কাজে আসছে না পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন

Mirror 2ঝর্ণা মনি : পাঁচ বছর আগে শরীয়তপুর জেলার জাজিরা থানার নাইজারপুর গ্রামের আবুল বারি শিকদারের ছেলে শাহিন শিকদারের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল ভোলার চরফ্যাশানের খোরশেদ রাঢ়ির মেয়ে শাহিনুর বেগমের। বিয়ের পর থেকেই তাদের মধ্যে ঝগড়া চলছিল। সম্প্রতি (৫ এপ্রিল) কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে স্ত্রী শাহিনুর বেগমকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে তার  স্বামী শাহিন।

শুধু শাহিনুরই নন, স্বামী বা শ্বশুড়বড়ির আত্মীয়স্বজনের হাতে কত হতভাগ্য নারী জীবন দিচ্ছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গণমাধ্যমেও সব সংবাদ প্রকাশিত না হওয়ায় আড়ালেই থেকে যাচ্ছে অধিকাংশ নির্যাতনের খবর।

পারিবারিক সহিংসতা এখন আমাদের দেশে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সহিংসতার শিকার নারীরা আইনের শরণাপন্ন হবার সুযোগ তৈরি হয়েছে। নারী ও মানবাধিকার আন্দোলনকারী সংগঠন সমূহের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে সরকার ২০১০ সালের অক্টোবর মাসে ‘পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা’ আইন পাশ করে। এই আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, পারিবারিক সহিংসতা বলতে পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে, এমন কোনো ব্যক্তি কর্তৃক অন্য কোনো নারী বা শিশুর ওপর শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন অথবা আর্থিক শাস্তিকে বোঝায়। শারীরিক নির্যাতন বলতে পারিবারিক সহিংসতা সংঘটিত হওয়ার সময় অভিযুক্ত ব্যক্তি কর্তৃক এমন কোনো কাজ বা আচরণ, যার ফলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির জীবন, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, শরীরের কোনো অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয় অথবা হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে অপরাধমূলক কাজ করতে বাধ্য করা অথবা প্ররোচনা করাও এর অন্তর্ভুক্ত।

আইনের ধারা ৪-এ বলা হয়েছে, যদি কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার পারিবারিক সহিংসতার সংবাদ প্রাপ্ত হন, তাহলে তিনি নির্যাতিত ব্যক্তিকে আইন অনুসারে প্রতিকার পাওয়ার অধিকার অবহিত করবেন, চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তি, বিনা খরচে আইনগত সহায়তা প্রাপ্তি প্রভৃতি বিষয় অবহিত করবেন। এছাড়া ধারা ৫ ও ৬-এ বলা হয়েছে, সরকারের মহিলা অধিদপ্তর কর্তৃক নিযুক্ত একজন থানা পর্যায়ের কর্মকর্তা, যিনি প্রয়োগকারী কর্মকর্তা হবেন, তিনি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাবলি সম্পর্কে আদালতের কাছে প্রতিবেদন পেশ করবেন। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে বিনা মূল্যে দরখাস্ত দাখিল, চিকিৎসাসেবা, আশ্রয় নিবাসে প্রেরণ প্রভৃতিতে সহায়তা করবেন এবং ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে অবহিত করবেন। কিন্তু পারিবারিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে আইন যেন ঠুঁঠো জগন্নাথ। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রতিনিয়তই বাড়ছে নির্যাতন।

মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ নারী পারিবারিক নির্যাতনের শিকার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন (ভিএডব্লিউ) সার্ভে ২০১১’ জরিপ অনুযায়ী, দেশের বিবাহিত নারীদের ৮৭ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশ বলেছেন, তারা স্বামীর মাধ্যমে শারীরিক নির্যাতন ভোগ করেছেন, ৩৬ শতাংশ যৌন নির্যাতন, ৮২ শতাংশ মানসিক এবং ৫৩ শতাংশ নারী স্বামীর মাধ্যমে অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

জরিপে, ৮৮ শতাংশ বলেছেন, তারা স্বামীর সংসারে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন, ৮৬ শতাংশ হন মানসিক নির্যাতনের শিকার আর যৌন নির্যাতনের শিকার হন ৫৫ শতাংশ। এর পরেই রয়েছে কর্মক্ষেত্র। ১৬ শতাংশ নারী কর্মক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতন, ২৬ শতাংশ মানসিক নির্যাতন আর ২৯ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৭ বছরে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মোট ৮৬৭ জন নারী। এর মধ্যে ২০০৬ সালে ৩০১ জন, ২০০৭ সালে ২৮৩, ২০০৮ সালে ৩১২, ২০০৯ সালে ২৮১, ২০১০ সালে ৩৯৭, ২০১২ সালে ৪৮২ এবং ২০১৩ সালে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩৮৫ জন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্বে নারী নির্যাতনের ইতিহাস অতি পুরানো। আরব দেশে আইয়্যামে জাহেলিয়ার যুগে কন্যা শিশুদের জ্যান্ত কবর দেয়া হতো। প্রাচীন ভারতে হিন্দু বিধবাদের স্বামীর সঙ্গে জলন্ত চিতায় পুড়িয়ে মারা হতো। বর্তমান সময়ে নতুন বোতলে পুরাতন মদের মতোই পাল্টেছে নির্যাতনের ধরন, বদলে গেছে এর সংজ্ঞা ও ক্ষেত্র। ঘরে বাইরে সবর্ত্র নারীর জীবনের নিরাপত্তা আজ শূণ্যের কোটায়। ধর্ষণ, যৌতুক, খুন, যৌন নির্যাতন, এসিড নিক্ষেপ, ইভটিজিংসহ বিভিন্ন ধরণের পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে যত্রতত্র।

নারী নেত্রীদের মতে, এখন প্রয়োজন সকলের বিবেকবোধ জাগ্রত করার, প্রয়োজন এ সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো।  কারণ নারী ও কন্যা শিশুদের উপর এই পারিবারিক সহিংসতা এখন পর্যন্ত অপক্ষাকৃত উপেক্ষিত ও অনুচ্চারিত রয়ে গেছে।

এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারি অধ্যাপক শিল্পী রানী দে বলেন, বাংলাদেশের নারীরা শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিক নির্যাতনেরও শিকার হন। কিন্তু এসব নির্যাতনের কথা খুব একটা সামনে আসে না। এসব নির্যাতনের জন্য কোনো মামলাও হয় না। শুধু নিম্নবিত্ত বা বিত্তহীন বা অশিক্ষিত পরিবারগুলোতেই নারীরা মানসিক নির্যাতনের শিকার হন না, এ ক্ষেত্রে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত নারীরাও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন।

সমাজবিজ্ঞানী ড. এ এস এম আতীকুর রহমান বলেন, গোটা সমাজব্যবস্থায় যে ইতিবাচক পরিবর্তন হওয়া উচিৎ ছিল তা হয়নি। এখনো সমস্ত দুর্ঘটনার জন্য নারীকে দায়ী করা হয়। নারীর জন্য সুরক্ষিত পারিবারিক পরিবেশ আমরা আজও তৈরি করতে পারিনি। ফলে নির্যাতন না কমে বাড়ছে।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির (বিএনডব্লিউএলএ) নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী বলেন, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ আইনটি একটি প্রতিরোধমূলক ও নমনীয় আইন। এটি পারিবারিক নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবেও স্বীকৃতি দিয়েছে। এ আইনের আওতায় দেশে ইতিমধ্যে ১১৫টির বেশি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে বিএনডব্লিউএলএ ৫০টির বেশি মামলা করেছে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.