আহারে ছিল একটা ওয়ার্ল্ডকাপ…

MOnija
মনিজা রহমান

মনিজা রহমান: ‘এ যেন আমাদের ভাঙ্গা ঘরে চাঁদের আলো ! বেড়ার গায়ে ঝুলে থাকা নীল অপরাজিতা !’

আমাদের নিরানন্দ, নিস্তরঙ্গ জীবনে ছিল একটা ওয়ার্ল্ডকাপ। আহারে তাও শেষ হয়ে গেল। বুকের মধ্যে কেমন যেন একটা হাহাকার। শুন্যতার অনুভূতি।

চার বছরের জন্য সমস্ত আনন্দ—উত্তেজনা-তর্ক-বিতর্ক-হাসি-কান্নাকে এখন একটা বোতলে ভরে ছিপি দিয়ে আটকে রাখতে হবে। আবার চার বছর পরে হেথা নয়, হোথা নয়, অন্য কোথাও, অন্য কোনস্থানে খুলবো সেই যাদুর বোতল। আর স্মৃতির জানালায় হুড়মুড়িয়ে আসতে থাকবে এক একটি ঘটনা। মনে পড়বে চার বছর আগের এই ব্রাজিল ওয়ার্ল্ড কাপের কথা। কিংবা তারও আগের। তারও। আরো আগের ওয়ার্ল্ডকাপের স্মৃতি।

ওয়ার্ল্ডকাপ আমাদের অতিতাশ্রয়ী করে তোলে। জীবিত ও মৃত ব্যাক্তিদের কথা মনে করিয়ে দেয়। আপনজনের সঙ্গে কবে কিভাবে ওয়ার্ল্ডকাপের উন্মাদনায় মেতেছিলাম সেই কথা মনে পড়ে। ফিলিপসের সাদা কালো টিভির কথা মনে পড়ে যায়। ফ্ল্যাস্ক ভর্তি করে লাল চা বানাতাম। প্রিয় ফুটবলারদের স্টিকার জমাতাম। প্রিয় দলের সাফল্যের জন্য নফল রোজা রাখতাম। স্কুল জীবনে একটা খাতাও ছিল। খেলোয়াড়দের নাম আর পরিসংখ্যান লিখে রাখার জন্য। বহুদিন আগে হারিয়ে ফেলা সেই খাতাটার জন্য মন কেমন করে।

ওয়ার্ল্ডকাপ বড় নির্মম। সবাইকে বড় কাঁদায়। প্রিয় দেশের পতাকা মুখে এঁকে আনে মানুষ। সেই পতাকার রঙ কিভাবে গলে পড়ে লোনা জলে। রিপোর্টাররা লেখে, কে হাসবে শেষ হাসি ? তাদের কথামতো শেষ পর্যন্ত একটা দলই হাসে। বাকী ৩১ টি দল বিদায় নেয় চোখের জলে। সেই ৩১ টি দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে চোখের পানি ফেলে তাদের সমর্থক আরো কোটি মানুষ। কেমন একটা মোচড় দেয় বুকের মধ্যে। বাংলাদেশ কোনদিন, কোনকালে খেলতে পারবে না জেনেও বিশ্বকাপে দেশটি শিরোনাম হয় বিদেশী পত্রিকায়, ফিফার ওয়েবসাইটে। হয় ফুটবলের প্রতি বাঙ্গালীর ভালোবাসার জন্য।

বাঙ্গালীর নিজের দল নেই ওয়ার্ল্ডকাপে। তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে তারা সমর্থন দেয় আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলকে। আমেরিকা-কানাডায় বিশ্বকাপ নিয়ে সেভাবে কোন আলোচনা নেই। ইউরোপে আছে, তবে কাজের ফাঁকে ফাঁকে। বাঙ্গালীর মতো রাত জেগে, পড়া নষ্ট করে, দিনের কাজ বাতিল করে ওয়ার্ল্ডকাপের খেলা কেউ দেখে না। এমনতি রাত জাগার ক্লান্তি, তারপর প্রিয় দল হেরে যাবার মানসিক অবসন্নতা তো আছেই। তবু বাঙ্গালী ওয়ার্ল্ডকাপের খেলা দেখবেই। তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় কত প্রশ্ন। হেরে গেলে কিভাবে মুখ দেখাব প্রতিপক্ষের কাছে ? যেদিন প্রিয় দল জয় পায়…স্কুল-কলেজে-কর্মস্থলে-বন্ধুদের আড্ডায়, বাসার ডাইনিং টেবিলে তখন তার প্রতাপ কে দেখে ! কণ্ঠ যেন মঙ্গলগ্রহ পর্যন্ত পৌছায়। আর হেরে গেল নত মুখ। কণ্ঠস্বর আর শোনা যায় না। মাথা নীচু করে চলে সে।

