তসলিমা কি যুদ্ধাপরাধী? রাজাকার?

Taslima
তসলিমা নাসরিন

শামীম আরা নীপা: তসলিমা নাসরিনকে একজন মানুষ হিসেবে যদি এই সমাজ ও সমাজের মানুষগুলো বিবেচনা করতো তবে কি উনাকে ২০ বছর ধরে নির্বাসন ভোগ করতে হতো? একজন মানুষ নিজেকে নারী হিসেবে বিবেচিত করার আগে একজন মানুষ হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা দাবি করে সমাজ, দেশ এবং বিশ্বের কাছে তথাপি সকল মানব জাতির কাছে। এটা কি অন্যায়?

আমাদের সমাজে নারীরা ২০ বছর আগের থেকে এখন বেশী এগিয়ে এসেছে দেশ ও সমাজের প্রতিটা সেক্টরে। কোথায় নারীর সফলতা এবং অতুলনীয় ভূমিকা ও অংশগ্রহণ নাই? আজ যেমন নারী তার শিক্ষা, কর্ম এবং মনন দিয়ে এগিয়েছে, কাল তারা আরো বেশী অগ্রসর হবে সমাজের কু- প্রথা, বাঁধা-বিপত্তিকে অতিক্রম করে। আমাদের দেশ এবং সমাজে ২০ বছর আগেও নারীর অবদান ছিল, এমন কি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধেও নারীর অবদান এবং ত্যাগ ছিলো অপরিসীম। তসলিমা নাসরিন পুরুষতন্ত্রকে মেনে নেয়নি, ধর্মের দোহাই দিয়ে উনাকে ঠেকানো যায়নি। এটাই কি অপরাধ ছিল?

তিনি নিজেকে মানুষ ভেবেছিলেন এবং মানুষের মতই বাঁচতে চেয়েছেন সবসময়। আমাদের সমাজটা সভ্য এক সমাজ হবে- সেই কামনা আমাদের সকলের। সেই সভ্য সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন এই প্রগতিশীল নারী, সেই সমাজে সম্মানের সাথে বাঁচতে চেয়েছিলেন- এটা উনার অন্যায় আব্দার নয়, বরং খুব ন্যায়সঙ্গত দাবি। উনার বোধকে উনি নিজের লেখায় প্রকাশ করেছেন, সেইটা যে সকলের মনঃপুত হবে তা নয়, সকলে যে তাতে একমত হবে তাও নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে লেখক তসলিমা নাসরিনের সাথে অনেক ইস্যুতে দ্বিমত, এমনকি সম্পূর্ণ বিপরীত মতও পোষণ করি কোন কোন ক্ষেত্রে, কিন্তু তার মানে এই না যে, আমি তার নির্বাসিত জীবনকে মেনে নিয়েছি।

উনার অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে অবশ্যই আমি তাঁর একজন সহযোদ্ধা। একজন স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে উনার বাক-স্বাধীনতা আছে। নারী হিসেবে মৌলবাদি আচরণের, পুরুষতান্ত্রিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছেন বলেই তিনি তার প্রতি হওয়া অন্যায়-অত্যাচারকে সবার সামনে এনেছেন, নতুবা উনার কি এমন প্রয়োজন ছিল, যে কারণে তিনি ধর্ম কিংবা পুরুষের বিরুদ্ধে কথা বলবেন কিংবা মিথ্যা অসঙ্গতি-বৈষম্য টেনে আনবেন লোকসমাজে?

আমাদের সমাজটা যে একেবারেই সভ্য নয়, তা আমাদের সবারই জানা। নিজ জীবনের অভিজ্ঞতা এবং নারী জীবেনের সিংহভাগ বাস্তবতাকে মাথায় নিয়েই উনার নারীবাদী লেখালেখি। পুরুষ অত্যাচার করবে, সমাজ ধর্মের নামে অত্যাচার করবে এবং নারীকে মুখ বুঁজে সহ্য করে যেতে হবে – আজ ও এইরকম বর্বর সমাজ আমাদের কিন্তু সেই সমাজটা আমাদের কারোরই কাম্য নয়।

দেশ স্বাধীন হয়েছে, মানুষ মত প্রকাশের স্বাধীনতা পেয়েছে, স্বাধীন দেশের নাগরিক সব শিক্ষিত ও আধুনিক হয়েছে, কিন্তু তার সবই তথাকথিত এবং পোশাকি। একজন চিকিৎসককে স্বাধীন দেশে সরকারী চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়ার হুমকি দেয়া হয় উনার মুক্তচিন্তা প্রকাশ, সমাজের কুৎসিত চেহারার উন্মোচন তথা লেখালেখির অপরাধে! উনার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়, কারণ কারো কারো ধর্মীয় বোধে আঘাত হানে তাদের ভাষায় -সেই নারীবাদী, নাস্তিক লেখিকার কলমের কালি।

একজন মানুষের ব্যক্তিগত আচার-আচরণ এবং জীবনবোধকে আপনারা কেন প্রভাবিত কিংবা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবেন?

