আরশিতে কাকাতুয়া

Love storyমঈনুস সুলতান: থাইল্যান্ডের তরুণী প্রেমজাই এর সাথে আমি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসে সাক্ষরতা বিষয়ক দু’মাসের প্রশিক্ষণে অংশ নেই। প্রশিক্ষণে দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে আগত অংশগ্রহণকারীরা নিজ নিজ দেশে ফিরে গেলেও আমরা দুজন থেকে যাই যুক্তরাষ্ট্রে। চেষ্টা করি ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটসে মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তি হতে। তখন গোল বাঁধে আমি ও প্রেমজাই টোফেল পরীক্ষা পাস করতে ব্যর্থ হলে। তো আমরা দুজনে নন-ডিগ্রি কোর্সে ভর্তি হই, যেখানে ক্লাস করার জন্য টোফেল ইত্যাদির কোন প্রয়োজন ছিল না।

জেন্ডার এন্ড ডেভেলপমেন্ট বিষয়ক একটি নন-ডিগ্রি ক্লাসে সপ্তাহে বার দুই আমরা মিলিত হতাম। এছাড়া কোন না কারণে ক্যাম্পাসে আমাদের দেখা সাক্ষাত প্রতিদিনই হতো। তখন আমি অত্যন্ত আর্থিক সংকটের মধ্যে ছিলাম। কিছুতেই স্বল্প বাজেটে বসবাসের জন্য একটি কামরা পাচ্ছিলাম না। তাই চেনাজানা বন্ধু বান্ধবদের এপার্টমেন্টে-কখনো কাউচে আবার কখনো ফ্লোরে বেডরোল পেতে বাতাশ ভরা বালিশে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়তাম। তিনবেলা যথেষ্ট পরিমাণে খাবার দাবার জুটানোও মুশকিল হয়ে পড়েছিল।

আমি যেদিন অনাহারে থাকতাম তা যেন প্রেমজাই কিভাবে টের পেয়ে যেত। ক্লাসের বিরতিতে তার ঢাউস পার্স থেকে একটি  প্লাস্টিকের কৌটা বের করে দিয়ে বলত – ক্যাফেটেরিয়ার বুফে লাঞ্চে প্রচুর বেক করা ফিস দিয়েছিল, আমি তো অত খেতে পারি না, এক টুকরা এক্সট্রা মাছ সেভ করেছি।

ততদিনে প্রেমজাই এর হালচাল চেহারা সুরতে বিস্তর পরিবর্তন এসেছে। সে চুল কাঁচি দিয়ে এবড়ো খেবড়ো করে নিজ হাতে ছেঁটে মুখে এনেছে ঈষৎ কর্কশ লুক। রেশমি স্কার্ট টার্ট বাদ দিয়ে পরতে শুরু করেছে পুরুষালী ঢং এর ঢোলা র‌্যাগেড্ সার্ট-প্যান্ট। আমার সাথে দেখা হলে আর আগের মতো সুইট করে হাসে না। খোঁচা মেরে খানিক ত্যাড়াত্যাড়া কথা বলে। আর আমি না চাইলেও খুব ইনডিরেক্টলি একটু-আধটু সাহায্যও করে।

আমার বাতাসভরা বালিশ ফুটো হয়ে যাওয়াতে আমি উইলিয়াম ফোকনারের ঢাউস রচনাবলীতে মাথা রেখে দিন কয়েক ঘুমাই। তাতে ঘাড় বাঁকা হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, আর ব্যাকপেন বাড়ে বিঘতভাবে। তখন প্রেমজাই নিয়ে আসে চিলেকোঠায় বসবাসের সম্ভাবনার সংবাদ। সে আরো চারটি আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ মেয়েদের সাথে একটি ভিক্টোরীয় ধাঁচের খুব পুরানো দোতালা বাড়িতে শেয়ারে বাস করছে। তার চিলেকোঠার এক চিলতে কামরা নাম কা ওয়াস্তে টাকায় ভাড়া দিচ্ছে। চাইলে আমিও ওখানে বাস করতে পারি।

Moinus
মঈনুস সুলতান

অই দিন সন্ধ্যাবেলা আমার বেডরোল, ব্যাকপ্যাক ও ফুটোবালিশ নিয়ে ওখানে এসে উঠি। চিলেকোঠায় পৌঁছাতে হয় হিলহিলে একটি আলগা মই বেয়ে। পরিসর পা লম্বা করে ঘুমানোর মতো প্রশস্ত। পাশে জামাকাপড়, জুতাছাতা, গোটা বিশেক বইপত্র ও কফিমগ রাখার মতো যথেষ্ট জায়গা আছে। বৈদ্যুতিক বাতির কোন বন্দোবস্ত নেই। তার প্রয়োজনও নেই, টর্চ জ্বেলে অনায়াসে মই বাওয়া যাবে। আর খুব দরকার পড়লে জ্বালানো যাবে মোমবাতি। তখন গ্রীষ্মকাল চলছে। আমি দিন-তিনেক চিলেকোঠায় বসবাস করে একরাতে গরমে ঘেমে-নেয়ে মই বেয়ে নেমে আসি দোতালায়।

