রাজীব হত্যা, ‘ট্রোজান হর্স’ এবং মূল্যবোধ

Sina Akhter
সীনা আক্তার

সীনা আক্তার: ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে ধর্মের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে। গোয়েন্দা পুলিশ এ হত্যাকান্ডে জড়িত সন্দেহে আট তরুণকে অভিযুক্ত করেছে, যা আদালতে বিচারাধীন। এই তরুণরা সবাই দেশের এক নামকরা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, যারা দেশের বিভিন্ন জেলায় বাংলা এবং ইংরেজী মাধ্যম স্কুল-কলেজেপড়াশোনাশেষে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী কাজীনাফিস সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রেকারাদণ্ড ভোগ করছে, সে ঢাকা শহরের এক নামকরা বেসরকারী স্কুল-কলেজের পড়াশোনা করেছে । ক’দিন আগে সন্ত্রাসবাদেসম্পৃক্তথাকারঅভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে রাহাতুলআশিকিমখান নামে আরেক বাংলাদেশী তরুণকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। রাজীবের করুণ মৃত্যু এবং আমেরিকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড- এসবের মূল কারণ এই তরুণদের চরমপন্থী মতাদর্শ এবং তৎপরতা।

অনেকের গৎবাঁধা ধারণা কেবল মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় চরমপন্থী মূল্যবোধের বিস্তার ঘটে, এবং মূলধারার বাংলা-ইংরেজী শিক্ষাব্যবস্থা এসবের বাইরে, ‘নিরাপদ’! এই ভ্রান্ত ধারণার জ্বলন্ত প্রমাণ উপরোল্লিখিত তরুণদের অতীত শিক্ষা পরিবেশ। তাই বলা যায় মাদ্রাসা শিক্ষা যেমন সবসময় চরমপন্থা না, একইভাবে মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থা সবসময় চরমপন্থার বাইরে না। এ কারণে মূলধারার বাংলা-ইংরেজী শিক্ষা ব্যবস্থায় কি ধরনের মূল্যবোধ এবং মতাদর্শের বিকাশ হচ্ছে তা নজরদারি করা অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়ের দাবী, কারণ এর সাথে আমাদের কিশোর-তরুনদের মানস গঠন এবং সমাজ-সংস্কৃতির ভবিষ্যত জড়িত। একইসাথে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে জাতি হিসাবে আমাদের মূল্যবোধ, ‘বাংলাদেশী মূল্যবোধ’ সুস্পষ্টভাবে প্রচার করা এবং সকলকে, বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের তা অনুধাবন এবং অনুসরণে উৎসাহিত করা।

আমরা সাধারণত কোন বিষয়ে চরম পরিণতি প্রকাশ পেলেই নড়া-চড়া করি। তারপরেও প্রায়ই ঘটনার মূল অনুসন্ধান করা হয় না, বা ঘটনার উৎস নিয়ে গবেষণার আলোকে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়,রাজীব হত্যা এবং নাফিসের ঘটনা। সাধারণত তরুণদের চরমপন্থী মতাদর্শ একদিনে তৈরী হয় না, বরং ধীরে ধীরে তা তৈরী হয়। বলা হয় শিশু-কিশোর বয়সেই মানুষ অধিকাংশ পারিবারিক-সামাজিক-ধর্মীয় মূল্যবোধ, মতাদর্শ, নৈতিক শিক্ষা রপ্ত করে। ঘটনাক্রমে আমরা রাজিব হত্যায় সংশ্লিষ্ট ঐ আট তরুণ এবং নাফিসের  উগ্র ধর্মীয় মতাদর্শ বিষয়ে অবগত হয়েছি, এদের বাইরে হয়তো আরো অনেক কিশোর-তরুণ আছে, যাদের সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণাই নেই। কিভাবে, কোন্ ধরনের শিক্ষায় এবং কাদের সংস্পর্শে উল্লেখিত এই তরুণরা উগ্রপন্থী মতাদর্শে দীক্ষিত হয়েছে বিস্তারিত জানা যায়নি।

যথাযথভাবে এদের মনোবিশ্লেষণের মাধ্যমেই তা জানা যেতে পারে, যা অন্য তরুণদের জন্য সতর্কতামূলক কর্মপরিকল্পনায় সহায়ক হতে পারে। অভিযুক্ত তরুণদের বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কিছুটা তদন্ত হয়েছিল শুনেছি কিন্তু তারপরে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে জানিনা। একইভাবে এই তরুণদের কলেজ এবং স্কুলের শিক্ষা ওঅন্যান্য প্রাসঙ্গিক পরিবেশের ব্যাপারে কোন তদন্ত হয়েছে কি না আমার জানা নেই। জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ-শ্রেণী নির্বিশেষে সহমর্মিতা-সহনশীলতা, নৈতিকতা এবং মূল্যবোধ শিক্ষাদানে এই স্কুল-কলেজগুলো কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে দায়িত্ব পালন করছে তা আমরা জানি কি?

