তোরা ছিলি, তোরা আছিস…

Friendsতানিয়া কামরুন নাহার: ১। বয়সটাই ছিল তখন কল্পনায় ভেসে বেড়াবার।অমন সময়ে যদি কোন রহস্যময় পাহাড়ের খোঁজ পাওয়া যায় তবে তো কথাই নেই।কোত্থেকে এক রহস্য পাহাড়ের খবর নিয়ে এসেছিলি তুই। সেই থেকেই আমাদের চিন্তা ভাবনা জুড়ে ছিল রহস্য পাহাড় জয় করা। সেজন্য আমরা রীতিমত প্রস্তুতিও নিতে আরম্ভ করেছিলাম।স্কুলের পরিত্যক্ত রুমগুলোতে ঝুলাঝুলি করার মত একটা না একটা কিছু পেয়ে যেতাম ঠিক ঠিক।আমরা ওগুলোতে ঝুলে ঝুলে ব্যায়াম করতাম। রহস্য পাহাড় জয় করতে হলে আগে শরীরটাকে ফিট করে নিতে হবে না! আমরা লিস্ট করতাম, কাকে কাকে আমাদের সাথে নেব, কাকে কাকে নেব না এসব।অনেক প্ল্যান ছিল আমাদের।

আমাদের দেখা হত স্কুলে আর স্যারের বাসায় পড়তে গিয়ে। এখন আমরা সব পৃথিবীর কোথায় কোথায় বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছি। রহস্য পাহাড়ের কথা হয়ত তোদের কারো মনে পড়ে না। এক একদিন মনে হয়, বাক্স প্যাটরা সব গুছিয়ে কৈশোরের সেই দিনগুলিতে ফিরে যাই, রহস্য পাহাড়ের খোঁজে বেড়িয়ে পড়ি সবাই মিলে।

২।
এক স্কুলে পড়লেও তখন তেমন বন্ধুত্ব ছিল না। পরে একই কলেজে ভর্তি হবার পরে একসাথে আমরা তিনজন যাতায়াত করতাম, তখন আমাদের বন্ধুত্ব গাঢ় হতে লাগলো। স্কুল পেরিয়ে কলেজ, পৃথিবীটাও একটু বড় হল। কিন্তু তারপরেও সীমাবদ্ধতা ছিল। কলেজে যাওয়া ও আসা ছাড়া আর কিছু করার কথা কল্পণাতেও আনার সাধ্যি ছিল না আমাদের। আমাদেরও ইচ্ছে হত কলেজ পালিয়ে কোথাও একটু ঘুরে আসার।এখন তো ভ্যালেন্টাইন’স ডে কবে সেটা সবারই মুখস্থ। আমরা তখনও তারিখটা মুখস্ত করতে পারি নি।একদিন কলেজে গিয়ে শুনি কালিপূজা উপলক্ষে কলেজ বন্ধ।তখন আমাদের একজন প্রস্তাব দিল, ‘’চল, বইমেলা ঘুরে আসি।‘’

–দারুন, আজ কিন্তু ভ্যালেন্টাইন’স ডে।

–ভ্যালেন্টাইন’স ডে কবে, তা যেন তুই খুব জানিস!(আরেকজন ফোঁড়ন কাটল)

–বইমেলায় যাবি কি না বল!
–বইমেলা কখন খোলে জানিস?
–যাবো কিভাবে? রাস্তা চিনিস?(সিরিয়াস আরেকজন উদ্বেগ প্রকাশ করল)

–বইমেলায় গিয়ে পরে আবার ফিরে আসবো কিভাবে?

শেষ পর্যন্ত কলেজ পালানো হল না আমাদের। ফিরে এলাম বাসায়। বাসায় এসে তিনজনে মিলে গল্প।কত গল্প যে ছিল আমাদের। না, আমাদের কারো বয়ফ্রেন্ড ছিল না। কিন্তু আমাদেরও ইচ্ছে হত কল্পণার বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঘুরবার।এইসব গোপন কথা শুধু প্রাণের বন্ধুদের কাছেই বলা যায়, অন্য কাউকে নয়।

আজ আমরা যে যার নিজের কাজে ব্যস্ত। তবু সব ব্যস্ততা ফেলে একদিন আয় না।সেদিন না হয় স্বামী-সংসার-চাকরি-ব্যস্ততা সব কিছুকে ছুটি দিয়ে শুধু আমাদের কথা ভাববো।কলেজে পড়ার সময় যা আমাদের স্বপ্ন ছিল, তা আজ ইচ্ছে করলেই আমরা বাস্তব করতে পারি।একদিন আয়, আমরা তিনজন মিলে ইচ্ছে মত পুরো ঢাকা শহর চষে বেড়াই। আমরা সেই আগের মত তিনজন মিলে এক রিক্সায় ঘুরে বেড়াবো, বাতাসে আমাদের চুল উড়াবো, আমাদের ওড়নার আঁচল উড়াবো।আমাদের দেখে কোন ছেলে যদি ভাব জমাতে চায় তাহলে আমরা প্রথমে একে অন্যের সাথে চোখাচোখি করে নেবো। তারপর হিহিহি করে হাসাহাসি করে ঐ ছেলেকে নার্ভাস করে দেবো।

