আমরা যারা একলা থাকি-৩০

0

imp 1উইমেন চ্যাপ্টার: মেয়েটির মুখ শুকনো, বোঝাই যাচ্ছে মনের মধ্যে ভীষণ কিছু একটা উথাল-পাতাল করছে। কিন্তু বলতে পারছে না। জিজ্ঞাসা করি, তোমার কি মন খারাপ? উত্তরে শুধু মাথা নেড়ে সায় দেয়। কথা আর বাড়াই না। একটু পর আবার বলি, মায়ের সাথে ঝগড়া হয়েছে? এবারও স্বীকারোক্তি। কি নিয়ে কথা কাটাকাটি, কেন, এসবের ধারেকাছে না গিয়েই বলি, সব ঠিক হয়ে যাবে। খেয়ে নিও, সব টেবিলে রাখা আছে।

এবারই প্রথম নয়। আরও একদিন এসে মেয়েটি বলেছিল, ‘আন্টি, আপনার জানা কোনো ভাল হোস্টেল আছে মেয়েদের’? বললাম, কেন, হঠাৎ হোস্টেল কেন? ও বলে, ‘আম্মু বলেছে, আমি যেন একটা হোস্টেল খুঁজে বের করি, তাহলে দুজনেরই সম্পর্ক ভাল থাকবে’। ভীষণ রকমের মন খারাপ হলেও ওকে বুঝতে দেই না। মেয়েটির বয়স ১৭-১৮ হবে। এসময় মা-বাবার প্রতি অনেক অভিমান থাকে, বড়রা যখন তাদের বুঝতে পারে না, ওরা তখন বিদ্রোহী হয়ে উঠে। মায়ের কাছে যে কথাটা সে বলতে পারছে না, সেটাই সে আমার মতোন আরেক মায়ের কাছে অকপটে বলছে। হয়তো ভাবছে, এই মা তো আর আমাকে শাসন করবে না!

গত বেশ কদিন ধরেই আমি ভাবছি মেয়েটাকে নিয়ে। আমার ছেলের বন্ধু। ও নিজে থেকেই আমার সাথে পরিচিত হয়েছে, বাসায় এসেছে। আমি থাকলেই সে বাসায় আসে, কিছুটা সময় আমার ছেলের সাথে বসে সিনেমা দেখে, একসাথে খাবার খায়, তারপর চলেও যায়। নিজের সাথে এ নিয়ে বোঝাপড়াও হয়েছে আমার। আমি কি প্রশ্রয় দিচ্ছি ওদের? না দিয়েই বা কী করতে পারতাম! আমি না দিলে ওরা বাইরে দেখা করতো, জায়গা তারা খুঁজে বের করতোই। তাছাড়া বয়সটাই তো এমন। আবার এটাও ভাবি, এ নিয়ে এতো সিরিয়াস হওয়ার কিছু নেই। সময়ই বলে দেবে সব। আজ যদি ওরা এই কঠিন-কঠোর নিরানন্দ জীবনে একটু হলেও আনন্দ পায়, সমস্যা কি!

ওরা দুজনই ব্রোকেন ফ্যামিলির ছেলেমেয়ে। মেয়েটি বলছিল, ‘ছোটবেলা থেকে সংসারের যন্ত্রণা-কষ্ট দেখতে দেখতে আর ভাল লাগে না। আম্মুও ভাবে যে, আমার জন্মই তার জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি আর এখানে থাকতে চাই না, দূরে কোথাও চলে যেতে চাই, পরিবার চাই’। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে আমি তার দৃপ্ত ভঙ্গিমা দেখি আর ভাবি, কতটুকু যন্ত্রণা সইলে এই বয়সী একজন সন্তানের মুখ থেকে এমন কথা বের হয়! যে বয়সে তার ভবিষ্যত নিয়ে ভাবারই কথা না, যখন তার ভিতরে কৈশোরের চপলতা থাকার কথা, তখন কী এক সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত তাকে এমন শক্ত মানুষ বানিয়ে দিল!

