রোজ নামচা-২১

Leena Haq
লীনা হক

লীনা হক: আজ আমার ছুটি হবে হাসপাতাল থেকে। নার্স আমাকে ফিটফাট করে বসিয়ে রেখেছে বিছানায়। ডাক্তার এসে ফাইনাল কথা বললেই হাসপাতাল বাসের ইতি। ডাক্তার এলেন প্রায় আড়াইটার দিকে। পরনে মাদ্রাজী সুতির শাড়ী, বয়স প্রায় ৫৫’র মতন। মাদ্রাজী স্টাইলে বেনী করা চুলে সাদা গোলাপি ফুল জড়ানো। এসে বসলেন আমার পাশে। আমার হাত তুলে নিলেন নিজের হাতে। ডাক্তারের হাত একটু খসখসে, কিন্তু উষ্ণ। কত হাজার হাজার মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন তিনি এই হাতের জাদুতে। পৃথিবীব্যাপী নাম ডাক তাঁর।

কালো চশমার ভেতর দিয়ে তাকালাম তাঁর দিকে, স্মিত হেসে আমার হাতে একটু চাপ দিলেন তিনি। ‘ তোমায় তো নুতন করে কিছু বলার নাই, জানো সবই। এই প্রগ্রেসিভ অসুখটাকে পুরোপুরি হারিয়ে দেয়ার মতন শক্তি এখনো আমরা অর্জন করে উঠতে পারিনি। কিন্তু তাতে কি, থামিয়ে রাখতে তো পারছি। আর তোমার অটো ইমিউন ডিজঅর্ডার ডিজিজটা না থাকলে লড়াইটা আরেকটু সহজ হয়তো হতো। আরো কিছু সময় হাতে আমরা! তাও তো কম লড়নি তুমি। আমার এই ৩৫ বছরের চিকিৎসা জীবনে তোমার মতো কাউকে পাইনি আমি. প্লিজ কিপ আপ দি স্পিরিট ডিয়ার! তোমার সাহসের কথা আমরা নিজেরাও বলাবলি করি।’

হাসি আমিও যদিও ভিতরে চাপা কষ্টের স্রোত আপাত সাহসী হৃদয়কে চিড়ে দিয়ে যায়। কতদিন? কতদিন আছে আমার হাতে পৃথিবীর আলো ঝাপসা হয়ে যাওয়ার আগে? আমার সন্তানেরা এখনো নিজের জীবন শুরু করে নাই। আমার ছেলে তার স্বপ্নের প্রায় কাছাকাছি, আমার মেয়ের প্রজাপতির রঙিন ডানায় ভর করে জীবনের বাগানে উড়ে বেড়ানো – এসব ঠিক মতন দেখতে পারবো তো? ডাক্তারের কথায় বর্তমানে ফিরে আসি।

জানতে চাইছেন কোন হোটেলে উঠেছি। বললাম। আমার আরও চার দিন থাকতে হবে এই শহরে, আরও কিছু টেস্ট আছে বাকী। বললেন আগামী শনিবার বিকেল ছয়টার দিকে যেন হোটেল লবিতে থাকি। আমার লোকাল ফোন নম্বর নিলেন। এই ডাক্তার গত আট বছর ধরে আমার চিকিৎসা করছেন। রোগী ডাক্তারের বাইরেও এক ধরনের সম্পর্ক তৈরী হয়েছে। অথবা বলা যায় সিস্টারহুড বন্ডেজ । এই দীর্ঘ সময়ে চিকিৎসার পাশাপাশি নিজেদের জীবনের কথাও বিনিময় হয়েছে কম না

চলে এলাম হোটেলে। শুয়ে থাকা ছাড়া আর কোন কাজ নাই। কখনো জানালায় বসি। পাঁচতালার উপর থেকে রাস্তা আর মানুষের জীবনের ব্যস্ততা দেখি। মুখে বঙ্গোপসাগর থেকে উড়ে আসে নোনা হাওয়া। মনের মধ্যে কত কথা ভেসে যায়। সারাটা জীবন স্রোতের বিপক্ষে সাঁতরাতে হল আমায়। অনেকেই বলে আমার নিজের কারণেই জীবনের এই উৎরাই ঠেলে চলতে হল। স্বভাবটা আরও নমনীয় হলে আর পাঁচজন মানুষের মতন স্বাভাবিক জীবন হতে পারতো আমার। কি আর করা আমি যে এমনই উলটপুরাণ ধরনে তৈরি। অসুখটাও এমনই হতে হল! কাকে আর দোষ দিব নিজেকে ছাড়া! আর হয়তো আমার ভবিতব্য! আজকাল সন্তানদের চিন্তার বাইরেও একটা ঘুরপাক খায় মধ্যে। জীবনের এই পর্যায়ে এসে একজন কথা দিয়েছে শেষ পর্যন্ত আমার হাত ছাড়বে না। ক্ষীণ দৃষ্টি বা প্রায় দৃষ্টিহীন কারো হাত ধরাটা কি সত্যি কাম্য হতে পারে! জানি না, কিন্তু আশা লাগে। আশাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। লড়বার সাহস জোগায়।

