হাত বাড়িয়ে দেখি, কেউ নেই-১

old man 1সুপ্রীতি ধর: পত্রিকায় শোক সংবাদ, একজন মারা গেছেন। স্রেফ একটা নিউজ, মানে পত্রিকার সিঙ্গেল কলাম খবর। আমরা জানলাম, মানুষটা মারা যাওয়ার আগে কর্মজীবনে পেশায় ছিলেন কাস্টমস কর্মকর্তা। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, তিনি মৃত্যুকালে দুই ছেলে ও দুই মেয়েসহ অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী ও আত্মীয়স্বজন রেখে গেছেন। ছেলেরা এই শোক সংবাদের মাধ্যমে তাদের বাবার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন, এমনকি চারদিন পর অনুষ্ঠেয় কুলখানিতে যাওয়ার নিমন্ত্রণও জানিয়েছেন।

বলবেন যে, মামুলী একটা শোক সংবাদ নিয়ে কেন এই লেখা! আসলেই মামুলী। ব্যাক্তি মানুষটাই যেখানে মামুলী ছিলেন, ছিলেন সাধারণের চেয়েও সাধারণ, যার মৃত্যুর সাথে পথের চালচুলোহীন মানুষটার কোন পার্থক্য নেই, সে তো মামুলীই বটে! ব্যাংকে তার ১৫ লাখ টাকা থাকলেই কি আজ তাঁর মৃত্যুতে কোন হেরফের হলো? তাঁকে তো মরতে হলো সেই অভাগাদের মতোনই!

মানুষটি একদিন বেঁচেছিলেন, চাকরি করতেন, সংসার ছিল, সন্তানও ছিল। হয়তো সন্তানের জন্মের পর সবার মাঝে মিষ্টিও বিলি করেছিলেন। ছেলে যেদিন প্রথম বা-বা ডাক শিখেছিল, তিনিই হয়েছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সুখী ব্যক্তি। ছেলে যেদিন প্রথম হাসলো, প্রথম হাঁটলো, প্রথম স্কুলে গেল, তিনিই হয়তো ছিলেন তার পাশে অতন্ত্র প্রহরীর মতোন। ছেলের পরীক্ষার ফলাফলেও তিনিই হয়তো সবার আগে খুশিতে লাফিয়ে উঠেছিলেন, নিজেকে বাবা হিসেবে গর্ববোধ করেছিলেন। জীবনে যা পাননি, ছেলেদের মাঝে তারই প্রতিফলন দেখতে চেয়েছিলেন। সবই ঠিক ছিল।

এভাবেই চলছিল বেশ। ছেলেরা বড় হলো। লেখাপড়া শেষ করে যার যার কর্মজীবনে ঢুকে গেল। একসময় এই শুল্ক কর্মকর্তা ছেলেদের বিয়েশাদিও করালেন বেশ ধুমধাম করেই। ছেলের সুখই বাবা-মায়ের সুখ। হয়তো তিনি তখন কিছুটা স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলছিলেন এই ভেবে যে, ছেলেরা বড় হলে, সংসারের হাল ধরলে তাঁর এতোদিনকার পরিশ্রম কিছুটা কমবে। আর হয়তো দৌড়াতে হবে না কোথাও। এবার স্ত্রী-নাতি-নাতনিসহ সুখে-শান্তিতে থাকবেন।

কিন্তু গল্পের শেষটা মোটেও সেভাবে হয়নি। দিন গেল, উনি অবসরে গেলেন। ব্যাংকে তাঁর কিছু টাকা জমা হলো সারা জীবনের পরিশ্রমের প্রাপ্তি। এই টাকাই তাঁর কাল হয়ে গেল। ছেলে-মেয়েরা এসে দাবি করলো টাকার। উনি বোঝালেন, এই টাকাটাই তাঁর শেষ সম্বল। কাজেই কিছু একটা করার চেষ্টা উনি করবেন অবসর জীবনে। কিন্তু ছেলেরা নাছোরবান্দা। মেয়েরাও বাদ যায় না কেউ। সবার দাবি ওই টাকা।

