সোভিয়েত নারীর দেশে-১৪

S. Petersburgসুপ্রীতি ধর: ক্রমেই লেনিনগ্রাদের সব বাঙালীর দেখা মিলছিল। নিজে থেকেই আসছিল তারা। ছুটির দিনগুলিতে আমার কাজই ছিল বিভিন্ন বাঙালীর হোস্টেলে ‘আযান’ দিয়ে বেড়ানো। আর ততদিনে গ্রীষ্মকাল গিয়ে শরতের প্রাচুর্য আকাশে-বাতাসে। বৃষ্টি হয় রোজ। গাছের সবুজ পাতাগুলো ততদিনে ফিকে হয়ে হলদেটে বর্ণ নিচ্ছে। লাল-হলুদের মাখামাখি সেই রং। আহা! কেমন প্রেম প্রেম আবহাওয়া। হালকা ওয়াটার প্রুফ জ্যাকেটেই চলে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে সমুদ্র পাড়ের জোর বাতাসে ঠাণ্ডা লেগে যাচ্ছে, কিন্তু আশ্চর্য, জ্বর আসছে না। পরে অবশ্য কেউ কেউ সেই হাওয়ার নাম দিয়েছিল ‘পাগলা হাওয়া’, এমনও বলেছিল, এর দাম নাকি ‘লাখ টাকা’। এসবই তো এখন স্মৃতি।

বাতাসের কারণে হোস্টেলের পিছনের এই ফিন উপসাগর তেমন একটা টানে না মন, তার চাইতে ১২ নম্বর ট্রলিবাসে করে এক ঘন্টা জার্নি করে মেডিকেল হোস্টেলে পৌঁছাতেই আনন্দ। অথবা ৫৪ নম্বর ট্রামে করে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের হোস্টেল। সেটাও এক ঘন্টার কারবার। সেখানে থাকে কেশবদা, পার্থদা। সিনিয়র মাকসুদ ভাই, মোশাররফ ভাই (তখন বাংলাদেশ ছাত্র সংগঠন লেনিনগ্রাদ শাখার প্রেসিডেন্ট)ও কাছেপিঠেই একটা হোস্টেলে থাকেন। মামুন ভাই, আরিফ থাকে আরেক হোস্টেলে। এতো এতো বাঙালীর খনি পেয়ে আমাকে আর পায় কে?

আস্তে আস্তে জানতে পারি, এখানে বাঙালীদের মধ্যে নাকি গ্রুপিং আছে। সেটা আবার কী? আরমেনিয়াতে ছিলামই আমরা তিনজন, গ্রুপ-টুপ বুঝিনি। এখানে একদল কমিউনিজমে বিশ্বাসী, ধারক-বাহক। তারা চলেন বৃত্তির নির্দ্দিষ্ট টাকায়। অন্য দল এই প্রথায় বিশ্বাসী নয়। তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় আইন-কানুন ভেঙে বাইরের দেশে যাচ্ছে, ব্যবসা করছে। কাঁচা টাকা তাদের হাতে। মোটামুটি একটা স্নায়ুযুদ্ধ দুই গ্রুপের মধ্যে। কিছুদিনের মধ্যেই তা বুঝতে পারি।

মজার ব্যাপার হলো, আমি এই শহরে নতুন। তাই ঠিক কোন গ্রুপে আমি যাবো সেকথা নিশ্চিত না জেনে সবাই আসেন আমার সাথে কম-বেশি পরিচিত হতে। আমিও মিশি সবার সাথে, কিন্তু পরে একটা সময়ে নিজেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। হয়তো নিজে থেকেই নি:শ্বাস ফেলার জায়গাটা নির্ধারণ করে ফেলতে পেরেছিলাম, তাই আমার গ্রুপটাও চিহ্নিত হয়ে যায় সবার সামনে।

কিন্তু আলাদা হওয়ার আগেই পালিত হয় আমার জন্মদিন এবং ওই জন্মদিনে এসেছিলেন মোটামুটি অনেকেই। বার তলা উঠতে গিয়ে লিফটে প্রায় ৪৫ মিনিট আটকা পড়েছিলেন সাজু ভাই (এখন টরেন্টোতে)। তার এখনও মনে আছে সেই রুদ্ধশ্বাস মূহূর্তের কথা। আর সেই ফাঁকে লিফট চলাচল বন্ধ থাকায় নিচ থেকে ফেরত গিয়েছিল আমারই দুই সহপাঠী বেলি আর পল্লব। এজন্য দীর্ঘদিন কথা শুনতে হয়েছে পল্লবকে। আর দুদিন পর ক্লাস থেকে ফিরে এসে বিছানায় বালিশে হেলান দিয়ে বসে থাকতে দেখেছিলাম একটা টেডি বিয়ার টাইপের পুতুলকে। রুমমেট বলতে পারেনি কে দিয়ে গেছিল। আমি অবশ্য ঠিকই জেনেছিলাম।

