কফি উইথ পাপ্পু দত্ত

Pappu
পাপ্পু দত্ত

পাপ্পু দত্ত – অসাম্প্রদায়িক সমাজ রাজনৈতিক আন্দোলনে একটি পরিচিত নাম। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে সোচ্চার অনলাইন অ্যাকটিভিস্টদের অন্যতম একজন। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে পড়াশুনা শেষ করে তিনি উন্নয়ন সংস্থার কাজে পেশাগত অভিজ্ঞতা নেন। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের সক্রিয়তায় পেশাগত কাজ কিছুটা একপাশে রেখে মন দেন ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার এ জনআন্দোলনে।

সমাজ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ লেখার ভালো হাত রয়েছে তার। অবসরে বই-পুস্তক পড়া তার শখ। আচরণে নিরাপোষ হলেও ফাঁপা মেট্রোপলিটানের সার্কাসের বাইরের মন্দ্র জীবনে পাপ্পু সহজ ও বন্ধুভাবাপন্ন। সবাই হেসে হেসে প্রতিদিনের নাগরিক ভাঁড়ামির অংশ হলেও পাপ্পু নিজেকে এসবের বাইরে রাখে্ন। এলিয়েনেশনের মেট্রোপলিসে চর্চিত নেতিবাচক গ্রাম্যতাকে প্রত্যাখান করে তিনি চলে যান সবুজ গ্রামের সহজ মানুষের আর নিসর্গের কাছে। অক্সিজেন নিয়ে ফিরে আসেন কার্বন-ডাই অক্সাইড বহুল মহানগর ও মহাফেসবুকে। চলুন আজ আড্ডা দিই পাপ্পু দত্তের সঙ্গে।

আমাদের নাগরিক সমাজ কতটা নাগরিক হতে পেরেছে, কতটা পরচর্চামুখর হতাশা ও গ্রাম্যতা নাগরিক মনে; সেসব নাগরিক জীবনের সংকট নিয়ে কথা হতে পারে; আর দেশভাবনাতো ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত আমাদের প্রতিদিনের আড্ডায়। আজকের অতিথি পাপ্পু দত্ত।

সাব্বির খান: এডমিন পরিবার থেকে আপনাকে স্বাগতম।আজ কেমন আছেন? দেশের সার্বিক পরিস্থিতির সাথে আপনার উত্তরের সহযোগ কতটুকু?

পাপ্পু দত্ত: আপনাকে ধন্যবাদ সাব্বির ভাই। আজ ভালো আছি । দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বলতে যা বোঝায় তার গণ্ডি আসলে অনেক বিস্তৃত । আমার ভাবনার জায়গায় রাজনীতি-যুদ্ধাপরাধের বিচার সংশ্লিষ্ট বিষয় বেশি প্রাধান্য পায় । তাই দেশের সার্বিক পরিস্থিতি দ্বারা আমার ভালো-মন্দ থাকা সম্পূর্ণ প্রভাবিত না হলেও নির্দিস্ট কিছু বিষয় অবশ্যই প্রভাবিত করে । তাই প্রাসঙ্গিকভাবেই ভালো-মন্দ থাকার সঙ্গে উত্তর প্রদানের বিষয়টি সংযুক্ত থাকে এবং নিয়ন্ত্রিত হয় ।

সাব্বির: আপনি একজন অ্যাকটিভিষ্ট। একজন রাজনীতিবিদ এবং আপনার প্রাত্যহিক জীবনের মাঝে পার্থক্যকে আপনি কিভাবে নিরূপণ করেন? একজন অ্যাকটিভিষ্ট কি অর্থে একজন রাজনীতিবিদও, যদি একটু বুঝিয়ে বলতেন।

পাপ্পু: আমার প্রাত্যাহিক জীবনকে রাজনীতিবিচ্ছিন্ন জীবন হিসেবে কখনও দেখিনি । আমি বিশ্বাস করি ‘মানুষ রাজনৈতিক জীব’ । একজন অ্যাকটিভিস্ট বলতে এখানে সুনির্দিস্টভাবে অনলাইনে-অফলাইনে যে বিষয়গুলোর সঙ্গে আমাদের এক্টিভিটি জড়িত সেগুলো অরাজনৈতিক কোনো ইস্যু নয় । রাজনীতি সচেতনতাবিহীন কারোর পক্ষে আমি মনে করি না ভালো অ্যাক্টিভিস্ট হওয়া সম্ভব । তবে হ্যাঁ, যে প্রশ্নটি এখানে আসতে পারে সর্বাগ্রে তা হচ্ছে, রাজনীতি বলতে কি বুঝানো হয় ?

আমাদের দেশে রাজনীতির তথাকথিত সংজ্ঞা হচ্ছে কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করে রাস্তায় স্লোগান দেয়া, দলের পক্ষে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়া ।
সত্যিকারের ‘রাজনৈতিক’ হয়ে ওঠার বিষয়টির ধারণা আরও অনেক বেশি বিস্তৃত । একাডেমিক দিক থেকে সেটা আরও ভালো বুঝা যায় । এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটে যখন তথাকথিত ‘রাজনীতির’ অংশ না হয়েও একজন মানুষ রাজনৈতিক এবং রাজনৈতিক সচেতনতা থেকে অ্যাক্টিভিস্ট হয়ে ওঠে ।

আনিস পারভেজ: যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে সোচ্চার অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট’ হিসেবে সরকারের নির্লোভ সদিচ্ছাটুকুর মূল্যায়ন করবেন কি?

