‘যুদ্ধশিশু’তে আমার শেকড় কোথায়?

Bustard Child 1রাওয়ান সায়েমা: যখন নিজের শেকড় কেউ উপস্থাপন করে তখন মানুষ মাত্রই একটা আত্মার টান অনুভব করে। আর এই টান থেকেই দিন তিনেক আগে ভারতীয় নতুন চলচ্চিত্রকার মৃত্যুঞ্জয় দেবব্রত এর ‘যুদ্ধশিশু’ চলচ্চিত্রটি দেখতে যাওয়া।

পিরিওডিক্যাল ফিল্মের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সেই পিরিওড এর কৃষ্টি ,কালচার , ভাষা , স্থাপত্য, ভৌগোলিক অবস্থা, পরিবেশ পারিপার্শ্বিকতা, মানুষ তথা সমাজের সামাজিক -রাজনৈতিক- অর্থনৈতিক- মানসিক অবস্থা, আচার আচরণ এমনকি কুসংস্কার, ধর্মীয় মূল্যবোধ সহ সেই সময়কে ফ্রেমবন্দী করে জীবন্ত করে তোলা। যেহেতু পিরিওডিক্যাল ফিল্ম একঅর্থে ইতিহাস হিসেবে গণ্য করা হয় তাই সমাজে এর দায় এবং দায়িত্বের ভার অনেক। এবং একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার নিজস্ব ফ্যান্টাসি বা ইমাজিনেশনের চেয়ে বাধ্যতা বা কমিটমেন্ট এর জায়গাটা থাকে নিরপেক্ষভাবে ইতিহাস তুলে ধরার মধ্যে যেটা ‘যুদ্ধশিশু’ নামক চলচ্চিত্রে অনুপস্থিত ছিল।

চলচ্চিত্রটির কম্পোজিশন ভালো। যুদ্ধ ফটোগ্রাফির অনেক জনপ্রিয় ফটোর অনুরুপ কম্পোজিশন খুব সার্থকভাবে ভিজুয়ালাইজ হয়েছে। তবে ভাষা, ভাষা প্রকাশের ভঙ্গি, উচ্চারণ প্রকাশ করে সে জাতির অন্তরাল এবং বাহ্যিক অভিব্যক্তি এবং চলচ্চিত্রের প্রথমেই ডায়লগ শুনে মনে হয়েছে ডাবিংকৃত ‘মিনা কার্টুন’ দেখছি! এমনকি ৭১ এ ভাষার যে উচ্চারণভঙ্গি তা ২০১৩ তেও? কয়েক মাইল অন্তর অন্তর ভাষার যে ভেরিয়েশন সেটা নাহয় একজন বিদেশীর না জানারই কথা, কিন্তু তাই বলে ভাষার বিবর্তন? গড়ে প্রত্যেক দশ বছরে ভাষার বোধগম্য পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়।

একটি পিরিওডিক্যাল চলচ্চিত্র বানানোর সাহসটা যিনি করেছেন তার কাছ থেকে আমি এটুকু আশা করতেই পারি একজন চলচ্চিত্র শ্রমিক হিসেবে।

এবার আসুক ভৌগোলিক পরিবেশ। গোপালগঞ্জে মিলিটারিরা ক্যাম্প করেছে, সবুজ পাহাড়ের পাশে বালুময় উঠোনে তারকাটা দিয়ে ঘেরা কাঠের ক্যাম্প! গোপালগঞ্জে পাহাড় , বালু , তারকাটা , কাঠ? এগুলো যুদ্ধভিত্তিক সকল মশলাদার বলিউডি সিনেমাতে দৃশ্যমান যা কপি করা হয়ে থাকে ওয়ার্ল্ড ওয়ার সহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর যুদ্ধ নিয়ে নির্মিত বিদেশী চলচ্চিত্রে।

মানলাম বিদ্যুতের খুঁটি এভয়েড করার কথা দেবব্রতর মাথায় ছিল তাই উনি গোপালগঞ্জকে পাহাড় পর্বতে বসিয়েছেন, তাহলে প্রশ্ন আসে টেলিফোন এর তার আসল কিভাবে? পিরিওডিক্যাল ফিল্মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ স্থাপত্য আর ‘যুদ্ধশিশু’ নামক ভারতীয় চলচ্চিত্রে দৃশ্যায়িত স্থাপত্য বাংলাদেশের সাথে মিলে না। তাছাড়া সেই সময়ে ঢাকা শহরে এত সরু অলি গলি ছিল না বরং বেশ ফাঁকা ছিল , যুদ্ধের কিছু সিকোয়েন্স দেখে মনে হইছে ডিরেক্টর ভারতের হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার ভিজুয়ালাইজ করছেন।

