ওরা কেউ এতটা জ্বলে না…

Urmi ATN
ঊর্মি

ইশরাত জাহান ঊর্মি: মানুষের লড়াইয়ের গল্প বুঝি কখনই শেষ হওয়ার নয়। তবে লড়াইটা কেন ঘরে,কর্মক্ষেত্রের মতো শিল্পচর্চার ক্ষেত্রেও করতে হয়? যেখানে মানুষ একটু নি:শ্বাস ফেলবে, যে খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটু আলো-হাওয়া টানবে ভেতরে, সেখানেও যদি সারাক্ষণ টানটান করে রাখতে হয় স্নায়ু, সেখানেও যদি সূর্য্যের আলোয় চকচক করে ওঠে খঞ্জর, সেখানেও যদি মুঠির মধ্যে সবসময় ধরতে হয় ধারালো ছুরি…তাহলে আমার মতো নিরুপায় মানুষেরা কই যায়?

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসি মফ:স্বল থেকে। এসেই খোলা হাওয়া। আরে আরে, মফ:স্বলে টিভি আর পত্রিকায় যাদের দেখেছি, নমস্য ভেবেছি, তারা তো হাতের কাছেই! আমার সাথে হেসে কথা কয়। সেই সময়ের মফ:স্বলে তো একটা ভালো বই পড়া, ভালো গান শোনা বা সিনেমা দেখার সুযোগ ছিল না, তাই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ব্রিটিশ কাউন্সিল, গাইড হাউজ আর টিএসসির সবুজ চত্বরের সংস্কৃতি চর্চা আমাকে যেন পাগল করে দিল। কোনটা ছেড়ে কোনটা করি।

থিয়েটারে গেলাম, আবদুল্লাহ আল মামুনের কাছে ভর্তি হওয়ার ইন্টারভিউ দিলাম। এখনও মনে আছে, তার প্রশ্নের উত্তরে খুব চ্যাটাং চ্যাটাং উত্তর দিয়েছিলাম। বয়সের দোষ আর কি! যাই হোক বেশিদিন মঞ্চে কাজ করতে পারিনি। আসলে প্রায়োরিটি ঠিক করতে পারছিলাম না। কিছুদিন করলাম চলচ্চিত্র আন্দোলনের সংগঠন। ভালো লাগেনি। বড় বেশি নাক উঁচু ছিলেন তারা। হিচকক থেকে শুরু করে সত্যজিত রায় তারা গুলে খেয়েছেন, অথচ মন-টন খুব ছোট, নিজের জ্ঞানের প্রতি অগাধ বিশ্বাস থাকতেই পারে, কিন্তু সেই জ্ঞানের চোটে আর সবাইকেই ছোট ভাবার এক অদ্ভুত অসুখ ছিল এদের মধ্যে। থাকতে পারলাম না।

শেষ পর্যন্ত থিতু হলাম আবৃত্তিতে। আমি বিনয়ের সাথেই বলছি, আমি বিনয়ী! খুব বেশি গল্প-টল্প দিতে পারি না। আমার পেশায় আমি এটা খেয়াল করেছি যে, গপ্পীদের খুব দাম। অর্থাত সারাক্ষণ আমি এই পারি, সেই পারি, ওমুক নেতার সাথে আমার খুব খাতির, অমুক মন্ত্রী রাতে আমাকে ফোন করে নিউজ ভালো হয়েছে বলে—এসব বলতে পারলে খুব নাম-কাম হয়। সবাই ভাবে, আরে বাপরে!

আর যদি, কেউ বলে আমি মোটামুটি আমার কাজটা বুঝি-তাহলে সবাই ভাববে, অযোগ্য। যাই হোক, এই গল্প দিতে না পারা আমিই বিনয় এবং আত্নবিশ্বাসের সাথে বলতে পারি যে, আমি আবৃত্তিটা ভালো করতে পারি। যখন বুঝলাম, আমার পাঠ এবং আবৃত্তি গুণ ভালো, তখন এটাকেই আঁকড়ে ধরলাম। গুলে খেতে শুরু করলাম, নরেন বিশ্বাস, শম্ভু মিত্র-তৃপ্তি মিত্র, কামরুল হাসান মঞ্জু, গোলাম মোস্তফা, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ভাস্বর বন্দ্যোপাধায়, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, প্রদীপ মুখার্জী, ব্রততী চক্রবর্তী আর শিমূল মুস্তফা, আহকামউল্লাহ পর্যন্ত। আবৃত্তির গ্রুপে কাজ করতে শুরু করলাম।