করিডোরে একটি পুরানো জ্যাম্পেস কাউচে স্কার্ট হাঁটু অব্দি গুটিয়ে পা ছড়িয়ে বসে প্রেমজাই। সে ডিকশনারি দেখে মৃদুস্বরে দুলে দুলে ইংরেজি শব্দের উচ্চারণ মশকো করছে। আমার ঘর্মাক্ত হালত দেখে বোধ করি তার কৃপা হয়। অনেক খোঁজাখুঁজি করে বেজমেন্ট থেকে সে নিয়ে আসে একটি মাকড়শার জালে জড়ানো টেবিল ফ্যান। ঘন্টা খানেকের পরিশ্রমে তাতে এক্সট্রা ইলেকট্রিক তার জুড়ে দিয়ে চিলেকোঠার ঠিক নিচে তার কামরায় প্লাগ-ইন করে মই বেয়ে তা আমার বেডরোলের পাশে রেখে যায়।

তারপর থেকে টেবিল ফ্যানের বাতাসে আমার শরীর জুড়ালেও, গভীর রাতে আমি দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠতে থাকি। কারণ টেবিলফ্যানটিতে কোন ঢাকনা ছিল না। তাই আধোঘুমে কেবলই মনে হতো -যদি ডানায় হাত লেগে টেগে যায়। প্রেমজাই তখন কেবলই মুখভার করে থাকতো বলে এ নিয়ে অভিযোগও করতে সাহস পেতাম না। তার মন খারাপের কারণ আমার জানা ছিলো। আমি দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় টোফেল পাশ করেছি, সাথে সাথে মাস্টার্স প্রোগ্রামে এডমিশনের বিষয়টিও সম্মানজনকভাবে সুরাহা হয়েছে। কিন্তু একই সাথে পরীক্ষায় বসে প্রেমজাই টোফেল উত্তীর্ণ হতে পারেনি। আমার সফলতায় আমি বড় বিব্রতবোধ করি। তার দিকে ভালো করে চোখ তুলে তাকাতেও পারি না আর।

উইকএন্ড শুরু হলে শনিবারে আমি একটু রাত করে বাড়ি ফিরতাম। অইদিন ভিক্টোরীয় ধাঁচের পুরানো দোতালা বাড়িটির যেন রূপ বদলে যেতো। চার চারটি শ্বেতাঙ্গ যুবতী সন্ধ্যার পর সাজগোজ করতো। আসতো তাদের বয়ফ্রেন্ডরা। আমি মুখচোরা বিলাইয়ের মতো বেশ রাতে পা টিপে টিপে লিভিংরুমের লাগোয়ো করিডোর ধরে হেঁটে যেতে যেতে দেখি মোমের আলোয় স্কার্টের ঘূর্ণি তুলে নাচছে একটি মেয়ে। আর তার বয়ফ্রেন্ড দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাজাচ্ছে চেলো। সিঁড়ির নিচের ফয়ারেও খুব কাছাকাছি হয়ে দাঁড়িয়ে আরেকটি কাপোল। তারা চাকোস চাকোস করে চুমো খাওয়ার ফাঁকে আমাকে ‘গুড নাইট, ও ‘হ্যাভ অ্যা নাইস ঈভিনিং’বলে। দোতালার করিডোরের কোণায় দেখি জ্যাম্পেস কাউচে পা ছড়িয়ে বসে প্রেমজাই, যথারীতি ডিকশনারি ঘেঁটে ঘেঁটে মশকো করছে ইংরেজিরিডিং প্যাসেজ।

আমাকে দেখতে পেয়ে অনেকদিন পর তার মুখে ফিরে আসে সুপারসুইট হাসিটি। ফিক করে ঠোঁট ঈষৎ বাঁকিয়ে বলে,‘টেল মি হাউ অ্যাম আই গোনা গেট অ্যা বয়ফ্রেন্ড?’  জবাবে আমি নির্লিপ্ত থাকলে সে টুসকি দিয়ে একটি মিন্টগাম আমার দিকে ছুড়ে দেয়। ঠিক তখনই পাশের লাগোয়া কামরা থেকে ভেসে আসে শরীরিভাবে অন্তরঙ্গ হওয়ার আলামত। আধো অস্ফুট আওয়াজকে বিশুদ্ধ বাংলায় বলা হয় শীৎকার। তাতে প্রেমজাই এর চোখমুখ লাজরক্তিম হয়ে উঠলে, আমি এ সুযোগে গুড নাইট বলে মই এ পা রেখে চিলেকোঠায় উঠে পড়ি। (চলবে)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.