হাত বাড়িয়ে দেখি কেউ নেই-২

old man 1শুচি সঞ্জীবিতা:  রহমান সাহেবকে দেখে যে কেউ বলবে, লোকটা পাগল হয়ে গেছে। সবসময় বিড় বিড় করে কি যেন বলে চলেছেন। আর এক জায়গায় স্থির থাকেন না তিনি। যেন চলছেন অনবরত। জুতা পায়ে দিচ্ছেন, আবার খুলছেন। সিঁড়ি দিয়ে একবার নামছেন, আবার উঠছেন।

কী সুন্দর তাঁর মুখের গড়ন, আকারে ছোটখাটো মানুষটিকে দেখলেই ভক্তি আসে। বোঝা যায়, সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম তাঁর। টিপটপ থাকেন, চুলটা পিছন দিকে উল্টিয়ে আঁচড়ান, সাদা চুল। বয়স কত হবে? ৭০ তো পার করেছেন অনায়াসেই।

যে বয়সে তার ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিদের নিয়ে আনন্দে থাকার কথা, সেই তিনিই আজ বৃদ্ধনিবাসে। তবে এখানেও তাকে আটকে রাখা কঠিন। শ্যামলী থেকে দিব্যি পায়ে হেঁটে চলে যান ধানমন্ডিতে নিজের বাড়ির সামনে। গেইট খোলা হয় না তাঁর জন্য। তাঁকে গেইটে দেখামাত্রই তাঁরই সহধর্মিনী চিৎকার করে দারোয়ানকে বলে দেন, যেন ঢুকতে না পারে। ছেলেদের ভয়েই করেন, বা নিজের থেকেই করেন, তা জানা হয় না। তবে এ বাড়িতে বাবার প্রবেশ নিয়ে কড়া নির্দেশ ছেলেদের। তারা আবার এরই মধ্যে মায়ের কাছ থেকে ডিভোর্স লেটারও সই করিয়ে নিয়েছে।

বৃদ্ধনিবাসে বেশ কয়েকদিন তাঁকে দেখার পর স্বভাবতই জানতে চেয়েছিলাম উনার পরিচয়। শুনে মনটা বিষন্ন হয়ে যায়। একসময় জাপানে বাংলাদেশ দুতাবাসের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন তিনি। ধানমন্ডিতে তাঁর নিজের বাড়ি। চাকরিতে অবসর নিয়ে ফেরত আসার সময় ব্যাংকে একটা ভাল ব্যালান্সও ছিল উনার। এসবই কাল হয়ে দাঁড়ায়। ছেলেরা বাড়ি এবং টাকা হাতিয়ে নিতে বাবার সাথে প্রথম থেকেই খারাপ ব্যবহার করা শুরু করে। একটা পর্যায়ে বাবাকে মানসিক বিকারগ্রস্ত বানানোর অপচেষ্টা চালায়। তাদের যুক্তিটা ছিল, বাবাকে পাগল প্রমাণ করা গেলে সম্পত্তি এমনিতেই তাদের হয়ে যাবে। মানসিক নির্যাতন করতে করতে একটা পর্যায়ে ওই ব্যক্তি কিছুটা ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। আবোল-তাবোল বলা শুরু করেন। ছেলেরাই তখন মায়ের কাছ থেকে ডিভোর্স লেটারটা নিয়ে বাবাকে বৃদ্ধনিবাসে পাঠিয়ে দেয়।

আশ্রয় কেন্দ্রে তাদের কড়া নির্দেশ থাকে, যেন কিছুতেই তাদের বাবা বাইরে যেতে না পারে, আবার তাঁকে ধানমন্ডিতে দেখা গেলে সোজা পাবনায় পাঠিয়ে দেয়া হবে, এমন হুমকিও দেয় তারা। কিন্তু বৃদ্ধনিবাস কর্তৃপক্ষের পক্ষে সম্ভব হয় না সবসময় নজরে রাখা। নিচে যাওয়ার নাম করে গেইট থেকে বেরিয়েই সোজা রিকশায় চেপে বসেন প্রায়ই। গন্তব্য তাঁর নিজের বাড়ি। সেই বাড়ির সামনে গিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন ঘন্টার পর ঘন্টা। ভিতরে যাওয়ার অনুমতি মেলে না। তীর্থের কাকের মতোন বসে থাকেন কখনও। একটি বার, অন্তত একটিবার যদি তিনি ভিতরে যেতে পারেন, সেই আশায়।

বাসার ওপর তলা থেকে কেউ দেখে ফেললে ছেলেদের ফোন করে জানানো হয়। ছেলেরা তখন রেগে-মেগে বৃদ্ধনিবাসে ফোন করে কৈফিয়ত চায়, নয়তো পাবনায় পাঠানোর হুমকি দেয়। কিন্তু নিবাস কর্তৃপক্ষ মোটেও চান না যে, তিনি পাবনায় যান। তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। কিছুদিন ভালোই থাকেন, আবার হারিয়ে যান। একবার পুলিশ ডেকে ছেলেরা বৃদ্ধনিবাসে পাঠিয়ে দিয়েছিল।

বৃদ্ধনিবাসের পরিচালকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এখন উনি কোথায় আছেন? জানালেন, ‘উনি নিখোঁজ এখন’। মানে? হ্যাঁ, একসময়ে ওই ভদ্রলোকের বোন আর বোনের ছেলেরা এসে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখান থেকেই তিনি ‘নাই’ হয়ে গেছেন। মানুষটার ছেলেদের খবর দিয়েছিল বৃদ্ধনিবাস। কিন্তু ছেলেরা জানার আগ্রহও দেখায়নি। ফলে গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে যায়। আমরা কেউই তার অস্তিত্বের সন্ধান পাইনি। শেকড়ই যেখানে উৎপাটিত, সেখানে মানবজন্ম বৃথাই গড়াগড়ি খায়। (চলবে)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.