পাপ্পু: ‘যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবীতে সোচ্চার অনলাইন এক্টিভিস্ট’ হিসেবে সরকারের নির্লোভ সদিচ্ছার মূল্যায়ন করতে গেলে প্রথমেই যে কথাটি আমাকে স্বীকার করতে হবে, তা হলো

এই বিচার শুরুর জন্য যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তা সরকারেরই সদিচ্ছার ফসল । অন্যভাবে বললে ত্রিশ লাখ শহীদ আর চার লাখ ধর্ষিতা মা-বোনের রক্তের ঋণ শোধে দেশের জনগণের প্রাণের দাবীকে সরকার উপেক্ষা করেনি । আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পর ৪৩ বছর পার হয়ে গেছে । ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের সরকার গঠিত হয়েছে ক্ষমতার পালাবদলে । তো সরকারের সদিচ্ছা না থাকলে বর্তমান যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল আমরা পেতাম না । ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতি নানান সমীকরণ তৈরিতে আমাদের প্রলুব্ধ বা বাধ্য করে । তাতে যুদ্ধাপরাধের বিচারে সরকারের নেয়া আন্তরিক পদক্ষেপগুলো অস্বীকৃত হয়ে যায় না । সরকারের সদিচ্ছা ঠিক ততখানিই মূল্যায়িত হবে যতখানির প্রতিফলন এবং বাস্তবায়ন সত্যিকার অর্থেই ঘটেছে ও ঘটবে ।

মাসকাওয়াথ আহসান: মেট্রোপলিটানের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে; নানা জায়গার মানুষ এসে আধুনিক মনোভঙ্গী নিয়ে নাগরিক জীবন যাপন। অন্যের এরিয়া অফ প্রাইভেসিতে ইন্টারফেয়ার না করা । অর্থাৎ নিজের মতো জীবন যাপন; অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে অনধিকার চর্চা না করা। মেট্রোপলিটান ও কসমোপলিটান সিটির মানুষেরা নিজের চরকায় তেল দেবার কথা। সেটি আমাদের ঢাকা শহরে কোন কোন ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই পিছিয়ে থাকা অজো পাড়ার কুচুটেপনা চোখে পড়ে। সমসাময়িক পুরবাসী (নগরবাসী) বা নেটিজেন হিসেবে কতটা প্রস্তুত আমরা? আপনার কী মনে হয়!

পাপ্পু: আবহমানকালের আমাদের সামাজিক রীতিনীতির প্রধান অংশজুড়ে বিরাজ করছে ‘প্রাইভেসি’ লঙ্ঘনের মতো অপরাধ । অপরাধ শব্দটির ব্যবহার আমার ব্যক্তিগত, আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রযোজ্য নয় ।

প্রাইভেসী বিষয়টি বুঝার জন্য যে ধরনের উদারনৈতিক-ইতিবাচক পারিপার্শ্বিকতা, পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষা, সুরুচি ও সংস্কৃতির চর্চা প্রয়োজন তা আমাদের দেশে অনুপস্থিত । কোনো কোনো পরিবারে দৈবচয়নের ভিত্তিতে আমরা পেলেও তা এই সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে না । তাই প্রাইভেসী বলতে প্রকৃতার্থে এখানে কিছু নেই । তাই এর যে লংঘনজনিত অপরাধ প্রতিনিয়ত ঘটছে পরিবার থেকে শুরু করে সর্বত্র তা আলাদা করে ‘অপরাধ’ হিসেবে পরিগণিত না হওয়ায় এর সম্পর্কে সচেতন হবার সুযোগটাও সেভাবে তৈরি হচ্ছে না ।

কুচুটেপনা বৈশিষ্ট্যটি হিউম্যান ইন্সটিঙ্কটস-এর অন্যতম । উপরে যে উদারনৈতিক পারিপার্শ্বিকতার কথা উল্লেখ করেছি তার অনুপস্থিতি এবং জন্মসূত্রে প্রাপ্ত পারিবারিক অপশিক্ষা কুচুটেপনার জন্য দায়ী । অনৈতিকভাবে কিছু অর্জন করতে চাওয়ার লোভ থেকেও মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে । যেহেতু এটি সংক্রামক তাই খুব সহজেই আশেপাশের মানুষের ভেতরকার এই ইন্সটিংক্টকে বাইরে বের করে নিয়ে আসে এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে তা প্রকট হয় ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তথা ভার্চুয়াল পৃথিবী এবং বাস্তবে আমার শরীরী অবস্থানের যে জগত এর মাঝে পার্থক্য তৈরি হতে পারে কেবলমাত্র উভয়জগতে বিচরণকারী মানুষের মধ্যেকার নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলো ভিন্নধর্মী হলে কিংবা তাদের মনস্তত্ব থেকে অন্তর্হিত হলে । সেটা আমরা হতে দেখি না । ফলে ভার্চুয়াল সামাজিক মাধ্যমে এসে বাস্তব জগতের মতোই নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলোর চর্চা একই ব্যক্তি যখন চালিয়ে যায় তখন উভয়জগতের মধ্যে পার্থক্য শুধু হয় শরীরি আর অশরীরি । এর বাইরে কিছু না । বরং আমরা দেখতে পাই মানুষ ভার্চুয়ালে এসে আরও বেশি অনৈতিক হয়ে পড়ে । এর কারণ প্রধানত, তার চেহারা দেখা যায় না । খুব সহজে ভদ্রতার মুখোশ সেটে নেয়া যায় এবং যথেচ্চাচারে লিপ্ত হওয়া যায় । এখানে আইনগত বাধ্যবাধকতা কাজ করে না, সামাজিকভাবে হেয় হবার ভয় প্রায় অনুপস্থিত । নেটিজেনরা প্রস্তুত হবার পরিবর্তে ‘সুযোগের অভাবে সৎ এবং সততার অভাবে সুযোগসন্ধানী’ -এরকমটাই প্রমাণ করে চলেছে নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নানান উপায়ে…………