৩।

ভার্সিটিতে আমরা তিনজন তিন ডিপার্টমেন্ট পড়লেও মনের মিল হতে খুব বেশি সময় লাগে নি। মনের মিল-অমিল সবই ছিল আমাদের।কী বন্ধুত্বই না ছিল আমাদের!বাসে দুইজনের সিটে তিনজনের দিব্যি জায়গা হয়ে যেত আমাদের। যদি হয় সুজন, তেঁতুল পাতায় নজন।আমাদের নামেও মিল ছিল।

আমাদের তিনজনকে দেখে জ্যোতিষি কাওসার ভাই ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন, ‌‌‘তোমরা সব সময় একসাথে থাকবে, তাহলে কোন বিপদ হবে না।যা কিছু করবে একসাথে করবে’। আমার তক্ষুনি মনে পড়ে গিয়েছিল হুমায়ুন আহমেদের ‘’তারা তিনজন’’ উপন্যাসটার কথা। আমরা কি তবে লি, অয়ু আর নিম? আমাদের তিনজনের শক্তিতে অনেক বিশাল কিছু কি ঘটে যেতে পারে? কাওসার ভাই আমাদের নাম দিয়েছিলেন ‘অর্কেস্ট্রা’, আমরা নাকি মানুষের আয়ু বাড়িয়ে দিতে পারি।

আমরা ঠিক করেছিলাম একটা ফ্যাশন হাউজ দেবার।একটা ফ্যাশন হাউজের স্বপ্ন এখনো ভীড় করে চোখে।তোরা তো জানিস, আমি একবার ক্যাটারপিলার যাকে সোজা বাংলায় বলে ছ্যাংগা, হুম, আমি ছ্যাংগা পুষেছিলাম কিভাবে প্রজাপতি হয় তা দেখতে।শৈশবে ছ্যাংগারা একসাথে গিজিগিজি হয়ে থাকলেও বড় হলে নিজেদের কাঁটাগুলোর কারণেই আর একসাথে থাকতে পারে না। একেকজন একেকদিকে ছড়িয়ে পড়ে জীবনের সন্ধানে।

আমাদের কিছু কাঁটা ছিল, কী কী সব বলে এগুলোকে…ব্যক্তিত্বের সংঘাত! আমরা বড় হচ্ছিলাম, একজন আরেকজনকে ছাড়িয়ে যাচ্ছিলাম। তাই সময়ের দাবিতে নিজের নিজের পথে হেঁটে যেতে হল আমাদের।সবাই ভাল আছি আমরা। তবুও মাঝে মাঝে মনে হয় টাইম মেশিনে করে সেই সময় গুলোতে চলে যাই, গিয়ে সময়টাকে স্থির করে দেই। আমরা একটা ফ্যাশন হাউজ করার স্বপ্ন দেখব, কিন্তু আমাদের ক্যাপিটাল নেই বলে হা-হুতাশ করবো।তিনজন বাসের সিট শেয়ার করে বসবো, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে মৃণাল হকের তৈরি রত্নদ্বীপ দেখে হাসাহাসি করবো, ওগুলো আমাদের তিনজনের তিনটা ডিম এই বলে।

আমাদের গল্পের যন্ত্রণায় বিরক্ত হয়ে পাশের যাত্রী বলবে, ‘’এই মেয়েরা এত কথা বল কেন? তোমাদের কি মাথা-ব্যথা করে না?’’ আমরা এত গল্প করবো যে বাসের সব যাত্রীর মাথা ব্যথা করিয়ে দেব।আবারও আমরা প্ল্যান করে একই সময়ে একই এসএমএস একই ব্যক্তির কাছে পাঠিয়ে দিয়ে মজা দেখবো। আমি যেই সময়ে টাইম মেশিনটা ফিক্সড করে দেবো, ঐ সময়ে অবশ্যই সিনেমা হলে অনন্ত জলিলের সিনেমা চলবে, আমরা সেই সিনেমাগুলো দেখবো। এ নিয়ে কারো কোন আঁতলামো গ্রাহ্য করা হবে না।বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঝামেলা হলে, তুই কান্নাকাটি করিস, খামাখাই মেজাজ দেখাস আমাদের দুজনের সাথে।

শেয়ার করুন:
  • 46
  •  
  •  
  •  
  •  
    46
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.