চরম আশংকায় টাঙ্গাইলের যৌনকর্মীরা

stop_violence_against_womenউইমেন চ্যাপ্টার: টানবাজার, কান্দুপট্টির পর এবার টাঙ্গাইলের প্রায় ২০০ বছরের পুরনো যৌনপল্লীটি ভেঙে দেয়া হয়েছে। উচ্ছেদ করা হয়েছে এর বাসিন্দাদের। উচ্ছেদ হওয়া যৌনকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, তারা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন। এখান থেকে উচ্ছেদ হওয়ায় তাদের মাথার ওপর থেকে কেবল ছাদটুকুই সরে যায়নি, কেড়ে নেয়া হয়েছে মুখের গ্রাসও। এখন তারা কোথায় যাবেন, কি করবেন, কি খাবেন, তা নিয়ে আতংকিত জীবন যাপন করছেন।

তবে দীর্ঘদিন ধরে ঐ যৌন পল্লীতে ছিলেন এমন ক’জন বলছেন, অধিকাংশ যৌনকর্মীরই পল্লীর বাইরে নিরাপদ কোন জায়গা না থাকায় তারা রয়েছেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়। পাশাপাশি রয়েছে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। ২৫ বছরের বেশি ওই পল্লীতে থাকা একজন যৌনকর্মী বলেন, “নিরাপদ কোন জায়গাই নেই। রাস্তা ঘাটে আছি সবাই। এখন কোথায় গেলে খেতে পারবো, ঘুমাতে পাবো সেটাই খুঁজছি।”

এই পেশায় থেকে যেতে চান কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমরা চলে যে যাবো তখন তো কিছু করে খেতে হবে। সেটা কে দিবে।”

হঠাৎ করে উচ্ছেদের শিকার হওয়া বা উচ্ছেদের পর যৌনকর্মীদের এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার হওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম ঘটেনি।

এর আগে রাজধানী ঢাকার একটি বড় যৌন পল্লী ছাড়াও নারায়ণগঞ্জের টানবাজারে দেশের বৃহত্তম যৌন পল্লী থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিলো বিপুল সংখ্যক যৌনকর্মীকে। প্রতিবারই উচ্ছেদের পর পুনর্বাসনের কথা বলে হয়। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনা।

তখনো তাদের পুনর্বাসনের জন্য নানা উদ্যোগের কথা বলা হয়েছিলো সরকারের পক্ষ থেকে।

আদৌ কি তা কোন কার্যকর পদক্ষেপ ছিল? এই প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ সেক্স ওয়ার্কার্স নেটওয়ার্কের সভাপতি জয়া শিকদার বলেন, যৌনকর্মীদের পুনর্বাসনের জন্য পরিকল্পিত ও কার্যকর পদক্ষেপ কখনোই নেয়া হয়নি।

তিনি বলেন, “নারায়ণগঞ্জে যৌন পল্লী উচ্ছেদের পর তারা পুরো নারায়ণগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকায় হোটেল ছাড়াও পুরনো ঢাকায় ঘরে ঘরে ছোট ছোট মিনি ব্রথেল হচ্ছে।”

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় কোন ভূমিকা রাখছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “তাদের জনগোষ্ঠী সম্পর্কে সঠিক ধারণা নেই। একটা মানুষের জন্য একটা সেলাই মেশিন কি যথেষ্ট? সেলাই মেশিন দিলেই পুনর্বাসন হয়ে গেলো ?”

কিন্তু পুনর্বাসন ছাড়া এভাবে শত শত যৌনকর্মীকে একটি নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে যেতে বাধ্য করাকে ঝুঁকি হিসেবেই দেখছেন গবেষকরা।

বাংলাদেশে এ পেশার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড: জারিনা রহমান খানের।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে পেশাটি নিষিদ্ধ হলেও অনেক যৌনকর্মীই এফিডেভিট নিয়েই কাজ করে। যৌনপল্লী থেকে বের করে দিলে তারা যত্রতত্র ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হন।

“বস্তি ভেঙ্গে দিলে লোকেরা আরেকটি বস্তি করবে। কিন্তু এদের তো অসুবিধা। এরা কোথায় যাবে। রাষ্ট্রের একটা দায়িত্ব আছে না ? কোথায় যাবে কিভাবে থাকবে ঠিক না করে তো উচ্ছেদ করা যায়না।”

তবে বরাবরের মতো এবারো যৌনকর্মীরা কোথায় যাবে কিভাবে থাকবে সেটি নিশ্চিত না করেই টাঙ্গাইলে তাদের উচ্ছেদের ঘটনা ঘটলো।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মোহসিন আলী জানান, তার মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট প্রকল্প রয়েছে এ ধরনের নারীদের সহযোগিতা বা পুনর্বাসনের জন্য।

“আমরা আমাদের নির্দিষ্ট জায়গায় এ ধরনের নারীদের পুনর্বাসন করি। আমাদের লোকজন যাবে এবং দেখবে ওখানে কি হয়েছে।”

এর আগে যৌন পল্লী উচ্ছেদের পর যৌনকর্মীরা সে প্রকল্পের সহযোগিতা পেয়ে পুনর্বাসিত হতে পেরেছে কি – না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এসব ক্ষেত্রে তারা বিবেচনায় নিয়ে থাকেন রেজিস্টার্ড যৌনকর্মীদের।

তবে গবেষকরা বলছেন বাংলাদেশে রেজিস্টার্ড যৌনকর্মীর সংখ্যা খুবই কম আর সে কারণেই পুনর্বাসন কর্মসূচি সফল হয়না।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.