হাত বাড়িয়ে দেখি, কেউ নেই-৫

old man 2শুচি সঞ্জীবিতা: বেশ কয়েক বছর ধরেই হাজেরা বেগমের মাথাটা ঠিক জায়গায় নেই। যেকোনো কাজই এলোমেলো হয়ে যায়। আর এখন সবচেয়ে প্রিয় সন্তানটিকে হারিয়ে তিনি প্রায় পাগলের বেশে ছোটাছুটি করেন এখানে-সেখানে। ফাঁক পেলেই চলে যান বহুদূর। পাড়ার ছেলেরা খুঁজে-পেতে নিয়ে আসে, বাড়িতে তালা দেয়।

কিন্তু হাজেরা বেগমের মন মানে না, অস্থির অস্থির করে কার জন্য যেন, ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না। বড় ছেলেটার জন্যই তিনি জীবনভর জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে গেছেন, আর এই একমাত্র সন্তান যে কখনও মায়ের সাথে গলা চড়িয়ে কথা বলেনি, শত কিছুতেই না। সেই ছেলেটি যখন রোজার মাসের এক সকালে চলে গেল তাঁকে না বলে, তিনি বুঝতে পারেননি। তিনি এখনও জানেন, তাঁর ছেলেটা গভীর ঘুমে ছিল। অনেক ডেকেছিলেন, কিন্তু উঠেনি আর। সেই থেকে তিনি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন, একে-ওকে পেলেই জিজ্ঞাসা করেন ছেলেকে দেখেছে কিনা, সবাই সহানুভূতির চোখে তাকায় তাঁর দিকে, কিন্তু হাজেরা বেগমের উদভ্রান্ত মন আরও বেশি অস্থির হয়। উনি কাঁদেনও না। একবারই শুধু ছেলের কবরের কাছে নিয়ে যাওয়া হলে উনি অনেকক্ষণ বসেছিলেন কবরের পাশে। বুঝেছিলেন কিনা কে জানে! পরক্ষণেই ছেলের খোঁজ নিচ্ছিলেন। এখনও মাঝে মাঝে ছেলের খোঁজ করেন!

লেখাপড়া শেখা হয়নি কোনদিন, কিন্তু বাবার সম্পত্তির কল্যাণে গ্রামেরই এক মেধাবী ছেলের পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়ে বিনিময়ে হাজেরাকে বিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর বাবা। সেই মেধাবী ছেলে শুধু শিক্ষা জীবনেই না, কর্মক্ষেত্রেও সততার গুণে ব্যাপক সাফল্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু বাদ সেধেছিল হাজেরার সাথে তাঁর সংসার জীবন। পাঁচ-পাঁচটি ছেলেমেয়ে নিয়ে চাকরির জায়গায় থাকতে পারেননি, নিজ এলাকায় জায়গা কিনে বাড়ি করে দিয়েছিলেন। হাজেরা বেগমের ওপর দায়িত্ব ছিল ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করানোর। উনি ডাহা ফেল করেছেন সেই দায়িত্বে। হোসেন সাহেবও জানতে পারেননি মায়ের শিক্ষাহীনতা আর দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে ছেলেরা পড়ালেখাটাকে গুরুত্বই দিল না। কেউ দাঁড়াতে পারলো না জীবনে, হাজেরা বেগমের হাতও শক্ত হলো না। ফলাফল হলো, মেধাবী বাবার ঘরে জন্ম নিয়েও সন্তানদের কেউই বাবার ধারেকাছে ঘেঁষতে পারলো না। অবসরের সাথে সাথে হোসেন সাহেব চিরবিদায় নিলেও এর ঘানি টানতে হলো হাজেরা বেগমকেই।