ওয়ার্ল্ডকাপ আমাদের ভালোবাসতে শেখায়। স্বার্থহীন ভালোবাসা। প্রিয় দল, প্রিয় দেশকে যে কতখানি ভালোবাসে মানুষ সেটাই জানা যায় এই মহাযজ্ঞে। ধরা যাক কানায় কানায় উপচে পড়া এক হলুদ গ্যালারি। মনে হবে এক সরিষার ক্ষেত। কিংবা নীল সমুদ্র। লোহিত সাগরের মতো লাল সমুদ্র হতে পারে। কত সাজে, কত বেশে আসে মানুষ। সেই সমুদ্রে ঢেউ ওঠে। একটু ছোঁয়া লাগতেই উপচে পড়ে আনন্দের সেই ঢেউ।

এবার ওয়ার্ল্ডকাপের উত্তেজনার রেশ নতুনভাবে উপভোগ করেছি। ভিন্ন পরিবেশে। ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। রাত জাগতে হয়নি। বিকেলেই খেলা। রোজাদারের জন্য দীর্ঘ অপরাহ্ন কখন কেটে গেছে টের পাইনি। প্রতিবেশী বন্ধুরা এসেছে বাসায় খেলা দেখার জন্য। রোজার কারণে আপ্যায়নের কোন সুযোগ নেই বলে বার বার রান্নাঘরে ছুটতে হয়নি। স্প্যানিশভাষী ধারাভাষ্যকারের দীর্ঘ গোওওওওওওওওওল উচ্চারণ টিভির সামনে টেনে এনেছে দুই শিশু সন্তানকেও।

২০১০ সালের ওয়ার্ল্ডকাপের সময় ছোট ছেলে সৃজনের বয়স মাত্র চার মাস। মাতৃত্বকালীন ছুটি কাটিয়ে অফিসে যোগ দিয়েই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছে। কোন ডেঅফ নেই। আবার অতিরিক্ত সময়ের ডিউটি। অন্য বিটের রিপোর্টারদের তখন পৌষ মাস। পায়ের ওপর পা তুলে তারা খেলা দেখে। আর এসে স্পোর্টস রিপোর্টারদের জ্ঞান দেয়। তবু একটা ওয়ার্ল্ডকাপের প্রতি প্রত্যেক স্পোর্টস রিপোর্টার কেমন যেন একটা প্রাণের টান অনুভব করে। গভীর ভালোবাসার অনুভূতি তৈরী হয়। আমার বড় ছেলে মননের জন্মদিন ২১ জুন হওয়ায়, পাওলো মালদিনির মতো সব সময় ওয়ার্ল্ডকাপের মধ্যেই উদযাপন করতে হয় বিশেষ দিনটি। ২০১০ সালে মায়ের সহকর্মীদের সঙ্গে অফিসেই কেক কেটে জন্মদিন উদযাপন করেছিল মনন। সাদামাটা আয়োজন। শুধু ওর মন রাখতেই করা। আসলে ওয়ার্ল্ডকাপের মহাউৎসবের মধ্যে আর কি কোন উৎসব মানায় !

নিউইয়র্কে যেখানে থাকি, তাকে লাতিন আমেরিকার আরেকটি খন্ড বলা যায়। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, চিলি, কোস্টারিকা, পেরুর মানুষের বসবাস এখানে। ওয়ার্ল্ডকাপের কয়েকদিন মনে হচ্ছিল আমি বুঝি রিও ডি জেনিরো কিংবা ব্রাসিলিয়ায় আছি। চারদিকে এমন ওয়ার্ল্ডকাপের আবহ। দোকানপাটে, বারে, রেস্ট্রুরেন্টে, সমর্থকদের পোষাকে সর্বত্র যেন ওয়ার্ল্ডকাপ। বিনা টিকেটে বড় পর্দায় খেলা দেখানোর ব্যবস্থা ছিল। আর প্রিয় দল জিতলে তো কথাই নেই। চারদিক যেন থইথই করে আনন্দে।

