ভাঙ্গা-গড়ায় নিত্য জীবন

Lee
সালেহা ইয়াসমীন লাইলী

সালেহা ইয়াসমীন লাইলী: সারাদিন ভ্যাপসা গরমে নিউজের কাজে ব্যস্ত কেটেছে। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উপলব্ধিহয়েছে যেন। বিকেলে বিছানায় হেলান দিয়ে পাশে রাখা অর্ধ সমাপ্ত সিরাজউদ্দিন সাথী’র ‘দাস বিদ্রোহের কথা’ বইটি হাতে নিয়ে ভাঁজ করে রাখা পাতাটি তুলে পড়ার জন্য আওড়াতে লাগলাম।

‘আওড়াতে’ শব্দটা ব্যবহার করছি এই জন্য যে বার বার একটি লাইন পড়ছি, কিন্তু কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না। মানে, পাঠে কোনভাবেই নিবিষ্ট হতে পারি না। এমনিতেই আমার কোন কিছু পড়তে একটু বেশী সময় লাগে।আগ্রহের বিষয় হলেতো কথাই নেই। এক একটি শব্দ, বাক্য যেন চিবিয়ে চিবিয়ে স্বাদ নেয়ার চেষ্টা। বন্ধুরা আমাকে পড়তে দেখলেই বলে আমি নাকি পড়া নিয়ে জাবরকাটি। মানে গিলে ফেলে আবারো মুখে এনে চিবাই। আমি অবশ্য অনেক বড় লেখক-পাঠককে আমার চেয়েওবেশী জাবরকাটতে দেখেছি। তাই নিজের এমন কর্মের জন্য অনুশোচনা নেই।

কিন্তু এই পাঠে জাবরকাটা তো দূরের কথা,একবারই গিলতে পারছি না। শিরোনামে দাস বিদ্রোহের কথা লেখাটি দেখার পর ঐ দাস শব্দটার মাঝে আটকে আছি কয়েকদিন। কত ধরনের দাসত্ব আছে মানুষের? অদৃশ্য শৃঙ্খল পরিয়ে রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার দাসত্ব করতে বাধ্য করে চলে। মনের শৃঙ্খল যদি মনকেও দাস করে রাখে তার মুক্তি কোথায়? আবার আমিই বা কেন চিন্তাকে দাস বানিয়ে রেখেছি- এমন প্রশ্ন গুলোর উত্তর খুঁজতে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে বিকেল। চিন্তার জট ক্রমে দম বন্ধ করে দিতে থাকে।ভারী হয়ে উঠে বুক। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে বেড়িয়ে পড়ি রাস্তায়। সঙ্গী হয় শুধু পায়ের শক্ত জুতাজোড়া।

আকাশে অনেক মেঘ। প্রচণ্ড গরম। একটুও বাতাস লাগে না শরীরে। অন্ধকার জেঁকে আসে ক্রমশঃ। তবুও হাঁটতে হাঁটতে ধরলা নদীর বাঁধের দিকে চলে যাই। শুনশান রাস্তা। পুরো পথ জুড়ে দুই-চারজন মানুষের দেখা মেলে, যারা আকাশের মেজাজ বুঝতে পেরে তড়িঘড়ি ঘরে ফিরছে। আমিও সজোরে ছুটি, তবে উল্টো পথে। হাঁটি তো হাঁটিই। পথের বাঁকগুলো যেন বার বার ঘরের কথা মনে করিয়ে দেয়, মনে করিযে দেয় দাসত্বের কথা। আমি বাঁক দেখতে চাই না, ঘরে ফিরতে চাই না!সোজা সামনে চলতে চাচ্ছি। কিন্তু বাঁক আমাকে বাঁকিয়ে দিতে থাকে, মনে করিয়ে দিতে থাকে। খুব শুণ্য বোধ করতে থাকি। তবু শুণ্যতা ডিঙিয়ে এগিয়ে চলি সামনে। হঠাৎ ক্ষিপ্রগতির বিজলীর ঝলকানীতে নিজেকে দেখতে পাই। দেখতে পাই পথও। অনেক দূরেএসে পড়েছি। একা। জনশূন্য নিস্তব্ধ গ্রামের পথ। এবার ক্লান্ত লাগতে শুরু করে। বসে পড়ি একটা কালভার্টের গায়ে। সাথে সাথেই ঝম ঝম করে বৃষ্টি। আশেপাশে অনেক দূর পর্যন্তকোন বাড়িঘর নাই।

