যাদের জন্য প্রযোজ্য-২: মিডিয়া কর্মী

Sina Akhter
সীনা আক্তার

সীনা আক্তার: আমাদের সুশ্রী এবং ফ্যাশনেবল মডেল, শিল্পী, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মিডিয়াতে সপ্রতিভ উপস্থিতি দেখা যায়। তাঁদের পোষাক, সাজগোজ, চালচলন দেখে অনেকেই অনুপ্রাণিত হয়, বিশেষ করে তরুণরা। তাঁদের এই সপ্রতিভ উপস্থিতির অনেকটা কৃতিত্ব মিডিয়া কর্মীদের, বিশেষ করে ক্যামেরাব্যক্তি এবং নির্দেশকের।

কিছুদিন থেকে লক্ষ্য করছি, আমাদের সুশ্রী মডেল, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কংক্রিটের ‘রাস্তায়’ দাঁড়ানো, বসা এবং দৌড়ানোর ছবি। ক’দিন আগে প্রথম সারির এক অনলাইন পত্রিকায় দেখলাম এক মডেল রাস্তায় উপুড় হয়ে শুয়ে ছবি তুলেছেন।

আমার ধারণা, ক্যামেরাব্যক্তির নির্দেশেই তাঁদের রাস্তায় দাঁড়িয়ে বসে, দৌড়ায়ে, শুয়ে ছবি তুলতে হয়। এমনটা শুধু স্থিরচিত্রে হয়, তা না। আমাদের নাটক- সিনেমায় অনেক সময় দেখা যায় কংক্রিটের রাস্তার মাঝ দিয়ে অভিনেতা-অভিনেত্রীরা হাঁটছেন…কথা বলছেন, এমন কি ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ী চলাচল অবস্থায় এমন দৃশ্য দেখা যায়। এছাড়া, রাস্তার মাঝখানে সমস্ত বাদ্যযন্ত্র নিয়ে ব্যান্ড দলের শিল্পীরা গাইছেন, এমনটাও দেখা যায় মাঝে মাঝে।

নাটক-সিনেমা-অনুষ্ঠান চিত্রায়নের আরো একটি পরিচিত জায়গা হচ্ছে, রেল লাইন। ছোটবেলা থেকে আমরা টিভি-সিনেমায় দেখে আসছি নায়ক-নায়িকা অভিসারে যায় রেল লাইনের ধারে…দুজনে হাত ধরাধরি করে লাইনের উপর হাঁটে, বসে গল্প করে, গান গায়…কত কি! গানের শিল্পীরা রেল রাইনে দাঁড়িয়ে, হেঁটে হেঁটে গান গায়। বলাইবাহুল্য, নাটক-সিনেমা-অনুষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্টতা না থাকলেওকংক্রিটের রাস্তা এবং রেল লাইন অনেক নির্দেশক- ক্যামেরাব্যক্তির অতিপছন্দের শুটিং লোকেশন!

বাস্তবতা হচ্ছে, রাস্তা এবং রেল লাইন নির্দিষ্ট যানবাহন চলাচলের জায়গা, যা সাধারণের হাঁটাচলার জন্য বিপদজনক এলাকা হিসাবে বিবেচিত। শুধু মানুষের জন্য নয়, পশুর জন্যও বিপদজনক এলাকা হিসাবে চিহ্নিত।

যেমন, অনেক দিনে আগে একবার ব্যাংকক থেকে পাতায়া নামক শহরের দিকে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ লক্ষ্য করলাম রাস্তার দু’ধারে একটু নীচু করে দেয়াল দেয়া। কৌতূহল নিয়ে ভ্রমণ গাইডকে জিজ্ঞেস করলাম এবং সে জানালো, পশুদের নিরাপত্তার জন্য এই দেয়াল দেয়া হয়েছে, যাতে তারা রাস্তায় এসে মারা না পড়ে।

একদিকে মানুষের নিরাপত্তায় আমাদের রাষ্ট্রের ব্যবস্থা সীমিত, যা আমরা মেনে নিয়েছি বলা যায়। অন্যদিকে, আমাদের মিডিয়া আমাদের এই ভয়ংকর বার্তাই দেয় যে, কংক্রিটের রাস্তা এবং রেল লাইন ঘোরাঘুরি, ছবি তোলা এবং অভিসার করার স্থান।

লজ্জার বিষয় হচ্ছে জনস্বার্থবিরোধী এই বার্তার জন্য সেন্সর বোর্ড কখনো কোন চলচ্চিত্রকে আটকে দিয়েছে, আমি শুনিনি। একই কারণে টিভি নাটক-অনুষ্ঠান প্রচার, পত্রিকায় ছবি প্রকাশ নিষিদ্ধ হয়েছে শুনিনি।

মিডিয়াতে জনস্বার্থ বিরোধী বার্তার করুণ প্রভাব মাঝে মাঝেই মিডিয়াতে খবর হয়। যেমন, গাড়ীতে চাপা পরে, রেলে কাটা পরে মৃত্যু সংবাদ। গত ক’বছর আগে কানাডায় বড় হওয়া এক তরুণী তাঁর বন্ধুর সাথে রেল লাইনের ধারে বেড়াতে গিয়ে রেলের ধাক্কায় মারা যান। এদের মত অনেক তরুণ-তরুণীই নাটক-সিনেমার নায়ক-নায়িকা-শিল্পীর মত রাস্তা-রেল লাইনের ধারে সময় কাটাতে যান। কারণ আমাদের মিডিয়া তাদের এমন বার্তাই দেয়।

আরো অনেক কারণ হয়তো আছে কিন্তু এসব ক্ষেত্রে মিডিয়ার বার্তা অন্যতম বলেই আমার মনে হয়। মোটকথা, আমাদের জীবনে মিডিয়ার প্রভাব ব্যাপক। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের শারীরিক-মানসিক সুস্থতা, নিরাপত্তা, মানসগঠনে মিডিয়ার দায়িত্বশীলতা বিষয়ে অধিকাংশ মিডিয়াকর্মীর সচেতনতা নেই। কারণ অন্য অনেক বিষয়ের মতই মিডিয়ার নেতিবাচক কাজের কোন তদারকি নেই, এর বিপদজনক প্রভাব বিষয়ে তেমন কোন পদক্ষেপ নেই। কিন্তু সুখের বিষয় হচ্ছে, আমাদের একটা তথ্য মন্ত্রনালয় আছে, সেখানে লোকবল এবং অর্থ আছে, সেখানে একজন মন্ত্রীও আছেন!

ড. সীনা আক্তার। লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিকসের পোষ্ট গ্রেজুয়েট, প্যারেন্টিং পেশাজীবি।

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.