ইউনিভার্সিটিতে আমি একাই বাংলাদেশি ছিলাম, আর ছিল ভারতীয়রা। পাশাপাশি আমাদের চারজনের একটা একান্ত গ্রুপ ছিল, যেখানে ছিল সিরিয়ান-রাশান রুমমেট তানিয়া, বুলগেরিয়ান ভেসেলকা গ্রাদিশকা (বিখ্যাত ফটো জার্নালিস্ট, আছে চিলিতে) আর ইরানি সহপাঠী আফসানা (জানি না কোথায়)। যেখানেই যেতাম, চারজন একসাথে। হোস্টেলে আড্ডা দিতে গেলে, পড়াশোনাও একসাথেই। এর মধ্যে একমাত্র আফসানাই ছিল বিবাহিত। তার স্বামী মোহাম্মেদ বেহরুজ মেডিকেলে পড়তেন।  মোহাম্মেদ মজা করে বলতেন, ক্লাসে যাওয়ার সময় একটা বউ রেখে গেছিলাম, ফিরে এসে দেখি চারজন। আমরা বেশ মজা পেতাম ওর এই দুলাভাইসুলভ রসিকতায়। পৃথিবীর সব দেশেই মনে হয় দুলাভাই বা জামাইবাবুদের সাথে শালীদের সম্পর্ক একইরকম!

আফসানা ছিল বয়সে আমাদের চেয়ে বড়। দেশে ইসলামি বিপ্লবের পর ওদের কমিউনিস্ট পরিবারের সবাই আফগানিস্তানে পালিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে এক বোন পাড়ি দেন চেকশ্লোভাকিয়ায়। আফসানা আর তার ভাই থেকে যায় কাবুলে। কাবুলে এরা আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে দেশের জন্য লড়াই চালাতো আর একটা পত্রিকায় কাজ করে জীবন ধারণ করতো। সেখান থেকে তাজিকিস্তান হয়ে লেনিনগ্রাদে আসে আফসানারা।

ইরানের বলেই কিনা জানি না, ওর সাথে আলাদা একটা ভাব হয় আমার। কেমন যেন একটা শেকড়ের টান অনুভব করি। পরে অবশ্য জেনেছিলাম, ওর পূর্বপুরুষের সাথে ভারতের শেকড় যুক্ত। দেশ থেকে ওর পালিয়ে আসার কষ্ট, দেশের জন্য টানাপোড়েন, মায়ের সাথে আর দেখা না হওয়া, ভাইবোনও সব ছাড়া ছাড়া, এসবই ছুঁয়ে যেত আমায়। সেই বন্ধুটি হঠাৎই একদিন (১৯৮৯ সালে) স্বামী-সন্তানসহ সুইডেনে গিয়ে থেকে যায়, আর আসেনি। লন্ডন থেকে ফিরে এসে জেনেছিলাম ওর চলে যাওয়ার গল্প। কষ্টে-ব্যথায় ভেঙে গেছিলাম সেদিন, মনে হয়েছিল শুধু বন্ধুই নয়, রক্তের কাউকে হারালাম জন্মের মতো।

চোখের সামনেই অল্প অল্প করে তখন বদলে যাচ্ছিল বিশ্বের সবচাইতে বড় দেশটি। রাজনীতি ক্রেমলিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ক্রমেই আমরা এর আঁচ অনুভব করছিলাম বাতাসে বাতাসে। জিনিসপত্র হাওয়া হয়ে যাচ্ছিল মার্কেট থেকে।  আফসানা যখন অন্ত:সত্ত্বা হয়, একদিন ডালিম খেতে চেয়েছিল। কিন্তু রাশিয়ার সমস্যা ছিল যে, বছরের সবসময় সবকিছু পাওয়া যেত না। তো, ডালিমও তখন আউট অব মার্কেট। আমরা সবাই মিলে পুরো লেনিনগ্রাদ তন্ন তন্ন করে খুঁজে আনলাম ডালিম। একজন সন্তানসম্ভবা মায়ের মুখে সেকী তৃপ্তির হাসি!