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, সম্প্রতি ব্রিটিশ মূল্যবোধ (British value) এবং (ইসলাম) ধর্মীয় চরমপন্থা নিয়ে সে দেশে রীতিমত তোলপাড় চলছে। এর প্রেক্ষিতে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বিশেষভাবে এই মূল্যবোধ সুস্পষ্ট করেছেন যেমন, ‘ব্রিটিশ মূল্যবোধ হচ্ছে সব ধরনের স্বাধীনতায় বিশ্বাস, অন্যদের প্রতি সহনশীলতা, ব্যক্তিগত এবং সামাজিক দায়িত্ব গ্রহণ, আইনের শাসন এবং ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন…।’ সরকারী-বেসরকারী-ধর্মীয় বা যে কোন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিটা স্কুলের এবং প্রত্যেক শিশু-কিশোরকে এই মূল্যবোধ শিক্ষায় উৎসাহিত করা উচিৎ বলে তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন।

একইসাথে ব্রিটিশ সরকার ‘চরমপন্থার’ বর্ধিত সংজ্ঞা প্রচার করছে, যেমন: ‘মৌলিক ব্রিটিশ মূল্যবোধের মৌখিক বা সক্রিয় বিরোধিতা করা হচ্ছে চরমপন্থা, এবং এই মূল্যবোধ হচ্ছে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, পারস্পরিক সম্মান, এবং বিভিন্ন ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীলতা’ (Extremism is the vocal or active opposition to fundamental British values, including democracy, the rule of law, individual liberty and mutual respect and tolerance of different faiths and beliefs…)। সরকার এই মূল্যবোধের উপর অধিক জোর দিচ্ছে যাতে মুসলিম কিশোর-তরুণরা উগ্রপন্থীকরণ প্রক্রিয়া এবং চরমপন্থা (radicalisation & extremism) থেকে দূরে এবং নিরাপদ থাকতে পারে।

বিশেষ দুটি কারণে এই চরমপন্থা এবং মূল্যবোধের বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে, যা আমাদের দেশের জন্যও প্রযোজ্য মনে করি।

এক. যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম শহরে মুসলিম গভর্নরদের দ্বারা পরিচালিত ২৫টি ‘সরকারী’ মাধ্যমিক এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে তথাকথিত ‘ট্রোজান হর্স’ ষড়যন্ত্র।

এবং দুই. সিরিয়া যুদ্ধে ব্রিটিশ মুসলিম কিশোর-তরুণদের অংশগ্রহণ। তদন্তে অভিযুক্ত বার্মিংহামের এই বিদ্যালয়গুলিতে কৌশলে সাম্প্রদায়িকমূল্যবোধ চর্চা হচ্ছিল, যা চরমপন্থা বৃদ্ধি-বিস্তার ঘটাতে পারে মনে করা হচ্ছে। আরো অভিযোগ উঠেছে যে এই বিদ্যালয়গুলিতে ব্রিটিশ মূল্যবোধের আলোকে শিক্ষাদান হচ্ছে না। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখিত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ হচ্ছে, কিছুসংখ্যক গভর্ণর ধর্ম নিরপেক্ষ(non faith) এই বিদ্যালয়গুলিতে একটি সংকীর্ণ (ধর্ম) বিশ্বাস ভিত্তিক মতাদর্শ আরোপ ও প্রচার করার চেষ্টা করছে;শিশু-কিশোরদের সকল ধর্ম-সংস্কৃতির প্রতি সহনশীলতা তৈরীতে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে না; শিশু-কিশোরদের চরমপন্থী মতাদর্শ থেকে দূরে রাখার জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।সক্রিয়ভাবে সংকীর্ণ-পশ্চাৎপদমূল্যবোধ এবং ধর্মবিশ্বাসে উৎসাহদান …যা বৃহত্তর সমাজ-সংস্কৃতির সাথে শিশু-কিশোরদের মানসিক দূরত্ব তৈরী করে তাঁদের অরক্ষিত/ঝুঁকিপূর্ণ করছে; শিক্ষার্থীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সঙ্গীত শিক্ষা কারিকুলাম থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। কিছু বিদ্যালয়ে মেয়ে এবং ছেলেদের প্রতি সম-বিবেচনা ওসম-আচরণ করা হচ্ছে না। এইসব তৎপরতা কৌশলে সংগঠিত হচ্ছিল বিধায় বিষয়টিকে বলা হচ্ছে’ট্রোজান হর্স’ ষড়যন্ত্র।

