সোভিয়েত নারীর দেশে-১৭

Leningrad 1সুপ্রীতি ধর: হঠাৎ যে কী হলো জীবনে, জীবন নদী দ্রুত বয়ে যাচ্ছে, যে কথাগুলো তুমি আমায় বলেছিলে, সব হৃদয়ে ধরে রেখেছি, বিশ্বাস করেছি, কিন্তু তুমি এখন এতো দূরে, তোমাকে আমার খুব প্রয়োজন, কি করে বাঁচবো আমি তোমায় ছাড়া……….। এটা গানের কথা, বিশ্বাস করুন, আমার না। তবে হুবহু না হলেও আমার জীবনে এই কথাগুলোর অর্থ প্রায় কাছাকাছি। প্রায় বলেছি কিন্তু।

গত দুদিন ধরেই আমি শুনছি আমাদের সময়কার অর্থাৎ সোভিয়েত আমলের জনপ্রিয় গানগুলো। আর বার বার আনমনা হয়ে ফিরে যাচ্ছি সেই দিনগুলোতে। বললে এতোটুকু অত্যুক্তি হবে না যে, আসলে ওই দিনগুলোতেই থাকি আমরা সোভিয়েত ফেরত অনেকেই, মাঝে মাঝে বাস্তবে ফিরি। আর কষ্ট পাই, নস্টালজিয়ায় ভূগি। সোভিয়েত সিস্টেমের আস্বাদ যারা আমরা নিতে পেরেছি, আমরা জানি, একটা দেশের রাজনৈতিক জীবন আর সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবন কতটা তৈরি করে নেয় একটা মানুষকে ভেতরে-বাইরে। ইচ্ছে করলেই আর বের হওয়া যায় না সেই গভীরতা থেকে। সেই জীবনে অভ্যস্ত হয়ে বাদবাকি জীবন অনায়াসেই কাটিয়ে দেয়া যায়।

সেইসময়কার বিখ্যাত শিল্পী আল্লা পুগাচেভার সেই গান, ‘স্তারিন্যিয়ে চিছি ইস্যো ইদুত’….মানে, পুরনো ঘড়ি এখনও বয়ে চলেছে, ‘স্জিজন নিভাজমোস্জনা পাভেরনুচ নাজাদ’….জীবনটাকে ইচ্ছে করলেই পিছনে ফিরিয়ে নেয়া যায় না, তখন এক শিহরণ বয়ে যেতো এসব গান শুনে। আসলে ভাষাটা পুরোপুরি রপ্ত না থাকলে একটা সংস্কৃতিকে বোঝা দায়। অথবা সোফিয়া রতারুর সেই বিখ্যাত গান, ‘লাভান্দা’। প্রথম বছর প্রিপারেটরি কোর্স শেষে মনে আছে এই গানটা আমাদের শেখানো হয়েছিল। এই গানের একটা লাইন আছে – ‘স্কোলকা লেত প্রাশলো, তি নি সা মনোই’, মানে হচ্ছে-কত বছর হয়ে গেল, তুমি আমার সাথে নেই, শুধুমাত্র এই লাইনটার জন্য যে কতবার করে এই গান গেয়েছি, বলতে পারবো না। চোখ দিয়ে এমনিই জল গড়িয়ে পড়তো। আর একবছরের জন্য যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল সম্পূর্ণ নতুন একটা দেশে, নতুন ভাষায়, সেই বন্ধু বিচ্ছেদের কষ্টটাও বেরিয়ে আসতো এই গানের মধ্য দিয়েই। গানের মেলোডি, রিদম কি করে মানুষের বেড়ে উঠতে সাহায্য করে, আমরা যারা সোভিয়েত ইউনিয়নের গিয়েছিলাম, আমরা তা জানি।

Leningrad 2সোভিয়েত শিক্ষা ব্যবস্থায় ওরা জানতো, ওদের ভাষা শেখাতে গেলে কি কি করতে হবে! প্রথম থেকেই পড়ালেখার পাশাপাশি আমাদের গান শেখানো হতো, গল্প বলানো হতো আমাদের দিয়ে, গল্প-উপন্যাস তো পাঠ্যক্রমেই ছিল, ক্লাসিক্যাল সাহিত্যের ওপর নির্মিত সিনেমাগুলো দেখানো হতো, রিভিউ লিখতে হতো, মিউজিয়ামগুলোতে নিয়ে যাওয়া হতো, প্রতিটি আর্ট ধরে ধরে বোঝানো হতো, আর একজন করে রুশভাষী রুমমেট দেয়া হতো। ভাষা না শিখে যাবো কোথায়? ফলে যা হবার তাই হয়েছে। এতো বছর ইংরেজি পড়েও কিছুই পারি না, অথচ রুশ ভাষা এখনও অনর্গল বলে যাই। কোথাও কোন ইংরেজি বলতে হলে বা শুনতে হলে আগে তা মস্তিষ্কের হার্ডডিস্কে রুশ অনুবাদ হয়ে পরে বাংলা হয়। বলার সময়ও তাই।