শনিবার বিকেলে তৈরি হয়ে নীচে নেমে লবিতে বসলাম। ঠিক পাঁচটা ৫০ মিনিটে ডাক্তারের ফোন, বের হও, আমি এসেছি। বের হয়ে আসি, পোরচে দাঁড়ানো সাদা ইনোভা, উঠে বসি। তিনি নিজেই ড্রাইভ করছেন। আজও পরনে সুতির শাড়ী, চুলে ফুলের মালা। এলাম আমরা সাগরের কাছাকাছি, থামলাম পুরনো একটি বাড়ীর সামনে। গাড়ি থেকে নেমে ঢুকলাম ভেতরে। পুরনো ঐতিহ্যের মাদ্রাজী রেস্তোরাঁ। আমার প্রিয় মাদ্রাজী দোসা আর কফি অর্ডার করলেন তিনি। ভাবলাম, হয়তো আরও কিছু বলবেন অসুখ সম্পর্কে। নাহ, সেইসব কোন কথাই বললেন না। বঙ্গোপসাগরের নোনতা হাওয়া রেস্তোরার বন্ধ কাঁচের ফ্রেঞ্চ উইন্ডোতে ধাক্কা খেয়ে শিস কেটে যাচ্ছে, মনে এলো এই তীররেখা ধরে পূর্ব দিকে এগোলেই আমার দেশ। জোয়ারের সময় বোধহয় এখন, বিশাল বিশাল ঢেউ ধেয়ে আসছে তীরের দিকে, সাদা ফেনা তুলে আছড়ে পড়ছে তীরে।

এটা সেটা খুচরো আলাপ। ছেলের খবর নিলেন, জানালেন নিজের কথাও। নাতি নাতনিদের কথা। তামিলনাডুর চেটটিনাড জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এসেছেন তিনি। কৃষক পরিবার তাঁর। জীবনের এই পর্যায়ে আসতে যে পরিমাণ সংঘর্ষ তাঁকে করতে হয়েছে, তার কিছু কিছু কথা আগেই জানাজানি করেছি। এক সময় কথা শেষ হয়। অসমবয়সী অসম সম্পর্কের ভিন্ন দেশের ভিন্ন ভাষার দুই নারী বসে রইলাম মুখোমুখি। জীবনের যুদ্ধে একজন যদি প্রত্যক্ষ সৈনিক যেখানে তার নিজের জীবন একধরনের বাজীর শিকার, তো আরেকজন সেনাপতি। লড়াই কঠিন, তবু মনে মনে আউরাই, বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনী। সময় বয়ে যায়। ঘড়িতে রাত বাড়ে। দূরে দেখা যায় সাগর আরও উত্তাল হয়েছে, তীরে আছড়ে পরা ঢেউয়ের ফেনায় ফসফরাস জ্বলে।

ফিরে আসি আমরা। হোটেলে আমাকে নামিয়ে দেন ডাক্তার। এবারের মত বিদায় বলি, আগামীকাল আমার ফিরতি ফ্লাইট। তিনিও নামেন। জড়িয়ে ধরেন আমাকে। তাঁর গলা শুনি, নেভার লুজ দি স্পিরিট। দি ফাইট মাস্ট কনটিনিউ। ইউ উইল ফাইট ব্যাক টিল দি লাস্ট! প্রমিজ মি!’ অফুরন্ত সাহসে বুক বেঁধে বলি,’ আই প্রমিজ ডক্টর, উইল নেভার গিভ আপ, আই প্রমিজ!’ টের পাই উষ্ণ অশ্রুধারা আমার কালো চশমার ফাঁক দিয়ে গালের উপরে গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু বুকের গভীরে প্রত্যয় জাগে, আমি পারবো, পারতেই হবে আমাকে! জল ভেজা চোখে আমার ছেলের স্বপ্ন দেখতে পাই – তার আবিস্কৃত যন্ত্রে রে দেয়ার ফলে ক্যান্সার রোগীর সুস্থ জীবন সম্ভাবনা বেড়ে গেছে শতকরা ৩০ ভাগেরও বেশী। চোখের সামনে ভাসা মেয়ের প্রজাপতি ডানায় ওড়া দেখতে দেখতে হোটেলের রুমে ফিরে আসি আর যেন দেখি জীবনের শেষ পর্যায়ে সেই বাড়িয়ে দেয়া হাতটাও প্রতীক্ষা করে আছে আমার জন্য।

দি ফাইট মাস্ট কনটিনিউ।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.