আমরা যারা একলা থাকি-২৮

imp 1উইমেন চ্যাপ্টার: (অদ্বিতীয়ার গল্প- ৩) জীবনের এই অধ্যায়ে আইনী বিচ্ছেদ কতখানি ঝামেলার হবে বা সামাজিক সমস্যা কিভাবে সামলাবে এই অনিশ্চয়তা থাকলেও, হাঁফ ছেড়ে নিঃশ্বাস ফেলে নুতন করে বাঁচার স্বাদ পেলো অদ্বিতীয়া। নুতন জীবনে সম্পত্তি বলতে একটি সুটকেসে তার নিজের টাকায় কেনা কাপড়-চোপড়, বন্ধুর থেকে ধার করা আরেকটি সুটকেসে বাচ্চাদের কাপড়, একটা কাগজের কার্টুনে ছেলেমেয়ের বই আর মেয়ের প্রিয় টেডি বিয়ারটি। এই বিশাল সম্পত্তির বাইরে ব্যাংকে অল্প কিছু টাকা আছে।

প্রথমদিন সকালে নাশতা খেতে যেতে হল হোটেলে কারণ ঘরে খাবার বা রান্না করার কিচ্ছু ছিল না। কিন্তু ব্যাপারটা তাদের তিনজনের কাছেই মনে হল যেন তারা কোথাও বেড়াতে বেরিয়েছে। চায়ের কাপ থেকে শুরু করে হাঁড়ি-কড়াই বিছানা-বালিশ সবই কিনতে হল। একটু হিসাব করে চলতে হবে এই জীবনে, কিন্তু টাকা পয়সা নিয়ে খিঁচ খিঁচ নাই। অদ্বিতীয়া এতো টাকা রোজগার করেছে কিন্তু কখনো নিজের হাতে টাকা খরচ করতে পারেনি সে। সব সময় টাকা পয়সার টানাটানি। স্বামীই টাকার হিসাব রাখত।

বিয়ের পর প্রথম প্রথম দু একবার দেশের মধ্যেই বেড়াতে গিয়েছিল আর একবার কলকাতা। তারপরে টাকার টানাটানিতে কোথাও বেড়াতে যেতে পারে নাই। বাবা চলে যাওয়ার পরে টাকার অভাবেই তার জীবনের এই অবস্থা, তাই সেও ভাবত থাক অযথা টাকা খরচ করে দরকার নাই। অদ্বিতীয়ার ব্যাংকের চেকবই, হিসাব সবই স্বামীর কাছে থাকতো, কিন্তু স্বামীর কোন ব্যাংকে একাউন্ট আছে, তা সে কোনদিনই জানতে পারে নাই। একবার হাতে টাকা ছিল না বলে নিজের জরুরি চিকিৎসা সময়মত করাতে পারে নাই, ক্ষতি হলো।

সেইবার অদ্বিতীয়া বলেছিল, এখন থেকে নিজের টাকার হিসাব সে নিজেই রাখতে চায়। অদ্বিতীয়াকে অবাক করে স্বামী বলল ঠিক আছে, সমান সমান দায়িত্ব। সংসারের খরচ অদ্বিতীয়ার, আর বাড়ীর সার্ভিস চার্জ, গাড়ির খরচ ইত্যাদি স্বামীর। মাসের প্রথমে সে জানলো, সংসারের খাবার খরচ, বুয়ার বেতন, স্কুলের খরচ, ডাক্তার ওষুধ, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস বিল, সামাজিক অনুষ্ঠান সবই সংসার খরচের মধ্যে পড়ে। রাগে ঘেন্নায় কথা সরে না তার মুখ থেকে। স্বামী দিত বাড়ির দারোয়ানের বেতনের অংশ, টেলিফোন বিল আর গাড়ির খরচ।

গাড়ি একটা ছিল, যা অদ্বিতীয়ার টাকায় কেনা, অথচ স্বামীর নামে। খরচের দায়িত্ব ভাগাভাগির পরে হঠাৎই একদিন ড্রাইভার এসে বলল, গাড়ি বিক্রি হয়ে গেছে, তার চাকরি আর নাই। সেই গাড়ি বিক্রির টাকার কি হলো তাও অদ্বিতীয়া জানলো না। হঠাৎ একদিন টেলিফোন কাজ করছে না, জানা গেল তিন মাসের বিল না দেয়াতে ফোনের লাইন কেটে দেয়া হয়েছে।

