সোভিয়েত নারীর দেশে-১৫

Petersburg 1সুপ্রীতি ধর: এই যাত্রায় মস্কোতে গিয়ে যে পরিমাণ হৈ-হুল্লোড় করলাম, তারপর আমার সেখান থেকে আসাটাই কঠিন ছিল। বার বার মনে হচ্ছিল, খুব বড় অন্যায় করা হয়েছে আমার সাথে। এতো বাঙালী এখানে, এতো কথা বলার মানুষ, এতো আড্ডা দেয়ার জায়গা ছেড়ে কোথায় কোন হিম হিম ঠাণ্ডায় উপসাগরের তীরে বাঙালী বিচ্যুত হয়ে থাকি!

এক বিকেলে সুস্মি-শাওনের সাথে গেলাম দ্বীজেন কাকুর (দ্বীজেন শর্মা) বাসায়। দরজা খুলতেই এক কুকুর এমন লাফ দিয়ে এসে উপরে পড়লো যে, যতক্ষণ ছিলাম, ভয়ে সেঁটিয়ে ছিলাম। বাসাভর্তি বই আর বারান্দাভর্তি পাখি। সব মিলিয়ে প্রথম সাক্ষাতেই কাকুকে আমার ভাল লেগে গেল। অবশ্য এমন মানুষকে ভাল না লাগাটাই অস্বাভাবিক।

মস্কোতে সুস্মির সাথে চলায় কোন দ্বিধা না থাকলেও শাওনকে নিয়ে যাওয়া মানে অবশ্যই পথ হারানোর একটা বিষয় থাকতো। প্রবাদ আছে, কোনদিন পথ না ভুলে সে নাকি তার নিজের হোস্টেলেই পৌঁছাতে পারতো না।

শীতের ছুটিতে আড্ডার পর আড্ডা, রাত জেগে দিনভর ঘুমানো, দিন চলে যাচ্ছিল বেশ।

এরই মাঝে বাংলাদেশ ছাত্র সংগঠনের সম্মেলনের দিন ঘনিয়ে এলো। চেনাজানা সবাই যাবে কৃষ্ণসাগর পাড়ের ওদেসা শহরে। আমার তো ভিসা নেই। কিভাবে যেন ম্যানেজ হয়ে গেল। আর এতো এতো মানুষ যাবে, সেখানে আলাদা করে ভিসা থাকলেই কি, না থাকলেই কি! গ্রুপ ভিসায় রওনা হলাম অনেকের সাথে আমিও। ট্রেনের পুরো ওয়াগন আমাদের দখলে। একেকটি কামরায় চারজন করে। আমার টিকেটও নেই। ফলে একটা কামরায় পাঁচজন হয়ে গেল। আমি, সুস্মি, শাওন, সাত্তার ভাই আর মোক্তার ভাই। মোক্তার ভাইকে তখনও আমরা কাণ্ডারি বলেই জানি। আমাদের অভিভাবক। উনি এই ঝামেলা থেকে বাঁচতে ওয়াগনের বুড়ি অ্যাটেনডেন্টের সাথে খাতির জমালেন। একটু পর পর গিয়ে চা খেতে চান, এটা চান, ওটা চান। বুড়িও মজা পান। গান-বাজনা-কবিতা-গানের প্রতিযোগিতা-হাসি-ঠাট্টা-মজা করে করে চলে গেল ৩৬ ঘন্টা জার্নির অনেকখানি সময়।

বিপদ হয়ে গেল পরদিন ভোরে। সেখানকার নিয়ম অনুযায়ী সকালে অ্যাটেনডেন্ট চা দিয়ে যান কামরায়। তো, উনি দরজা খুলেই দেখেন যে, একটা সিটে শাওন-সুস্মি আড়াআড়ি করে ঘুমানো, অপর তিনটাতে আমরা তিনজন। সেই যে মাথা বিগড়ালো সেই বুড়ির, আর তো কোন পদ্ধতিই খাটে না মোক্তার ভাইয়ের। কোনো বিশেষণেই তখন আর মন গলে না তার। নিয়ম কেন ভাঙা হলো, সেই মহাপ্রশ্নের মুখে আমরা তো অপরাধী, নিরুত্তর।

উনাকে যে আমরা একটা টিকেটের টাকা দিয়ে দেবো, সেই উপায়ও নেই। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখনও আছে। কাজেই সততা প্রায় সবজায়গাতেই। আদর্শ মেনে চলছে অধিকাংশই। কিছুতেই নিয়মের ব্যত্যয় হওয়ার উপায় নেই। আমাকে দেখিয়ে উনাকে অনেক করে বোঝানো হলো যে, ‘এই যে এই মেয়েটা লেনিনগ্রাদ থেকে চলে এসেছে আমাদের সাথে যাবে বলে, ওকে না নিয়ে আমরা যাই কি করে!’ এই কথা, সেই কথার পর উনি রাজী হলেন এভাবে যে, পরবর্তী স্টেশনে নেমে আরেকটা টিকেট কেটে নিতে হবে। আমরা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। অপরাধ করতে চাইনি, টিকেট ছাড়া যেতেও চাইনি কেউ, কিন্তু শেষ মূহূর্তে টিকেট না পেয়ে অবস্থাটা এমন হয়ে যাওয়ায় খুবই খারাপ লাগছিল সবার। যাক্, শেষমেষ পৌঁছালাম ওদেসা শহরে।