বড় বড় ফোঁটার মাটিতে আছড়েপড়ার শব্দ।চোখে মুখে পানির শক্ত স্পর্শলাগে। লাগুক। আমি বসে ভিজতে থাকি একা, অন্ধকার পথের ধারে। কেন জানি বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আমার খুব কাঁদতে ইচ্ছে করে। আনন্দে উদ্বেলিত হতেও ইচ্ছে করে। ভিজে ভিজে মনের দাসত্বগুলো খুলে ফেলার প্রাণান্তর চেষ্টা করতে থাকি। বৃষ্টির সাথে তাল দিয়ে গলতে থাকে মনও। একটুও আলগা হয় যদি মনের শেকল। বৃষ্টি চলতেই থাকে বেশ খানিকটা সময়। তারপর কখন যেন কমতে কমতে থেমে যায়।

পুরোটা সময় জুড়ে ভাবি, কেমন আছি আমি? জবাব খুঁজে খুঁজে হয়রান হই। পাই না। কাউকে কখনও বলা হয় না কেমন আছি বা কেমন থাকি। যদিও তেমন কেউ নেই জানতে চাওয়ার। যদিও কেউ বিনয় দেখাতে কুশল জানতে চায় সেটাও হয় বলার জন্য বলা! জবাবটাও তেমন হয়। কিন্তু বিধাতাই কি জানেন? আমার বিশ্বাস জানেন না। তাই তাকেও আর কখনই বলা হয় না।

বলেই বা কি হবে? এই ভাল বা মন্দ থাকা-না থাকায় উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো সবার কেউ থাকে না। যতটা উদ্বিগ্ন থাকে পাছে(পিছনে)কথা বলার লোক। গাধার পিঠে চড়লেও দোষ, গাধাকে পিঠে নিলেও দোষ। তাদের নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করার অত সময়ও যে নেই। তবুও কেন যেন ভাবনা এসে ভীড় করে! সেটা কোন সন্ধ্যারকথা, কোন প্রভাতের, কোন গোধূলী বেলার। কেমন আছি আজকাল? কেমনই বা থাকতে চেয়েছি?

ভিজে জবজবে কাপড়ে জুতায় এবার উল্টা টানে ছুটতে থাকি। কযেকগুণ বেশী সময় নিয়ে ফিরি। স্নান সেরে আবারো বইটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে বন্ধ করতে থাকি।পড়া হয়না একটা বাক্যও। ল্যাপটপটা নিয়ে লিখতে বসা। কষ্টগুলো লিখে ছিঁড়ে ফেললেই নাকি কষ্ট কমে যায়। কিন্তু ল্যাপটপে লেখা কষ্টগুলো ছিঁড়ে ফেলার সুযোগ কই? তাই ক্রমেই মালার কাঠির মতো গেঁথে গেঁথে রেখে দেয়া হয়।

কোন কাঠিতেকেমন স্বাধীন আমি? কোনটাতে কতবার শ্বাস নেব ঠিক করে দেবে বিধাতা নামের সমাজ? আবার কোনটাতে কি ভাবব তারও সীমা ঠিক করে লক্ষণ রেখা টেনে দেয় অন্যকেউ! এভাবে কাঠি এগোয়।মালাও বাড়ে।

রাতভর নিকষ অন্ধকার ঘরটায় বাতি জ্বালালেও হিস হিস করা কবরের অন্ধকার, শ্মশানের নিস্তব্ধতা। জানালা খুললেই ঢুকে পড়ে অনুশাসনের প্রেতাত্মারা। দরজার খিল আলগা করলেই দৈত্যরুপে হুংকার তোলে সামাজিক খড়গ। আবারো গুটিয়ে নিয়ে বন্ধ কবরে ঢুকে পড়ি। অনন্ত নরকবাস।

আমারো যে একটা জানালা চাই- আলো আসার। ছোট্ট একটা খিড়কি হলেও চলে। নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য কিছু বাতাসও তো চাই। রোয়াক বেয়ে চুইয়ে পড়া বৃষ্টি ছুঁতে চাই হাত বাড়িয়ে। একটা দরজাও দরকার। কিছু উত্তাপ আসুক প্রাণ নিয়ে। আগে তো জীবন পাই, তারপর না হয় নরকেই–। আমিও বুঝে যেতে চাই জীবনের অনুরণন!

রোজ এমন ভাবনায় ভেঙ্গে ভেঙ্গে টুকরো করি নিজেকে। আবার গড়ি কল্পনায়।নিজের এমন ভাঙ্গাগড়ায় এগিয়ে চলি পথ। হয়তো গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি কোথাও! তবুও অপেক্ষা আর একটি দিনের। আবারো কাজ, আবারো ছুটতে থাকা কোথাও!

লেখক পরিচিতি:সাংবাদিক ও লেখক

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.