তীর্থের কাক: উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে কোন কোন বাধার সম্মুখীন হয়েছেন? এগুলো হতে উত্তরণের পথ আপনার কাজের জায়গা থেকে বলবেন কি? আরেকটা প্রশ্ন: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে বেশিরভাগ পুরুষ এবং নারী, নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে বিচার করে সেখানে নারীকে যথার্থ মানুষ হিসেবে গণ্য হতে হলে বাকি সমাজের কি ভূমিকা পালন করা উচিৎ বলে আপনি মনে করেন?

পাপ্পু: ‘উগ্র সাম্প্রদায়িকতা’ আমাদের উপমহাদেশের সবচে বড় সংকট সৃষ্টিকারী কারণ বা উপাদান যেভাবেই আপনি দেখুন । এর সঙ্গে রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত । কখনও কখনও রাষ্ট্র এর পৃষ্টপোষক হয় ।

উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইটা বেশ সময়সাপেক্ষ । কেননা , ধর্মকে আশ্রয় করেই এর উৎপত্তি । ধর্মের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে প্রভাবিত হয়ে অনেক সময় একজন অতি নিরীহ মানুষও হঠাত করেই হয়ে উঠতে পারে উগ্র সাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব ।

বাধার যে ধরনটি এখানে খুব কমন তা হলো, জনসংখ্যার দিক থেকে যে ধর্ম পালনকারী মানুষের সংখ্যা একটি দেশে বেশি হয় তারা তাদের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক এমনকি ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থের জন্যও ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে যখন ব্যবহার করা শুরু করে । তারা তখন উগ্র সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠে যেটার মাধ্যমে অধিক লোকের সমর্থন পাওয়া তাদের জন্য সহজ হয় ।

এগুলো থেকে উত্তরণের জন্য পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সব পর্যায়েই বিশেষ করে একটি শিশুর জন্মের পর তার মনস্তাত্বিক গঠন, মননশীলতার বিকাশে যে উপাদানগুলোর উপস্থিতি প্রয়োজন সেগুলোর সহজলভ্যতাই পারে ধীরে ধীরে উপরের সমস্যা থেকে উত্তরণে সাহায্য করতে । আর্থিক সমস্যা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে অনেক সমস্যার সৃষ্টি করে । সেগুলো যত বেশি সমাধান হবে ধাপে ধাপে অন্য সমস্যাগুলোও অটোম্যাটিক সমাধানের দিকে যাবে । কেননা, মানুষের যে পাঁচটি মৌলিক চাহিদা এদের যে কোনো একটি পূরণে ভারসাম্য এদিক ওদিক হলেই অন্যান্য সমস্যাগুলো আরোপ হবার সুযোগ বা পরিবেশ পায় । বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম উদাহরণ নয় ।

প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ তীর্থের কাক।

আনিস পারভেজ: সেই উত্তরণে রাষ্ট্রের করণীয় কি? শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মক্ষেত্রকে ধর্ম থেকে আলাদা করাই কি সমীচীন নয়?

মেহজাবীন খান: আপনাকে যদি দেশের প্রধান করা হয় আপনি প্রথমে কোন কাজটি করবেন? আরেকটি প্রশ্ন মেজাজ খুব খারাপ হলে তখন কি করেন?

পাপ্পু: তীর্থের কাক, আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে সংক্ষিপ্তভাবে বলছি, নারী শুধুমাত্র বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের প্রায় সর্বত্র ভোগ্যপণ্য হিসেবে গণ্য হয় ।

বর্তমান যুগ মার্কেট ইকোনমির যুক । বাজার অর্থনীতিতে সবকিছু দেখা হয় পণ্য-বাজার-ভোক্তা-প্রফিটের হিসেবে । নারী এখানে পণ্য হিসেবে লোভনীয় অবস্থানে আছে সন্দেহ নেই । উল্টোভাবে লক্ষ্য করে দেখুন, এই পণ্যের ভোক্তা কেবল পুরুষই নয়, নারী নিজেও । যখন এভাবে দেখা হয় তখন ‘ভোগ্যপণ্য’ হিসেবে নারীর চাহিদাকে বিবেচনা করা হয় । আপনি যে নৈতিকতার ও নারীর প্রতি সম্মানের জায়গা থেকে দেখছেন বাজার অর্থনীতিতে তা উপেক্ষিত ।