আমার একটা প্লাস পয়েন্ট ছিল অন্য বাঙালীদের চেয়ে, তাহলো, আমার রুমমেটরা সবসময়ই রুশভাষী ছিল, ডাইনে-বাঁয়ের রুমমেটরাও রুশী, বুলগেরিয়ান দুজন ছিল, তারাও ধরতে গেলে রুশভাষীই। ছোট থেকেই তারা এই ভাষা শিখে এসেছে, আর স্লাভ মূলভাষা বলে ওদের ভাষাও কাছাকাছিই। ইউনিভার্সিটিতে বাংলাদেশি বাঙালীও আমি একাই। কাজেই পায়ে পাড়া খেয়েই মোটামুটি ভাষা শিখে নিয়েছিলাম। সেইসাথে দেশটির সংস্কৃতিকেও রপ্ত করেছিলাম বেশ ভাল করেই।

শিখেছিলাম ওদের রীতিও। রুশীরা আদর করে বিভিন্ন পশুপাখির নামে সম্ভাষণ করতো। প্রথম প্রথম মনে হতো, ওরা হয়তো অপমান করছে, পরে এই শব্দগুলোর জন্যই হা-পিত্যেশ করেছি। সোভিয়েতের এই শীতের মধ্যেও মেয়েদের সম্ভাষণ জানাতে গিয়ে ছেলেরা গ্লাভস, টুপি খুলে হাত মেলাতো, বাস-ট্রাম থেকে নামতে গিয়ে দেখতাম, আগে নামতে দেয়া হতো মেয়েদের। ছেলেদের কেউ যদি আগে নামতোও, সে হাত বাড়িয়ে দিতো নামার জন্য। বিশেষ করে ৯১-তে আমার মেয়েটা যখন পেটে, তখন তো সোনায়-সোহাগা। বিদেশ-বিভূঁইয়ে ওই অবস্থায় কোনদিন অনুভবই করিনি যে, আমি একা। বাসে-ট্রামে অনায়াসে জায়গা পেয়ে যেতাম। এই প্রসঙ্গে একদিনের একটা দুষ্টুমির কথা না বললেই না।

ক্লাস ছুটির সময় প্রচণ্ড ভিড় হতো বাসে-ট্রামে। একবারে কোনটাতেই জায়গা পাওয়া যেতো না। কোনরকম যদি উঠা যেত, তারপরও বসার জায়গা মিলতো না। আমরা একসাথে উঠতাম বেশ কয়েকজন, তক্কে তক্কে থাকতাম, কেউ যদি নামে। তো, একদিন একজন মধ্যবয়সী নারী পথে নেমে গেলে তার সিটটা খালি হলো। আমি ধরাম করে তাতে বসে পড়লাম। আসলে সারাদিন ক্লাস করে ওইদিন খুবই ক্লান্ত ছিলাম। তানিয়া, ভেসেলকা, আফসানা সবাই তাদের ব্যাগ আমার কোলের ওপর দিয়ে ফ্রি হয়ে দাঁড়ালো একটু। একজন মাঝবয়সী নারী খুব ক্ষেপে গেলেন আমার ওপর। তরুণরা বেয়াদব, বড়দের কি করে সম্মান করতে শিখতে হয়, তা জানে না, এমন অনেক কথাই বললেন।

আমাদের মাথায় তখন দুষ্টুমি বুদ্ধি খেলছে, কিছুতেই উঠবো না। বাসের সবাই আমাদের দেখছে। এসময় উনাকে আমাদের একজন বললো, ‘আন্টি, ওর তো বাচ্চা পেটে, উঠবে কিভাবে’? সবাই তখন আমার দিকে অবাক দৃষ্টি নিয়ে তাকাতে লাগলো, আমি পড়লাম মহাবিপদে। মুখে তখন যারপরনাই বিষন্ন আর ক্লান্তির ভাব আনার চেষ্টা করলাম, যেন সত্যি সত্যিই অন্ত:সত্ত্বা বলে মনে হয়। কি করে যেন সবাই বিশ্বাস করে ফেললো, আর সেই নারী কিছুক্ষণ সন্দেহে চোখে তাকালেও পরে হেসে দিয়ে মাফ চেয়ে নিলেন। আমাদের তখন পেট ফেটে যাচ্ছে হাসির দমকে।

এখনকার রাশিয়া আর আমাদের আমলের সোভিয়েত ইউনিয়নের আকাশ-পাতাল ফারাক। আমাদের সময় অনেক অভাব ছিল। বিশেষ করে আমরা যারা পুজিঁবাদী দেশ থেকে যাওয়া, আমাদের জন্য সেখানে অসুবিধাই হওয়ার কথা। কিন্তু কেমন করে জানি, আমরা মানিয়ে নিয়েছিলাম। এটা নেই, ওটা নেই, তারপরও জীবন আছে, প্রাচুর্য আছে, আনন্দ আছে। সোভিয়েত মানুষের দু:খবিলাস কমই ছিল। অল্পেই তারা সুন্দর জীবন কাটাতো। এখন জানি না। প্রতিযোগিতার জীবনে আনন্দ কতটুকু, আমি জানি না।

