ঘরে ফেরা…

Urmi ATN
ঊর্মি

ইশরাত জাহান ঊর্মি: আম্মাকে দুপুরে ফোন করে জিজ্ঞাসা করি, আম্মা কি রান্না কর? আম্মার গলা ভার। বলে,

শোলা কচুর ঘন্ট ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে, বাচ্চা রুই মাছের ঝোল….

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি, কতদিন তোমার হাতের শোলা কচু খাই না! আম্মা চাপা ক্ষোভ আর অসন্তোষ মিশিয়ে বলে,

: কেমনে খাবা, তোমরা আসবা না, গরম তোমাদের সহ্য হয় না, আমরা গ্রামে থাকি, এতদিন তাও অর্চি আসতো, এখন সেও…

কান্নায় আম্মার গলা ভারী হয়ে আসে। অর্চি আমার ছোট বোন। গত ডিসেম্বরে বিয়ে হয়েছে। ওরও শশুরবাড়ি, লোক-লৌকিকতা, কিভাবে ঈদ করতে বাড়ি যায়! আম্মা আবার বলে,

: অর্চি মার্কেটে গিয়ে বারবার ফোন দিচ্ছে, আম্মু কি রং-এর জামদানী কিনবো তোমার জন্য, এই-সেই, আমি রাগ হয়ে বলছি, আমার কোন শাড়ি-টাড়ি লাগবে না, আমার কোন ঈদ নাই, আমি একা, একাই থাকি, আমার জন্য খবরদার তোমরা কিছু কিনবা না।

একটু থেমে আমাকে বলে,

: তুমি যে টাকা দিছ তোমার আব্বুকে, তাও আমি তুলে রাখছি, ফেরত নিয়ে নিও, আমার কিচ্ছু লাগবে না…

আমার মা। কি যে তার রূপ আর ব্যক্তিত্ব ছিল এককালে! বাইরে যখন সূতী শাড়ী আর মেলানো একরং-এর ব্লাউজ দিয়ে পরে বের হতেন, আমাদের ছোট্ট মফস্বলের মানুষজন হাঁ করে তাকিয়ে থাকতো, সামথিং ডিফারেন্ট শী ওয়াজ!

সিদ্ধার্থ কাকু বলতো,

: ঊর্মি, তোমার আম্মা যদি ঢাকায় থাকতেন, ওরকম সুযোগ পেতেন তাহলে সুলতানা কামাল বা এরকম কেউ হতেন।

সেই আম্মা। ডায়বেটিস, হার্টের অসুখ ইত্যাদি ইত্যাদির সাথে লড়াই লড়াই করে করে প্রায় পরাজিত। আম্মাই শিখিয়েছিল, ডাক্তারকে কখনও রোগের কথা বলতে লজ্জ্বা করবে না। ডাক্তার হলেন ডাক্তার। পুরুষ বা মহিলা হোক, সবার আগে তিনি ডাক্তার। তাকে মিথ্যা বলা বা লজ্জ্বা করার কিছু নাই। সেই আম্মাকেই যখন বারডেমে এনজিওগ্রাম করে বের করল, দেখি নি:শব্দ, কিন্তু চোখে পানি। আমি ট্রলির কাছে গিয়ে বলি,

: আম্মা খুব ব্যাথা পেয়েছ?

আমাকে অবাক করে আম্মা বলে,

: না, কিন্তু ছি ছি পুরুষ ডাক্তার, ম্যাক্সির ভেতর দিয়ে পাইপ দিয়ে…

আমি বুঝতে পারি, আম্মার বয়স হয়ে গেছে, আম্মা মানসিকভাবে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে।

ঈদে বাড়ি ফেরা হয় না। টেলিভিশনে চাকরি করি। এক ঈদে ছুটি পাই, আরেক ঈদে কাজ করতে হয়। রোজার ঈদে অফিস করি, কোরবানী ঈদে ছুটি নিয়ে বাসায় গরু সামলাই। পরে যাই বাড়িতে দেখা-টেখা করতে। ততদিনে ঈদ তো বটেই ঈদের আমেজও শেষ হয়ে যায়। আম্মা-আব্বু কিছু বলেন না। কখনই না। আমারও তাই মনে কখনও অনুতাপ হয়না। মনে হয় এটাই স্বাভাবিক। বাপের বাড়ি হলো মেয়েদের বীজতলা। ছোটবেলায় পোতা থাকে বীজ। চারা একটু বড় হলে বীজতলা থেকে তুলে নিয়ে শশুরবাড়ীর জমিতে পুঁতে দেওয়া হয়। আমরাও মিশে যাই।

