ভাবী ও অ-ভাবী

Women journalistসাবরিনা করিম মুর্শেদ: মাঝে মাঝে আমি ভাবি, মানুষের পছন্দ-অপছন্দ বড় অদ্ভুত। এর কোন নির্দিষ্ট নিয়ম কানুন হয় না। একজনের কাছে যা স্বাভাবিক, অন্যের কাছে তা সাক্ষাৎ বিবমিষা। যে কোন বিষয়েই এই পছন্দের বৈষম্য লক্ষ্যণীয়।

সেদিন যেমন আমার এক প্রবাসী বন্ধুকে দেখলাম মুখগ্রন্থ বা ফেসবুকে লিখতে প্রবাস জীবনে এসে বাংলাদেশের অনেক শিক্ষিত নারী তার কষ্টার্জিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জলাঞ্জলি দিয়ে কিভাবে মিষ্টি ভাবী, বিরিয়ানি ভাবী হয়ে বসে আছেন। আমার বন্ধু যে দুঃখের জায়গা থেকে কথাটি লিখেছে, তা যে কেউ অনুধাবন করতে পারবে। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে শিক্ষালাভ করে শুধু বেকারভাতা পাওয়ার লোভে কেউ যদি বাড়ী বসে মিষ্টি বানায় বা বিরিয়ানি রাধে, তবে নারী শিক্ষা ও প্রগতি সংক্রান্ত ঝান্ডাধারী আমাদের মত জনা কয়েক নারীর বুক মুচড়ে উঠতে বাধ্য।

কিন্তু আমার খটকা লাগলো তার লেখার ওপর দু একটি মন্তব্য পড়ে। কেউ কেউ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবহারের অভাবে দুঃখিত হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু কেউ কেউ আবার ‘ভাবী’ সম্বোধন নিয়েই ভ্রুকুঞ্চিত করেছেন। একজন বলেছেন ভাবী ডাক শুনলে তার গা ঘিন ঘিন করে। আমার ভীষণ অবাক লাগলো। যদিও ব্যক্তিগত ভাবে আমি ভাবী ডাকের চাইতে আপা ডাকে বেশী স্বচ্ছন্দ্য, কারণ কর্মসুত্রে সাংবাদিক ও উন্নয়ন কর্মী হবার সুবাদে সবসময় আমাকে আপা ডাক শুনতে হয়েছে। বর্তমান পরিযায়ী জীবনেও আমার বন্ধুদের ভাবী বলে ডাকতে হয়না, বরং ছোট বড় সবাইকেই নাম ধরে ডাকি।

তবুও ভাবী ডাক আমার মনে ‘বিবমিষা’ জাগায় না।যে বিশেষ নারীকুল প্রতিনিয়ত এই ভাবী ডাকে অভ্যস্ত তাদের প্রতি আমার কোনরূপ তিক্ততা বোধ হয়না। তারা সবাই যে অর্থ, শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা জ্ঞানের অভাবে ‘ভাবী’ হয়েছেন তা কিন্তু নয়, বরং সময়, সুযোগ, সর্বোপরি সামাজিক প্রথা তাদেরকে ‘ভাবী’ করেছে।কাজেই অ-ভাবী না হয়ে আজ তারা ভাবী। আমার অ-ভাবী বন্ধুদের মূল বক্তব্যের একটা অংশ কিন্তু অন্য রকম। ‘ভাবী’ ডাকের চাইতেও কিন্তু তারা বিশেষ দলের আচরণ সম্পর্কে বিরূপতা ব্যক্ত করেন। স্বাভাবিকভাবে সেখানে পরনিন্দা পরচর্চা ব্যাপারগুলো চলে আসে।কিন্তু মানুষের আচরণ তো স্বভাবসিদ্ধ এবং অনেক নিয়ামকের ওপর নির্ভরশীল। ‘ভাবী’ শ্রেণী ছাড়া অন্যান্যরা কি মাৎসর্‍্যকে জয় করতে পারে? কর্মক্ষেত্রে পুরুষরা কি পরনিন্দা করেন না?

আমার আরও মনে পড়ছে দুর্ভাগ্যবশত ইংরেজী সাহিত্যের সাথে আমাদের কিছুটা ভাষাতত্ত্বও পড়ানো হত। সেখানে Sociolinguistic এ আমরা পড়তাম কিভাবে সমাজ মানুষের ভাষাকে প্রভাবিত করে। কিভাবে সমাজ ভেদে, ভাষাভেদে মানুষের kinship term বা আত্মীয়তার সম্পর্কের নামগুলো ভিন্ন রকম হয়। ইংরেজী uncle বাংলায় এসে মামা, চাচা, খালু, ফুপা ইত্যাদি হয়ে যায়। এক sister in law হয়ে যায় পারস্পরিক দ্বন্দ্বময় ননদ ও ভাবী। কাজেই বোধ করি ভাষাগত ও প্রথাগত কারণে ভাবীদের ‘ভাবী’ হয়ে থাকতে হয়।

স্কুলের সামনে বাচ্চার মায়েরা ভাবী, আশেপাশে ৪০ ঘর প্রতিবেশী ভাবী, এমনকি নারী সহকর্মী ‘আপা’ হলেও পুরুষ সহকর্মীর স্ত্রীও ভাবী। আমাদের প্রজন্মে আমরা যেমন ছেলেবেলায় (নাকি মেয়ে বেলায়?) বড়ই হয়েছি মায়ের সাথে ‘ভাবী ভাবী’ খেলে।

তবে ভাষা ও সমাজ নিয়ত পরিবর্তনশীল, কাজেই ভাবীত্ব কতদিন থাকবে তা একমাত্র সময়ই বলতে পারে। তবে যদি অ-ভাবীদের মত ভাবীরা ‘ভাবী’ ডাকের কারণে অস্তিত্বের সংকট অনুধাবন করেন, যদি কন্যা, জায়া, জননী পরিচয়ের উর্দ্ধে ওঠার আকুতি অনুভব করেন, তাহলে বোধ হয় তাদের ‘ভাবী’ ডাক বিসর্জনে খুব একটা দেরী হবে না।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.