মালয়েশিয়ান বিমান বনাম রুশ-ইউক্রেন ইস্যু

Malaysian Planeউইমেন চ্যাপ্টার: মালয়েশিয়ার একটি যাত্রীবাহী বিমান নিখোঁজ হওয়ার চার মাসের মাথায় আরেকটি বিমান ইউক্রেন-রুশ সীমান্তে বিধ্বস্ত হয়েছে, ২৯৮  জন যাত্রীর সবাই নিহত। তবে ধ্বংসাবশেষে অনেকগুলো ঝা চকচকে ‘মালয়েশিয়ান পাসপোর্ট’ কি করে যেন আনকোরা অবস্থায় পাওয়া গেল, পুড়লো না, ছাই হলো না।

আর বিমানটি দেশে-শুনে সেখানেই বিধ্বস্ত হয়েছে, যেখানে ‘পশ্চিমা মিত্রদের’ অসীম মমতা মাখানো রাজনীতির তোড়ে রাশিয়া-ইউক্রেনের ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্ব আজ ভাঙনের মুখে। নিজের ঘর ভাঙার কষ্ট পশ্চিমা উড়নচন্ডি জাতি বুঝবে কি করে! ওরা তো কেবল ঘর ভাঙার তালে।

এদিকে বার বার মালয়েশিয়ার বিমানই কেন টার্গেট হচ্ছে? আগেরবারটা যদি ‘স্রেফ একটা দুর্ঘটনাই’ ধরি, এবারও কি তা ধরা যায়? যায় না। এবার তো আমরা ছাই-ভস্ম দেখছি নিজের চোখে। এতোগুলো মানুষ মূহূর্তে ছাই হয়ে যাওয়া চাট্টিখানি কথা না। গাজায় গত নয়দিনেও এতো মানুষ মরেনি। তবে এবার স্থল অভিযানে ঠিক কতজন মরবে, তাও জানতে পারবো না কখনও।

গত মার্চে মালয়েশিয়ার নিখোঁজ যাত্রীবাহী বিমান এমএইচ ৩৭০-এর হদিস আজও মেলেনি। এ নিয়ে আমরা অনেক নাটক-উপনাটক মঞ্চস্থ হতে দেখেছি বিশ্বজুড়ে, কিন্তু বিমানটি আসলে হাওয়া হয়ে যাওয়ায় বা ‘তথাকথিত ভারত মহাসাগরেও বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের’ অলৌকিক অস্তিত্ব থাকায় আমরা জানতে পারলাম না বিমানটির আসলে কি হয়েছিল? তাছাড়া বিমানটির হতভাগ্য যাত্রীদের ততোধিক হতভাগ্য নিকটজনেরা কোনদিন বলতেও পারবে না, ‘ঠিক এই জায়গায় বা এভাবে আমরা স্বজন হারিয়েছিলাম’।

কত কেচ্ছাকাহিনীই না আমাদের পড়তে হয়েছে। আর যেসব নৌবহর প্রমোদবিহার চালাচ্ছিল ভারত মহাসাগরে তল্লাশির নামে, তারা ঠিকমতো ফিরেছে তো ঢেরায়? নাকি আবাস গেড়েছে কোথাও? কেই বা জানে!

একুশ শতকে বিজ্ঞানের শনৈ শনৈ উন্নতির মাঝে কেমন অদ্ভুত না ব্যাপারটা! বিশ্বাস করা যায় যে, আস্ত একটা বিমান রাডার থেকে হারিয়ে পৃথিবী নামক গ্রহ থেকেই উধাও হয়ে গেল! নাকি এলিয়েনদের খপ্পর পড়েছিল? আর সেই গল্প আমাদের গিলতে হয়েছে! আমরা কি সভ্য কোনো মানুষ?

রহস্য ঔপন্যাসিকরা নিশ্চয়ই এই সুযোগ হেলায় হারাবেন না। কিন্তু একই কায়দায় তো আর আরেকটি ঘটনা ঘটানো যায় না। তাই এবার বিমানটিকে ‘ভূপাতিত’ করা হয়েছে ‘অজ্ঞাত উপায়ে’। আগেরবার ২৭৫ জন যাত্রী ছিলেন, এবারে আরও ২০ জন বেশি, অর্থাৎ ২৯৫ জন। এতোগুলো মানুষের সাথে এতোগুলো পরিবার, এতোগুলো জীবন! ভাবলেই গা শিউড়ে উঠে। সব রাজনীতির বলি!