এখন আসি পরের লাইনে । যখন একজন নারী তার জন্মসূত্রে পাওয়া অধিকার নিজে থেকে অনুভব এবং স্বীকার না করে অন্য কারো কাছে (হতে পারে সেই জবরদখলকারী ব্যক্তি ঐ নারীর পরিবারের বা পরিবারের বাইরের সদস্য, নারী বা পুরুষ যে কেউ ) নিজের অধিকার পাবার জন্য কান্নাকাটি করে তখন একবার সে নিজেকে অন্যের অধীনস্থ বলে স্বীকার করে নেয় এবং যার অধীনে থাকে সেই ব্যক্তিটি অন্যায়ভাবে উক্ত নারীর অধিকার খর্ব করে ।
এখানে নারী অসচেতন তার নিজস্ব স্বাভাবিক অধিকার সম্পর্কে ।

আপনি সমাজের করণীয় জানতে চেয়েছেন । সমাজ সৃষ্টির আদিতে আছে এই নারী । কারণ সন্তান জন্ম দেয় সে । একজন নারী যখন পুরুষ সন্তান জন্ম দেয় তখন তার উচিত সেই সন্তানকে তার মায়ের এবং নারীর জাতির বাকি সদস্যদের সম্মান করতে শেখানো । আমাদের ক’জনের মা তা করেন ? ‘সত্য’ বড় দুঃখজনক । শিশু যদি হয় নারী তাহলে তাকে সেই শিক্ষা দেয়া হয় যাতে পরিবারের এবং সমাজের পুরুষ সদস্যদের মতের বাইরে সে না যায় । মানুষের জন্ম ঠিক যে জায়গায় সেখান থেকে নারীকে সম্মান দেবার শিক্ষাটা না পেলে এই মানুষদের দ্বারা গঠিত সমাজে নারীর মর্যাদা পাবার বিষয়টি অন্ধকারেই থেকে যেতে বাধ্য ।

আরও কিছু দুঃখজনক ব্যাপার আছে । আমাদের এখনকার সচেতন শিক্ষিত সমাজেও নারীর বিষয়ে নারী নিজেই একটি অশিক্ষিত অজঃসমাজের ধারণাই বহন করে । অপেক্ষাকৃত বুদ্ধিমানরাই সমাজ নিয়ন্ত্রণ করে । তাই এখানে চালকের আসনে বসতে চাইলে নারীকে সেই মেধা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়েই আসতে হবে । একজন নারী তার মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহারে যত বেশি মনোযোগী হবে, রাষ্ট্রের চালিকাশক্তিগুলোর অংশ হতে যত বেশী আগ্রহী হয়ে উঠবেন এবং নিজের সন্তানদের সুশিক্ষিত করে তোলার ব্যাপারে মনোনিবেশ করবেন, শুধুমাত্র তখনই তারপক্ষে সম্ভব হবে নিজেকে একটি বিশেষ মর্যাদার স্থানে উন্নীত করা, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা ।

পাপ্পু: মেহজাবীন খান, আপনার প্রথম প্রশ্নটি আপেক্ষিক । ওটা নির্ভর করবে অনেকগুলো শর্তের উপর । যেমন, দেশের পরিস্থিতি, অনেক সমস্যার মধ্যে যেগুলো অগ্রগণ্য, বাস্তবায়নের সামর্থ্য ইত্যাদির উপর। মেজাজ খারাপ হলে তার কারণকে ‘নাই’ করে দিতে চেষ্টা করি । সমাধানের চেষ্টা করি । অক্ষম হলে নিজে নিজে প্রশমিত করার বিভিন্ন উপায় খুঁজে বের করি ।

শুভ মেহেদী: আপনি নিজে নারী হয়ে নিজের রূপের ব্যাপারে কতটুকু সচেতন যখন আপনি একজন রাজনীতিবিদ বা ছাত্র সংগঠনের হয়ে মাঠে ঘাঁটে আন্দোলন করে বেড়াচ্ছেন? অথবা আপনি নিজে নারী হয়ে আরেকজন নারিকে আপনার নিজস্ব রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অনুপ্রাণিত করতে হলে সবচেয়ে বেশী কোন জিনিষটায় বেশী খেয়াল রাখেন অথবা জোর দেন তাঁকে অনুপ্রাণিত করার ক্ষেত্রে?

পাপ্পু: মেহেদী ভাই, রুপ-সৌন্দর্য্যের ধারণা এক একজনের কাছে এক একরকম । আমার চেহারাসুরত, আকার-আকৃতি নিয়ে গর্ব-হীনমন্যতা কিছুই নেই । সুস্থ মানুষ হয়ে জন্মেছি এরচে বড় কি পাবার থাকতে পারে । যেখানে যে কাজেই ব্যস্ত থাকি না কেন এই বিষয়টি আমার ভাবনার তালিকায় থাকে না বললেই চলে এবং তা অনেস্টলি । তবে নিজের ভালো লাগার জন্য সুন্দর থাকতে চাওয়াকে অবশ্যই নিরুৎসাহিত করি না । আর অন্য একজন নারীকে আমি ঠিক নারী নয়, মানুষ হয়ে উঠতে বলি সবাইর আগে । এর জন্য যা যা প্রয়োজন যেমন শিক্ষা, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হয়ে ওঠার গুরুত্ব ইত্যাদি বিষয় অবধারিতভাবেই চলে আসে।