শুরুটা ভালোই ছিল। গ্রুপ বা দল মানেই তখন ভাবতাম শক্তির জায়গা, ভাবতাম যূথবদ্ধতার একটা সৌন্দর্য আছে, সংগঠনের আছে শক্তি। আমি ভাবতাম, সংগঠন মানে সহমতের জায়গা, সহযাত্রার জায়গা। ভাবতে শুরু করলাম,সময় দিতে থাকলাম। এবং ধীরে ধীরে মুখ আর মুখোশগুলো খোলাসা হলো। সংস্কৃতির মুখগুলো সব। তারা কবিতা পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, ঢাকা, ঢাকার বাইরে নানান জায়গায় অনুষ্ঠান করে। বিটিভিতেও দু’একটা।

আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, যে যূথবদ্ধতার সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়েছিলাম, সেই একত্রিত হওয়াটাই আসলে সবচেয়ে বড় ঝামেলা এখানে। তখন সিন্ডিকেট বলে যে একটা শব্দ আছে তাই জানতাম না। কিন্তু দেখলাম, এখানেও আমরা আর মামুরা। কীভাবে কীভাবে যেন একটা দল গড়ে যায়। দলের মধ্যে দল, উপদল। সে দলে যারা আছেন তারাই সর্বশ্রেষ্ঠ। আর যদি নতুন কেউ ভালো পড়তে শুরু করে, সে দলের প্রধানদের আনুকুল্য ছাড়া সেখানে স্থান পাওয়ার উপায় নাই। বরং উল্টো বিপদ আছে।

ধরা যাক, বৃন্দ আবৃত্তির একটা স্ক্রিপ্ট করা হলো, বেছে বেছে আপনাকে সবচেয়ে দুর্বল অংশটুকু দেয়া হবে পড়তে। এসবও ওভারকাম করা যায়, যোগ্যতা থাকলে সবচেয়ে দুর্বল অংশেও আপনি ভাল করতে পারেন, যদি শেষ পর্যন্ত সেটা কবিতা হয়। কিন্তু আমি লক্ষ্য করলাম, অধিকাংশই কবিতা পড়েন না বুঝে, উপলব্ধি না করে। এবং এরা পদাধিকার বলে এবং দলে আগে আসায় আমার গুরুজন। গুরুজনদের এহেন অদ্ভুত সাংস্কৃতিক বোধ দেখে আমার চটকা ভাংগে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ যে সমস্যার আমি মুখোমুখি হলাম, তা হলো জেলাসি। আমার চেহারা-টেহারা কেমন আমি ঠিক বুঝতাম না, কিন্তু উপদলের সদস্যদের চোখ-মুখ দেখে মনে হতো, আমার চেয়ে সুন্দর বুঝি আর কেউ নাই। (ভাইরে যা মানুষের জন্য পজিটিভ হয়, তা আমার জন্য সবসময়ই উল্টে সমস্যার সৃষ্টি করেছে।)

কেন আমার পোশাক সেন্স ভালো হবে, আমি কেন গ্রুপের অনুষ্ঠানে স্বামীকে নিয়ে আসি না অ্যাজ ইফ গ্রুপের ছেলেদের মাথা খাওয়ার জন্যই আমি আসি, কবিতা পড়তে নয়। আর এসব মন্তব্য আর ভাবনা তারাই করছে এবং ভাবছে যারা কবিতার ক’ও বোঝে না, যাদের সাংস্কৃতিক মান বলতে কোন বস্তু নাই, যাদের গ্রুপে থাকার কারণ ভিন্ন। কি কারণ তা আজ লিখতে সাহস করছি না। আমি কিন্তু যুদ্ধ শুরু করলাম। না হারতে। যতই আমাকে দমাতে চাওয়া হোক, ভালো পড়েও অনুষ্ঠানে সুযোগ না দেয়া হোক, বা দিলেও এমনভাবে দেয়া হতো যেন দয়া করা হচ্ছে, যতই মুখটিপে হাসুক নাকউঁচু মানুষগুলো—আমি যুদ্ধের রিং ছাড়লাম না। এটা যে আমার প্যাশন। প্যাশনের বাংলা আমি বলি, আবেগমিশ্রিত ভালোবাসা। আমি ভালোবাসাকে ছেড়ে কীভাবে যাই?

