সোভিয়েত নারীর দেশে-১৬

Dnipro Riverসুপ্রীতি ধর: বন্ধুরা তাগাদা দেয়, বলে যে আমি নাকি ফাঁকিবাজ হয়ে গেছি, নিয়মিত লিখছি না সোভিয়েত নারীর দেশে। এমন একটা দেশে, এমন একটা সময়ে আমাদের বসবাস ছিল যে, লিখতে গেলে কী-বোর্ডও চুপ মেরে যায়, হাত সরে না। আমি তো কোন ছার! সেই সাড়ে নয় বছরের ইতিহাসমুখর বিদেশ জীবনে কত টানাপোড়েন, কত উত্থান-পতন, যেমন রাজনৈতিক, তেমনি আমাদের মানসিক জীবনেও, সবকিছু কি আর লিখে বোঝানো যায়! কত কান্না, কত হাসি, কত সাদা কাগজে গোটা গোটা অক্ষরে, চিরকুটের আকারে লেখা অনুভূতি, সব তো লেখার নয়। থাক না কিছু কথা একান্তই আমার হয়ে!

সেইসময়েই একবার ভরা শীতের মধ্যে কাঁপতে কাঁপতে গিয়েছিলাম একজনের হোস্টেলে। পাইনি তাকে। শুনেছি রুশ বান্ধবীদের নিয়ে জন্মদিন পালন করছে অন্য কোথাও। আমি চিরকুট লিখেছিলাম, ‘প্রকৌশলীদের গতিবিধির ওপর সাংবাদিকদের গোয়েন্দা নজর থাকতেই পারে’। চিরকুটের সেই ভাষা পরে এতো পপুলার হয়েছিল যে, একজন আমি মস্কোতে আছি জেনেও লেনিনগ্রাদ এসে আমার হোস্টেলের রুমের (১২০১) সামনে এসে দাঁড়িয়ে থেকে গিয়েছিল, এবং সেও লিখেছিল, ‘সাংবাদিকদের গতিবিধির ওপর পদার্থবিদদেরও নজর থাকতে  পারে’। বলুন আপনারাই, এসব কি প্রেম ছিল! আমি তো বলবো, প্রেমের অধিকও যদি কোন সম্পর্কের সংজ্ঞা থাকে, এটা তাহলে তাই। এই প্রকৌশলী বা পদার্থবিদ, সবাই আমার আত্মার বন্ধু ছিল, প্রেমের সম্পর্কে বাঁধা পড়েনি কেউ। আজও অটুট সেইসব সম্পর্ক। বয়সটা কেবল গেছে দূরের পথ ধরে হেঁটে হেঁটে। আহ, যদি ফিরে পেতাম আরেকটিবার!

সোভিয়েত আমলে আমাদের শীতকালীন ছুটির মেয়াদ ছিল ২০ দিন, আর গ্রীষ্মে টানা দুই মাস। গ্রীষ্মের ছুটিতে আবার আমাদের জন্য বাজেট বরাদ্দ থাকতো এক্সকারশানের জন্য। তো, সেবার আমাদের ইউক্রেন যাবার পালা। লেনিনগ্রাদ থেকে যাচ্ছি তিনজন। সিনিয়র শিহাব ভাই পই পই করে বলে দিলেন পল্লব আর মুরাদকে, যেন ওপেনার থেকে শুরু করে সব নিয়ে যাই সাথে। পথে কি না কি খেতে হয়! আর এটাও বললেন, ‘যাচ্ছেন তো, এটাই কিন্তু সুযোগ’! আমরা তখন অনেক কিছুই বুঝে নিয়ে হেসেছিলাম। মেডিসিন ইনস্টিটিউট ওদের দুজনের জন্য বিমানের টিকিট দেয় যাওয়ার পথে। কিন্তু আমার ভার্সিটি ট্রেনের দিয়েছিল। টানা তিনদিনের জার্নি আবার আমার। খারাপ লাগতো না কখনই। একেবারে নিজের মতো করে থাকা। আর ততদিনে ভাষা রপ্ত, তাই খাওয়া নিয়ে, কেবিনমেটদের সাথে গল্প করারও সমস্যা নেই। আড়াই দিন পর কিয়েভ পৌঁছে দেখি, পল্লব এসেছে আমাকে নিয়ে যেতে।

ইউক্রেনের ১০টি শহর ২০দিনে ঘুরে এলাম আমরা। এখানে আমরা বলতে লেনিনগ্রাদ থেকে তিনজন, আমি, মেডিসিনের পল্লব আর মুরাদ। তিনজনই একই ব্যাচের। ওদেসা থেকে যোগ দিলেন সুশান্তদা ও আরও একজন (আজ আর নামটা মনে নেই)। মোট পাঁচজন বাঙালী। ভারতীয় আছে অনেক। অন্য দেশিরা তো আছেই। সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের প্রায় প্রতিটি শহর থেকে আসা মোটামুটি শ দেড়েক শিক্ষার্থীর একটা বিশাল গ্রুপ নিয়ে ইউক্রেনের শহরে শহরে ছুটছে ১০টা ইনট্যুরিস্ট বাস।

