পাশে থেকো ছায়াসখা

Neem flowerসালেহা ইয়াসমীন লাইলী: ছায়ায় দাঁড়ালে নিজে ছায়াহীন হয়ে পড়ি! হয়ে পড়ি অস্তিত্বহীন। একবিন্দু বালুর অস্তিত্ব নিয়েও আমি আমার ছায়া চাই! চাই নিজের অস্তিত্ব। ছায়াহীন দীর্ঘ পথ চলতে চলতে আমি আমার ছায়ার সঙ্গেই সখ্যতা গড়েছি। ছায়াসখা, তুমি থাক আমার সাথে, আর কেউ নয়! ছায়ায় থাকা ছায়াহীন কায়ায় আমার কোন আস্থা যে নেই!

পাখা গজানোর আগে কোন মা পাখি তার সন্তানকে উড়তে দেয় না। উড়তে শেখার পরই তাকে ছেড়ে দেয়। হাঁটতে শেখার আগ পর্যন্ত মা-বাবা সন্তানের হাত ধরে রাখে। এই নির্ভরতার হাত ছায়ার মতো সন্তানের চারদিকে নিরাপত্তা দেয়।জীবনে দায়িত্বশীল কাউকে পাশে না পাওয়ায় আমি উড়তে ও হাঁটতে শুরু করেছি শেখার আগেই। যখন নিজেই পদে পদে হোঁচট খেয়ে পথ চলছি, তখনই আবার দায়িত্ব নিতে হয়েছে অন্য কাউকে উড়তে এবং চলতে শেখানোর।

চলার এই দুর্গম পথে কাঁধে বোঝা নিয়ে চলতে চলতে বার বার হাঁপিয়ে উঠে এক টুকরো ছায়া খুঁজেছিচারপাশে। যে ছায়ায় পরম নির্ভরতায় কাঁধের বোঝা রেখে দু’দণ্ড জিরিয়ে নিতে পারতাম। পরম মমতায় ছায়ার বুকে মাথা রেখে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে খানিকটা প্রশান্তি পেতে পারতাম! কিন্তু ছায়া পাইনি আমার পথে। এই ছায়া মরিচিকা হয়ে বার বার চোখে চিক চিক করেছে, কিন্তু ধরা দেয়নি। কিয়ামতের মতো সূর্যটা মাথার দেড় হাত উপরে নেমে এসে উত্তাপে পুড়িয়েছে পুরোটা জীবন।

ছায়াহীন পথে কোন ছায়া আমাকে স্বস্তি না দিলেও নিজের এক টুকরো ছায়া আমাকে ছেড়ে যায়নি কোনদিন। কষ্টের তীব্রতায় এই ছায়ার আকৃতি কখনও ব্যপ্ত হয়েছে, কখনও স্ফিত তো কখনও সংকুচিত। নিজের চেহারাটা এই ছায়ার আয়নায় দেখে নেই রোজ।বুঝতে পারি এই পুড়ে পুড়ে পথ চলায় আমার অস্তিত্ব। তাই এই ছায়াই আমার পরম বন্ধু। ছায়া সখা।

হঠাৎ কোন অজানা ছায়া এসে নিজেকে ঢেকে দিলে সেই ছায়াকে মেঘ ভেবে আঁতকে উঠি। ঘর পোড়া গরু আমি নই। আমার আপন কোন ঘরের অস্তিত্ব কোনদিন ছিলনা। তাই কোন পোড়া গন্ধ আমার নাকে লাগে না। শুধু মেঘের ছায়ায় আমার ভয়। মেঘ ক্ষণস্থায়ী।ঝরে ঝরে মেঘ কেটে গেলে তীব্রতা নিয়ে নেমে আসবে সূর্যটা। যন্ত্রণা তীব্রতর করতে জ্বালাতে থাকবে কয়লা কাষ্ট দেহটাকে।

যদি কেউ বন্ধুত্বের কোন হাত বাড়িয়ে দেয় আমার দিকে, শক্ত করে ধরে পায়ে পা ফেলে পথ চলতে চায় নির্ভরতার, টলমলে পথে চলার শক্তি হতে চায়,  মাথার উপর একটা মজবুত ছাতা হয়ে ঢেকে দিতে চায়, রোদ-বৃষ্টি, এই বন্ধুর ছায়া আমাকে ছায়াহীন করে ফেলে। তার বিশ্বস্ততার হাতটি আমার অতীত ভুলিয়ে দিতে চায়। অস্ত্রহীন করে দিতে চায় আমার সংগ্রামকে। থামিয়ে দিতে চায় আমার স্রোতের বিপরীতে পথ চলার শক্তি। আমি অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ি। খুঁজে ফিরি আমার আমিকে। খুঁজে ফিরি আমার ছায়াকে।আমি স্বস্তি পাই না, আমি শান্তি পাই না ছায়াহীনএই জীবনেতাই ছায়ার খোঁজে আমার আবারো পথ চলা ছায়াহীন পথে।

দুর্গম জীবনের পথে ক্লান্ত পা দুটো আর চলতে চায় না। টলে উঠে বার বার। মনে করিয়ে দেয় অনেক তো হলো, এবার না হয় থামো। কিন্তু আমি থামতে পারি না। আমি থামতে চাইও না। চলতে চাই শেষ মূহূর্তটি পর্যন্ত।আমার ছায়ার সাথে। তাকে ছাড়া যে আমি অস্তিত্বহীন। ছায়া, তুমি পাশে থেকো সব সময়, সখা হয়ে।

সাংবাদিক ও লেখক

 

 

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.