একটি প্রশ্ন করতে চাই সেই মৌলবাদীদেরকে- আপনাদের ধর্মবোধ এতই কি ঠুনকো এবং হাওয়া হাওয়াই যে, কেউ কিছু বললেই আপনাদের ধর্মে আঘাত লেগে তা চুরচুর হয়ে যায়, উড়ে উড়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়? কেমন ধার্মিক আপনারা? আমি কাউকেই উৎসাহিত করবো না যে, সে অন্যের ধর্ম বা নিজ ধর্ম নিয়েও কোন কুৎসিত কথা বলে বা লিখে বা অসম্মান করে। পারস্পরিক সম্মানবোধ এবং মুক্তচিন্তার প্রতি সম্মান বোধ থাকলে কেউ অন্য কারো কোন বোধেই আঘাত হানার কথা না।

ধর্ম বা ধর্মীয় বোধকে অস্ত্র হিসেবে ব্যাবহার করে কেউ অন্যায়- অত্যাচার করে তা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, ঠিক একই ভাবে কেউ কারো ধর্ম বা ধর্মীয় বোধকে আঘাত করে সাম্প্রদায়িক মনন ও আচারের প্রকাশ করে, তাও গ্রহণযোগ্য নয়। তারপরও যখন ধর্মযুদ্ধ বেঁধে যায় কোথাও কোথাও তখন আমার মনে এই প্রশ্নই আসে যে, আস্তিক বা নাস্তিক যেই হোক, আপনাদের মতাদর্শগত অবস্থান এবং আপনাদের ধর্মবোধ নিশ্চয়ই পোশাকি এবং ঠুনকো যার কারণে আপনাদের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললেই আপনারা দানবের চরিত্রে আবির্ভূত হন মানুষের শরীর এবং মস্তিষ্কটা নিয়ে!

বাংলাদেশ থেকে একজন লেখককে নির্বাসিত করে উনার পাসপোর্ট কেড়ে নিলেই কি মৌলবাদীদের ধর্ম রক্ষা হয়? পুরুষতন্ত্র কি জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে উঠে যায়? লেখককে নির্বাসিত করে তার মিথ্যা সাক্ষাৎকার কিংবা পুস্তক বের করলেই কি উনার মেধাকে, চিন্তার সীমানাকে আটকে ফেলা যায় কিংবা দমন করা যায়? নতুন প্রজন্মকে সেই লেখক এর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করে বিরুপ করতে পারলেই কি এই সমাজের ধর্ম আর পুরুষতন্ত্র রক্ষা হয়?

আজ বাংলাদেশে নাস্তিক মানুষ এর সংখ্যা অসংখ্য, সকলে নিজেদের মতামত প্রকাশে অনেক এগিয়ে এসেছেন। বাংলাদেশে নারীবাদী মানুষের সংখ্যাও এখন কম নয়। নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলা এবং পুরুষতন্ত্রকে আঘাত করার মত সচেতন – সাহসী মানুষ এর সংখ্যা আজ অনেক। তাহলে এই দেশ কি সমস্ত নাস্তিক, নারীবাদী মানুষকে এই দেশ থেকে নির্বাসিত করে দেশটাকে আইয়ামে জাহেলিয়াত এর সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়? আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীরা কেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে তসলিমা নাসরিনকে এই দেশে ফিরিয়ে আনছেন না? কেন ২০ বছর একজন লেখককে বাংলাদেশের বাইরে নির্বাসিত থাকতে হচ্ছে? দেশের কাছে থেকেও কেন তিনি দেশের মাটির গন্ধ নিতে পারছেন না? তিনি নারী বলেই কি উনাকে নির্বাসিত থাকতে হচ্ছে? উনি নারী বলেই বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী মুক্তমনা সমাজ উনার অধিকারের লড়াই লড়ছেন না? উনি নারী হয়ে ভণ্ডদের মুখোশ উন্মোচন করেন বলেই কি উনাকে বিগত ২০ বছর থেকে নির্বাসিত থাকতে হচ্ছে?

তসলিমা নাসরিনকে এই দেশে ফিরিয়ে আনার জোর দাবি তুলে এগোতে হবে। এই দেশে উনাকে নিরাপত্তাও দিতে হবে। এসব উনার নাগরিক অধিকার, তা কেউ ক্ষুন্ন করার অধিকার বা ক্ষমতা রাখে না। তসলিমা নাসরিনকে কোন ইস্যুতে নির্বাসন দেয়া হয় (কেন, কখন, কিভাবে, কার দ্বারা, আইনি সংশ্লিষ্টতা ছিলো কিনা) সেইটা পয়েন্ট আউট করে তার প্রেক্ষিতে যুক্তি দাঁড় করিয়ে এগোতে হবে। অনলাইন-অফলাইন সব জায়গাতেই ক্যাম্পেইন করতে হবে। কলেজে, ইউনিভার্সিটিগুলোতে ক্যাম্পেইন করতে হবে।

উনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারটার সাথে আইনি লড়াই জড়িত। উনার জন্য কাজ করতে হলে জনমত এবং আইনি লড়াই – দুটোই প্রয়োজন। সমস্ত দেশী ব্লগের এডমিনদের সাথে যোগাযোগ করে একই সময়ে সবগুলো ব্লগে উনার পক্ষে লেখা যাওয়া জরুরি। রাজপথের কর্মসূচির সাথে সাথে অনলাইন পত্রিকাগুলোতে ক্যাম্পেইন চালানো দরকার। মানুষকে নারীবাদ না বুঝিয়ে মানুষবাদ বুঝানো বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে আজ। মানুষের মানবাধিকার, নাগরিক ও মৌলিক অধিকার সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা প্রয়োজন।শারীরিক মেটাবোলিজমে নারী কিন্তু সবার আগে সে মানুষ। একজন মানুষ তার অধিকার প্রাপ্ত হলে আর আলাদা করে নারীবাদের কথা টেনে তাকে বা কেউকে কিছুই বুঝাতে হয়না।

উনার আদর্শে যারা বিশ্বাসী এবং যারা উনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে চান, যারা লেখকের অধিকার আদায়ে সোচ্চার তারা উনার সাথে যোগাযোগ করে উনার জীবনদর্শন এর উপর সংক্ষিপ্ত বায়ো নিয়ে সেই দর্শন বা দৃষ্টিভঙ্গি সম্বলিত একটা লেখা দাঁড় করিয়ে ক্যাম্পেইন চলতে পারে। উনার সম্পর্কে যে মিথ্যা কিছু প্রচারণা আছে, তা ভেঙ্গে দিতে হবে জনমন থেকে।

মুক্তিযুদ্ধে যারা যুদ্ধাপরাধী – কই তাদের তো কেউ নির্বাসিত করে নাই! তাদেরকে তো এই দেশ থেকে বের করে দেয়া হয় নাই! তসলিমা নাসরিন কি সেই যুদ্ধাপরাধী, রাজাকারদের থেকেও অনেক বেশী জালিম? আমাদের দেশে অনলাইনেই অনেকে চটি পেইজ চালায়, অনেকে চটি বই লিখে- সেইসব বই বাজারে পাওয়া যায়, অনেকেই প্রতিদিন ধর্ষণ করে নারীকে, অনেকেই নারীর সম্মানকে ও ভার্চ্যুয়ালি ধর্ষণ করে, সাইবার ক্রাইম ও প্রতিদিনের ঘটনা — এসব কি কারো ধর্মে আঘাত করে না? এসব কি মৌলবাদীদের ধর্মে ছুরি চালায় না? এইসব বিকৃত পশুদের নাগরিকত্ব বহাল আছে, কিন্তু তসলিমা নাসরীনকে এই দেশ থেকে বের হয়ে যেতে হয়েছে, উনার এই দেশে ঢোকা হারাম হয়ে গেছে! কেন???

তসলিমা নাসরীন এর কথা, আচরণ এবং লেখা মৌলবাদীদের এবং পুরুষতন্ত্রের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়, কিন্তু ঐ চটি লেখক, পর্ণো ব্যবসায়ী দের, ধর্ষকদের, সাইবার ক্রিমিনালদের বিকৃত লেখা, অপকর্ম সেইসব মৌলবাদীদের এবং পুরুষতন্ত্রের ধর্মে কোন আঘাতই হানে না, বরং সেইসব বিকৃতি এই দেশে জায়েজ, জায়েজ ঐ বিকৃত পশুদের নাগরিকত্ব! না-জায়েজ হারাম শুধু তসলিমা নাসরীন?

এই ভণ্ডামি কার সাথে এবং কেন? তসলিমা নাসরিনের অধিকার আছে তার জন্মভূমিতে ফিরে আসার এবং বসবাস করার। রাজাকার এবং ঐ বিকৃত পশুরা যদি এই দেশের সম্মানকে এত সমুন্নত করতে পারে এবং তাদের নাগরিকত্ব বহাল থাকে, তাহলে এই রাষ্ট্র কোন অধিকারে আর কোন আইনে তসলিমা নাসরিনকে এই দেশে ঢুকতে দেয় না? তিনি তো যুদ্ধাপরাধী নন, রাজাকার নন, ধর্ষক নন, চটি লেখক নন, পর্ণো ব্যবসায়ি নন, সাইবার ক্রিমিনাল নন। এই দেশে আর কত ভণ্ডামি চলবে? ব্যক্তি বিশেষে আর কত হাজার ভিন্ন নীতি চরিতার্থ করবে এই দেশের মানুষ গুলো?

লেখক: অ্যাক্টিভিস্ট, মানবাধিকার কর্মী

 

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.