়েছে বোন। আজ আপনার জীবনের শুভলগ্নে আমার ব্যক্তিগত দুঃখের ক্ষত থেকে নতুন করে রক্ত ঝরছে।

আমার বাবা যখন মারা যান সেই ১৯৬৯ সালের কথা , আমার বয়স তখন মাত্র নয় বছর । মা তখন কত অল্প বয়সের একটি মেয়ে, তিন সন্তান নিয়ে বিধবা হয়েছিলেন। আর সেই বৈধব্যের অর্থ বোঝার বয়সও আমার ছিল না । পরে ৭৯ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন তিনি । জীবনে আর বিয়ে করেননি । কেউ তার জন্যে চেষ্টাও করেনি । আমি তখন ছোট ছিলাম কিছুই করিনি মায়ের জন্যে । মা কিন্তু ধুকে ধুকে তাঁর একাকী জীবন পার করেছেন আমার চোখের সামনেই ।

আজ আপনার সিদ্ধার্থের মত আমারো বয়স বেড়ে এক সময় ২২ হয়েছিল । কই , আমিতো আমার মায়ের জন্যে এমন করে ভাবতে পারিনি !

মৃত্যুর আগে আমার বাবা একজন সিভিল ঠিকাদার ছিলেন , আর মা ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষিকা। আমরা ছিলাম তিন ভাই, আমাদের কোন বোন ছিল না। বোনের জন্য দুর্বলতা আমাদের সব সময়ই ছিল, ভালো মন মানসিকতার যেকোনো মেয়েকে আমি বোনের আসনে বসাতাম , এমন অনেকেই আমাকে ভাইয়ের আসনে বসিয়েছেন ।

বোন ছিলনা বলে , আমি আমার মায়ের কষ্টগুলোকে শেয়ার করতে পারতাম না । মাঝে মাঝে মা অসুস্থ হলে আমার মায়ের ছাত্রীর সুবাদের বা আমার বোনের সম্পর্কের কারণে অনেকেই পালা করে আমার মায়ের পাশে থাকতো, যাকে বলে ডিউটি করা, কার নাম বলে কাকে বাদ দিয়ে ফেলি তাই নাম উল্লেখ করছি না।

তখনই বুঝতাম ছেলে হওয়ায় মায়ের এমন কিছু সমস্যা আছে যা আমি শেয়ার করতে পারি না । আজ আমার বাবা জীবিত থাকলে মা হয়ত সে কষ্টগুলো বাবাকেই শেয়ার করতেন । এর কিছু কিছু হয়তো আমার সেই বোন গুলো তাদের সেবায় পরিত্রাণ করতো , আসলে কতটুকু পারতো আর পারতো না তাও বুঝার ক্ষমতা আমার ছিল না, এমন কি পরিণত বয়সেও সেটা বুঝতে চাই নাই বা পারি নাই, কতোটাই স্বার্থপর ছিলাম, এখন এমনটাই মনে হয়।

আমাদের তখন বাড়িটা ছিল ময়মনসিংহের রাজবাড়ি (এখন মহিলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ) অয়োময় নাটকের রাজার বাড়ির পুকুর ঘাটের উপর সুদর্শন এক ডুপ্লেক্স বাড়িতে। সেই রকম রাজকীয় সব ফিটিংস ছিল, আর স্কুলের বড় আপার বাসভবন হিসেবে এর চাকচিক্যই ছিল আলাদা। সময়টা ছিল ১৯৭০ থেকে ১৯৮০ পর্যন্ত ।

আমি মাকে দেখতাম সারা দিন স্কুল শেষে ঘরেই থাকতেন, এতোটাই ক্লান্ত থাকতেন যে আমাদেরকে পড়ানোর কোন এনার্জি তার থাকতো না, তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন, আর প্রতি রাতে এশার নামাজের পর মোনাজাতে বসে ডুকরে ডুকরে কাঁদতেন।

আমি একদিন মাকে জিজ্ঞাসা করলাম: ” মা তুমি প্রতি রাতে এশার নামাজের পর মোনাজাতে বসে কান্না কর কেন ” ?