তবে এর মাঝেও আমাদের জীবন চলছিল ভালই। শনিবার-রবিবার ঘুরে বেড়ানো শহরে বা শহরের বাইরে, উপশহরগুলোও ছিল একেকটা ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান, রাতে হোস্টেলের নিচ তলায় জমজমাট ডিসকোটেকায় বনি-এম, মডার্ন টকিং, অ্যাবা, সলিড গোল্ড এর মিউজিকে মাতোয়ারা হওয়া, আবার বাঙালীদের আড্ডায় দলবেঁধে গান গেয়ে গেয়ে জীবনটা ভারী সুন্দর হয়ে উঠেছিল। ফলে রাজনীতি কোনদিকে হেলে যাচ্ছিল অতটা অনুভবে লাগেনি। তাছাড়া তখনও ৯০ রুবলেই চলছিল মাস।

তখন ছিল চিঠি লেখালেখির এক অপূর্ব সময়। মস্কো থেকে চিঠি আসতো বন্ধু সুস্মির, বাবলা ভাইয়ের। খনি বিশেষজ্ঞ মুশফিকুর রহমান ওরফে বাবলা ভাই তো অসম্ভব ভালো ভালো চিঠি লিখতেন, যেখানে সুধা থাকতো, বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছা জাগতো সেই চিঠি পড়ে। মায়ের চিঠি আসতো ২২ দিন পরপর। কী যে অপেক্ষায় থাকতাম সেই চিঠির! বিদেশে তখন এসব চিঠির কী মূল্য ছিল তা আজকের প্রজন্মের কেউ আর বুঝবে না। হাতের লেখাগুলোর ওপর দিয়ে হাত বুলাতাম বার বার, যেন ছোঁয়া পাচ্ছি মায়ের। চিঠিজুড়েও সেই ভালবাসাই বইতো!

লেনিনগ্রাদ শীতপ্রধান শহর বলে সবসময় সবকিছু পাওয়া যেত না এক বাঁধাকপি, আলু ছাড়া। কিন্তু আমার তিন মহীয়সী ভারতীয় বন্ধুর কল্যাণে টেরই পেতাম না ‘খাদ্যাভাব’ বলে কিছু আছে রাশিয়ায়। ওরা প্রতিবছর দেশে গিয়ে স্যুটকেস ভর্তি করে নানা ধরনের ডাল, এটা-সেটা নিয়ে আসতো। মশল্লার খনিও ছিল ওদের ঘর। আর প্রায় প্রতিদিনই ওদের ঘরে কেউ না কেউ আসতো। কাজেই আমার খাবার নিয়ে আর কোন দু:শ্চিন্তাই ছিল না।

জানুয়ারিতে প্রথম সেমিস্টার শেষে দ্বিতীয়বারের মতো মস্কো যাই সুস্মির (এখন নিউইয়র্কে থাকে) নিমন্ত্রণে। তখন এক শহর থেকে আরেক শহরে গেলেও ভিসা লাগতো, আর এজন্য লাগতো ইনভাইটেশন। একরাতের ট্রেন জার্নি। রাত ১১টা ৩৩ মিনিটে ছেড়ে ‘ক্রাসনাইয়া স্ত্রেলা’ ভোর পাঁচটায় পৌঁছালো মস্কো স্টেশনে। আজ আর মনে নেই, সুস্মি যেন কাকে পাঠিয়েছিল আমাকে আনতে। সেকেন্ড মেডিকেলের সুশীলই কি ছিল ছেলেটি? সেই শীতের ভোরে ঠিক দাঁড়িয়েছিল আমার জন্য। কিন্তু সে আমাকে সু্স্মির হোস্টেলের পরিবর্তে নিয়ে এসেছিল প্যাট্রিস লুবুম্বার একটি হোস্টেলে। এতো বছর পর আর মনে নেই, কার রুম ছিল সেটি। কথা ছিল, সুস্মি বিকেলে এসে আমাকে নিয়ে যাবে।

এবারের মস্কো আসাটা আমার জন্য অন্যরকম। প্রায় দেড় বছর পর। এখানে রাস্তাঘাটে, সব জায়গায় কেবলই বাঙালী, আর বাঙালী। বড় বড় চোখে সবাইকে দেখি। যে রুমে উঠলাম, সেখানে এসে হাজির রুমা। সেই রুমা, মস্কোতে প্রথমবার এসে যাকে দেখেছিলাম ‘গুন্ডামি’ করতে। এখনও একইরকম আছে। তখনও সুস্মির দেখা মেলেনি, কিন্তু আমার যেটা অনুভব হলো, মস্কোর কেউ একাকীত্বে ভুগে না, সেই সময়টাই নেই। বাড়ির জন্যও কারও মন পোড়ে না, সেই অবকাশও নেই।

