সাহেরা কথা- ১৫

লীনা হক:

আজ সকালে চা খাওয়ার সময় জিজ্ঞ্যেস করলাম,’ ও সাহেরা, এই যে জাতীয় বাজেট ঘোষণা হলো, তাতে তোমার মতামত কী?’

সাহেরা বলে,’ জাতীয় বাজেট আবার কী আফা?’ যতদূর পারি বোঝাতে চেষ্টা করলাম। সাহেরা বলে,’ ও, তাই কহেন আফা, জিনিসপত্রের দাম বাড়াইবার জন্য বচ্ছরকার সরকারি হিসাব।‘

বাজেটের এমন টু দি পয়েন্ট ডেফিনেশন শুনে আমার গলার চা তালুতে ঠেকলো। সাহেরা গো সাহেরা, বাংলা ভাষার অভিধান তৈরির সময় কেন যে তোমার সহযোগিতা নেয়া হয় নাই! সাহেরা তার চায়ের কাপ হাতে করে এসে বসলো আমার খাটের পাশে। আমি তার বাজেট তথা ‘দাম বাড়াইবার সরকারি হিসাব’ সম্পর্কে বক্তব্য শোনার জন্য তৈরি হলাম।

বলে চলে সে, ‘ আফা, এই যে রমজান আইতাছে, পিঁয়াজের দাম বাড়বে, ডালের দাম বাড়বে, চালের দাম বাড়বে, বেগুনের দাম বাড়বে, তার জন্য সরকারি বাজেটে কিছু বলে নাই? পানির বিল আর বাত্তির (ইলেকট্রিসিটি) বিল কি কমছে?”

বলার চেষ্টা করলাম, সাহেরা, বাজেট শুধু এইসব নিয়ে নয়…’ প্রায় থামিয়ে দিলো আমাকে সে।

‘আফা, আমার মতন গরীবের ঘরের জন্য এগুলাই বাজেট। শুনছি বাল্বের দাম বাড়ছে। আমাগোর বাড়ীঅলা কইল।‘। বুঝলাম সে এনারজি সেভিং বাল্বের কথা বলছে।

‘ওমপুর (রংপুর) যাওয়ার বাস ভাড়া কি কমিছে আফা?”

আহ সাহেরা, তুমি যে এতো ছোট বিষয় নিয়ে ভাব, বড্ড বেকায়দায় ফেলো আমাকে।

পত্রিকা থেকে পড়ে শোনাই তাকে, বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত দাবি করেছেন, সরকার খাদ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি কৃষকের শস্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করেছে। মন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রণোদনা মূল্যে কৃষকের কাছ থেকে খাদ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে, কৃষি খাতে সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার সাথে সাথে বাংলাদেশকে একটি কৃষি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করার কথা বলেছেন মন্ত্রী।

সাহেরা বলে, ‘কিন্তুক আফা, গেল বছরও তো হামার আব্বায় আলু আর মুলা চাষ করিয়া নোকসান (লক্সান) খাইল, পাইকারের ঘর যে দামে বোলায় তাতে তো ওমার খরচাও ওঠে না। ওমরা তো সরকারি কুন সাহায্য পায় নাই। ক্ষেতের মুলা ক্ষেতেই গোর দিলো। আর আলুরও সেই মতন হইল!”

তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কৃষকের ভতুর্কির পরিমাণ বাড়ানোর কোনো ঘোষণা বাজেটে নাই। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জন্যও কৃষি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করেছেন তিনি। কৃষি খাতে মোট ১২ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। গত অর্থবছরের তুলনায় ১১১ কোটি টাকা বেশি। এদিকে সামগ্রিকভাবে কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও অনুন্নয়ন খাতে বরাদ্দের পরিমাণ আবার ৮১ কোটি টাকা কমে গিয়েছে। ওদিকে কৃষি উন্নয়ন বরাদ্দ এক হাজার ৩৩২ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ৫২৪ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। সার, বীজ, সেচসহ কৃষি উপকরণ সহায়তা আগের বছরগুলোর মতোই অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এবারও জামানত ছাড়া বর্গাচাষিদের ঋণ দেওয়া অব্যাহত থাকবে। এ ছাড়া নতুন উদ্যোগ হিসেবে কৃষকের সব তথ্যসংবলিত তথ্যভান্ডার (ডাটাবেইজ) গড়ে তোলা হবে।

আবার জিজ্ঞ্যেস করে সাহারা, ‘ আফা, আমার আব্বার এক টুকরা জমি আছে, আবার ভাগীতে (বর্গা) ক্ষেত করে আমার ভাইয়েরা, ওমরা (ওরা) কি এইসব সুবিধা পাইবে যা তোমরা পড়ে শুনাইলেন? হামার উপজেলা সদরের কৃষি ব্যাঙ্কে কি কৃষি অফিসে কোনও ঋণের জন্য কি বীজ সারের জন্য তদবির করতে নাগে পয়সা। এইগুলার কোনও বিহিত কি সরকার করবে এই হিসাবে? ”

অনেক খুঁজেও এই সকল বিষয়ের মনিটরিং করার ব্যাপারটি বা সেই বিষয়ের জন্য কোনও বাজেট বরাদ্দ দেখলাম না আমি। বলি তাকে, শোন সাহেরা, এই বাজেটে ভালো প্রস্তাবও আছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জন্য দুই হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে নারী উন্নয়নের জন্য ১০০ কোটি টাকা। বেরসিক সাহেরা আবার জানতে চায়,’ ১০০ কুটি হউক কি ২০০ কুটি- হামার কি লাভ হইবে সেই কথা কহেন তো বাহে তোমরা!”