পাপ্পু: আমার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে অন্য কারোর একমত এবং আগ্রহী হওয়ার উপর নির্ভর করে তার সঙ্গে পরবর্তি ধাপের আলোচনায় অগ্রসর হওয়া । সেগুলো ব্যাকরণ মানা ব্যাপার না । ব্যক্তিভেদে প্রয়োজনসাপেক্ষে নিদান আলাদা আলাদা মেহেদী ভাই।

সুপ্রীতি ধর: কিন্তু একটা জায়গায় একটু খটকা আছে আমার। তুমি বলেছো, ‘অপেক্ষাকৃত বুদ্ধিমানরাই সমাজ নিয়ন্ত্রণ করে । তাই এখানে চালকের আসনে বসতে চাইলে নারীকে সেই মেধা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়েই আসতে হবে । একজন নারী তার মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহারে যত বেশি মনোযোগী হবে’….কথাটা কতটা সঠিক? বুদ্ধিমানরাই যদি সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করবে, তবে তো সমাজের এই হাল হতো না। আর সবক্ষেত্রে কি নারী তার মেধা আর যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারছে?

পাপ্পু: বুদ্ধিমানরা সমাজের নিয়ন্ত্রণ না নেবার অর্থ পরিষ্কার । অযোগ্য লোকের হাতে চলে যাওয়া । আর নারী চালকের আসনে বসার ব্যাপারে এখনও যথেষ্ট পিছিয়ে আছে বলেই তো এই প্রসঙ্গের অবতারণা হয়েছে।একটা উদাহরণ দিলে চালকের আসনে বসার ব্যাপারটি আরও ক্লিয়ার হবে । একদিন ধানমন্ডিতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের একটি বিলবোর্ডে আমার চোখ আটকে গেল । ব্যাংক লোন বিষয়ক বিজ্ঞাপন । সেখানে তিনটি ছবি ছিল । দৃষ্টিকটু লেগেছে যে বিষয়টি তা হলো, একটি ছেলের অ্যামবিশন সে পাইলট হবে, একটি মেয়ের অ্যামবিশন সে সুন্দরী প্রতিযোগিতায় যাবে । খেয়াল করুন পার্থক্যটা । একটি মেয়ের অ্যামবিশন কেন এমন হয় না যে সে বিজ্ঞানী হবে, বড় একজন রিসার্চার হবে কিংবা পাইলট । সে যাবে সুন্দরী প্রতিযোগিতায় যেটা আসলে চালকের আসনে তাকে বসাবে না কখনই, চালকদের স্টিয়ারিং হতে সাহায্য করবে বড়জোর । আমি জানি না ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারলাম কি না । এই অ্যামবিশনের জায়গায় নারীকে আমি দোষ দিব কেননা সামর্থ্য থাকলেও এর সদব্যবহার করার সদিচ্ছা সচরাচর নারীদের মধ্যে আমি খুঁজে পাই না ।

সুপ্রীতি: পাপ্পু, তোমার এই প্রসঙ্গের জের ধরেই বলছি, সাম্প্রতিক সময়ে একজন মেয়ে মডেল বেশ খোলামেলা পোশাক পরে আলোচনায় এসেছে। সে তার সাক্ষাতকারে বলেছে, ছোটবেলা থেকেই ভাল কিছু করার স্বপ্ন ছিল, তাই সে এটা বেছে নিয়েছে। তুমি তার এই কথাকে কতটা সমর্থন করো?

পাপ্পু: ‘ভালো কিছু’র মানদণ্ড মানবসমাজে দুইভাবে নির্ধারিত । একটা হচ্ছে সর্বজনগ্রাহ্য , আরেকটা একান্তই ব্যক্তিগত ইচ্ছে (খামখেয়ালীও হতে পারে কখনও ) থেকে উদ্ভূত । এখানে যে উদাহরণ আপনি দিলেন তা স্থান-কাল নির্বিশেষে সর্বজনগ্রাহ্য ভালোর উদাহরণ নয়, দ্বিতীয় ধারণাটি প্রযোজ্য । এই ‘ভালো কিছু করা’র ইচ্ছেজনিত কর্মকান্ড যদি সমাজের , আরও স্পেসিফিক্যাল নারীদের অবস্থানগত উন্নয়নে কোনো ইতিবাচক অবদান রাখতে সমর্থ না হয় তাহলে এর প্রতি আমার সমর্থনের সুযোগ নেই । হ্যাঁ, ব্যক্তিগত আচরণের  বিরোধীতায় আমি যাচ্ছি না ব্যক্তির স্বাধীনতাকে সম্মান জানিয়ে ।