আজ যখন নির্মোহভাবে পেছনে তাকাচ্ছে সে, ভেবে পায় না এখন কেন এসব নিয়ে প্রশ্ন তুলে নাই অদ্বিতীয়া? তুললেই তো অশান্তি। রাগারাগি, চিৎকার, গালি গালাজ, জিনিস পত্র ছোঁড়াছুড়ি। অদ্বিতীয়ার যে এসব রুচিতে বাঁধত। কারো সাথে বলতেও লজ্জা হতো যে।

তার এই রুচিবোধ কি মানুষ হিসাবে তাকে মেরুদণ্ডহীন করে তুলেছিল অনেকটা? আরও কত কথা! তার নিজের জীবন যেন উপন্যাস! প্রথম যখন অন্য নারীর সাথে স্বামীর সম্পর্ক টের পেলো অদ্বিতীয়া মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে গেল। তারপরে বারে বারে। নিজের ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর সাথে সম্পর্কের কথা কানে এসেছে, তবু সে পাত্তা দেয় নাই। ভেবেছে মানুষ এখনো নারী-পুরুষের স্বাভাবিক বন্ধুত্বের সম্পর্কে অভ্যস্ত হতে পারে নাই। কত রাত ঘুম ভেঙ্গে উঠে দেখেছে স্বামী বারান্দায় বসে টেলিফোনে মৃদুস্বরে আলাপে মগ্ন।

কেন কিছু জিজ্ঞ্যেস করে নাই অদ্বিতীয়া? প্রায় প্রতিমাসে ব্যাংকক বা কলকাতা যাওয়া। ততদিনে অদ্বিতীয়ার স্বামী একটি ব্যবসা শুরু করেছে, অদ্বিতীয়ার গহনা বন্ধক রেখে টাকার ব্যবস্থা হলো। ব্যবসা ভালই চলছিল, কিন্তু অদ্বিতীয়া সবসময় শুনতো, টাকা নাই হাতে। দেশের বাইরে যাওয়াগুলি নাকি ক্লায়েন্টরা নিয়ে যেতো। শুধু খুব কাছের একজন বন্ধু সে জানত। কিন্তু সেই-ই বা কি বলবে এই পরিস্থিতিতে। পরবর্তীতে অবশ্য এই বন্ধুটি আর আরেকটি বন্ধু অদ্বিতীয়ার পাশে দাঁড়িয়েছিল তার হাত শক্ত করে ধরে।

বাড়ির কাজের বুয়া যখন তারই কাছে অভিযোগ করলো যে অদ্বিতীয়ার অবর্তমানে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে বুয়াকে প্রতিশ্রুত টাকা দেয় নাই অদ্বিতীয়ার স্বামী, আকাশ কি ভেঙ্গে পড়ছিল তখন? জানে না সে, শুধু জানে নিজের ভিতর থেকে ঠেলে ওঠা বিবমিষার তীব্র তিক্ততা বমির আকারে উগরে দেয়া ছাড়া আর কি করতে পারতো অদ্বিতীয়া? ঘর আলাদা করলো সে। তারপরেও এই জীবন অদ্বিতীয়া টেনেছিল প্রায় আরও কয়েক বছর। কিন্তু এই পরিস্থিতি ক্রমশ তাকে মৃত্যুর মুখে নিয়ে গিয়েছিল।

মানুষের নিঃশ্বাস বন্ধ হলেই কি কেবল মৃত্যু হয়? অদ্বিতীয়া যেদিন জানালো সে এই জীবনে ইস্তফা দিচ্ছে, স্বামী রটাতে শুরু করলো যে অদ্বিতীয়ার অন্য কারো সাথে সম্পর্ক আছে। সে যে অফিসের কাজে দেশে-বিদেশে যায়, হোটেলে কার সাথে থাকে, কে তার খবর রেখেছে ইত্যাদি। অনেক আত্মীয়েরই তো বেশ আগ্রহ ছিল কি হচ্ছে অদ্বিতীয়ার সংসারে তা জানার, তাদের কাছে এইসব কথা পৌঁছে যেতে লাগলো। কিন্তু অদ্বিতীয়া তারপরেও তার নিজের বা স্বামীর পরিবারের কারো কাছে শালিস বা আলোচনার জন্য যায় নাই।