S. Petersburgক্লাস করি, ক্লাস শেষে বেরিয়ে পড়ি নানা জায়গায়। আর সপ্তাহের ছুটির দুইদিনে আমাদের হোস্টেলে পাওয়াই মুশকিল। বিশেষ করে আবহাওয়া যদি একটু সহায় হতো, অর্থাৎ একটু গরম গরম ভাব হলেই আমাদের আর পায় কে? ঠাণ্ডা হলে ইনডোরে আনন্দ, নইলে আউটডোরে। বোঝাতে পারলাম তো! হোস্টেলও কম আনন্দের ছিল না। শনি-রোববার জমজমাট ডিসকোতেকা। রুশি মেয়ে বন্ধুরা অনায়াসে ছেলেবন্ধু জুটিয়ে নিতো, ভালই থাকতো তারা। রাশিয়া, পোল্যান্ড, বুলগেরিয়ার মেয়েদের মধ্যে আফ্রিকান, ল্যাতিন আমেরিকান ছেলের অনেক ‘ডিমান্ড’ ছিল। লাতিনদের পয়সা কম ছিল। কিন্তু আফ্রিকান এবং আরবরা এগিয়ে ছিল পয়সার দিক দিয়ে। বিশেষ করে লিবিয়ার ছেলেরা তো সোনায়-সোহাগা। আমরা যখন মাত্র ৯০ রুবলেই হেসে-খেলে দিনাতিপাত করি, ওরা তখন মাস শেষে ওদের সরকারের কাছ থেকে ৫০০ ডলার এক্সট্রা পায়। তো, ওরা টাকা উড়াবে না তো কে উড়াবে! সাদা চামড়ার মেয়েদের গলায় আরবী ফ্যাশনের স্কার্ফ ঝুলানো মানেই আমরা বুঝে যেতাম ওর বন্ধু কে!

৮৮ সালেই আমরা বুঝে যাচ্ছিলাম বাজারে টান পড়েছে, আমাদের দৈনন্দিন খাওয়ার জিনিসগুলোও দোকান থেকে হাওয়া হয়ে যাচ্ছিল। হয় উৎপাদন কমে গিয়েছিল, নয়তো সরবরাহ কমে গিয়েছিল। কোনকিছু কিনতে গেলেই বিশাল লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হতো। আমরা ছাত্র মানুষ। আমাদের এতো সময় কোথায় দাঁড়ানোর! তাই আমরা অনেকেই ভাব জমিয়ে তুললাম রাশান বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সাথে, যারা লাইনে দাঁড়াতে পারবেন। আমাদের মানে আমার আর ভারতীয় তিন কন্যার একজন এমন বৃদ্ধ পরোপকারী বন্ধু ছিলেন, সের্গেই সম্ভবত নাম। কোনদিন তাকে আমরা ভয়াবহ মাইনাস তাপমাত্রার ভিতরেও গরম জ্যাকেট পরতে দেখিনি। সেই তিনি আমাদের কোন দূর-দূরান্ত থেকে এনে দিতেন আমাদের খাবারের কাঁচামাল। সূর্যমুখি তেল থেকে শুরু করে, জিলিওনি গারোশকি (মটরশুঁটি), মিক্সড সবজি, এমনকি মুরগিও। এর জন্য তিনি কোনদিন এক্সট্রা কোন টাকা নেননি, জোর করেও তাঁকে জ্যাকেট যেমন পরানো যায়নি, তেমনি এক চা ছাড়া কোন খাবারও খাওয়ানো যায়নি। এমনই উদার মনের মানুষ ছিলেন তিনি। প্রথমদিকে তিনি শুধু ভারতীয় বন্ধুদের সরবরাহ করলেও পরে শিউলী আপাসহ বাংলাদেশীদের অনেকেই নিয়েছেন তার কাছ থেকে।

কানাঘুষা ছিল যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন শহরের বাঙালীরাও ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে। অনেকে নাকি ততদিনে ‘মিলিয়নার’ হওয়ার পথে। যদিও সেই আনন্দ-উৎফুল্ল থাকার বয়সে এই ‘মিলিয়নার’ শব্দের কোনো মাজেজাই আমার কাছে ছিল না। আমি তো বেশ আছি, ভাল আছি আমার জীবন নিয়ে। কিন্তু এক কান, দুই কান হয়ে অনেক গল্প লেনিনগ্রাদ পর্যন্ত এসে পৌঁছাচ্ছে ততদিনে।

বুঝতে পারছিলাম, আমরা লেনিনগ্রাদের মানুষজন অনেক পিছিয়ে আছি। তবে সবাই না। এখানেও তো গ্রুপিং ছিল। একটা গ্রুপ তখন সোভিয়েত নীতি-আইন অমান্য করেই ভিসা ছাড়াই যাতায়াত করছে মস্কোতে, আর কিসব ব্যবসার ফায়দা করছে। (চলবে)

 

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.