মাসকাওয়াত আহসান: ফ্রিডম অফ চয়েসের ব্যাপার।

সুপ্রীতি: একই প্রশ্ন আমাকেও করা হয়েছিল। তোমাকেও করছি। এই যে মডেলের কথা বললাম, এটা যেমন আমাদের সমাজে হচ্ছে, তেমনি হেফাজতে ইসলামি নারীদের ঘরে বন্দী করার পাঁয়তারা করছে। এই দুটোকে তুমি কিভাবে দেখছো? নারীর স্বাধীনতা ফেলবে, নাকি স্বেচ্ছাচারিতা বলবে মডেলের এই আচরণকে? মাসকাওয়াত, আমি এটাকে মোটেও ফ্রিডম অব চয়েস বলবো না। তাহলে তো কেউ গাছপাতা পরেও স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে।

পাপ্পু: নারীর স্বাধীনতার সংজ্ঞা নারীকেই আগে ডিফাইন করতে হবে । পুরুষদের স্বাধীনতার প্রশ্নে এধরনের সমস্যার উৎপত্তি যদি না হয় তবে নারীদের বেলায় কেন হচ্ছে সেটাও খতিয়ে দেখার ব্যাপার আছে । হিজাব কিংবা নগ্নতা পো্ষাকি স্বাধীনতা, এটা ‘স্বাধীনতা’ শব্দটার সার্বিক ন্যারো ডাউন না ঘটিয়ে একটি ক্ষুদ্র অংশকে প্রাধান্য দিচ্ছে বলেই বোধ করি । নারীর পোষাকি স্বাধীনতার আগে মনস্তাত্বিক স্বাধীনতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখতে হবে । অর্থাৎ তাকে জানতে হবে সে কি চায়, কোনটা চায় । পোষাকি স্বাধীনতা উপেক্ষিত অথচ মনস্তাত্বিকভাবে স্বাধীন একজন মানুষের উদাহরণ আমাদের চোখের সামনেই, তিনি বেগম রোকেয়া । আমি অল্পকথায় বললাম । এর অনেক ব্যাখ্যা আছে, অনেক বক্তব্য, বিতর্ক । আপনি বুঝবেন আশা করি

মাসকাওয়াত: ফ্যাশন ও মডেলিং-এর জগতটা শিল্পের একটি শাখা, একজন শিল্পী যদি গাছ-পাতা পরা মানুষের ছবি আঁকতে পারেন, একজন মডেল শিল্পীও গাছ-পাতা পরে র‌্যাম্পে আসতে পারেন। সেটা কতটুকু শিল্পিত সেটা বিচার্য বিষয়। কিন্তু শোভনতার কোন সীমারেখা টেনে দেয়া ২০১৪ সালের মিডিয়া ও সমাজ বাস্তবতায় প্রায় অসম্ভব।

সুপ্রীতি: অন্য বিষয়ে বলি, পাপ্পুকে আমি যখন থেকে দেখেছি, মনে হয়েছে খুব রাগী একজন মানুষ। আসলেই কী তাই?

কাকলী: You Must have been so very tired answering all those questions Dear Pappu Dutta… Here is a cup of Coffee for you.. seat back, relax and sip this.. Along with Coffee Listen to this… One of my Favorites…

কানু দত্ত: কি গান শুনতে পছন্দ করেন?

পাপ্পু: দাদা, সঙ্গীতের বেলায় আমি সর্বভুক। সুপ্রীতি দিদি, আমার রাগের নেপথ্যে যুক্তিসঙ্গত ‘কারণ’ বিদ্যমান থাকে । আমি তীব্র অনুভূতিপ্রবণ মানুষ, তাই রাগের অনুভূতিও তীব্র। কাকলী আপা, আপনাকে ধন্যবাদ কফির জন্য।

হাসান অপু: সবচেয়ে বেশী কিসে রাগ উঠে?? কোন কারণে সবচেয়ে বেশী কষ্ট পান।। আমাদের সমাজে সুশীল নামে যারা বিচরণ করছেন তাদের সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী??

পাপ্পু: অপু, সবচে বেশী রাগ ওঠা নির্ভর করে রাগের কারণের গুরুত্বের উপর । অস্বচ্ছ আচরণ, সৎভাবে নিজের ভালো এবং মন্দকে স্বীকার করতে না পারা বিষয়গুলো বিরক্তির উদ্রেক করে । আরও অনেক্কিছুই আছে । ধরে ধরে বললে লম্বা হয়ে যাবে । সেদিকে না যাই ।

আমার ভালোবাসার মানুষদের আমি পালটা আঘাত দিতে পারি না । তারা যখন এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আমাকে বার বার আঘাত করে এবং আমি ফিরিয়ে দিতে পারি না সেটা প্রচণ্ড কষ্টের কারণ হয় । প্রকৃত সুশীল অর্থাৎ সু-শীল মানে ভালো নাপিতরা সমাজের উপকারী । তাদের নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই । আর প্রতীকী সুশীলদের আমি ঘৃণা করি ফিতাকৃমির মতো প্রাণহানিকর পরজীবী হিসেবেই ।

কাকলী: রাজনীতি মানে কি শুধু ক্ষমতায় আরোহণ? রাজনীতি মানে কি সমাজ সেবাতে ১০০% আত্ম নিয়োগ করা না? আপনি কি ভাবেন?