সারা সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে দলের পর দল ধরে বাঙালীরা আসছে সম্মেলনে। থাকার জায়গা বরাদ্দ হলো হোস্টেল। সেকী ঠাণ্ডা সেই বছর! স্মরণকালের ভয়াবহ বরফ পড়েছিল সেবার। হোস্টেল রুমে হিটিং কাজ না করায় রাতে ঘুমানো দায় হয়ে পড়েছিল। একটা রুমে আমি, সুস্মি আর শাওন। দুটো বিছানা একসাথে করে মাথাপিছু দুটো করে কম্বল একসাথে করে তিনজন জড়াজড়ি করেও শীত মানাতে পারিনি আমরা। পরনে তো গরম জ্যাকেট-কোট সবই ছিল। ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতা!

তবে ঘুম কি আর হয়! এতো মানুষের মাঝে ঘুম মানেই জীবন থেকে অনেককিছু হারিয়ে ফেলা। কে হারাতে চায় তা? আর এসেছি তো সবটুকু মজা পরখ করে দেখতে, বিদেশের মাটিতে এতো বাঙালীর স্পর্শ তো সারাবছর পাবো না, তাই ঘুম হারাম করে দিলাম আমরা। তারপরও ভোররাতে চোখটা বুঁজে আসে।

Black sea 2ভোরবেলায় তপু এসে ডেকে তুললো আমাদের। সাগর পাড়ে যাবে সে, আমাদেরও নিয়ে যাবে। রাত জাগা চোখে ভোরের ঘুম তখন। তারপরও কষ্ট করে নিজেকে টেনে তুললাম। সাথে শাওন-সুস্মিকেও টেনে তোলা হলো। চললাম সবাই সাগর পাড়ে। কিন্তু কৃষ্ণসাগরের সেই জল কোথায়? যেদিকে তাকাই শুধু সাদা, বরফে আবৃত বিশাল প্রান্তর। ওটাই নাকি সমুদ্র। ধীরপায়ে আমরা হাঁটছি। কোথা থেকে সাগরের শুরু, তাই বুঝতে পারছিলাম না। আইসবার্গ বা হিমশৈল নিয়ে আতংক আছে। কাজেই আমাদের গতি কমে এলো।

সন্তর্পণে কিছুদূর গিয়ে ছবি তুলে ফেরত এলাম আমরা। শুনেছি, এরপর আরও অনেকগুলো গ্রুপ গিয়েছিল হাঁটতে, তাদের মধ্যে চম্পক নামে তিবিলিসির একজন পড়ে গিয়েছিল সমুদ্রের জলে। তাকে টেনে তোলা ছিল রীতিমতোন দু:সাধ্য। সেবার প্রাণে বেঁচে গেলেও চম্পক (আমাদেরই ব্যাচমেট) পরে মারা যায় কোন এক দুর্ঘটনায়।

সেই সম্মেলনেই দেখা হয়েছিল আজকের নারায়ণগঞ্জের মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী আপার সাথে। উনি তখন আমাদের এক ব্যাচ সিনিয়র, পড়েন মেডিকেলে। তখন কি কেউ জানতো, তার ভিতরে এমন নেতৃত্ব লুকিয়ে আছে! প্রিপারেটরি কোর্সে ফেলে আসা অন্যান্য দেশের বন্ধুদের সাথেও দেখা হয়েছিল আমার।  সেটাই শেষ দেখা।

বিশেষভাবে দেখা করতে গিয়েছিলাম খালিদ আল মুসাননেফ নামে ইয়েমেনের একজনের সাথে। ডাক্তারি পড়ছিল সে। কিন্তু খালিদ ছিল না ওদেসায়, তাই দেখাও হয়নি। কিন্তু তার রুমে গিয়ে অবাক হয়ে গেছিলাম। বিছানার ওপরে দেয়ালে নানাকিছু সাঁটানো। রুটিন থেকে শুরু করে সুন্দর সুন্দর ভিউকার্ড। এর মাঝেই এককোণায় আমার একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি। নিচে বাংলায় লেখা আমার ডাক নাম। সেইসময়ই জেনেছিলাম ওর ভাললাগার কথা। আর কোনদিন জানাও হয়নি, কথাও হয়নি। তবে একটা ভালোলাগা বোধ আমায় এখনও তাড়া করে বিষয়টা ভাবতেই।

