উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে ধর্ষণ

Mirror 2ঝর্ণা মনি : সম্প্রতি এক জরিপে জানা গেছে, চলতি বছর প্রথম ছ’মাসে ২২০৮ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৪৩১টি, গণধর্ষনের শিকার হয়েছেন ৮২ জন। আর ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪৫ জনকে।

অপরদিকে ২০০৬ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১৩ হাজার ৭০ টি। ভয়াবহ অবস্থানে রয়েছে ধর্ষণ। যা মোট নির্যাতনের ৩৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। গত সাত বছরে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৫ হাজার ১৬৬ জন। ধর্ষণের পর হত্যা এবং আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ৮ শ ৫০ টি। এই হার ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ। দেশের ১৪ টি জাতীয় দৈনিকে প্রচারিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।

নারীর প্রতি সংহিতার সবচেয়ে কুৎসিত ও বিকৃত রূপ হচ্ছে ধর্ষণ। যা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রেমের প্রস্তাবে বা বিয়েতে রাজি না হলে নারীকে ধর্ষণ করা হচ্ছে। ছুড়ে মারা হচ্ছে অ্যাসিড। ধর্ষকদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না ছোট শিশুরাও। মুঠোফোনে ধর্ষণের ছবি তোলা বা ভিডিও ধারণ করা হচ্ছে। অনেক সময় ধর্ষণের পর হত্যাও করা হচ্ছে। এসব ঘটনায় মামলা হলেও অনেক সময় বিচার হয় না।

ফলে মানবতার এই নিকৃষ্ট সহিংসতাটি বেড়েই চলছে দিন দিন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন অন্বেষণের এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ধর্ষণের হারও বেড়েছে ১৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন ১০ জন নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। গত ১২ বছরে (২০০১-২০১২) ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪০ হাজার ৫৭০ জন নারী। এর মধ্যে শিশু এক হাজার ৫শ’ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৩৩ জন নারীকে।

নারীনেত্রীদের মতে, নারীদের সুরক্ষায় দেশে নানা আইন থাকলেও সেসব আইন কোনো কাজে আসছে না। নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত সমাজের সব স্তরের নারীরা কোনো না-কোনোভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন। ঘরেই নারীরা বাবা, ভাই ও স্বামীর দ্বারা নির্যাতিত হন। ঘরের বাইরে রাস্তাঘাটে, যানবাহনে, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সবখানেই নারী নিরাপত্তাহীন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন (ভিএডব্লিউ) সার্ভে ২০১১’ জরিপ অনুযায়ী, ২৯ শতাংশ নারী পরিবারেই যৌন নির্যাতনের শিকার হন। বেসরকারি সংগঠন অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি ২০০১ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ পর্যন্ত ১০ হাজার ৮৭ জন নারী ও মেয়ে শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ সময়ে ১ হাজার ৭৯৬ জন এসিড সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ১ হাজার ৭৮২ জন নারী ও মেয়ে শিশু বখাটে কর্তৃক যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের আরেক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৯ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন দুই হাজার ৯৭৭ জন, ২০১০ সালে তিন হাজার ২৪৩ জন, ২০১১ সালে তিন হাজার ৩৪৪ জন, ২০১২ সালে তিন হাজার ৪০৭ জন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে ৯৭৫ জন নারী বর্বর নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়েছে, এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৮৫ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৯৪ জনকে ও ধর্ষণের চেষ্টা করা আরো হয়েছে ১৫৩ জনকে।

নারীর প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধ না থাকার কারণে বর্বর এই নির্যাতন আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে মন্তব্য করে সমাজবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এ এস এম আতীকুর রহমান বলেন, দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার বিষয়টি নেই বললেই চলে। ফলে আমরা সন্তানদের আর্দশভিত্তিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে পারছি না। যার নিষ্ঠুর বহি:প্রকাশ ঘটছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় ধর্ষকরা স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী আশ্রয় পেয়ে থাকে। ফলে এসব ঘটনার মামলা হয় না। মামলা হলেও তা প্রমাণ করা এবং শাস্তি নিশ্চিত করা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। এসব কারণে সমাজের এই বিষবৃক্ষটি ডালপালা বিস্তার করছে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.