পাপ্পু: সাব্বির ভাই, মেল চ্যাপটার একটি কফি হাউস, পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকান, টিএসসি চত্বর, মানব-অবমানব-উপমানব-অপমানব নিয়ে নিরীক্ষণ-পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের জন্য সুন্দর একটি গবেষণাগার । যে সামাজিক বাস্তবতায় আমাদের বসবাস, খুব ছোট পরিসরে মেল চ্যাপটার তারই প্রতিরূপ ।

কাকলী: গণজাগরণ মঞ্চের দাবীকৃত নেতা কর্মী রা আন্দোলন ছাড়া বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে আমাদের সমাজের অসঙ্গতি নিরসনের জন্য মাঠে কাজ করছে না কেন? শুধু আন্দোলন করে বাস্তবতার ফল পাওয়া যাবে?

পাপ্পু: আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর দিচ্ছি । তার আগে একটা জিজ্ঞাসা থেকে যায় যে ১০০% সমাজসেবা বলতে আপনি কি বুঝেন ?

আমরা আমাদের রাজনীতিবিদ/জনপ্রতিনিধিদের আলাদা শ্রেণীতে বা জীব হিসেবে বিবেচনা করি । তারা আর দশজন সাধারণ মানুষের মতোই । তাদের পরিবার আছে, স্বার্থ আছে । তাদেরকেও জীবনযাপনের জন্য বিবিধ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে হয় । একটি বিশেষ চেয়ারে যখন কেউ বসেন নির্দ্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের জন্য, তখন সেটার প্রতি দায়বদ্ধতা ও সততাও কাম্য । জনপ্রতিনিধিরাও অন্যান্য পেশার মানুষদের মতো একটি বিশেষ পেশায় যুক্ত । শুধুই ক্ষমতায় আরোহন এবং এর অপব্যবহার শুধুমাত্র রাজনীতিবিদদের বেলায় নয়, আমি মনে করি সমাজের প্রতিটি পেশার মানুষের স্ব স্ব অবস্থান থেকে বিরত থাকা উচিত ।

জনপ্রতিনিধিরা আমাদের জনগণের অংশ । তারা এলিয়েন নয় কিংবা দৈবশক্তিতে বলীয়ান নয় । তারা আমাদেরই প্রতিনিধিত্বকারী । শুধু তাদের বেলায় ক্ষমতায় আরোহন বা ১০০% সমাজ সেবার আকাঙ্ক্ষা আমি সরমর্থন করি না । এটা সকলের জন্য প্রযোজ্য হওয়া উচিত । তাহলেই দায়বদ্ধ এবং সৎ প্রতিনিধি খুঁজে পেতে আমাদের জন্য সহায়ক হতে পারে কাকলী আপা।

কাকলী: ওয়ার ক্রিমিন্যালের মতো সামাজিক ব্যাধি নির্মুলে আমরা ব্যক্তি পর্যায়ে ভুমিকা রাখার ব্যাপারে উদাসিনতা দেখাচ্ছি কেন? বিচারের প্রশ্নে কেন সরকারের মধ্যেও দীর্ঘ সুত্রিতার আভাস দেখা যায়; যেখানে ক্ষমতায় মুক্তি যুদ্ধের স্ব পক্ষের দল??

পাপ্পু: গণজাগরণ মঞ্চ গঠিত হয়ে একটি নির্দিস্ট ইস্যুতে । সেটা যুদ্ধাপরাধের বিচার। এখানে ফোকাসড এবং লেগে থাকাটাই কাজ । সমাজে সমস্যার অন্ত নেই । এর সবকিছু নিয়ে তো গণজাগরণের পক্ষে সম্ভব না কাজ করা । হ্যাঁ, যেটা হতে পারে তা হলো, যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং শাস্তি কার্যকরের দাবী বাস্তবায়নের পরে তারা চাইলে সেগুলোর দিকে নজর দিতে পারে । এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত । এর সঙ্গে মঞ্চের কোনো সম্পর্ক নেই । এবং মঞ্চ বিষয়ক কোনো প্রশ্নের অফিসিয়াল উত্তর দেবার অধিকার মঞ্চের মুখপাত্র রাখেন, আমি নই ।

তীর্থের কাক: প্রচলিত ধর্মগুলো কি নারীকে ঘরে তথা পুরুষের দাসত্বে বন্দী করছেনা? ধর্ম -সমাজ -রাষ্ট্র এবং ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে আপনার মতামত কি? নারীকে চালকের আসনে বসাতে ধর্মের ধনাত্মক কিংবা ঋনাত্বক ভুমিকা কি? ইদানিং বহুল প্রচারিত একটা প্রপাগাণ্ডা পোষাকের কারণে নারী ধর্ষিতা হয় ‘-এ বিষয়ে আপনার মতামত কি?

কাকলী: আপনার বেড়ে ওঠা নিয়ে যদি কিছু বলতেন; মানে পাপ্পু দত্ত হয়ে ওঠার গল্প।। স্কুল কলেজ এর প্রিয় শিক্ষক দের যদি একটু স্মৃতি চারনে আনতেন।। কেমন ছিল সেই সব ফেলে আসা দিন গুলো?