কি বলতো অদ্বিতীয়া, যে তার স্বামী তার গায়ে হাত তুলতে শুরু করেছিল? কিছু হলেই বাবা-মা তুলে অশ্রাব্য ভাষায় গালি? স্বামীর অভিযোগ ছিল, স্বামীকে যৌনসুখ দিতে পারে না সে! অদ্বিতীয়া কাকে বলতো, মন যেখানে টানে না সেই শারীরিক সম্পর্কটা টেনে নেয়া ছিল কষ্টদায়ক। আলাদা থাকলেও তার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে মাতাল স্বামী চিৎকার করতো। ঘুমন্ত মেয়েকে বুকে চেপে ধরে অদ্বিতীয়া নিজের কানে বালিশ চাপা দিত। অন্তর্যামী জানেন, স্বামীর সাথে সম্পর্ক থাকাকালীন সে অন্য কোনও পুরুষের দিকে তাকায়নি।

কাকে বলতো অদ্বিতীয়া এইসব কথা! নিজের ঘরের কথা বাইরে বের করে লোকের হাসি ঠাট্টার পাত্র না হবার যে সিদ্ধান্তের কারণে অদ্বিতীয়া কোনদিন মুখ খুলে নাই, সেই পাবলিক নুইসেন্সই হল তার জীবনে। লোকে বলাবলি করল এতবছর যদি সে সহ্য করতে পারল তাহলে মেয়ে বড় হওয়া পর্যন্ত তার সংসার টিকিয়ে রাখা দরকার ছিল। তাছাড়া সে যেহেতু এতদিন কিছু বলে নাই কাউকে তো হঠাৎ এসবের মানে কি? তারও নিশ্চয়ই কোনও দোষ আছে। দোষ তো আছেই অদ্বিতীয়ার, আত্মসন্মানবোধ।

অনেকে যারা অদ্বিতীয়ার ব্যক্তিত্ববোধকে অহংকার ভাবতো, তারা ভাবল এইবার অহংকার ভাঙল। মেয়ে মানুষের এতো আত্মসন্মানবোধ আবার কিসের! আরও বলল এতো বড় ছেলে-মেয়ে নিয়ে এসব তামাশা করার দরকারটা কি? অদ্বিতীয়ার মনে রাখা উচিত, এটি তার দ্বিতীয় বিয়ে ছিল। মোদ্দাকথা, সব ধরনের অভিযোগের তীর অদ্বিতীয়ার দিকেই ধেয়ে আসল, স্বামীর বেলায় শুধু মন্তব্য হল,’ পুরুষ মানুষ এরকম করেই থাকে, তাকে সামলানোর দায়িত্ব নারীর উপরেই বর্তায়, প্রথম থেকেই কঠিনে-নরমে অদ্বিতীয়ার এই ব্যাপারটা সামাল দেয়া উচিত ছিল। ব্যর্থতা অদ্বিতীয়ারই। অদ্বিতীয়ার কানে আসে সবই কিন্তু শোনে না সে কিছুই। জীবনের ওই অধ্যায়ের পাতা উল্টে গেছে তার কাছে।

সহকর্মীদের সাথে যৌথ মালিকানার একটি বাড়ীর একটি ফ্ল্যাটের মালিক সে। প্রতিটা জিনিস নিজেদের পছন্দমত সাজায় তারা। বিনা দ্বিধায় সে বলে, আমি আর আমার সন্তানেরা মিলেই আমাদের পরিবার। শেষ পর্যন্ত আইনী বিচ্ছেদ পেলো সে। খোরপোষ কিছুই পেলো না। তার দেনমোহর ছিল ১ টাকা। হাসে অদ্বিতীয়া নিজের মনেই। তার দুটি সন্তানই পড়ালেখায় মেধাবী। মাকে কষ্ট দেয় না তারা কোনওভাবেই। জীবনের পুরনো অধ্যায়কে দ্রুত ভুলে যাওয়ার জন্য অদ্বিতীয়া বেশী বেশী কাজ করে। কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের অতি প্রিয়জন অদ্বিতীয়া- কী দেশে, কী বিদেশে।

অজস্র ভুল সে করেছে জীবনে, কিন্তু ভুল স্বীকার করতে ভয় পায় না অদ্বিতীয়া। এতো বাধা বিপত্তির পরও স্বপ্ন পূরণের দিকে হেঁটে চলেছে সে এক নি:সঙ্গ শেরপা। ফিনিক্স পাখীর মতন ভুলের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে আবারো পুনর্জন্ম যেন এই অদ্বিতীয়ার। (চলবে)

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.