মামুলী মানুষটা তখন বুঝেছিলেন টাকাটা কিছুতেই হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। তাছাড়া ততদিনে সংসারের দৈনন্দিন টানাপোড়েনগুলোও তিনি অনুভব করছিলেন। আস্তে আস্তে নিজেকে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছিলেন। মা যেহেতু কর্মক্ষম, সংসারের কাজগুলো করতে পারেন, তাই মা এখনও অতিরিক্ত হয়ে পড়েনি কারও কাছে। ছেলেমেয়েরা মাকে নিয়ে টানাটানি করে। কিন্তু বাবা একা পড়ে থাকেন এককোণে।

old man 2একদিন বড় ছেলের সাথে কথা কাটাকাটি হয় বাবার। ছেলে তাঁকে বাসা ছেড়ে চলে যেতে বলেন। বাবার কষ্ট হয়। এটাই কি তাঁর ছেলে? কিন্তু উনি বেরিয়ে যান বাসা থেকে কাউকে কিছু না বলেই। এমনকি স্ত্রীর সাথেও বলেন না। এক ভাগ্নের সাহায্য নেন। কিন্তু একদিন বুঝতে পারেন, ওই ভাগ্নের চোখও ওই টাকাটার ওপরই। ততদিনে তাঁর শরীর পড়ে আসছে। মানসিক স্বাস্থ্যও একেবারে শূন্যের কোঠায়।

প্রচণ্ড শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে নিজ বাসায় ফিরেছিলেন, কিন্তু সন্তানরা কেউ ঘরে তোলেনি। স্ত্রীও মুখ ফিরিয়ে নিলেন। স্ত্রী’র কথা একটাই, ‘টাকাটা দিয়ে দিলেই তো হতো’। ভাগ্নের সাহায্য নিয়ে তিনি একটা হোটেলে গিয়ে উঠেন। সেখানেই তাঁর অস্থায়ী নিবাস গড়ে উঠে। কিন্তু অসুস্থতা বেড়েই চলে, তিনি হাঁটাচলার শক্তি হারিয়ে ফেলেন একসময়। হোটেল কর্তৃপক্ষ তাঁকে আর রাখতে রাজী হয় না। অত:পর হোটেলের লোকজনই তাঁকে মসজিদে রেখে আসেন। সেখানে কদিন থাকার পর সেখানকার লোকজনও বাদ সাধেন। কিন্তু যাবেন টা কোথায়?

এসময় একটি বৃদ্ধনিবাস থেকে তাঁর খবর পেয়ে গাড়ি আসে। উঠিয়ে নিয়ে যায় তাঁকে। ডাক্তার ডাকা হয়। অন্তিম মূহূর্ত। শেষরাতে স্ট্রোক করে ওই মামুলী মানুষটার। চোখ দুটো তাঁর উদাস, কাউকে খুঁজছিলেন আতিপাতি করে, কিন্তু সামনে ঝুঁকে পড়া মুখগুলোর সবই অচেনা ততক্ষণে। হাসপাতালে তাঁকে নিয়ে ভোররাতে ছুটে আসে বৃদ্ধনিবাসের গাড়ি। শহরের নিস্তব্ধতা খান খান হয়ে ভেঙে পড়ে তাঁর শেষযাত্রায়। তিনি চলে গেলেন। বৃদ্ধনিবাসের যিনি কর্মকর্তা, তিনি মুষড়ে পড়েন। বলেন, কিছুদিন আগে খবর পেলে হয়তো তাঁকে বাঁচানো যেতো। কিন্তু অবহেলা আর অপুষ্টি তাঁকে ক্ষয় করে ফেলেছিল অনেক আগেই।

মসজিদের কাছ থেকেই ছেলেদের ঠিকানা-ফোন নম্বর জোগাড় হয়ে যায়। ওরা সময় নেয় না। খবর পাওয়ার সাথে সাথে ছুটে আসে ‘প্রিয় বাবা’কে রিসিভ করতে। সশরীরী বাবার চেয়ে মৃত ‘লাশ বাবা’ই আজ তাদের কাছে অনেক মূল্যবান। এই দিনটির জন্য কতোই না অপেক্ষা করেছে তারা। তাই  এসে কান্নায় ভেঙে পড়তেও তাদের মনে দ্বিধা জাগে না। নিয়ে যায় মামুলী মানুষটাকে। দাফন করা হয় যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা অক্ষুন্ন রেখেই।

অত:পর সাজানো শোক সংবাদ ছাপা হয় একটি দৈনিক পত্রিকায়। আমরা সেই খবর পড়ি। মনে মনে তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি। শুধু জানা হয়না অধিকাংশ শোক সংবাদের পিছনের এসব গল্পকে।

 

শেয়ার করুন:
  • 113
  •  
  •  
  •  
  •  
    113
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.