পাপ্পু দত্ত: ওয়ার ক্রিমিন্যালের মতো সামাজিক ব্যাধি নির্মূলে আমাদের ব্যক্তি পর্যায়ে ভূমিকা রাখার ব্যাপারে উদাসীনতার অনেক কারণসমূহের মধ্যে প্রধানগুলো হচ্ছে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত বিশ্বের ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা, ত্রিশ লাখ শহীদ এবং চার লাখ বীরাঙ্গনার প্রতি সম্মান জানাতে কার্পণ্য,  দায়িত্ব থেকে পলায়নপর মানসিক প্রবৃত্তি, দেশপ্রেমের অভাব, জাতি হিসেবে নিজেদের আত্মসম্মানবোধের অভাব, রাজনৈতিক অসচেতনতা, স্বাধীনতাবিরোধী পক্ষের দ্বারা ধর্ম ও অর্থের অপব্যবহার, কল্পনাতীত সহিংসতা, নিরাপত্তা ভীতি, ব্যক্তিস্বার্থ ও রাজনৈতিক স্বার্থ , মোটামুটি এগুলোই দৃশ্যমান বলা চলে ।

আর বিচারের দীর্সূত্রিতার প্রসঙ্গে যে কথাটা আসে প্রথমেই, এই বিচার চলছে সরকারের সহায়তায় গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে । সরকার বিচারের দায়িত্বে নেই, আছে ট্রাইব্যুনাল যেটা সম্পূর্ণ স্বাধীন । সরকার চাইলেই এখানে যা খুশি তা করতে পারে না । কেননা, বিচার যদি সরকার করতো তাহলে এত তথ্যপ্রমাণ-ফর্মালিটির প্রয়োজন হতো না । পূর্বাপর সামরিক সরকারগুলোর ন্যায় বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড ঘটিয়েই যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি দিতে পারতো । দীর্ঘসূত্রিতা ট্রাইব্যুনালের । বিচারপতি ও প্রসিকিউশনে সমস্যা, আসামী পক্ষের নানান টালবাহানা, ষড়যন্ত্র, বাঁধা বিপত্তি সবই এখানে বিদ্যমান।

সুপ্রীতি: তাহলে বলতে চাইছো, ট্রাইব্যুনালে সরকারের কোন ধরনের হস্তক্ষেপ নেই?

কাকলী: ধন্যবাদ সুপ্রীতি দিদি। আমার প্রশ্ন আমার আগেই করে ফেলার জন্যে!!!

পাপ্পু: তীর্থের কাক, আমি ধর্মবোদ্ধা নই । ধর্ম বিষয়ে খুব কম জানি এবং পারতপক্ষে আলোচনা করি না । ধর্ম আমার কাছে মন্দিরে যেয়ে পালনের বিষয় আজ অবধি হয়ে উঠেনি । যা ধারণ করা হয় তার নাম ‘ধর্ম’ অর্থাৎ আমি যা ধারণ করি আমার মননে, বিচারবোধে, হৃদয়ে, নৈতিকতায় সেটাই আমার ধর্ম । এর আগেও আপনার প্রশ্নের জবাবে বলেছি, আরেকবার বলছি, ধর্মের যে ব্যবহার রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে হয়ে থাকে, নারীদের ক্ষেত্রেও প্রচলিত সমাজবাস্তবতায় ধর্মের প্রয়োগ একইভাবে হয়ে থাকে । যেহেতু অত্র অঞ্চলের মানুষ ধর্মভীরু, নারীদের উপর অনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরোপে তাই ধর্মের ব্যবহারটাও খুব সহজেই সম্ভব হয় ।
পোশাকের বিষয়টি ছুতা । ধর্ষকের মানসিক কাঠামোই এর কারণ । আর সেই কাঠামো কিভাবে কোন জায়গা থেকে তৈরি হয় এটা নতুন করে বলার কিছু নেই যেহেতু নারীদেরকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখা এবং নারীদের মর্যাদা বিষয়ক প্রশ্নের উত্তরে আমি উদারনৈতিক পারিপার্শ্বিকতার অভাব ও পারিবারিক অপশিক্ষার কথা উল্লেখ করেছিলাম । ধন্যবাদ।

পাপ্পু: আমি খুব সাধারণ মানুষ । সাধারণ থাকতে পারাটাই আমার কাছে অসাধারণ লাগে । একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে অন্য দশজনের মতোই বেড়ে উঠেছি । অনেক ভালো ভালো শিক্ষা পরিবার থেকে পেয়েছি, হয়তো যতটুকু সামর্থ্য আমার তারচে বেশি নিতে পারিনি । বিশেষ কোনো গল্প নেই।

পাপ্পু: সবসময় যেমন করে কাটাই, মন খারাপ হলেও তাই । কথা না বলার চেষ্টা করি । তবে গান শোনাটা বেশ ইফেক্টিভ মনে হয়েছে আমার কাছে । আর খুব পছন্দের কাছের কারো সঙ্গে আড্ডার সুযোগ পেলে তো কথাই নেই । ভালো লাগার মুহুর্ত যেগুলো শেয়ার করার অন্যদের সঙ্গে করি, কিছু থাকে একান্ত নিজের জন্য আমি কবিতা লিখতে পারি না । যোগাযোগ কম । আপনারা লিখেন সেসব পড়ি । আর পড়ার ব্যাপারে সর্বভুক বলতে পারেন । যখন যা জোটে …

( বন্ধুপ্রতীম মেল চ্যাপ্টারের নিয়মিত আড্ডা থেকে তুলে আনা)

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.