আমাদের কো-অর্ডিনেটর কয়েকজন। প্রতি বাসেই একজন করে।  আমাদের বাসে যিনি ছিলেন, খুবই মজার। তিনি হাফ প্যান্টের ওপর ফুল প্যান্ট পরতেন। প্রয়োজনে ফুলপ্যান্টটা খুলে ফেলতেন। সে এক দৃশ্য বটে! উনি মুখ খুললেই সবাই হাসিতে ফেটে পড়তো, এমন একটা ফানি চরিত্র। সবাই তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করলেও ভালও বাসতো। পুরো জার্নিটাই ছিল জীবনের সেরা বিনোদনের একটি। বিশাল ইউক্রেনের পেটের ভিতর দিয়ে চলছি আমরা, দুধারে সূর্যমুখি ফুলের ক্ষেত, যতদূর চোখ যায় ধূ ধূ সড়ক। কখনও কখনও উঁচু-নিচু পথ, কখনও বা সমতল। দুধারে জনমানবের চিহ্ন বলতে নেই। এভাবেই আমরা এগিয়ে যেতাম নতুন জায়গায়।

বিকেল ৫টাতেই রাতের খাবার খেতে হতো বলে আমরা বেশ বিপাকেই পড়েছিলাম। এরপরেই বের হতাম খাবারের সন্ধানে। আর যেসব শহরে বাংলাদেশি থাকতো, সেখানে তো কথাই নেই। জানা নেই, শোনা নেই, পরিচয়ের প্রথম পর্বেই রান্নার আয়োজন। পুরো টিমে আমি একমাত্র মেয়ে। কাজেই আমার কোথাও হাত লাগাতে হয়নি। সব চিন্তা ছিল টিমের ভাই-বন্ধুদেরই। ছোট্ট একটা শহরে গেছিলাম তখন, নাম পলতাভা। এমন শান্ত শহর অন্য কোথাও দেখিনি। আজও মনে হলে কেমন ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা একটা অনুভূতি হয়।

একটা শহরে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ফলের বাগানে। সবার হাতে একটি করে বাস্কেট ধরিয়ে দেয়া হয়। বলা হয়, যত পারি ফলমূল তুলে ভরে নিয়ে আসতে, খেলেও আপত্তি নেই। আমরা ঝাঁপিয়ে পড়লাম। গাছ থেকে পেড়ে আপেল-নাশপাতি-চেরি জীবনের প্রথম খেলাম। কিছু বাস্কেটে রাখি, বাকিটা পেটে চালান দিই। কিন্তু কতক্ষণ খাওয়া যায়! একপর্যায়ে ক্ষান্ত দিই। ফিরতি পথে আধা বাস্কেট ফলমূল নিয়ে আমাদের জন্য নির্ধারিত থাকার হোস্টেলে ফিরি। এমন অভিজ্ঞতা জীবনে ওটাই প্রথম এবং শেষ।

একদিনের কথা না বললেই না। নাম মনে নেই, কোনো একটা শহর থেকে আমরা তখন চলে আসছি। হঠাৎই কী মনে হলো, আমি আর উড়িষ্যার একজন হাঁটতে হাঁটতে বন পেরিয়ে নদীর ধারে চলে গেলাম। অনেক দূর পর্যন্ত সেই নদীতে হাঁটু জল দেখে আর স্থির থাকতে পারিনি। নেমে যাই নদীতে। এদিকে আমাদের ফেরার কথা মনেই নেই। বাসে যখন মাথা গোণা শুরু হলো, দেখলো দুজন হাওয়া। কো-অর্ডিনেটর বললেন, যাদের সিট-সঙ্গী হারিয়ে গেছে, তারাই যেন খুঁজে নিয়ে আসে। কিছুক্ষণ পর আমরা দূর থেকে দেখতে পাই, উড়িষ্যার মেয়েটির স্বামী আর আমাদের পল্লব আসছে দৌড়াতে দৌড়াতে। এসে আর কোনো কথা নেই কারও মুখে। গম্ভীর মুখে আমরা কেবল তাদের পিছু নিলাম। সিট-সঙ্গী শব্দটি সেই থেকে বেশ প্রিয় হয়ে উঠেছিল!