দলের যিনি প্রধান, তিনি তো শিল্পটিকে বোঝেন, বোঝেন আমার দুরবস্থাও। কিন্তু তারও কিছু করার ছিল না, একলা আমাকে টানলে তো তার চলবে না, শক্তিশালী উপদলটিকেই তার পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে নানা কারণে। তবু আমি প্রবলবেগে এগুতেই থাকলাম। ঢাক-ঢোল পেটাতে পারি না বলে নতুন যিনিই আমার পড়া শুনেছেন, বলেছেন, আরে তুমি তো ভালোই পড়ো, নিয়মিত হও না কেন? কি বলি?

রিহার্সেল করতে হয় দলের এমন একজনের বাসায়, যার বাসা মগবাজার, অলি-গলি, তস্যগলি পেরিয়ে, আমার বাড়ী আদাবর, তার উপর করি টেলিভিশনের চাকরি—সব সামলে কেমনে অতদূর যাই রিহার্সেলে? যারা নিয়মিত যায়, তাদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন স্বামী-স্ত্রী, অন্যেরা ছাত্র বা ছাত্রী—অতএব তাদের অসুবিধা হয় না, সব সমস্যা যদি আমার একলারই হয়-তাহলেই বা কার কি করার আছে? আর আমার খুঁত ধরার লোকের তো অভাব নেই। দাঁতে দাঁত চেপে তবু আমি গ্রুপে যাই, মাসিক ঘরোয়া আসরে শ্রেষ্ঠ আবৃত্তিকার হই, দুএকটা অনুষ্ঠানে অংশ নেই।

যারা মুখটিপে হাসে, তাদের হাতে হাত রাখি, আন্তরিক, শিল্পের মুখোশ পড়া মানুষগুলো তবু যদি একটু মানবিক হয়! তবু যদি তারা আমার একমাত্র ত্রুটি-সময় কম দেয়ার অপরাধ ক্ষমা করে! আমার ঘর-সংসার নিয়ে গ্রুপে না আসার অপরাধ ক্ষমা করে!

তারপর মেয়েটা হওয়ার পর সূতোটা একেবারেই ছিঁড়ে গেল। আমারই দোষ। পার্সোনাল ম্যানেজমেন্টটা করে উঠতে পারলাম না। মেয়েদের চাকরি পর্যন্ত তবু সংসার সহ্য করতে পারে, আবার শিল্পক্ষুধা? ইয়ার্কি মারার জায়গা পাও না? চুপচাপ অফিস করে বাসায় আসো, বাচ্চা সামলাও। বয়স কম ছিল, ইউনিভার্সিটির হলে থাকতে, তখন টিএসসিতে গিয়ে কবিতা পড়েছো, ঠিক আছে? এখন কি এসব মানায়? শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার মতোই আরও কতজন ঝরে পড়েছে তোমার মতোই, তুমি কোন ছাড়! মানায় না, মানায় না-এত ঝামেলা মানায় না।

মানায় মানায়। সমাজ, সংসার এবং উপদলের নেতৃবৃন্দকে বলি, মানায়। আমি পেশা ছাড়তে পারি, প্যাশন নয়। আমি ফিরবোই। এবং মুখটিপে হাসা, কবিতা না বোঝা মানুষগুলোর হাতে আর আন্তরিক হাত রাখবো না। সংগঠনে অবশ্যই থাকবো, কিন্তু দলগত আক্রমনে নয়, কারণ আমি মানুষ, জন্তু নই। আমি প্রয়োজনে একলাই এগুবো। এখন না হোক, যখনই হোক, আমি ফিরবোই। হুমায়ূন আজাদের কথাটা মনে পড়ে যাচ্ছে,

এখন কেউ আমার মতের সাথে একমত হলেই বরং বিব্রত হই, মনে হয় আমার মান কি তবে নীচে নেমে গেল!

আমি তোমাদের সাথে সহমত না হয়েই এগুবো, এই যুদ্ধটা আমি করবোই-জানান দিলাম। আবুল হাসানের কবিতাটা আছে না,

দুদিকে সমান জ্বলি: প্রথমত: মাটির ভিতরে বহুকাল,

তারপর তোমরা যখন তোল এটা ওটা

তোমাদের কারখানায়

মেশিনে চুল্লিতে আমি টের পাই আমার আত্মায় এক অন্য আগুন!

মাটির মিথুন ভেঙে এত আমি জ্বলি!

ওরা কেউ এতটা জ্বলে না!

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.