যৌতুকের হিংস্র ছোবলে ঝরছে প্রাণ

Mirror 2ঝর্ণা মনি: প্রায় নয় মাস আগে যশোর সদর উপজেলার রায়মানিক গ্রামের শিপন ঘোষের সঙ্গে বিয়ে হয় খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চরঘাটা গ্রামের মিহির ঘোষের মেয়ে রিক্তা ঘোষের (১৯)। বিয়ের সময় ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা যৌতুক দেয়া হয়। বাকী ছিল আরও ২০ হাজার টাকা। ওই টাকার দাবিতে প্রায়ই রিক্তাকে নির্যাতন করতো শিপন। গত ১০ এপ্রিল রাতে যৌতুক দাবিতে রিক্তাকে বেধড়ক মারপিট করা হলে তার মৃত্যু হয়।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন অন্বেষণের এক গবেষণা প্রতবেদনে দেখা গেছে, ২০০৮ সালে যৌতুকের কারণে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ২৬৯টি। ২০১২ সালে ঘটেছে ৭৭১টি। অর্থাৎ নির্যাতনের হার বেড়েছে ৪৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে ২৪৫ জন নারীকে।

সমাজ থেকে যৌতুকের বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলার জন্য ১৯৮০ সালে দেশে একটি আইন প্রণীত হয়। যৌতুক নিরোধ ওই আইন (৩৫ নং আইন) অনুযায়ী যৌতুকের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, বিয়ের কোন পক্ষ অন্য পক্ষকে বর বা কনের বা কোন এক পক্ষের মা-বাবা কর্তৃক বা অন্য কোন ব্যক্তি কর্তৃক কোন পক্ষকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিয়ের সময় বা বিয়ের আগে বা বিয়ের পরে যে কোন সময় পণ হিসাবে প্রদত্ত বা প্রদানে সম্মত কোন সম্পত্তি বা মূল্যবান জামানতই হচ্ছে যৌতুক। যৌতুক নেয়ার জন্য শাস্তি হবে ১ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড বা ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দন্ডই হতে পারে। যে ব্যক্তি যৌতুক নেয়া ব্যাপারে সহায়তা করবে তাদেরও একই রকম শাস্তি হবে এবং যে ব্যক্তি যৌতুক দাবি করবে তারও একই রকম শাস্তি হবে। এ ছাড়া যৌতুক গ্রহণের জন্য যদি কেউ উদ্বুদ্ধ করে বা প্ররোচিত করে সেই ব্যক্তিও ৩ ধারা অনুযায়ী অপরাধী হবে এবং তার শাস্তি হবে।

আইন সত্ত্বেও যৌতুকের হিংস্র ছোবল থেকে রক্ষা পাচ্ছে না নারী। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দেশে যৌতুকের কারণে নির্যাতিত হয়েছেন ১২১৫ জন নারী। শুধু নারী নয়, যৌতুকের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবার। অনেক দরিদ্র বাবা মা শেষ শেষ সম্বল ভিটাটুকু বিক্রি করেও যৌতুকের করাল থাবা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। যৌতুকের নির্মম বলি হচ্ছে প্রায়শই। আবার কেউ কেউ নির্যাতন সইতে না পেরে যৌতুকের দায় মেটাচ্ছেন আত্মাহুতি দিয়ে।

আসকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ বছরে যৌতুকের পর হত্যা এবং আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১৭১৭ টি। এর মধ্যে ২০১২ সালে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৫৬ জন এবং হত্যা ও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ২৮২ টি। গতবছর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৩৩ এবং আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১৮৫ টি। অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি ২০০১ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ পর্যন্ত যৌতুক সহিংসতার কারণে ২৭৫৩ জন নারীকে হত্যা এবং ১৭৮৭ জন নারীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। এছাড়াও এ সময়ে ১৯৯ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। তবে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশের বাইরেও প্রতিনিয়ত কত নারী যৌতুকের জন্য তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সহিংসতা বাড়ছে। যৌতুকের জন্য নারী নির্যাতনও বাড়ছে। নারীর প্রতি সমাজ শ্রদ্ধাশীল না হলে নির্যাতন থেকে বেরিয়ে আসা যাবে না।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.