এমনিতে এখানে মেক্সিকান আর কলম্বিয়ান মানুষের বসবাস বেশী। ওরা জিতলে দুই সন্তানকে দুই হাতে ধরে বেরিয়ে গিয়েছি শুধু ওদের উৎসব দেখবো বলে। হাজার মানুষের সেকি মাতম আর উন্মাদনা। নিউইয়র্কের বিখ্যাত পুলিশ ডিপার্টমেন্ট এসেও থামাতে পারছে না তাদের। সব টিভি ক্যামেরা চলে এসেছে সেই উৎসবকে ঘরে ঘরে পৌছে দিতে।

একটা ব্যস্ত রাস্তার পুরোটা জুড়ে প্রিয় দেশের পতাকা উড়িয়ে গাড়ীর মিছিল। প্রিয় বান্ধবী কিংবা শিশু সন্তানকে কাঁধে বসিয়ে উৎসবে সামিল হওয়া। ভুভুজেলার তীব্র শব্দ। নেচে গেয়ে একাকার হওয়া। জীবনের এই স্রোত দেখতে কার না ভালো লাগে।

প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এবারের ওয়ার্ল্ডকাপকে মনে রাখবে সবাই। কত নাটকীয় উথ্থান-পতন। ব্রাজিল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচ দিয়ে শুরু হয়েছিল আনন্দ যাত্রা, শেষ হল আর্জেন্টিনা-জার্মানির ফাইনালের মহারণে। মাঝে ঘটে গেল কত ঘটনা। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারকে কামড় দিল সুয়ারেজ। নেইমারকে আহত করলো জুনেগা। আবার জুনেগার সতীর্থ হামেস রড্রিগেজ হল এবারের আসরের সেরা উদীয়মান তারকা। গোলকিপাররা দেখাল তাদের গ্ল্যাভসের নৈপুন্য। দুই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নকে হারিয়ে নতুন রূপকথা লিখল কোস্টারিকা। কোন ম্যাচে না হেরেই হল্যান্ডের কাছে টাইব্রেকারে পরাস্ত হয়ে বিদায় নিল তারা।

কোস্টারিকার রূপকথার কাহিনীর মতো জার্মানির কাছে ব্রাজিলের সাত গোল খাওয়ার দু:স্বপ্ন বহুদিন সবার মুখে মুখে ফিরবে। আর পেতে পেতে মেসির বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে নিতে না পারার দু:খ। ফাইনালে হেরে গিয়ে আর্জেন্টিনার কান্নার সঙ্গী হয়েছে সাত সাগর তের নদীর পাড়ের বাংলা নামের বদ্বীপও। বুকের মধ্যে কেমন যেন সর্বস্ব হারানোর দু:খ। অনেকে সেই রাতে মনের কষ্টে সেহরী না খেয়েই রোজা রেখেছেন। অধিক শোকে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারাও গেছেন দুইজন। প্রিয় দলের প্রতি মানুষের সেকি পাগলপারা ভালোবাসা।

ওয়ার্ল্ডকাপের কদিন আর্জেন্টাইন-বাঙ্গালী-ব্রাজিলিয়ান একই ঐকতানে গেয়েছে গান। ‘আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে। গাছে গাছে পাখি ডাকে….।’ আবার চোখের জলে ভেসেছে একইভাবে। ‘চোখের জলের হয় না কোন রঙ, তবু কত রঙের ছবি আছে আঁকা। ’

আহারে ওয়ার্ল্ডকাপ শেষ। নেই কোন গান, নেই কোন অকারণে কষ্ট পাওয়া, আবার ভু্লোক-দ্যুলোক ভেদিয়া তুরিয়ানন্দে শামিল হওয়া। সর্বত্র আবার সেই পুরনো, কেজো, ব্যস্ত চেহারা। কেন যে ওয়ার্ল্ডকাপ এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায় !

ওয়ার্ল্ডকাপ যেন একটা পাখী। যার দিনগুলি পাখির মতো উড়ে চলে যায়। পড়ে থাকে শুধু স্মৃতির পালক।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.