তবে মালয়েশীয় এয়ারলাইন্সের এমএইচ ১৭ ঘিরে অন্তত আগের বিমানটির মতোন সেই অনিশ্চয়তা নেই। ২৯৫ জন আরোহীসহ জ্বলে খাক হয়ে ইউক্রেনের মাটিতে আছড়ে পড়েছে সে। নানাকথা বলা হচ্ছে। রাশিয়া গুলি করে বিমানটিকে বিধ্বস্ত করেছে, রুশপন্থী বিদ্রোহীরা করেছে, আবার রাশিয়া দুষছে ইউক্রেনকে। এই তিন টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে আমরা আমজনতা না পারছি কোনরকম সিদ্ধান্ত নিতে। যখন যে লিংক পাচ্ছি, হুমড়ি খেয়ে তাই পড়ছি, দেখি তো কোন হদিস পাওয়া গেল কিনা! বিমানটি ধ্বংসের পিছনে কার হাত ছিল, জানতে পারলো কিনা কেউ!

এমন খবরও শুনছি, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিমান ভেবে ইউক্রেন নাকি এই হামলা চালিয়েছে। বিশ্ব রাজনীতির ধারেকাছের কেউ না হয়েও, কিছু না বুঝেও এইটুকু বলতে পারবো যে, ইউক্রেন কোনদিন ‘এরকম ভেবে এরকম কাজ’টি করবে না। পুতিনকে মারতে পারে না ইউক্রেন। ইউক্রেনকে যেভাবেই লেলিয়ে দেয়া হোক না কেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে, যদি না আমেরিকা সেখানে নিজে হাতে কিছু না ঘটায় তাহলে ইউক্রেনের হাত দিয়ে এমন কাজ করা কোনদিন সম্ভব হবে না।

বিশ্ব মিডিয়ায় খবর আসছে যে, রুশ-ইউক্রেন সীমান্তে বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার কারণ জানা গেলেই নাকি মার্চ মাসে নিখোঁজ বিমানটিরও একটা সুরাহা হবে। আগেরবার বিমানটি কুয়ালালামপুর থেকে বেইজিং আসছিল। সেটি কি করে ভারত মহাসাগর তথা অস্ট্রেলিয়ার কাছাকাছি চলে গেল, বোধগম্য নয় মোটেও। যদিও সেখানে কিছু মিলেছে বলে জানা যায়নি।

আর এবারের বিমানটি আমস্টারডাম থেকে কুয়ালালামপুর যাওয়ার পথে ইউক্রেন-রাশিয়ার সীমান্তের ওপর দিয়ে যাচ্ছিল। যতটুকু জানি, এই সময়টাতে বিমান থাকে অনেক ওপরে। ৩৩ হাজার ফুট ওপরের কথাও শোনা যাচ্ছে। অত ওপরে কি করে বা কোন ধরনের মারণাস্ত্র দিয়ে বিমান ভূপাতিত করা সম্ভব হয়? রুশপন্থী বিদ্রোহীদের হাতে যে অস্ত্রশস্ত্র আছে (কিছুদিন আগে একটি শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় ফেলে যাওয়া অস্ত্রের বর্ণনা অনুযায়ী)তা দিয়ে আশপাশের মানুষকে হত্যা করা বা ভয় দেখানো ছাড়া আর কিছু সম্ভব না। তারা এই অভিযোগ অস্বীকারও করেছেন। দোনেৎস্ক অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের একজন নেতা জানিয়েছেন, ১০ কিলোমিটার উঁচু থেকে উড়োজাহাজ ভূপাতিত করার মতো কোনো অস্ত্র তাদের হাতে নেই৷

রাশিয়া আধুনিক অস্ত্র দিচ্ছে বলে যে অভিযোগ তুলছে পশ্চিমারা, তা যদি সত্যিই হতো, তাহলে এতোদিনে সেখানে মানুষ মরে পচা লাশ হয়ে যেত। আর ইউক্রেনও এ পর্যন্ত যতটুকু করেছে ‘তাদের মিত্রদের’ কথায়, সেটাও খুব একটা ‘উইলিংলি’ করেছে বলে বোধ হয় না। জাতিগত, ভাষাগত, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিগত, সর্বোপরি ৭০ বছরের দীর্ঘ আদর্শগত নৈকট্য বলে একটা ‘শব্দ’ আছে অভিধানে, একটা ‘আচার’ আছে জীবনে, যা তারা যাপন করে, সেখানে এমন রক্তারক্তির ইতিহাস দূর অতীতে থাকলেও নিকট অতীতে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তাই বিশ্বাস করি না যে, পুতিনের বিমান ভেবে আস্ত একটা মালয়েশিয়ার বিমান তারা ফেলে দিয়েছে।