ফিরতি পথে আবার কিয়েভ। আজকের জ্বলন্ত কিয়েভ তখন ছিল অনন্য সুন্দর, প্রকৃতির অকৃপণ হাতে তৈরি এক শান্ত শহর। লেনিনগ্রাদে নেভা নদীকে বাঁধাই করা হয়েছে, আর কিয়েভে নদী মাটির কাছাকাছি। অসাধারণ সেই দৃশ্য। অনেক বাঙালী সেখানে। আমাদের সাথে সাথে সেই কটা দিন ছিলেন লীনা আপা-মোর্শেদ ভাই। তারা তখনও বিয়ে করেনি। দেখেও বোঝার উপায় নেই, প্রেমিক কিনা। তারপরও দীর্ঘ সময় একসাথে থাকা, আমাদের নিয়ে ঘুরে বেড়ানো, সব দেখে বুঝেই ফেলি একসময়। সেই তারা আজ দুবাইতে, সুন্দর-সুখী একটা জুটি। তিন সন্তানের মা-বাবা। সময় কত দ্রুত গড়ায়। এই যে আজ আমি লিখছি, মনে হচ্ছে এই তো সেদিনের কথা। কিন্তু আমাদের সন্তানরা জানান দেয়, না, সময় পেরিয়ে গেছে, আমাদের সময় বলে কিছু আর নেই।

১৯৮৭ সালের আগস্টে গিয়েছিলাম লেনিনগ্রাদ, ৮৮ সালের জানুয়ারিতে মস্কো এবং ওদেসা সম্মেলন, এরপরই গ্রীষ্মে এই সফর। জীবনটা নেহায়েত মন্দ না। শুধু এই দুবছরে দেশে যাওয়া হয়নি। মাঝে মাঝে মা এবং বাসার বাচ্চাগুলোর জন্য মনটা টাটিয়ে উঠে, এছাড়া সবটাই আনন্দময়।

৯০ রুবল বৃত্তি পাই, এই টাকায় পুরো মাস চলে যায় দিব্যি। ছয় রুবল দিয়ে পুরো মাসের একটা পরিবহন টিকিট কাটি, যা দিয়ে মেট্রো রেল থেকে শুরু করে ট্রাম-ট্রলি-বাস সবকিছুতেই চড়তে পারি। এক কেজি চালের দাম ৮৮ কোপেক (১ রুবলও নয়), গরুর মাংস ২ রুবল, মুরগি ২ রুবল ২০ কোপেক আর ১০টা ডিম ৯০ কোপেক। বাদবাকি সবকিছুই কোপেকের হিসাব। শুধুমাত্র ফ্যাশনেবল কোনো পোশাক কিনতে গেলেই সমস্যা। দুই মাস টাকা জমালেই একটা পোশাক কেনা যায়।

আমার জীবনে এতো চাহিদা কোনদিনও ছিল না। দেশ থেকে যে জামাকাপড় নিয়ে গেছি, শীতের দেশে তারই সদ্ব্যবহার হয় না খুব একটা। আমার পোল্যান্ডের বন্ধুরা সব সালোয়ারগগুলো নিয়ে গেছে, টি-শার্ট দিয়ে পরে। ভারী সুন্দর লাগে ওদের। আর ওরা বিনিময়ে আমাকে তাদের স্কার্টগুলো দিয়ে দেয়। বন্ধুত্ব এভাবেই জিইয়ে থাকে দিনের পর দিন।

এদিকে বাঙালীর সংখ্যাও লেনিনগ্রাদে বাড়তে থাকে প্রতিবছর। নতুন ছাত্ররা আসে, আমরা পুরনো হতে থাকি, আর যারাই নতুন আসে, তাদেরকে রান্নাবান্না থেকে শুরু করে সবকিছু শিখিয়ে-পড়িয়ে নিতে হয়। কিন্তু কদিন না যেতেই ওরা ‘সবদিক’ থেকেই পণ্ডিত হয়ে উঠে।

ইউক্রেন সফর শেষ করে এসেই শুনতে পাই, রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী কাজে যেতে হবে। এর আগের বছর কাজ করেছিলাম নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে। এবার বরাদ্দ হয়েছে গার্মেন্টস কারখানা।  যথারীতি কারখানায় ঢোকার পর মাথায় একটা স্কার্ফ বেঁধে কাজে যাই প্রতিদিন। ওখানে প্রায় বিনা পয়সায় খাবার দেয়া হয় শ্রমিকদের, আমরাও সেই সুযোগ পাই। কিন্তু টানা আট ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে সুতো টানার কাজ করতে গিয়ে প্রথমদিকে ভাল লাগলেও পরে শরীর আর চলতো না। সকালের শিফটে কাজ করতেন শিউলী আপা, মৃণালদা, বিকেলের শিফটে আমি আর পল্লব। তাদের সাথে আমাদের দেখা হতো দুই শিফটের মাঝে।

একমাস এমন হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর ১০০ রুবল রোজগার করি। একটা ছোট্ট লাদুগা ফ্রিজ কেনার সামর্থ্য অর্জন করায় আমি যারপরনাই খুশি। জীবনের প্রথম নিজের একান্ত একটা সংসারে একটা ফ্রিজ আসায় নিজেকে ভীষণভাবে সংসারি ভাবতে লাগলাম। (চলবে)

 

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.