ছেলেটি তার বিপরীত। বর্তমান-ভবিষ্যত কোনকিছু নিয়েই তার ভাবনা নেই। মেয়েটির কথা সে হেসে উড়িয়ে দেয়। সেও যে ঘরে বড় হচ্ছে, সেটাও এই দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে ‘ভাঙা ঘর’। কিন্তু এই ‘ভাঙা ঘরেও’ চাঁদের আলো ঠিকই ঠিকরে পড়ে, ছেলেটি ছুঁতে পারে না। প্রচণ্ড সীমাবদ্ধ চরিত্র তার। ছোটবেলা থেকে সেও দেখে এসেছে তার মায়ের লড়াই, কিন্তু এতোটুকু স্পর্শ করেনি তাকে। পাশের ঘরে মা অসুস্থ থাকলেও চেয়ে দেখে না। জল দেয়া তো দূরের কথা।

দুটো ছেলেমেয়ে প্রায়ই একই কাঠামোতে বড় হলেও কী আশ্চর্য বৈপরীত্য! একজন স্নেহ খোঁজে, একজন স্নেহ হাতে ঠেলে দূরে সরিয়ে দেয়। এখানেই ছেলেমেয়ের পার্থক্য কিনা আমি জানি না। তবে একজন একাকি মা হিসেবে জানি, কতটা কষ্ট করে দিন যাপন করতে হয়, একটা সন্তানকে ‘বড়’ করতে হয়। কতকিছু না দিতে পারার গ্লানিও থাকে মনে। সব ছাপিয়ে মানিয়ে নেয়া ছাড়া কীইবা করার আছে!

কিন্তু এই যে কিশোরী মেয়েটি তার মাকে ভুল বুঝছে, প্রতিনিয়ত লড়াই করছে মায়ের সাথে, মায়েরও নিশ্চয়ই কষ্ট হচ্ছে! মেয়েটির মুখেই শুনেছি, মেয়েটিকে রেখে দিয়ে তার মাকে জোর করে বাসা থেকে বের করে দিয়েছিল বাবা। এরপর মা চলে যায় বাইরে। সেখানে সাতবছর পড়াশোনা করে ফিরে এসে একটা বহুজাতিক কর্পোরেশনে ভাল চাকরি নেন। কিছুদিন আগেই মেয়েটি বাবার কাছ থেকে চরমভাবে অপমানিত হয়ে মায়ের কাছে চলে এসেছে। এখন মা-মেয়েতে চলছে ‘অ্যাডজাস্ট’ করার দ্বন্দ্ব। কিন্তু দুজনের দূরে থাকাই যে এই সমস্যার সমাধান নয়, এটা আমি ওর মাকে কি করে বোঝাবো, তাই ভাবি।

আমি বলি, সব ঠিক হয়ে যাবে। মাও অভ্যস্ত হবে, তুমিও হবে, সময় দাও দুজন-দুজনকে। কিন্তু আমি নিজের দিকে যখন তাকাই, তখন দেখি, এই আমার ভিতরেও কত ক্ষোভ, কত রাগ সবার প্রতি, সমাজের সিস্টেমের প্রতি। একটু ভাল থাকার জন্যও কোথাও কম্প্রোমাইজ করি না। কেন করি না? জীবনের এই পর্যায়ে এসে আরও বেশি অধৈর্য্য হয়ে পড়েছি যেন। কারও কোন মন্তব্য শুনতে আর ভাল লাগে না। কারও কোন সমস্যা শুনলে ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। কিন্তু আমিও জানি, জীবনটা আসলে একটু সহজ করে নিলেই সহজ হয় জেনেও আমরা তা জটিল করে তুলি।

কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ যেমন বলেছেন, ‘বড় ধরনের বিপদের সামনেই একজন মানুষ অন্য একজনের কাছে আশ্রয় খোঁজে। তাই পৃথিবীতে ভয়াবহ বিপদ আপদেরও দরকার আছে’। কিন্তু এই আশ্রয় কি সত্যিই আশ্রয়? নাকি আরেকটা ভুল করার আগে মহড়া মাত্র!

তারপরও আমি চাই, একজন একাকি মা হিসেবে যে জীবন আমি পাড়ি দিয়েছি, এই মেয়েটি বা ছেলেটি অথবা কোন ছেলে-মেয়েই যেন এমন অস্থির জীবনে না পড়ে!

(চলবে)

 

শেয়ার করুন:
  • 341
  •  
  •  
  •  
  •  
    341
    Shares

লেখাটি ১,০০৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.