বিশ্ববাসী যখন গাজায় ইসরায়েলি অভিযান নিয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে ক্রমে, তখন দৃষ্টি তো ফেরাতেই হয় অন্যদিকে। ইসরায়েল এখন গাজায় তাদের ‘আতশবাজি’ বন্ধ করে ‘স্থল অভিযান’ শুরু করেছে, মেরে সাফ করে দিচ্ছে ফিলিস্তিনিদের, এ অবস্থায় বিশ্বের একজনই প্রথম প্রতিবাদ করেছিলেন, তিনি মি. পুতিন, এখন অবশ্য অনেকেই করছেন।

তার মানে কী দাঁড়াচ্ছে? সিরিয়ায় যখন নৌবহর পাঠানো শুরু করলো আমেরিকা, পুতিনও রুখে দাঁড়ালেন, ফল হলো যে, সেই নৌবহর ফেরত গেল। ইউক্রেন ইস্যুতে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা জারি করছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে, পুতিন অনড়। গতকাল এমন কথাও তিনি বলেছেন, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে আমেরিকারই বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে। তাঁকে কিছুতেই টলানো যাচ্ছে না!

তাহলে তো নতুন কোন পথ বের করতেই হয়। মালয়েশিয়ার বিমানই টার্গেট হলো। সেখানেও কোন বড় ধরনের ষড়যন্ত্র বা ব্যবসা লুকায়িত আছে কিনা, তা বলতে পারবে কেবল সংশ্লিষ্টরাই। নইলে মালয়েশিয়ার বিমানের রিপুটেশন নিয়ে আগে তো কোনদিন প্রশ্ন উঠেনি! এখন কেন হচ্ছে? আগেরবার বিমান নিখোঁজ হওয়ার পর কোথায় যেন পড়েছিলাম যে, একই আদলের মালয়েশিয়ার বোয়িং একটা বিমান ইসরায়েলে বসে থাকতে দেখা গেছে। তাহলে সন্দেহ তো আমাদেরও হয়, অনেক কিছুই হয়।

মূল টার্গেট কে আসলে? মালয়েশিয়ার বিমান কোম্পানি? নাকি রাশিয়াকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যা দেয়া? নাকি গাজা থেকে বিশ্ববাসীর নজর ফেরানো? কোনটাতে কার লাভ, এবং কত লাভ?

আরও একটি বিষয়। এই ঘটনার তদন্তে ইউক্রেনকে সহায়তা করার প্রস্তাব দিয়েছে যু্ক্তরাষ্ট্র। ঘটনাটা তো দুইদেশের সীমান্তে। রাশিয়াকে নয় কেন? এটা স্পষ্ট এবং খুবই স্বাভাবিক যে, ইউক্রেনের মুখ দিয়ে ‘পশ্চিমা মিত্রশক্তি’রা এখন অনেক কিছুই বলানোর চেষ্টা করবে। আর ইউক্রেনও এখন তালগোল হারিয়ে ফেলেছে, বটবৃক্ষের ছায়া সরে গেলে যা হয় আর কী! ছায়ায় থাকতে বুঝে না কি ছিল! আগে যদি বুঝতো, তবে আজ এই অবস্থায় এসে ঠেকে না বিষয়টা। রাশিয়া তাদের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন অন্যভাবে ইউক্রেনকে গ্যাস দিতে গিয়েও সেই রাশিয়ার ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।

বিষয়টা আসলেই জটিল, অনেক জটিল। আর এর মধ্যে মালয়েশিয়ার বোয়িং ঢুকে যাওয়ায় জটিলতর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল রাজনীতি বোদ্ধারাই পারবেন এই সমস্যা থেকে আমাদের আপাতত মুক্তি দিতে। আর আমরা নতুন কোন ‘থিওরি’ পড়ার অপেক্ষায় থাকি এখন!

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.