সেই সময়ে মুক্তিযুদ্ধ এবং মিলিটারি এই কথাদুটো সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত শব্দ। সেখানে মিলিটারি কথাটা একবারও আসেনি। একটু ভাবেন প্রথমদিকে তখনকার আপামর গ্রামজনতা থেকে সাধারণ মানুষ ভাবতেই পারেনি যে নতুন একটা রাষ্ট্র , নতুন একটা দেশ গঠন হবে এবং তারা নিজেদের পাকিস্তানি হিসেবে চিনত । তাইলে পাকিস্তানি হয়ে পাকিস্তানি পাকিস্তানি আসবে বলে চ্যাঁচাবে নাকি মিলিটারি আসছে বলে চ্যাঁচাবে?

তাছাড়া বাংলাদেশে যত ডকুমেন্স , ডকুমেন্টারি বা সিনেমাতে কোথাও দেখলাম না পাকিস্তানি আসছে বলে গ্রামের আমজনতা চিৎকার করছে! আয়রন করা সাদা পাঞ্জাবি পড়ে পরিপাটি হয়ে ‘আজাদি আজাদি’ বলে চেঁচিয়ে আয়েশী ভঙ্গিতে যুদ্ধ!

আজাদি? এটা মানে কি? আহা! মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সবাই সাদা পোষাক, কারো কাঁধে উত্তরীয় টাইপের বস্ত্র! অথচ গামছা নাই! ক্যাম্পে মেয়েদের অসামঞ্জস্য পোষাক , প্রত্যেকটি মেয়ের ভুরু প্লাগ করা , পাঞ্জাবি পরিহিত মানুষজন দেখে মনে হল এটা কোন বাংলাদেশ?

শাহবাগ আন্দোলনের ছেলেটার চোখে সুরমা কেন ? গলায় তাবিজ কেন? ঈদের দিনেও সুরমা পড়ার প্রথা প্রায় বিলুপ্ত যেখানে ! ন্যারেটিভ যখন মনোলগ হয়ে যায় ! অহেতুক কিছু সিকোয়েন্স! বাচ্চা ছেলেটা ও বাচ্চা মেয়েটার হারিকেন নিয়ে অলিগলি পেরিয়ে শুতে যাওয়া এবং তা দেখে বাবার মুখের পরিতৃপ্তির হাসির মানে কি? হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি? তা দেখানোর জন্য আগের সিকোয়েন্সগুলো যথেষ্ট !

আবার বাচ্চা ছেলেটাকে ইন্ডিয়ার বর্ডার ক্রস করার সময় গুলি করে মারল , মেয়েটাকে ছেড়ে দিল কেন? আর ইন্ডিয়ার বর্ডার গার্ড কই ছিল? শরণার্থী ক্যাম্পের এত কাছে মিলিটারি ! আবার ক্যাম্পে উল্টা করে ঝুলিয়ে রাখা মুক্তিযোদ্ধার মুখে হিসু করা দেখালেও পরের শটে মুখ তো ভেজা দেখা গেল না!

মিলিটারিদের বিপক্ষে মিশনে নামার আগে আমির ও তার দুই সঙ্গী পথে মশাল জ্বালিয়ে গল্প করতে করতে হেঁটে যায়! গেরিলা যুদ্ধে রাতে জ্বলন্ত মশাল ? ক্যাম্পে অবস্থানরত মেয়েরা রাতে ঝরণায় গোসল করতে যায় কোনপ্রকার পাহারাদার ছাড়া তারপরেও তারা গোসল ছেড়ে সুবোধ বালিকার মত ক্যাম্পে ফিরে আসে! ক্যাম্পে তারা নেচে , গেয়ে , ঝাড়ু দিয়ে এবং ধর্ষিত হয়ে জীবন-যাপন করে এবং রাতে পাহারা ছাড়া ক্যাম্পের বাইরে গিয়ে ফিরে আসে? এসবের মানে কি? ইতিহাস বিকৃতির এমন জলজ্যান্ত নিকৃষ্ট নির্লজ্জ উদাহরণ আর কি হতে পারে?

আর পিরিওডিক্যাল ফিল্মের নাম করে সিনেমার শরীরে আষ্টেপৃষ্ঠে বিকৃতি জড়িয়ে বাংলাদেশী তথা বাংলাদেশকে খাটো করেও চলচ্চিত্রটি সেন্সর পায় কিভাবে! আশা করছি প্রশাসন এ ব্যাপারে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.