উহ, সাহেরা আমরা জাতীয় বিষয় নিয়ে কথা বলছি, খালি আমি আমি করো নাতো! থামাই তাকে, আচ্ছা শোন, আরও ভালো খবর আছে, বঞ্চিত, অবহেলিত ও পরিত্যক্ত গোষ্ঠীর উন্নয়নে বিভাগীয় ও জেলা শহরে তাদের আবাসনের ব্যবস্থা করার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী। ৫০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে এই জন্য।

শেষ করতে পারি না, সাহেরা ফস করে বলে ওঠে,’ তার মানে কি হামারগুলার জন্য সরকার বাড়ি বানাই দিবে? ওমপুর (রংপুর) শহরত সরকারি এই বাড়ি পাওয়ার জন্য কি করা নাগবে আফা তোমরা এটটু হেল্প (সাহেরা এই ইংরেজী শব্দটি ঠিক ঠাক উচ্চারণ করে) করেন তো মোক এই বিষয়ে।‘ নাহ আর পারছি না সাহেরাকে নিয়ে।

প্রসঙ্গ পাল্টাই, সাহেরার মেয়েদের পড়ালেখা নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন। ভাবলাম সরকারের শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির কথাটা তাকে খুশি করবে। শিক্ষা খাতে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বরাদ্দ গত বছরের চেয়ে দুই হাজার ৮৮৬ কোটি বেড়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে দেখা যায়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনকূলে অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন ব্যয় মিলিয়ে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৩ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের বাজেটে তা ছিল ১১ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন ব্যয় মিলিয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৫ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের তুলনায় এই বরাদ্দ প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বেশি। কিন্তু মূল বাজেটের কত শতাংশ তা আর সাহেরাকে বললাম না। বর্ধিত শিক্ষা বাজেটেও কিন্তু কোনও খাতওয়ারি কিছু দেখলাম না। প্রাথমিক শিক্ষকদের মিনিমাম সন্মানীয় বেতন ভাতা কি এখান থেকেই হবে? এইসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করার কন্য কোনও উদ্যোগের কিছু পেলাম না। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত শুভংকরের ফাঁকিতেই দাঁড়াবে হয়তো বা।

তবু শেষ চেষ্টা করি সাহেরাকে আশার বাণী শোনাতে। সাহেরা শোন, আগামী ২০১৮ সালের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা হবে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত।এর মধ্যেই ৭৫৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি ও সপ্তম শ্রেণি চালু করা হয়েছে। পরবর্তীতে সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তা করা হবে। সাহেরার মেয়ের স্কুলও এর মধ্যে পড়বে। ব্যাপারটা আনন্দের নয়?

এইবার সাহেরা নড়ে বসে,’ আফা, তোমরা যে কহিলেন কত কুটি (সাহেরা কোটি বলতে পারে না) টাকা পড়ালেখার জন্য সরকার দিলো। মাইয়ার ঘরের (মেয়েদের) বৃত্তির টাকা কি বাড়বে? সরকার কি মেয়েদের জন্য বই ছাড়া খাতা পেন্সিল, ইশকুলের পোশাক এই গুলার ব্যবস্থা করবে এই টাকার থেকে? পরীক্ষার ফি কি মাফ করে দিবে নাকি?’ সাহেরার কোনও প্রশ্নের কোনও সঠিক জবাব আমার কাছে না থাকাতে, আমাদের বাজেট আলোচনায় সমাপ্তি টানতে বাধ্য হলাম।

সাহেরা চায়ের কাপ হাতে উঠে যেতে যেতে আপন মনে বলল,’ গরীবের কষ্ট এই জিন্দেগীতে কুনদিন কমে বলে কেউ দেখছে? মোর জীবনে তো খালি দেহি সগল কিছুর দাম খালি বাড়ে আর বাড়ে। মোর মাইয়া দুইখানের একটু ভালো খাওয়া পরার আর কুন ভরসা নাই। মাইয়াক ম্যাট্রিক পর্যন্ত পড়াইতে মোর জান বাইর হইবে। সরকারি এইসব ভ্যানা প্যাঁচাল শুনিয়া মোর কুন লাভ নাই, হাতের কাম শেষ করিগা‘। আমি বোকার মতন অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার বিস্তারিত বিবরণ আর খ্যাত অর্থনীতিবিদগণের সারগর্ভ চুলচেরা বাজেট পর্যালোচনার এক তাড়া কাগজ যা কিনা সাহেরার ভাষায় ‘ভ্যানা প্যাঁচাল’ হাতে নিয়ে বসে থাকি।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.