কোনো ছেলেই দায়িত্বশীল হলো না, শিক্ষার ‘প্রকৃত আলো’য় কেউই আলোকিত হলো না, অথচ বাবা তাদের শিক্ষা কর্মকর্তা ছিলেন, সবার মধ্যে জ্ঞান বিতরণই ছিল যার দায়িত্ব, সেই তাঁর ছেলেমেয়েরা নিজেদের মধ্যেই বাধা পড়ে রইলো, বের হতে পারলো না বাইরের জগতে। হাজেরা বেগম এসব দেখে, সহ্য করতে না পেরে মরমে তিলে তিলে জ্ঞান হারাতে থাকেন। বুদ্ধিতে কুলোয় না কিছুই। ছোট মেয়েটার বিয়েটাও ভেঙে যায় বার বার। এ নিয়ে মায়ের ঘুম হয় না। মেয়েটার একটা গতি না করেই যদি তিনি চলে যান, তখন কে দেখবে মেয়েকে? বয়স বাড়তে থাকে, মায়ের মাথার ভিতরে পেশিগুলো আরও জটিল প্যাঁচ নিতে থাকে। তার মস্তিষ্কে কিভাবে যেন এই বিয়ে না হওয়ার বিষয়টা স্থায়ী আকার নেয়। এর অনেক বছর পর মেয়ের বিয়ে হলেও তিনি কারও সাথে দেখা হলেই বিয়ে হয়েছে কিনা জিজ্ঞাসা করেন। এমনকি নিজের মেজো ছেলের বউকেও সকাল-সন্ধ্যা দুবেলা একই প্রশ্ন করেন।

সেই মা’টা আজ ভীষণভাবে একা, বিপর্যস্ত। কেউ তার পাশে নেই। ফোনে মায়ের কথা জিজ্ঞাসা করলে কারও কাছ থেকেই ভাল কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। কেন কী হয়েছে, কী করেছেন উনি? সেই কথার আর জবাব নেই। ফোনের এ প্রান্ত থেকে মেয়ের উৎকণ্ঠার স্পর্শ পাওয়া যায়। মনটা খারাপ হয়ে যায় এসব কথা শুনে। বড় ছেলের বাচ্চাদের জন্য যখন মন টানতো, তখন বাধা হয়ে দাঁড়াতো সবাই, তিনি বলতে পারতেন না সেই কথা। এখন তো মন বলেই আর কোনকিছুর ঠাহর পান না হাজেরা বেগম। ছেলের বউও হারিয়ে গেছে, একমাত্র নাতি-নাতনিরাও সংসারের এই কোলাহলে জায়গা পায়নি কোনদিন।

একেবারেই শোনা কথা। একদিন বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতে মা আশ্রয় নেন মেজো ছেলের ঘরে। ছেলের অভিযোগ, মেয়েরা মাকে বের করে দিয়েছে। আর ছোট মেয়ে জানায়, ওই বাসায় যেতে না পারলে আম্মা ছটফট করে বলেই চলে গেছে বৃষ্টিতে। ঠিক বুঝতে পারি, মা আসলে একটা আশ্রয় চান। ঘোর পাগল না হলেও হতে বাকি নেই। সবসময় তিনি শুনতে পান, বড় ছেলে তাঁকে ডাকছে, কিন্তু তিনি যাওয়ার পথটাই কেবল হারিয়ে ফেলেছেন। তাইতো তিনি ঘুরে বেড়ান হাটে-মাঠে-ঘাটে।

এর মাঝেই ছোট ছেলেটাকে বিয়ে করানো হয়। আশা করা হয়, মাকে দেখে রাখবে সে। কিন্তু সেও তো নতুন। টাল সামলাতে পারে না। মা যেন এখন ভীষণ ভারী একটা সিন্দুকের মতোন, কেউ নিতে চায় না ঘরে জায়গা নেই বলে। আর যুগের তালে পড়ে সিন্দুকটাও পুরনো হয়ে গেছে, মরিচা ধরে গেছে। কিন্তু এই যে মা, যে সারাজীবন সন্তানদের রক্ষা করতে গিয়ে নিজের পিঠ এগিয়ে দিয়েছেন, সেই মা আজ কিভাবে, কোথায় থাকবেন?

এই দেশ, এই সমাজ বাতিল মানুষদের তোয়াক্কা করে না। ‘বড় ভাল মানুষ ছিল’ এইটুকু বলা ছাড়া তাদের বলারও যেন কিছু নেই। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা তো নেই-ই এসব মানুষের জন্য। তাহলে কি সবারই মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই?

বি.দ্র. এই লেখাটা আজই (১৫ জুলাই ২০১৪) সকালে লিখেছিলাম। আর রাত আটটার দিকে খবর পেলাম, সকাল থেকে সেই মা’কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সকালে নাকি উনি বাসা থেকে বেরিয়ে যান, এখনও আসেননি। সারা শহরে মাইকিং করা হচ্ছে। সবাই ছুটছে বিভিন্ন দিকে। রাত ১১টায় খবর আসে, পাওয়া গেছে তাঁকে, পুকুর থেকে তুলে আনা হয়েছে। কী আশ্চর্য জীবন!

(চলবে)

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.