সন্ধ্যার পর সুস্মি এসে অনেক মেট্রো রেল চেঞ্জ করে নিয়ে গেল তার হোস্টেলে। ও আমাকে চিঠিতে লিখেছিল, খুব অগোছালো মেয়ে সে। ভেবেছিলাম, ওর রুমে এসে আমাকে হয়তো গুছিয়ে দিতে হবে সব। এখন দেখি, এমন পরিপাটি সব যে নিজেকেই ওর সামনে অগোছালো মনে হলো।

সেই দিনগুলো ছিল অসাধারণ। তিনদিনের জন্য গিয়েছিলাম মস্কো। কিন্তু থেকেছিলাম ২০ দিন। সেই ভ্রমণেই পরিচয় হয়েছিল বিজনদার সাথে। যে পরিচয় কথার, আত্মিক সম্পর্কের। যা এখনও আছে তেমনি অমলিন। নামমাত্রই ছিলাম সুস্মির হোস্টেলে। আসলে থাকতাম বিখ্যাত ‘মিখলুকা মাকলায়া’তে, যেখানে গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলগুলো ছিল। ১০ নম্বর আর ৭ নম্বর হোস্টেল ছিল ‘বাঙালীখ্যাত’। দেশ থেকে যেই আসতো, সে জেনেই আসতো এই দুটি হোস্টেলের কথা। এক কাপড়ে গিয়ে টানা তিনদিন থেকে যেতাম সেখানে। শীতের মধ্যে স্নানের তো বালাই-ই নেই। ১০ নম্বর হোস্টেলের মুকুল ভাই, বাবুল ভাই, সুপ্রভাতদার রুম ছিল তীর্থক্ষেত্র। আর ওদিকে ৭ নম্বর হোস্টেলের এমদাদ ভাইয়ের রুম।

এরকম মাখামাখি জীবন কাটিয়ে এসে খুব অসহায় লাগে আজকাল। কেন যে পেরিয়ে এলাম দিনগুলি? সেই তো ভালো ছিল। ভবিষ্যতের ‘দু:স্বপ্ন’ ছিল না, বর্তমান নিয়েও চিন্তা ছিল না। এরকম নিশ্চিন্ত জীবন কি আর হবে কখনও?

মস্কো থেকেই আমি ইউক্রেনের ওদেসা শহরে বাংলাদেশি ছাত্র সংগঠনের সম্মেলনে গিয়েছিলাম। সেই কাহিনী বললে পুরো একটা এপিসোড লাগবে। বলবো সেকথা।

বর্তমানে পেট্রোবাংলার সিনিয়র কর্মকর্তা ফারহানা শাওন তখন নেহায়েত আমাদের মতোনই ছোটখাটো ছিল। আজ সে বাংলাদেশের সমুদ্রজয়ের অন্যতম একজন অংশীদার। কিন্তু তখনকার সেই ছোট শাওনের সাথে বন্ধুত্ব তখনই হয়েছিল। সুস্মি, আমি আর শাওন-তিনজন। যেখানে যাই সেখানেই আমরা। গল্পের এমনই জোর যে, একসাথে ক্যান্টিনে খেতে গিয়ে চলে এসেছিলাম ব্যাগ ফেলে। পরমূহূর্তে গিয়েই আর পাইনি। এমন ঘটনা সোভিয়েত রাশিয়ায় তখন দুর্লভ ছিল।

গল্প আছে, শাওন একবার ব্যাগ হারিয়ে ফেলেছিল। সেই ব্যাগ ফেরত এসেছিল দ্বীজেন কাকুর (শর্মা) ঠিকানায়। এমনই ছিল দেশটি।

কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে তখন ভাঙছে, তারও একটি প্রমাণ আমার ব্যাগটি হাপিস হয়ে যাওয়া। ব্যাগে ছিল মাস চলার মতোন ৭৫ রুবল আর একজোড়া সোনার রিং। শাওন আমাকে ২৫ রুবল ধার দিয়েছিল, আর সুস্মি দিয়েছিল একটা ব্যাগ। সেই ঋণ অবশ্য এই জীবনেও শোধ করিনি আমি। (চলবে)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.