নিজের সংসার, সন্তান, চাকরি। অথচ দায়িত্ব বা মায়ার ঐ জায়গাটা আমরা ভুলে যাই কেন? সবাই-ই কি আমার মতো? কই না তো! আমার চোখের সামনেই আমার ননদকে দেখছি মায়ের সাথে কত বন্ডিং! মিনিটে মিনিটে ফোন। প্রতিটি বিষয় নিয়ে আলোচনা। আমি কেন এরকম হলাম? সাব্বীরও তো কখনও বলেনি, ঈদে বাড়িতে যেও না। হয়তো সে যেতো না, তার মা আমাদের সঙ্গে থাকেন, মাকে ফেলে সে কীভাবে যাবে? কিন্তু আমাকেও তো আটকায়নি, আমি তো যেতে পারতাম, গেলাম না কেন? তখন তো বাচ্চাও ছিল না যে ওর গরম সহ্য করা নিয়ে ভাবতে হবে। তবে? আমি কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারছি না।

আমার মনে হলো, সব বাবা-মায়েরই একটা করে ‍”মানুষ না হওয়া” ছেলে-মেয়ে থাকা দরকার। যারা কৃতি হয়ে রাজধানী বা বিদেশ-বিভূঁই-এ ক্যারিয়ারের জন্য চলে যাবে না। মা-বাবা তাকে বকবে, গালি দেবে, বলবে, ‍”তোর কিছুই হলো না, জীবনে কিছুই করতে পারলি না, অকম্মা একটা, তোর ভাই-বোনদের দ্যাখ তো…” কথা শোনাবে কিন্তু সেই ছেলে বা মেয়েকেই বুকে নিয়ে ঘুমাবে। অসুখে, অবেলায় তারাই কাছে থাকবে। আমার নানু যেমন ছিলেন মেজো মামা। মেজো মামাকে রাজবাড়ীতে সবাই এক ডাকে চিনতো। আনোয়ার ভাই। রাত দুপুরে মামীকে ডেকে বলতেন, শিরিন খিচুরী রাঁধো তো, কয়েকজন ছাত্র আসছে, খাওয়াতে হবে। মামা ছাত্র রাজনীতি করতেন। কাচারী ঘরের টিন খুলে কোন অভাবীর ঝড়ে উড়ে যাওয়া বাড়িতে যেন দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু অন্য মামাদের মতো তার টাকা-পয়সা ছিল না। একবার না কি চাকরি পেয়েছিলেন, সুন্দরবনে ফরেস্ট রেঞ্জের কি চাকরী। একমাস না পুরাতেই চলে এসে নানুকে বলেছিলেন,

:আরে ধুর খালি নোনা ইলিশ, ওই খেয়ে থাকা যায়?

আমার সেই মামাই নানুর কাছে শেষজীবন পর্যন্ত ছিলেন।

খুব সাম্প্রদায়িক শোনাবে হয়তো কিন্তু আমার এ-ও মনে হয়, একটা ছেলে হওয়া জরুরি। সব বাবা-মায়েদের। ছেলে না থাকলে আসলে বিপদ। ছেলেরাই আসলে বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেয়। মেয়েরা আর কতটুকু পারে! ব্যতিক্রম তো অবশ্যই আছে, কিন্তু মোটা দাগে এটাই সত্য।  সব কথা কহতব্য নয়। সব ঘটনার ব্যাখ্যাও দেওয়া যায় না। শুধু ভাবি, একদিন ঠিক বাড়ি যাবো। দ্বীধা আর পিছুটানহীন। আমি তখন তাড়ায় থাকবো না। তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করবো আমার শৈশব, চেটে-পুটে খাবো আমার কৈশোর। আম্মা আমাকে আর বিয়ে হয়ে যাওয়া অন্য বাড়ির দাায়িত্ব নেয়া মেয়ে মনে করবে না, ঠিক আগের মতোই আমি বলবো, আমার মায়ের মতো ভাত মাখতে আর চুল বেনী করতে কেউ পারে না। ছোট্ট মেয়ের আ্যপ্রিসিয়েশনে মা-ও হাসবেন গর্বের হাসি…

কিন্তু তা কি আর হবে? হায় যে রজনী যায় ফিরাইবো তায় কেমনে…

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.