‘ট্রোজান হর্স’ হচ্ছে গ্রীক পৌরাণিক কাহিনী যার উৎস ট্রয়ের যুদ্ধ। গ্রীকরা ট্রয় নগরীতে প্রবেশের জন্য যুদ্ধ কৌশল হিসাবে এক বিশাল কাঠের ঘোড়া তৈরী করে, যার মধ্যে সৈন্যরা লুকিয়ে থাকে। কাঠের ঘোড়াটিকে ট্রয় শহরের বাইরে ফেলে রেখে গ্রীক সৈন্যরা ট্রয় এলাকা থেকে চলে যাবার ভান করে। অন্যদিকে পরিত্যক্ত কাঠের ঘোড়াটিকে সাফল্যের বিজয়স্মারক মনে করে ট্রয় সৈন্যরা তা শহরে নিয়ে যায়। সুযোগ বুঝে গ্রীক সৈন্যরা কাঠের ঘোড়া থেকে বের হয়ে ট্রয় শহরের দখল নেয়।

আমাদের দেশে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসাগুলোতে গভর্ণরদের দায়িত্বশীলতা, বহিরাগতদের প্রবেশাধিকার এবং তৎপরতা কতটা, বা ‘ট্রোজান হর্স’ ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে আমরা কতটা সচেতন! সেখানে শিক্ষকরা শিশু-কিশোরদের কি ধরনের নৈতিকতা-মূল্যবোধ শিক্ষায় উৎসাহদান করেন! আমাদের দেশে মোটামুটি চার ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে। যেমন সরকারী ব্যবস্থায় মূলধারার শিক্ষা এবং মাদ্রাসা শিক্ষা। অন্যদিকে বেসরকারী ব্যবস্থায় আছে ইংরেজী মাধ্যম এবং কওমী মাদ্রাসা। আমরা জানি মাদ্রাসায় ইসলামী মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেয়া হয় এবং সাধারন শিক্ষা ব্যবস্থায় সার্বজনীন মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয়া হয়। ইসলামী মূল্যবোধ এবং উগ্রপন্থী মতাদর্শ সমার্থক নয়।

অন্যভাবে বলা যায় ইসলাম ধর্মে চরমপন্থার স্থান নেই। কিন্তু লজ্জার এবং উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে বর্তমান বিশ্বে অধিকাংশ উগ্র জঙ্গী তৎপরতার সাথে মুসলিমরা জড়িত, এ যেন ধর্মের সাথেই চরমপন্থার বসবাস! তার মানে কোন ব্যক্তি-গোষ্ঠীর হীন স্বার্থে ধর্মকে (কু) কৌশলে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং তা করা হচ্ছে বিশেষ করে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে। যে কোন শিক্ষাব্যবস্থায় কৌশলে শিশু-কিশোরদের উগ্রপন্থী মতাদর্শ দীক্ষা দেয়া এবং যে কোন ধরনের চরমপন্থায় উৎসাহদান সমাজ-সংস্কৃতির জন্য ভয়ানক বিপদজনক, যা দেশ-জাতির ভবিষ্যতের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

অনেক অভিভাবক সার্বজনীন অথবা ইসলামী মূল্যবোধে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য তাঁদের ছেলে-মেয়েদের নামকরা বাংলা/ইংরেজী মাধ্যম বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করেন। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃক শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় মূল্যবোধের নামে কোন প্রকার উগ্রপন্থী মতাদর্শ এবং চরমপন্থায় উৎসাহদান রীতিমত অন্যায়, প্রতারণাও বটে-যা উক্ত শিক্ষার্থী, তাদের অভিভাবক, এবং দেশ-সমাজের প্রতি প্রতারণা। সরকারের সীমিত নজরদারী এবং অভিভাবকদের সচেতনতার অভাবে এ ধরনের প্রতারণামূলক তৎপরতা সংগঠিত হতে পারে। তাই এ বিষয়ে সরকারী-বেসরকারী মূলধারার বাংলা, ইংরেজী, মাদ্রাসা কোন ব্যবস্থাকেই পুরোপুরি নিরাপদ ভাবাটা বোকামি এবং এ ব্যাপারে অভিভাবক, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। কারণ আমরা রাজীব, নাফিসের মত পরিণতি আর কোন তরুণের জীবনে চাই না। সতর্কতামূলক বার্তা হিসাবে এদের ঘটনাগুলোই যথেষ্ট।

তাছাড়া, আজকের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীই আগামী ৫-১০ বছরের মধ্যে মূল্যবান ভোটার, যারা নির্ধারণ করবে আমাদের ভবিষ্যত সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি-অর্থনীতির গতিপথ। সেজন্যই এই শিশু-কিশোরদের সঠিক মূল্যবোধ, মতাদর্শ গঠনে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া অত্যাবশ্যক।

ড. সীনা আক্তার। লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিকসের পোষ্ট গ্রেজুয়েট, প্যারেন্টিং পেশাজীবি।

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.