মা আমাকে বলেছিলেন, তোমার বাবা’র কথা মনে হয়।

আসলে ব্যাপারটা শুধুই বাবাকে মনে করেই কি ? সেই বয়সে আমি আমার মার মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনের শূন্যতা কে অনুভব করতে পারতাম না। হায়রে অভাগা সন্তান আমি! নিজেকে এখন ধিক্কার দিতে ইচ্ছা করে।
কারণ তারও যে একটা মন ছিল, সেও যে একজন মানুষ, আমাদের তিন ভাইয়ের মা বলে কি তিনি আনন্দ, আহ্লাদ আর প্রেম ভালবাসার ঊর্ধ্বে চলে গিয়েছিলেন ? নিশ্চয়ই না।

কিন্তু আমি তার বড় সন্তান হয়েও কোনোদিন কেন ভাবি নাই, যে মায়েরও একটি জীবন আছে, আর সে জীবনকে অর্থবহ করে তোলার চেষ্টা সন্তান হিসাবে আমার উপরও বর্তায়। কিন্তু এই অভাগা আমিও যে করতে পারি সেটা বোঝার মত উদারতা, মানবতা আমার জন্মায় নাই। বা আমি চেষ্টা করে দেখি নাই।

ঘটনা-দুর্ঘটনা সবার জীবনেই ঘটে ! কিন্তু আমরা কি অসহায় বাবা / মায়ের বেলায় অগ্রণী ভূমিকায় যাই ? পরিতাপের বিষয় হল আমাদের সমাজে এই দীক্ষাটা নেই।

কিন্তু লতাজী ,
আপনার আর মার্ক এর জীবনকে একটি গ্রন্থি দিয়ে বাঁধতে সিদ্ধার্থের ভূমিকাটা এই ঘুনে ধরা সমাজকে নাড়া দিয়েছে। আর কাউকে দিক বা না দিক আমাকে দিয়েছে, আমার পরিবারকে দিয়েছে আর আপনার অগণিত ভক্তকুলকে দিয়েছে ।

আজ আমি নিজেকে সিদ্ধার্থের কাছে এক পরাজিত সৈনিক বলে মনে করছি । সিদ্ধার্থের মত করে আমি কেন পারি নাই আমার মাকে বুঝে নিতে ? আজ নিজেকে খুব স্বার্থপর মনে হচ্ছে, কারণ আমাদের বেড়ে উঠার প্রয়োজনের পাশাপাশি আমার মা’র প্রয়োজন গুলোকে সন্তান হিসাবে ভাববার মত কালচার সেই যুগে ছিল না। আমরা কেউ এমন করে ভাবতাম না। সেই যুগের কালচারটাকে এখন আমার কাছে খুবই পাশবিক মনে হয় ।

সিদ্ধার্থ আজ আমাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিলো আমরা এক ভয়াবহ স্বার্থপর সমাজের মানুষ ছিলাম। যে সমাজ একজন নারীর বেদনাকে থোড়াই কেয়ার করে। উন্নত মন মানসিকতার জন্য, অন্তরের সংবেদনশীলতার জন্য সিদ্ধার্থ যা পেরেছে, আমি তা করতে পারিনি আমার মায়ের জন্যে ।

আজ সিদ্ধার্থের সহযোগিতায় আপনার জীবনের এই বেঁচে থেকে জীবনকে সেলিব্রেট করার দৃষ্টান্ত আমাকে আমার মায়ের কাছে ছোট করে দিলো । আজ এই পরিণত বয়সে মায়ের কষ্টগুলোকে , তাঁর একাকীত্বকে এখন বুঝতে পারি, সেজন্য আমি নিজেকে অধম মনে করি।

সিদ্ধার্থ অনেক বেশী মানবিক, বুদ্ধিমান আর দায়িত্ববান।

লতাজী,
আমি আপনার ভক্ত ছিলাম আর এখন সিদ্ধার্থের মানবতা বোধের কাছে মাথা নোয়ালাম।
সিদ্ধার্থকে কাছে পেলে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে পারলে নিজের বুকটা অনেক হালকা হতো। কেন আমি বলতে পারিনি —

” মা লাভ কেন গ্রো ”

এই কথাটা এখন বাণী চিরন্তনীর মত একটা মর্মবাণী হয়ে থাকলো। জগতের সকল একাকি মায়ের সন্তানেরা সিদ্ধার্থের মত সংবেদনশীল মন নিয়ে মায়ের দুঃখ বুঝুক, আর মা’কে ভালোবাসুক ।
প্রশান্তি নামুক আপনার আর মার্ক এর জীবনে । জয় হোক সিদ্ধার্থের মানবিকতার।

নোট: আমার এই লিখা পত্রটি লাইলাতুল কদরের রাতে লতাজীর মঙ্গল কামনা করে লেখা , আমার চিরকালের প্রিয় নায়িকা ,প্রিয় লতাজীকে উৎসর্গ করে।
বিতর্কিত মন্তব্য এখানে নিষ্প্রয়োজন।

 

শেয়ার করুন:
  • 729
  •  
  •  
  •  
  •  
    729
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.