সম্মেলনের কয়দিন ভুলেই গেছিলাম আমার আলাদা কোন জীবন আছে। আমি এই জগতেরই আরেকটি শহরের নিভৃত বাসিন্দা। বিশ্ববিদ্যালয়ে একা। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমি বর্তমানে আনন্দ মাটি করতে রাজী নই মোটেও। তাই লেপ্টে রইলাম সবার সাথে। ফিরে গেলাম মস্কো। সেখান থেকে আবার নিজ ঠিকানায় প্রত্যাবর্তন।Black sea3

মস্কোতে শীতের মূল সময়টা কাটিয়ে এলেও এতো ঠাণ্ডা লাগেনি, যতটা এই সমুদ্রপাড়ের শহরের পাগলা হাওয়ার দাপট। এমনকি ওদেসার সেই দিনগুলিও যেন উত্তরের এই হাওয়ার কাছে নস্যি। বাতাসের জোর এতোটাই প্রবল যে, মাঝে মাঝে শক্তি হারিয়ে ফেলতাম ঘরে ফিরতে গিয়ে, উড়িয়ে নিয়ে যেত। দিন-রাত সব সমান শীতে। লাইট জ্বেলে জীবনযাপন চলে। ঘড়ি ধরে চলে কাজকর্ম।  ক্লাসও করি ঘড়ে ধরে ধরে। মাকে চিঠি লিখি, ‘মা, দিনের আলো তো দেখি না’। মা অবাক হয়ে যায় এসব গল্প শুনে।

লেনিনগ্রাদের বাঙালীদের আবিষ্কার করলাম বেশ অন্তর্মুখী। খুব একটা যেতো না কোথাও। নিজেদের মাঝেই তাদের চলাচল। আর মেয়েও তো ছিলাম আমরা মোটে পাঁচজন। আর সবাই যে যার জায়গায় যেন বন্দী। সেখানে আমি হয়ে পড়লাম ঠিক উল্টো চরিত্রের। লম্ফ-ঝম্প কোনকিছুতেই পিছপা হই না, কোথাও যাওয়ার কথায় এক পায়ে খাড়া আমি। শুধু সিনিয়র শিউলী আপা ব্যতিক্রম, কোথাও তার যেতে হতো না, সবাই আসতো তার কাছে। সেই ৪৩০ নম্বর রুমে।
২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২৬শে মার্চ, পহেলা বৈশাখ এসব প্রোগ্রামে নতুন করে পরিচয় হয় সবার সাথে। সাংস্কৃতিক পরিচয় যাকে বলে। গান-নাচ কিছু না জানলেও দিব্যি চালিয়ে দিলাম অনুষ্ঠান। হাস্যকর আর কী!

সমস্যাটা হলো যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার চাপ তেমন না থাকায়, আর ঘুরাঘুরির বদভ্যাসের কারণে দেশ থেকে যে ডেলিগ্যাটই আসতেন লেনিনগ্রাদে, আমার ওপর দায়িত্ব পড়তো তাদের নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর। সেই কারণে কিছুটা মন খারাপ বা মাঝে মাঝে অস্বস্তি ঠেকলেও লাভ যেটা হয়েছিল যে, সেই সুবাদে আমার সবগুলো আর্ট মিউজিয়াম ছিল নখদর্পণে। এর ইতিহাস, চরিত্র সব। হেরমিটেজের অলি-গলি মুখস্ত হয়ে গেছিল প্রায়। তাছাড়া ক্লাসে পড়ার অংশ হিসেবেও আমাদের নিয়ে যাওয়া হতো বিভিন্ন স্থানে, সিনেমা দেখতেও নিয়ে যেতেন শিক্ষকরা।

ধরেন, দস্তয়েভস্কির কোনো বই আমাদের পড়ানো হচ্ছে, সেই উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ছবিটিও আমাদের দেখানো হতো গল্পপড়া শেষে। যাতে আমরা রিভিউ লিখতে পারি। অসম্ভব রকমের এক সিস্টেম তাদের। ফলে ছবি দেখার নেশা আরও বেড়ে গিয়েছিল। রোববার সকাল সারা শহর যখন ঘুমিয়ে বা প্রায় নিস্তব্ধ, তখনও আমি ছুটতাম পাড়ার সিনেমা হলে ছোটদের রবিনসন ক্রুশো জাতীয় সিনেমা দেখতে।

একই বছর সামারে ২০ দিনের এক্সকারশানে গেলাম ইউক্রেনের ১০টি শহরে। কিয়েভ থেকে শুরু হয়ে আবার কিয়েভেই শেষ।  সেই যাত্রায় জীবনের আরেকটা মোড় তৈরি হয়েছিল আমার। সেকথা না হয় উহ্যই থাক। (চলবে)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.